ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

সাম্প্রতিক সময়ে এই হিজাব-বোরকার দেশে মার্গারিটা মামুনকে ‘বাংলাদেশি কন্যা’ বা ‘বাংলাদেশের গৌরব’ বলে যখন কিছু বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশি মিডিয়াকে আত্মতৃপ্তিতে দেখি, তখন স্বভাবতঃই একটা প্রশ্ন এসে যায়, আসলে সে কি আদতে বাংলাদেশি হবার কারণে অলিম্পিকের রিদমিক জিমন্যাস্টিক-এর শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছে?

অন্তুর্জাল থেকে গৃহীত

যে দেশে এমনিতেই নারীদের বিভিন্ন খেলাধূলায় অংশ নিতে এখনো পারিবারিক বা সামাজিকভাবে অকথিত অবরোধ কাজ করে, সেখানে রিদমিক জিমন্যাস্টিকের মত একটা ইভেন্টে খাটো কাপড় পরে (বিশেষ করে নিম্নাঙ্গে), মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের ক’জন মেয়ে মাঠে নামতে সাহস করবে? জঙ্গি এবং হেফাজত-মার্কা ইসলামী কট্টর মৌলবাদীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করার মত ক’জন বাংলদেশি পরিবার এবং কন্যা সন্তান এইসব শারীরিক কসরতে নিমগ্ন হতে চাইবে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূক্তির কথা না হয় বাদই দিলাম। তাছাড়া সংবাদপত্রের বদৌলতে কয়েক বছর আগে দেখেছিলাম, মেয়েদের ফুটবল খেলাতেও এই ধরণের মৌলবাদীদের প্রতিবাদ বা উৎপাত।

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে মহিলা ম্যারাথন নিয়ে যে কটূক্তিগুলো ফেসবুকে চোখে পড়লো, তাতে বোঝা যায়, নারীদের নিজেদের শারীরিক উন্মোচন এই দেশে একটা বড় ধরণের ট্যাবু। অথচ ম্যারাথনে মহিলারা যে পোষাক পরে ছিলো, সেটা যথেষ্ট রক্ষণশীল। নীচের ইউটিউব লিংকে প্রতিযোগী আফরিন জোহার বক্তব্যে করুণ সত্যটা ফুটে উঠেছে। সে বলেছে, “… প্রফেশনাললিও যদি আপনি খেলাটাকে নিতে চান, পারিপার্শ্বিক অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। আমাদের যখন, একটা মেয়ে যখন খেলতে নামে তখন তার গেট-আপ, ড্রেস-আপের জন্যও অনেক ধরণের কথার সম্মুখীন হতে হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটা, অনেক আগানোর পরও আমরা অনেক কিছুতে অনেক পিছিয়ে আছি। ফিফটি পার্সেন্ট যদি আগিয়ে যায়, এখনো ফিফটি পার্সেন্ট, এখনো মন-মানসিকতা এতটা ওপেন হয় নি।” নতুন প্রজন্মের একজন মেয়ে যখন উপরোক্ত কথাগুলো বলে, তখন বোঝা যায়, বাংলাদেশের মেয়েরা খেলাধূলায় কোন পরিস্থিতিতে আছে।

ঢাকা মহিলা ম্যারাথন ২০১৬

নারীকে নিয়ন্ত্রণে থাকতে হয় পুরুষের। আর তা নাহলে পুরুষের পৌরুষত্বে বা ইগো-তে বাধে। এমনকি নারী নিজেও তার সত্ত্বার মুক্তি বা স্বাধীনতায় সচেতন নয়। ছোট্ট একটা ঘটনার কথা বলি। অনেক আগে বিটিভিতে মগ্ন হয়ে রাশান এক ব্যালেরিনার ব্যালে দেখছিলাম। এসময় পাশে বসা দু’জন অতিথির একজন, এক বয়সী মহিলা বলে ফেললেন, এদের কি বেহেশতে জায়গা হবে? অন্যজন তিরিশোর্ধ্ব যুবক মহিলার সাথে কন্ঠ মেলালেন। বর্তমান বাস্তবতা তো সেই আগের চেয়ে সঙ্গীন। এখন বাংলাদেশে যেখানে হিজাব এবং বোরকার প্রচলন দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে বেড়েই চলেছে, সেখানে মার্গারিটার ছান্দিক জিমন্যাস্ট নিয়ে আগামী ১০০ বছর কেন ১০০০ বছরেও বাংলাদেশ থেকে নতুন একজনের তৈরি হওয়া তো দূরে থাক, এইসব জিমন্যাস্টিক নিয়ে মাঠে নামার প্রশ্নই আসবে না।

যতই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বলা হোক না কেন, মার্গারিটা বংশগতভাবে এই গুণটা অর্জন করেছে তার মার রাশান জিন থেকে। “তার মা সাবেক রিদমিক জিমন্যাস্ট, তার হাত ধরেই এই খেলায় হাতেখড়ি রিটার। পরে সেখান থেকে এ বছর প্রথমবারের মতো অলিম্পিকে অংশ নিয়েছেন তিনি।” শুধু হাতেখড়িই নয়, এর পুরো লালন-পালন হয়েছে রাশিয়ায় থাকার কারণেই। কারণ রাশানদের এই ঐতিহ্য আজকের নয়, যুগ যুগ ধরে।

অন্তর্জাল থেকে গৃহীত

আর বাংলাদেশের আদৌ কি কোন ছান্দিক জিমন্যাস্টিক ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে, যার কারণে রিটা-কে নিয়ে আমরা গর্ব করবো? আর যে পোষাক-আশাকে এই ধরণের ছান্দিক জিমন্যাস্টিকে অংশ নেয়া প্রয়োজন, সেরকম বাস্তবতা কি বাংলাদেশ তৈরি করতে পেরেছে? ক্রীড়াবিদ না হয়েও বাংলাদেশের জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিবের স্ত্রী-র পোষাক-আশাক কীভাবে জঙ্গি ছাগুদের আক্রমণের স্বীকার হয়েছে বা হচ্ছে, সেটা কী ফেসবুকের কল্যাণে আমরা কম জানি!

কালো আফ্রিকান, জ্যামাইকানরা ইউরোপ, এমেরিকায় এসে, সেসব দেশের আলো বাতাসে বেড়ে উঠে, এবং সে সাথে ওসব দেশে অনুশীলন করে ঐ দেশের একজন হয়েই অলিম্পিক বা অন্য ধরণের বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সে হিসেবে, মার্গারিটা মামুনের তার বাবার ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় ছাড়া জিমন্যাস্টিকের ক্ষেত্রে আদৌ কোন বাংলাদেশি ইতিহাস বা ঐতিহ্য নেই।

সুতরাং আত্মতৃপ্তির ক্ষেত্র বাংলাদেশিদের এতটুকুই – রিটা আমাদের আত্মীয়, শুধুই চাচাতো বা মামাতো বোন অথবা ভাতিজী বা নাতনী!