ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বনাম ইসলাম – ১ম পর্ব

‘৭১-পূর্ব পাকিস্তানিরা যা করে উঠতে পারেনি, কট্টর মৌলবাদী হেফাজত -এ ইসলামীরা ‘স্লো পয়োজনিং’-এর মত এখন তাই করে যাচ্ছে। শুরুতে একটা নির্দোষ প্রজাতির লেবাস লাগিয়ে সরকারকে পথভ্রষ্ট করার মিশন নিয়ে এগিয়েছে। পৃথিবী এখন যে পর্যায়ে এসেছে, ধর্মগুলি অনেক আগে থেকেই মানুষের মাইক্রোস্কোপের নীচে এসে গেছে। সব ধর্মকেই মানুষ কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিচ্ছে। যখন কোরআন এবং নবী মুহাম্মদকে নিয়ে কোন প্রশ্ন করা হলেই তা সহ্য করতে না পেরে কট্টর মুসলিমরা মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীদের উপর চাপাতিহস্ত হয়, ইসলাম এবং নবীকে কটূক্তি করা হচ্ছে বলে বিষোদগার করা হয়, তখন তার দায় কোনভাবেই মুক্তমনাদের উপর পড়ে না। দুর্বল মস্তিষ্ক এবং চিত্তই মুক্তবুদ্ধির আলোচনাকে ভয় করে। এরা প্রকারান্তরে জানিয়ে দেয়, ইসলাম মুক্ত বুদ্ধির চর্চাকে সমর্থন করে না। মূলতঃ এসব বিষোদগারের পেছনে রাজনৈতিক কারণটাই সবচেয়ে বড়। আমজনতাকে উস্কে দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করা যায়।

এই কারণেই হেফাজত ২০১৩-তে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হলে মুক্তিবুদ্ধি চর্চার ধর্ম বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী ব্লগারদের নাস্তিক ট্যাগ লাগিয়ে ফাঁসির দাবি করেছিলো। একটা ধর্ম বিশ্বাসী গোষ্ঠীর অস্তিত্বে কত বড় টান পড়লে তারা এমন দাবি করতে পারে, ভেবে অবাক হই। অথচ তাদের শেকড় হাজার বছরের পুরাতন, এই ভূ-খণ্ডে কয়েক শতাব্দীর। তাদের মূল উদ্দেশ্য যে ছিল অরাজনীতির আড়ালে রাজনৈতিক, সেটা বুঝে উঠতে আমজনতার সময় লেগে গেলেও, ভুক্তভোগী মুক্তমনাদের সময় লাগেনি। একটা সুপরিকল্পনা নিয়ে তারা এগিয়েছে, এবং সফলতাও অর্জন করেছে। কিন্তু তথাকথিত বাংলাদেশি শিক্ষিত বাঙালি, বুদ্ধিজীবী এবং সংস্কৃতিমনাদের বুঝে উঠতে এত সময় লাগছে যে, তাতে অবাক হতে হয়।

অথচ ‘৭১ পূর্ব বাংলাদেশে শিক্ষিত বাঙালি, বুদ্ধিজীবী এবং সংস্কৃতিকর্মীরাই সবার আগে শত্রু পক্ষের দুরভিসন্ধি বুঝে ফেলেছে। যার কারণেই ‘৫২-র ভাষা অন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটা আন্দোলনেই বাঙালিরা জয়ী হয়েছে। ‘৭১-ও তাই। সকল অন্যায়-অবিচার-চক্রান্তকে বাঙালি মগজ এবং মনন দিয়েই মোকাবেলা করেছে। ফলশ্রুতিতে বাঙালির জাতীয় জীবন থেকে মাতৃভাষাকে, রবীন্দ্রনাথকে বিতাড়িত করার চক্রান্ত থেমে গেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এখনকার সময়ের বাঙালি শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের মৌলবাদী হেফাজতি আস্ফালনের বিরুদ্ধে শুরু থেকে কার্যকর কোন প্রতিবাদ, প্রত্যুত্তর বা কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি কেন? যে প্রতিরোধ এবং প্রতিবাদের সূচনা হয়েছে তা ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিস্টদের দ্বারা তৈরিকৃত গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে। এমন কি যখন নিরীশ্বরবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের উপর চরমপন্থী ইসলামপন্থীরা নির্মমভাবে চাপাতিহস্ত হচ্ছিল, তখন শিক্ষিত জনগণের ঐ অংশকে সম্পূর্ণ নির্জীব দেখা গেছে। আপামর মুসলিম বাংলাদেশিদের কথা নাই বা বললাম।

উপরোক্ত প্রশ্নের দু’টো উত্তরই মেলে। প্রথমতঃ,’৭১ পূর্ব আমাদের সংকটটা ছিল জাতিগত গোষ্ঠী স্বার্থের এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং আচরণ থেকে মুক্তি। ’৭১-পরবর্তী তা এসে গেছে ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধি এবং অর্জনের। সুতরাং ক্ষমতাসীন এবং বিশেষ শ্রেণীর বিরাগভাজন হয়ে নিজেদের অর্জন এবং অস্তিত্বকে কেউ সংকটাপন্ন করে তুলতে চান না। বরং তাদের দৃষ্টিতে গুটিকতক হঠকারী বা উচ্ছৃঙ্খল ধর্মনিরপেক্ষ বা নিরীশ্বরবাদী ব্লগারদের ধর্মানুভূতিতে আঘাতের দায়ভাগ তারা নেবেন কেন? অথচ তারা নিজেরাও ধর্মনিরপেক্ষতা, নিরীশ্বরবাদীতা বা বাম মতবাদের প্রতি অকুন্ঠ আস্থা রাখেন,অথবা মানসিকতায় বহু মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমর্থন পোষণ করেন।

আর এই কারণেই দেখা যায় এইসব গতানুগতিক সাংস্কৃতিক বুদ্ধিজীবি, ক্ষমতাসীনদের খুশি করতে শহীদ মিনারের পবিত্র অঙ্গনে জমায়েত হয়ে ব্লগার/লেখকদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত না দেবার সবক দেন, তখনই যখন দেশে ব্লগার বা অনলাইন এক্টিভিস্টদের উপর চাপাতি চালানোর মহোৎসব শুরু হয়েছে। তারা কি আদৌ বুঝে উঠতে পেরেছেন যে,’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানীদের, হিন্দুদের বিপক্ষে মুসলমানদের লড়াইয়ের অপপ্রচারের ধারাবাহিকতায়, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসীদের লড়াই বলে এই উগ্রবাদী মুসলিম গোষ্ঠী নতুন তত্ত্বে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এবং ঠিক সেই সময়ে যখন দেশে ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিঘ্ন করার জন্য হিংস্র মৌলবাদ উঠে-পড়ে লেগেছে।

দ্বিতীয়তঃ, যে ৯০% মুসলমানের দেশ যেভাবে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে, সেখানে যখন মুসলিম জনগণের ‘ধর্মানুভূতিতে আঘাত’-এর একটা স্পর্শকাতর শোরগোল উঠে, তাকে যে ভয়াবহ ধর্মীয় উন্মাদনা বলাটাই যুক্তিসংগত, সেটা রাজনৈতিক সচেতন বা অসচেতন যে কারো বুঝে ওঠা কঠিন নয়। ধর্ম যখন রাজনীতিতে মেশে তখন রাজনৈতিক ইসলামের যেভাবেই হোক জনগণকে উসকাতে হবে বা উত্তেজিত করতে হবে। ‘৭১-এ সেই ঘৃণ্য মৌলবাদী উগ্রগোষ্ঠী তা করেছে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্ধের তত্ত্বে, সেই ধারায় ২০১৩-তে এসেও তা করতে হয়েছে আস্তিক-নাস্তিক দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব তৈরির মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে।

এখানে একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়, ২০১৩-র ৫ মে হেফাজতের তান্ডবে বায়তুল মোকাররমে প্রচুর কোরআন শরীফ পুড়লেও এইসব ধর্মবাদীদের মধ্যে কোন বিকার নেই, কিন্তু শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে ভুল করে হলেও একটা কুরান শরীফ পুড়লে সারা বাংলাদেশে লংকা কান্ড বাধতো। যেমনই বেধেছিলো সাঈদীকে চাঁদে দেখার পর।

আর দু’চারজন মুষ্টিমেয় নাস্তিক ব্লগার কে কোথায় কী লিখেছে, তাতেই যদি ধর্মভীরু মুসলিমদের ধর্ম বিশ্বাসে টান পড়ে,তবে বুঝতে হবে সমস্যাটা নাস্তিক ব্লগারদের লেখালেখিতে নয়, সমস্যাটা দুর্বলচিত্ত এই মুসলমানদের ঈমানে। রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা এই সুযোগটাকে অবলীলায় তাদের পক্ষে কাজে লাগান ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে। ধর্মানুভূতির এই তীব্র স্পর্শকাতর প্রতিক্রিয়ার কারণেই কি বামপন্থী দার্শনিকেরা একে আফিমের সাথে তুলনা করেছেন? জনগণের হিতাহিত জ্ঞান, ভাল-মন্দ বিচারের ক্ষমতা লুপ্ত করতে পারলে, জনগণের বোধ ও মননকে বিকশিত হতে না দিলে পশ্চাৎপদ অন্ধ মৌলবাদের অস্তিত্ব আরো দীর্ঘায়িত হয়, তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি আরো সুদৃঢ় হয়।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার তার ক্ষমতাকে আরো নিরঙ্কুশ করতে এই সংকীর্ণ মৌলবাদী গোষ্ঠীর সমর্থন লাভে স্কুল পাঠ্যপুস্তক থেকে ভিন্ন মতামতের বা মতাবলম্বীদের লেখাগুলোকে সরিয়ে দিয়েছে। বাংলা নববর্ষে তাদের ভয়-ভীতিতে ঢাকা শহরে বৈশাখের শোভাযাত্রা বা অনুষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য করেছে। বাঙালির যে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ বা বহুত্ববাদীতার যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, তা সর্বত্র সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার পরিবর্তে তার রাশ টেনে ধরা হচ্ছে। অথচ এই অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং বহুত্ববাদের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই ’৭১-এ আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। আমাদের সেই শক্তির জায়গাটা যখন আমরা হারাতে বসেছি, তখন অতি সহজেই ’৭১-এর সেই হিংস্র মৌলবাদী শক্তির প্রেতাত্মা এবং তাদের সৃষ্ট উত্তর প্রজন্মের হাতে আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের অগ্রগতি এবং আমাদের ভবিষ্যতের স্বপ্নকে বিপন্ন করে তুলছি।

স্বভাবতঃই মনে উদয় হয়,আমরা কোন ধরণের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করছি। এই ভবিষ্যতটা কি পশ্চাৎপদ তালিবানী দর্শনের,নাকি বিজ্ঞান,বাস্তব এবং বিবেচনার? যখন বলা হচ্ছে,“বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের ফলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যে পরিবর্তন ঘটে চলছে আলেম সমাজ ইসলামের আলোকে এর ব্যাখ্যা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। পরিবর্তনশীল যে কোনো কিছুকেই এককথায় ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে দায় সারছে আত্মঘাতী জঙ্গিবাদ: উৎসের স্বরূপ সন্ধানে। চৌদ্দশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও যে ইসলাম বিশ্বাসী মোল্লারা এখনও পর্যন্ত নৃত্যকলা, সঙ্গীত, চিত্রশিল্প এবং সাহিত্যের মত ললিত বিষয়গুলোকে না-যায়েজ (হারাম) বলে, তাদের সাথে মূলধারার উদারনৈতিক বা মধ্যপন্থী ধর্মবিশ্বাসী বা অবিশ্বাসীদের সংঘাত তৈরি হওয়া কি অস্বাভাবিক কিছু?

ঐ কট্টর মুসলিম গোষ্ঠীর সাথে কোন ধরণের আপোষরফা হতে পারে তা আমার জানা নেই। যারা ধর্মের নামে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, এবং পোষাক-আশাকসহ আরবীয় সংস্কৃতির পুরোটা গ্রহণ করতে কোনরূপ দ্বিধান্বিত নয়, তাদের সাথে আপোষরফা মানে বাঙ্গালির নিজস্বতা এবং ললিত শিল্পকলাকে বিসর্জন দেয়া। যার নমুনা হিসেবে দেখি, সুপ্রীম কোর্টের সামনে লেডি ‘জাস্টিসিয়া’-কে সরানোর জন্য এই কট্টর মুসলিমদের আন্দোলনের আস্ফালন। [লেডি জাস্টিসিয়া সম্পর্কে ধার করা দু’টো কথা, “লেডি জাস্টিস’ থিমেস-এর ভাস্কর্য’ বাঙালি ঐতিহ্য না হলেও এটি ন্যায় বিচারের প্রতীক হিসেবে বিশ্বের অধিকাংশ বিচারপ্রাঙ্গণে ঠাঁই পেয়েছে। এটি বিশ্ব আইনি ঐতিহ্য বললে মনে হয় সঠিক বলা হবে। যাকে আমাদের বিচার প্রাঙ্গণে আমাদের জনজীবনের সাথে মিল রেখে বাঙালি নারী আদলে তৈরি করা হয়েছে।” সেই সাথে আরো দু’টো কথা আমি যোগ করতে চাই, এটা আমাদের সংস্কৃতির সাথে কোন দ্বন্দ্ব তৈরি করেনি, বরং আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে ন্যায় বিচারের দৃষ্টিকোণে।]

এই মৌলবাদী গোষ্ঠীর অন্ধত্ব এতই হাস্যকর যে, এই গোষ্ঠীর কাউকে দেশের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে কেউ কবে কখনো দেখেছে কি? তারা কি শহীদ মিনারে, স্মৃতিসৌধে যাচ্ছে? বাংলাদেশের সংবিধানকে মেনে নিচ্ছে? তবে তাদের আবদারটাকে মেনে নেবার বড় কোন কারণ আছে কি? রমনার বটমূল বা রবি ঠাকুরের সাথে তো আছে তাদের আজন্মের শত্রুতা। জাতীয় কবি নজরুল তাদের কাছে ততদূর যায়েজ, যতদূর তার ইসলামী সঙ্গীত। নতুবা কবি নজরুল কাফের।

যারা ধর্মনিরপেক্ষতা বা নিজস্ব সংস্কৃতি বোঝে না, এবং উগ্র আস্ফালনে ফ্যাসিস্ট কায়দায় একদেশদর্শী হয়ে বাংলাদেশে ইসলামের ঝান্ডা ওড়াতে চান, তার নমুনা কেমন হতে পারে, তার জন্য বেশিদূর না গিয়ে তালিবানী আফগানিস্তানের দিকে তাকালেই চলে। এই তারাই তো একসময়ে শ্লোগান দিয়েছে, “আমরা হবো তালিবান/বাংলা হবে আফগান।” এমন দুঃসহ ভবিষ্যতের জন্য কি আমরা অপেক্ষা করছি?

মূলধারার সাংস্কৃতিক কর্মীদের আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে দেখছি। মনে হচ্ছে, তারা সম্বিৎ ফিরে পাচ্ছে। ইসলাম ‘ধর্মানুভূতি’-তে আঘাত দেবার জন্য ব্লগারদের তারা ছবক দিচ্ছিলেন, সেটা যে মৌলবাদী গোষ্ঠীর একটা রাজনৈতিক চাল ছিল হলি আর্টিজান এবং তৎপরবর্তী ঘটনাসমূহের বিস্তারে এখন ঠিকই বুঝতে পারছেন। কিন্তু প্রশ্ন, তারা কি ‘৮০-র দশকের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের ধারায় গা ভাসাবেন? না কি জনমানসে নতুন উপলব্ধি তৈরির জন্য শিল্পসৃষ্টি এবং তার প্রকাশভঙ্গির ভাষা বদলাবেন?

বর্তমানের সংকটকে উপলব্ধি না করে পলায়নপর শিল্পসৃষ্টিতে মেতে থাকার সময় এখন নয়। আরো স্পষ্টবাদী হওয়া চাই। ইসলাম নিয়ে কট্টর ইসলামপন্থীদের সাথে যে সাংঘর্ষিক একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে, সে আলোকে নব সৃজনশীলতায় সত্যানুসন্ধানী হতে হবে। মানুষের ধর্মবাদী জিজ্ঞাসাগুলো থেকে পাশ ফিরে গেলেই যে সংকট মোচন হবে, তা নয়। যে ইসলামবাদীরা নৃত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রকে বরাবরই বিদ্বেষের দৃষ্টিতে দেখে গেছে, তাদেরকে উত্তর দিতে হবে। উপযুক্ত উত্তর কী হবে এবং কীভাবে, তা শিল্পীর সৃজনীশক্তিই উদঘাটিত করবে।

সময়টা এখন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। গত তিন/চার দশক ধরে তারা এই সময়টার জন্যই তৈরি হয়েছে। ধর্মভীরু জনগণের কাছে ধর্মকে মেধা-মনন-মগজে না নিয়ে আফিম সেবনের মত করে তুলে ধরেছে মসজিদে খুতবায় বা ওয়াজ মাহফিলে। ফলশ্রুতিতে ধর্মীয় অন্ধত্ববাদই শেকড় গেড়েছে এই ভূ-খন্ডে, ইসলামের রেঁনেসা যুগের মহা মনীষী ইবনে সিনা বা আল রাজীর মত যুগোপযোগী মুক্ত-চিন্তাধারীদের আমরা এখন দেখি না। এখানে মুক্ত চিন্তার বিকাশ মানে বিপরীতে চাপাতির কর্ম বেড়ে যাওয়া। শুভ বা মঙ্গলের বিরুদ্ধে অশুভ বা অমঙ্গলের রক্তচোখের আস্ফালন। বুঝতে হবে ‘৭১-এ বুদ্ধিজীবী হত্যাটাও অন্ধত্ববাদীদের এই একই উগ্র চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। তাদের গড়ে তোলা প্রজন্মই এখন চাপাতি চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে ব্লগ বুদ্ধিজীবীদের উপর।

এই ভূ-খন্ডের মুসলমানদের চিন্তার জগৎ কি আদৌ এগিয়েছে তবে? যদি আগায় তবে কারা তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে? এই প্রশ্নটা পাঠকের কাছেই রেখে দিই।

এই অন্ধ ধর্মভীরুতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক কর্মীরা কতদূর জেগে উঠতে পারে, তার উপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামী।