ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাস্থ্য

shetuAshrafulHoque

কষ্ট করে একটা লেখা তৈরি করতে চাইছিলাম কিছুদিন থেকে। চিন্তার উৎপত্তিটা হলো ব্লগার সেতু আশরাফুল হকের মৃত্যুর উপলব্ধিতে। একটা মানুষ যখন জানেন যে, একটা নির্দিষ্ট অংকের টাকা হলে উনি সুস্থ হয়ে উঠবেন, কিন্তু টাকাটা না এলে তিনি জানতেন, তাকে চলে যেতে হবে। এর চাইতে আর বেশি কষ্ট কি হতে পারে? যার অর্থই হলো, তিনি কোন চিকিৎসার সুবিধা পাবেন না, যদি না টাকা থাকে বা আসে।

আমরা এমন এক পৃথিবীতে আছি, সভ্যতা আমাদের অনেক সামনে নিয়ে যাচ্ছে, আর পাশাপাশি সে সুযোগগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত হতে হলে অর্থের একটা মানদন্ড এসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বৈজ্ঞানিক যত অগ্রগতিই হোক না কেন, তাতে করে সাধারণ জনগণের কোন লাভই আসছে না। প্রশ্ন হলো, বাস্তবতা এমন কেন? আর বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে তবে সুফল বা কতটুকু আসছে।

বাংলাদেশ নামক এখনো দরিদ্র দেশটি এই সুফল থেকে বড় বেশি বঞ্চিত হচ্ছে। এর তো একটা প্রতিকার হওয়া উচিৎ। যে মানুষটা তার শরীরে মরণঘাতি রোগ নিয়ে মৃত্যুকে ধীর পায়ে পায়ে কাছে আসতে দেখছে, সে ভালই করেই জানে, তার বাঁচার উপায় আছে, যদি বিজ্ঞানের আশ্রয়ে তার বাঁচার সুযোগটা ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে আনা যায়। সে ভাল করেই জেনে যাচ্ছে, এই সুযোগটা পৃথিবীর একটা বড় অংশের মানুষের আছে, যদিও সে অংশটা পুরো পৃথিবীর অনুপাতে এখনো অনেক ছোট। কিন্তু একটা অংশের মানুষ তো এই বাঁচার সুযোগটা ভালভাবেই পাচ্ছে। বিপরীতে তার নিজের বাঁচাটা অনেক সুদূর পরাহত হয়ে আছে। তার জীবনের সাধ-আহলাদ, পৃথিবীকে কিছু দেয়ার মারাত্মক প্রচন্ড আকুতি সব ফাঁকা দেয়ালে শুধুমাত্র নিষ্করুণ, নির্দয়, নিষ্ঠুরতায় বাড়ি খেয়ে ফিরে আসে। মানবতাবাদের উচ্চারণটা পরিহাস করে উঠে। এত এত দেশ নায়ক, বুদ্ধিবাদী নায়ক, মানুষের প্রতি ভালবাসার নায়ক থাকা সত্ত্বেও, যে জীবনকে অর্থের বিনিময়ে বাঁচানো সম্ভব, চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুবিধাকে কাছে নিয়ে এসে আকাঙ্খিত জীবনকে ধরে রাখা সম্ভব, তা আর হয়ে উঠছে না। একে তো মানুষ এবং মানবতার পরাজয় বলে ধরে নিতে হয়। আমরা দিনের পর দিন এমন একটি পরাজয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। আর যারা আপ্রাণ চেষ্টা করছে মানুষের কাছে আবেদন জানিয়ে, হাত পেতে একটা প্রাণের রক্ষার প্রচেষ্টায়, তারাও আমাদের মনুষ্যত্ব এবং মানবতার এই পরাজয়ে মনে মনে বা মানসিকভাবে লাঞ্চিত হচ্ছে, বিপর্যস্ত হচ্ছে। আমি কখনো কখনো করুণ চোখ মেলে তাদের দিকে তাকাই এবং নিজেদের দৈন্যতায় বড় কষ্ট পাই।

11_11
ছবিটি ফেসবুকের Tetul hugur-র থেকে নেয়া

অর্থ না হলে এই যে অনর্থ ঘটে যায়, এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কি খুব কঠিন? শুনেছি কিডনী সারাতে সেতু আশরাফুল হকের প্রয়োজন ছিল ৮০ লক্ষ টাকা। টাকার হিসেবে নিঃসন্দেহে এটা বড় একটা অংকই বটে। কিন্তু যে দেশে জনসংখ্যা ১৬ কোটি, যে দেশের একজন ভিক্ষুকের দিনে তার উপার্জন থেকে মাত্র এক টাকা দান করা অসম্ভব নয়, সে দেশ দরিদ্র হলেও একজনের জন্য ৮০ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করা খুবই সম্ভব। আমি বলতে চাচ্ছি ৮০ লক্ষ লোক মাত্র এক টাকা করে দান করলে ৮০ লক্ষ টাকা মাসে একবার কেন কয়েকবার তোলা যায়। কিন্তু এই ৮০ লক্ষ টাকা পেতে হলে আশি লক্ষ লোকের কাছে একটাই শর্ত দিতে হবে যে, তাদের কেউ যদি এমনই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, তবে এই আশি লক্ষ লোককে একই ভাবে তাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে দিতে হবে।

ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলো তো এইভাবেই কাজ করছে। আমাদের ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর দরকার নেই। দরকার শুধু একটা বিশ্বস্ত ব্যাংক একাউন্ট, যেখানে প্রতিটি টাকা সঞ্চিত থাকবে, আর দরকার ৮০ লক্ষ লোকের সেই একাউন্টে মাত্র এক টাকা করে টাকা জমা দেয়া। আর হ্যাঁ, খরচ একটা আছে, সেটা হলো সেই ৮০ লক্ষ লোকের একটা ড্যাটাবেজ তৈরি করা, যাতে তাদের নাম-ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর এবং প্রদত্ত অর্থের পরিমাণ অনলাইনে সবাই জানতে পারবে। একটা স্বচ্ছতা থাকবে, ব্লগ তৈরি করলে যেভাবে প্রতিটি লেখাই আমাদের চোখে পড়ে। যে টাকাটা জমা দিয়েছে, সেই তার নাম-ঠিকানা এবং টাকার পরিমাণ অনলাইনে জানাবে এবং জমা দেয়ার প্রুফটা দেখাবে। বড় যে প্রশ্ন থাকবে, তা হলো ব্যাংক একাউন্টটা নিয়ন্ত্রণ করবে কে?

আমি বলি, ব্যাংক একাউন্টটা কোন ব্যক্তি নামে হবে না, কেউই নিয়ন্ত্রণ করবে না। একাউন্ট তৈরিটা এমনভাবে হবে, যে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে রোগীটি চিকিৎসাধীন আছে, তাদের কাছ থেকে বিশ্বস্ত কাগজ-পত্র পেলেই শুধু ব্যাংক খরচটা পরিশোধ করবে। ব্যাংক সাথেও এমন বিশ্বস্ত চুক্তি হতেই পারে, কেননা আশি লক্ষ টাকা ব্যাংকে জমা হওয়াটা তো কম কথা না। ব্যাংকও প্রতি মাসে মাসে হিসেব-নিকেশ অনলাইনে তুলে ধরবে। কারো যে কোন প্রশ্নের উত্তর দেবে। ব্যাংকের তরফ থেকে জবাবদিহিতার ব্যাপারটা থাকতে হবে।

আমাদের হাতে প্রযুক্তি আছে, যে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আমরা ব্লগিং করছি, সেই একই প্রযুক্তি দিয়েই আমরা অনলাইনে ৮০ থেকে ১ কোটি লোকের একটা সহজ ডাটাবেজ তৈরি করে তাতে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কঠিন কোন রোগের তথ্য-উপাত্ত, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ সম্পর্কে সচেতনতা, বিবিধ প্রশ্ন ও উত্তর এবং সর্বোপরি, কারো কঠিন কোন রোগ হলে সাহায্য-সহযোগিতার আহবান জানিয়ে একটি ওয়েব-সাইট তৈরি করতে পারি। বাংলাদেশের বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর আর্থিক সহযোগিতায় এই ওয়েব-সাইটটি তৈরি হতে পারে। তাদের গুণগত পণ্যের বিজ্ঞাপন রাখা হলে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

এখন আসে উদ্বুদ্ধকরণ। ৮০ লক্ষ থেকে ১ কোটি লোককে এই রকম একটি মহতি কাজে জড়িত করা অনেক বড় ব্যাপার, যেখানে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে প্রত্যেকেই তাদের বিপদে একই সুবিধা পেতে পারে। আর এই কাজে নিবেদিত কিছু ব্লগার বা স্বেচ্ছাসেবী কিছু কর্মীর প্রয়োজন, যারা রাত দিন পরিশ্রম করে চলবেন সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর। প্রথমদিকে হোঁচট খেয়ে খেয়ে চললেও একসময় আমার বিশ্বাস, একটা অবস্থান দাঁড়িয়ে যাবে। রাতারাতি বিপ্লব হয়ে উঠবে, তা আমি বলছি না। বরং এরকম একটা উদ্যোগ থেকেই বড় কোন বৈপ্লবিক সূচনা হতে পারে।

সবাই ভেবে দেখবেন কি?