ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

গার্মেন্টস কারখানায় আগুন লেগে জান-মালের ক্ষতির ঘটনা প্রায়শই ঘটে। আমাদের দেশের সূদীর্ঘ কালের গার্মেন্টস শিল্প বিকাশের পথ পরিক্রমায় অগ্নিকাণ্ডের কারনে বহু জান ও মালের ক্ষতি হয়েছে। হৃদয় বিদারক ঘটনাও ঘটেছে যার একটি অতি সম্প্রতি আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টসের ঘটনা। ১১০ জন নিরীহ, নিরপরাধ, পোষাক শিল্পের কর্মী আহুনে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে করুণ মৃত্যু বরণ করেছেন। দেশ ব্যাপী এমন কি সারা বিশ্বে এই মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জাতি শোক পালন করেছে। সরকার পোষাক কারখানা গুলিতে একদিনের সাধারণ ছূটি ঘোষনা করেছে।

দেশের সচেতন মহল এমনতর হৃদয়বিদারক দূর্ঘটনার বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। মিডিয়ার সকল মাধ্যমে খবর ও পর্যালোচনা হয়েছে কেন এমন দূর্ঘটনা ঘটে, এর পিছনে কার দায় রয়েছে? দূর্ঘটনা না ঘটার জন্য কে কি দায়িত্ব পালন করতে পারতেন? মালিকের কি দায়? বিজিএমই এর কি দায়-দায়িত্ত্ব, বায়ারদের নিয়োজিত কমপ্লাইয়েন্স অডিট কোম্পানীদের কি করনীয় ছিল এই সব বিষয়ে পুঙ্খনুপুঙ্খ আলোচনা হয়েছে, মতামত এসেছে। তাজরীন ফ্যাশনের ঘটনা কি নিছক দূর্ঘটনা নাকি অবহেলা, নাকি অর্ন্তরঘাতমূলক কোন কাজ? এই ধরনের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।

এক এক করে দূর্ঘটনা, অবহেলা বা অর্ন্তরঘাতের উপর আলোকপাত করা যেতে পারে।

দূর্ঘটনা একটি দৈব কর্ম। যেকোন সময়, যেকোন স্থানে, যেকোন পরিস্থিতিতে দূর্ঘটনা ঘটে তবে সক্রিয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেকোন অবস্থায় দূর্ঘটনার সম্ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে অথবা এর ক্ষয়-ক্ষতি কে সীমিত করে। তাই দূর্ঘটনে প্রতিরোধে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ যারপরনাই জরুরী। আমাদের দেশে গার্মেন্টস কারখানায় আগুন, সড়ক দূর্ঘটনা, লঞ্চডুবি, অবকাঠামোর ধ্বস ঘটেই চলেছে। আমারা প্রতিটি ঘটনার পর পর কিছুদিন খুব তোড়জোড় করি কিন্তু সময়ের ব্যাবধানে আবার সব ভুলে যাই, আবার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

প্রকৃতপক্ষে পূণঃ পূণঃ দুর্ঘটনা আমাদের কি কিছু শিক্ষা দেয়? সড়ক দূর্ঘটনার দায়-দায়িত্ত্ব কার? হয়তো মালিকের কারন তিনি গাড়ী চালানোর জন্য ভাল চালক রাখেননি বা যন্ত্রাংশ নিয়মিত বদলে গাড়ীকে ফিট রাখেননি; হয়তো চালকের। কারন তিনি হয়তো অসাবধানে গাড়ী চালিয়েছেন। হয়তো সরকারের কারন সরকারের কর্তৃপক্ষ হয়তো সঠিক ভাবে সড়কের রক্ষনাবেক্ষন করেননি। হয়তো পথচারীর, কারন তিনি অসবধানে রাস্থায় চলছিলেন। এই যে এত সব নানামূখী কারন একটি ঘটনায় থাকতে পারে তার জন্যই দূর্ঘটনার পর তদন্ত করে বের করতে হয় প্রকৃত কারন বা কারন গুলি কি? গার্মেন্টস ফ্যক্টরীর অগ্নিকান্ডের ক্ষেত্রেও দূর্ঘটনা ঘটলে তার পিছনে থাকবে তার অনেক কারনের একটি বা কতিপয় কারন। অবহেলা (ঘটনা ঘটাকালীন) বা অর্ন্তঘাতকে বাদ দিলে দূর্ঘটনার কারন হিসাবে দেখা যায় বৈদ্যুতিক এবং যান্ত্রিক কারনই সামনে আসে। এর জন্য মালিক প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভাবে দায়ী। কারন হয় তিনি ভাল মালামাল ব্যবহার করেননি বা তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভাল মানবসম্পদ নিয়োজিত করেন নি। অতএব তিনি দূর্ঘটনা প্রতরোধে ব্যর্থ।

অন্যদিকে “অবহেলা” মালিকের পক্ষেও হতে পারে, কর্মকর্তাদেরও হতে পারে। আবার সরকারের বিভিন্ন প্রতষ্ঠানেরও হতে পারে। মালিক যদি অবহেলার বশে অগ্নি নির্বাপন যন্ত্রপাতি না ক্রয় করেন, বা নির্মান ব্যয় কমাতে ত্রুটি রেখে দেন তো তা অবহেলা ছাড়া আর কি? কর্মকর্তাগন স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন না করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সচল না রাখে তবে তা পরিষ্কার অবহেলা।

অর্ন্তঘাত (স্যবোট্যাজ) একটি আলোচিত বিষয় পোষাক শিল্পের প্রেক্ষাপটে। বিদেশী স্বার্থ আছে এমন কথা শোনা যায় অহরহ। কিন্তু এইসব বিষয় কেবল ধোঁয়াশাই থেকে যায়। কারখানার ভেতরের সমস্যা যেমন মধ্যম লেভেলের কর্মকর্তাদের ভুল বা অযোগ্যতার কারনে সৃষ্ট ক্ষোভ অনেক সময় কারো কারো মনে অর্ন্তঘাত প্রবনতার সৃষ্টি করে। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি পরিস্থিতি। কারখানার ব্যাবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এই ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক হতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে এধরনের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। কারখানার সঠিক কর্ম পরিবেশ রক্ষা করলে এমন হবার নয়।

কমপ্লাইয়েন্স বিষয়ে কিছু বলা উচিৎ। বর্তমানে অন্যান্য শিল্প-কারখানা স্থাপনের মতই গার্মেন্টস শিল্প স্থাপন করতে এই সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন মেনে তবেই করতে হয়। কাষ্টমস বন্ড, ব্যাংক, আয়কর, কারখানা পরিদর্শকের ছাড়পত্র, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ফায়ার লাইসেন্স সবি নিতে হয়। বিজিএমইএ/বিকেএমইএ তাদের সদস্য করার পূর্বে সবকিছু ঠিক-ঠাক আছে কিনা দেখে দেয়। না থাকলে সদস্যপদ দেয় না। কারখানা স্থাপনের সকল নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান আর শর্ত পালনের মাধ্যমেই কারখানা প্রাথমিক ভাবে কমপ্লাইয়েন্ট হয়। এইটুকু বিধি-ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। এর উপর থাকে ক্রেতা কোম্পানীর নিজস্ব নিয়ম-কানুনের চাহিদা। দেশের প্রচলিত আইন না মানলে বেশীরভাগ ক্রেতা অর্ডার দেয় না। বড় বড় ক্রেতা (ব্র্যান্ড) দের চাহিদা থাকে বাড়তি। তারা তাদের নিজেদের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অডিট করায় আবার তৃতীয় পক্ষীয় বিভিন্ন কোম্পানীর মাধ্যমেও অডিট করিয়ে দেখে তাদের কাছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে তারা যে পরিবেশ ও বিধি-বিধান চান তা আছে কিনা। এর ভিত্তিতেই রেড, ইয়েলো, অরেঞ্জ শ্রেনীতে বিভক্ত হয় আমাদের গার্মেন্টস কারখানা গুলি। অনেক কারখানা কমপ্লাইয়েন্স এর বিধি-বিধান অর্থপূর্ণ ভাবে মেনে চলে আর অনেক কারখানা কাগুজে ভাবে মেনে চলে বলে জানা যায়। ক্রেতা কোম্পানী গুলোর কাছেও এসব হয়তো অজানা নয়। তারাও এসব মানেন তাদের দেশের আইন মেনে চলার জন্য। কমপ্লাইয়েন্স কে মেনে চলতে হবে কারখানার স্বার্থেই। মালিককে বুঝতে হবে এই গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা। প্রফেশনালদের এটাই গুরু দায়িত্ব। আর্ন্তজাতিক প্রতিযোগীতামূলক বাজারে কমপ্লাইয়েন্ট থাকা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন, প্রায় অসম্ভব। সুতরাং অর্ডার পেতে, অস্তিত্ব রক্ষা করতে, দূর্ঘটনা এড়াতে, সুষ্ঠ কর্ম পরিবেশ বজায় রাখতে কারখানাকে কমপ্লায়েন্ট রাখা অতীব জরুরী।

একটি বিষয় না বললেই নয় তা হলো পোষাক শিল্পের যে কোন দূর্ঘটনার পর পরই আমাদের দেশে শুরু হয় এক ধরনের জটিল কর্ম-কান্ডের স্রোতধারা। রাজনৈতিক দল গুলি পরস্পর দোষারোপ করে, শ্রমিক ভাই-বোনেরা রাস্তায় নেমে আসে, মিডিয়া সোচ্চার হয়ে কখনো কখনো পরিস্থিতির মাঝে নাজুকতা সংযোজন করে ফেলে। এর ফলে কোন কোন অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। জান ও মালের ক্ষয়-ক্ষতি হয়। মিডিয়ার ভূমিকা প্রোএক্টিভ হতে পারে কিনা ভেবে দেখা দরকার। সাম্প্রতিক কালের ঘটনায় কোন কোন টিভি চ্যানেল পুরো নিউজ জুড়েই রেখেছিলো তাজরীন ফ্যাশনের খবর।

তৈরী পোষাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলির সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এই শিল্প খাতের মালিকদের সংগঠন হিসাবে নানামূখী কার্য্যক্রম পরিচালনা করলেও নানা কারনে তাদের কাজের সমালোচনা হয়, হচ্ছে। অন্যান্য সকল ক্ষেত্রের মত এসব প্রতিশঠানেরও রাজনীতিকরন হয়েছে। রাজনীতি সব কিছুকেই হয় এক পেশে না হয় ভাগাভাগি করে দেয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে। যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ এর জন্য চাই যে কোন রকমের চাপবিহীন পরিবেশ। বিজএমইএ অনেক ভাল কাজ করে, করছে। বাইরে থেকে আমারা তা বেশী একটা দেখতে, বুঝতে পারিনা। আবার তাদের প্রচার-প্রচারণাও দুর্বল গোছের। অন্যদিকে এমন দুঃখজনক ঘটনা বিজিএমই এর অনেক সফলতাকেই ম্লান করে দেয়।

এই শিল্পের সাথে জড়িত অনেকের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি যে অনেক ত্যাগ এর বিনিময়ে পোষাক শিল্পের শ্রমিক-মালিকদের জোরালো অংশগ্রহণে আজ এই শিল্প এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। অনেক শ্রমিক ঘটনা-দূর্ঘটনায় প্রান দিয়েছে। অনেক মালিক নানান কারনে (যেমন আগুন লাগা, ভাঙচুর, অজ্ঞতা, এয়ার, ডিস্কাউন্ট, ষ্টকলট হয়ে যাওয়ার কারনে সব হারিয়ে পথের ফকির হয়ে গেছেন। অনেকে দেনার দায়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেকে শিল্পপতি থেকে আবার চাকুরীতে যোগদিয়েছেন বাধ্য হয়ে।

আজ এই শিল্পের প্রসারের কারনে ব্যাকোয়ার্ড শিল্পের বিকাশ হয়েছে। অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে ব্যক্তি পর্যায়ে। এতগুলো ব্যাংক, এতগুলো বীমা কোম্পানী, এত এত কঞ্জিউমার প্রডাক্ট এর কোম্পানি গড়ে উঠার পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সব চেয়ে বেশী হয়েছে নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। জাতি পেয়েছে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত, কর্মজীবি মা। নেপোলিয়ন একটি ভাল জাতির জন্য একজন ভাল মা চেয়েছিলেন কারন তিনি জানতেন ভাল মা ভাল সন্তান গড়ে তুলতে পারেন। আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা তাদের বর্তমান প্রজন্মের বাবা-মা এর চেয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাবে কেবল তাদের জনক-জননীর এই সক্ষমতার কারনেই।

না বললেই নয় যে এই শিল্পের জন্য সব সময়েই, সব সরকারের মাধ্যমেই অনেক সহযোগীতার নিয়ম, নীতিমালা এসেছে। আর এটা আসাটাও স্বাভাবিক ছিল। যে শিল্পের উন্নয়নে দেশের অর্থনীতিতে এমন বিরাট অগ্রগতি সংগঠিত হয় তার বিকাশ তরান্বিত কররা চেষ্টা কেন সরকার করবেনা? আর তা করে কেন আবার খোটা দিবে দেখ তমাদের জন্য আমারা এটা করেছি, ওটা করেছি? অন্যরাও বা কেন এই শিল্প কে বাঁকা চোখে দেখবে? এই ব্যবসায় যদি অনেক অর্থ-বিত্ত অর্জনের সুযোগ থেকে থাকে (যা আছেও বটে) তবে আপনিও এই ব্যবসা শুরু করুন। একে ঈর্ষা করবেন কেন? বাস্তবতা কি এই নয় যে সকলের অবদানেই আর দেশে সম্ববত একটি ইন্ডাষ্ট্রিই এই মানে যেতে পেরেছে যেখানে অনেক নীয়ম-নীতি মানতে হয়। দেশের আর কোন শিল্প খাত এতটা গোছানো অবস্থায় আস্তে পেরেছে? উন্নতির অনেক সোপান যে শিল্প পার হয়ে এসেছে তার প্রতি সবারই চাই দায়িত্ত্বশীল আচারন-অভিব্যক্তি। সঠিক ভাবে গড়ে তুলতে পারলে এই পোষাক শিল্পই হতে পারবে এই জাতির উন্ন্যন, উন্নতির অন্যতম প্রধান সহায়ক শিল্প।

শাকিল মনজুর
১৮/১২/২০১২