ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দৈন্য দশা নিয়ে ভাবতে গেলে স্বভাবতঃই এর শৈশব আর কৈশোরলগ্নের কথা মনে পড়ে যায়। বর্তমানে চলচ্চিত্র শিল্পের অনেক সমস্যার কথা আমরা তুলে ধরতে পারি, ভাল চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বার্থে। কিন্তু এখন বারে বারে মনে হচ্ছে, আসলে সমস্যাটা আমাদের মগজে-মস্তিষ্কে।বড়ভাবে বললে, বলতে হয় মনোজগতে। আর বিরাটভাবে বললে, জাতিগত বা দেশগতভাবে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব বা সাইকি(psyche)-কে ধরার ব্যর্থতাকে। আমাদের ষাটের দশকের চলচ্চিত্রগুলোকে দেখুন। জনরুচি এবং চাহিদাকে আন্তরিকভাবে তুলে ধরার কী এক নিদারুণ প্রচেষ্টা সেখানে রয়েছে। এই প্রচেষ্টাটা একটা প্রক্রিয়াতে রুপান্তরিত হতে চেয়েছে।

এখন যদি আমরা বলি, আমাদের চলচ্চিত্রের উপর যথেষ্ট শিক্ষা-দীক্ষা নেই, তবে আমাকে আবার আমাদের চলচ্চিত্রের শৈশব এবং কৈশোরের ঊষালগ্নে ফিরে যেতে হয়।এখানকার চলচ্চিত্রের সেই শুরুতে ক’জনেরবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল? ন্যূনতম জ্ঞানে শুধুমাত্র আন্তরিকতা নিয়ে গণমানুষের অসীম ভালবাসা আদায়ে তাদের মাঝে কার্পণ্য দেখা যায়নি। হাতে গোনা অল্প কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও কারো মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনার কমতি ছিল না। শৈশব-কৈশোরের যে উৎসাহ উদ্দীপনা, তা আর পরবর্তীতে সেভাবে টিকে থাকে নি। এখানে প্রশ্নটা কেনো-র। কেন এমন হলো?

আমাদের চলচ্চিত্রের যাত্রাটাকে মোটাদাগে দু’টি পর্বে ভাগ করা যেতে পারে – স্বাধীনতা পূর্ব এবং স্বাধীনতা পরবর্তী। স্বাধীনতা উত্তর আমাদের চলচ্চিত্রের শৈশব-কৈশোরকালের ঊষালগ্ন সম্পর্কে আমাদের আদৌ কোন অভিযোগ আছে বলে জানা নেই। শুদ্ধবাদীরা এই সময়ের বিনোদন ধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলোকে দায়ী করতে পারেন। আমাদের পূর্ব বাংলায়, বা নিজেদের অঞ্চলের আমাদের দ্বারা নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রতি নিজস্ব একটা আবেগ থাকাটা সে সময়ে স্বাভাবিকই ছিল। আর সে সময়টা ছিল আমাদের জাতীয় চেতনা বা স্বাধিকার বিকাশের কাল। সবকিছুই ছিল নতুন এবং চেতনার নব উন্মেষে উদ্ভাসিত হচ্ছিল। এসময়টাই ছিল সম্মিলিত বা সমন্বিতভাবে সৃষ্টিশীলতা বিকাশের কাল। সব ধরণের সৃষ্টিশীলতা আমাদের মাঝে দারুণভাবে শিহরণ তুলছিল। সেটাই ছিল প্রকৃত অর্থে, সৃষ্টিশীল হবার প্রকৃষ্ঠ সময়। একটা নবযুগের বাস্তবায়নের প্রাক-মুহূর্ত।

এই সময়ে আমরা পেলাম আমাদের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র, জহির রায়হানকে। মূলতঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত তিনিই ছিলেন এই গণমাধ্যমের প্রাণ ভোমড়া। তার আশে-পাশে নিরবিচ্ছিন্ন বা বিচ্ছিন্নভাবে আরো দু’চারজন চলচ্চিত্রকরের আবির্ভাব হচ্ছিল। তারাও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিবিধ মাত্রা তৈরি করছিলো। চলচ্চিত্রের মত একটা শক্তিশালী গণমাধ্যমে আপামর জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করাটা একটা বড় চ্যালেজ্ঞ। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প সে চ্যালেজ্ঞটা ভালভাবেই উতরিয়েছে।

তা সম্ভব হয়েছে, আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং নিজস্ব পরিচয়কে মাথা তুলে দাঁড় করানোর যে প্রাণপণ চেষ্টা তার সাথে একাত্ম হয়ে আমাদের সাহিত্য ও শিল্পের বেড়ে উঠা। পূর্ব বাংলায় চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (FDC) স্থাপনই তো আত্মপরিচয়কে আরো বলিষ্ঠ করণের প্রচেষ্টা ও স্পৃহা। এ বাংলায় নিজস্ব ভাষায় চলচ্চিত্র সৃষ্টিটাই জনগণকে চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাগৃহমুখী করে তোলে। সে সময়ে জনগণের যে যৌথ অবচেতনা (collective unconsciousness), সেটাকে খুব ভালভাবে আত্মস্থ এবং উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান।

সে অনুযায়ী জহির রায়হান যেমন বাণিজ্যিক কারণে সুস্থ ধারার বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন, তেমনি নির্মাণ করেছেন, আমাদের ভাবনার জগতকে নাড়া দেবার জন্য শিল্প পদবাচ্যের চলচ্চিত্র। বাঙ্গালির জাতিসত্ত্বার পরিচয়ের উন্মেষ্কালে জনগণ চলচ্চিত্রে তাদের পরিচিত পরিবেশে স্বীয় মননানুযায়ী সহজ-সাবলীল গল্প শুনতে চেয়েছে। একজন পরিচালক এবং প্রয়োজক হয়ে তিনি চলচ্চিত্রে সে চাহিদা পূরণ করে পূর্ব বাংলায় নবীন এই শিল্পের বিকাশে শক্ত এবং জোরালো অবদান রেখেছিলেন। উনি ভালই বুঝেছিলেন, জনগণের মধ্যে যদি এই শিল্পের শেকড় বিস্তার না করে, তবে এইরকম ব্যয়বহুল একটি মিডিয়াকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। গণরুচি কখনো একমাত্রিক নয় বলে জহির রায়হান সে সময়ের রুচি অনুযায়ী একাধারে রুপকথা, মিষ্টি প্রেমের গল্প, সামাজিক বক্তব্য বা জীবনভিত্তিক গল্প, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মানসপটে বিধৃত গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে মনোযোগী ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে প্র‍যোজক, পরিচালক, পান্ডুলিপি লেখক। এই সময়ের অন্য প্রযোজক এবং পরিচালকেরাও একই ভাবে পেশাদারী চলচ্চিত্র শিল্পে তাদের দায়িত্ব পালন করে জনগণের কাছে আস্থাশীল হয়েছেন।

জনগণ তখনকার চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি আস্থাশীল ছিল বলেই, সেই সময়ের পূর্ব বাংলার জনচেতনাকে আরো ত্বরাণ্বিত করতে জহির রায়হান নির্মাণ করে ফেলেন “জীবন থেকে নেয়া”-র মত চলচ্চিত্র, যা বিপুলভাবে জনগণের মাঝে সমাদৃত হয়। জহির রায়হান এও উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, গণরুচির সেবা বা তার প্রতি আত্মসমর্পণই শুধু নয়, চলচ্চিত্রের মত ব্যাপক এই গণমাধ্যমকে শিল্পগুণে জারিত করে গণরুচি বা চেতনার স্তরকে আরো উন্নত পর্যায়ে রুপান্তরও প্রকৃত শিল্পীর মেধা ও মননের পরিচায়ক। একে নিজস্ব ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে বিনির্মাণও বলা যেতে পারে। এই বিনির্মাণ প্রক্রিয়া থেমে গেলেই শিল্পটির মৃত্যু ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় গণমানুষের সাথে চলচ্চিত্রশিল্পের এক অন্তর্নিহিত দেয়া-নেয়া বা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া (interaction) চলে। এর অনুপস্থিতি, চলচ্চিত্র শিল্পকে আর বেশি দূর দৌড়ুতে দেবে না।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পূর্ব চলচ্চিত্র শিল্পে যে গতি ছিল, তার পেছনেও ছিল পূর্ব বাংলার বাঙ্গালি চেতনার উন্মেষ। আমাদের নিজস্ব ভাষা এবং ভাবধারার চলচ্চিত্র বাঙ্গালি চেতনা বিকাশের সাথে এগিয়ে গেছে। একটা নবজন্মের সব কিছুই সে সময়ের সাহিত্য-সংস্কৃতি-চলচ্চিত্রে বিদ্যমান ছিল। তারপর একটা নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হলো। সে রাষ্ট্রের নতুন আশা-আকাঙ্খা বা বাস্তবতাকে ধরার জন্য যে নতুন নায়কদের দরকার ছিলো, নতুন রাষ্ট্রের জনগণ তা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এবং দারিদ্রের কাষাঘাতে জীর্ণ একটা রাষ্ট্রকে উজ্জীবিত হওয়ার মত নতুন মন্ত্র ও দীক্ষার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এই সংকটকালে এখানে ঐতিহাসিকভাবে শিল্পের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে।

ষাটের দশকে নির্মিত এই বাংলার চলচ্চিত্রের দিকে আর একবার তাকানো যাক। সে সময়ের ব্যক্তি এবং সামাজিক জীবনের যে সহজাত সারল্যতা (simplicity), মূল্যবোধ, আন্তরিকতা, আতিথেয়তা, ও ভালবাসা ছিল, সেসব উপজীব্য করে চলচ্চিত্রগুলো সেভাবে তাদের গল্প এবং ট্রিটমেন্টগুলোকে সাজিয়েছে। একটা পরিচ্ছন্ন সরল, নিটোল এক আবেশ চলচ্চিত্রগুলোতে ছিল। তখনকার জনজীবন এখানকার মত জটিল হয়ে উঠেনি। আর এসব চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা সর্বোপরি অভিনয় শিল্পীরাও জাতির যৌথ অবচেতনাকে ধারণ করে উত্তীর্ণ হয়েছিলো। গ্রামীণ পটভূমিতে নায়িকা কবরীর সারল্যতা আধা-পূঁজি, আধা-সামন্ত সমাজ-বাস্তবতায় হৃদয় কেড়েছে, অভিনেতা ‘রাজ্জাক’ শহুরে সুশীল, প্রেমময় নায়কের আর্কিটাইপ (architype) হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা, মাত্র আধুনিকতার পরশ পাওয়া এ বাংলার বাঙ্গালি যুবক-যুবতীরা তখন প্রেম খুঁজছিলো। জীবন-যাপনের শ্লথ গতির সাথে চলচ্চিত্রের গল্প, ভাষা ও কাঠামোর বিকাশে কোলকাতা কেন্দ্রিকতা বেশ স্পষ্ট হলেও আমাদের পরিচয়ের উন্মেষ ঘটছিল।

সেই ধারাবাহিকতাকে বজায় রেখে সত্তরের দশকে, মধ্যবিত্তের সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে ‘শাবানা’, কখনো বা ধনীর আদুরে কন্যা। শহুরে বাস্তবতায় চটপটে আকর্ষণীয় প্রেমিকা বা গ্রামীণ জীবনের অবুঝ চটপটে আকর্ষণীয় ভাজ-ভঙ্গির মেয়ে হিসেবে ‘ববিতা’ আমাদের কাছে উপস্থাপিত হয়ে গেছে। অভিনেতা ‘ফারুক’-কে দেখি গ্রামীণ জেদি যুবক, যার গ্রামীণ বেয়ারা, গোয়ার্তুমি প্রেম আমাদের অবচেতন মনস্তত্ত্বে আকর্ষণীয় আর্কিটাইপ হয়ে দেখা দেয়। ‘সোহেল রানা’-কে বলে ফেলি, ড্যাসিং হিরো। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, কিভাবে শিল্প গণমানুষের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই বেড়ে উঠে।

আমাদের চলচ্চিত্রে ষাটের দশকে যে গল্প বলাটা শুরু হয়েছিলো, তাতে যে সারল্য, নির্মল বিনোদন, প্রেমময়তা ছিল, মানুষের সুখ-দুঃখ কষ্ট আর আনন্দের ছবিগুলো যেভাবে যত্নের সাথে তুলে আনা হয়েছিলো, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সে পট পরিবর্তন ঘটে গেলেও সেই ধারাবাহিকতায় কিছু কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছিল। হাতে গোণা দু’একটা ছাড়া বেশিরভাগ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রও গতানুগতিক ধারায় গল্প বলাটা পছন্দ করেছিলো। এ্যাকশানধর্মী চলচ্চিত্রের জন্মও হয়েছিল এই ‘৭০-এর দশকে। এসবেও সমস্যা ছিল না। স্বাধীনতা-পূর্ব এখানকার চলচ্চিত্র যে আশা নিয়ে এগিয়েছে, ‘৭১-এর মত বিশাল পট-পরিবর্তনে জনজীবনে পূর্বের সেই আপাতঃ নিস্তরঙ্গ যুথাবদ্ধতায় বিরাট এক আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছে। এই আন্দোলন পরবর্তী জীবন, বাস্তবতা এবং সংকটককে যেমন আমাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক শক্তি ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম চলচ্চিত্রেও তার প্রতিফলন পড়েছে। ‘৭০ দশকে এর প্রভাব ততদূর অনুভূত না হলেও ‘৭৫-এর পট-পরিবর্তনের পর জাতির উল্টোমুখী হাঁটা শুরু হলে, ‘৮০-র দশকে এসে সে ধাক্কাটা ধীরে ধীরে প্রকট হতে থাকে। একটা গতি এবং দিক-নির্দেশনাহীন জাতি তার পূর্ব-পরিচয়কে ভুলতে বসে যেমন এক সংকটে নিপতিত হয়, তেমনি আমাদের জাতীয় জীবনের সাথে তাল মিলিয়ে চলচ্চিত্র শিল্পও সে মুখো হয়।

যুথবদ্ধ মানুষের স্বপ্ন নষ্ট হলে, একে অন্যের থেকে দূরে সরে গেলে, সেখানে চলচ্চিত্রের মত গণমানুষের মধ্যে বেঁচে থাকা মাধ্যমটির প্রাণও ফুরিয়ে যেতে থাকে। ঠিক সেটাই ঘটেছে ‘৮০ এবং ‘৯০-এর দশকে। এমন কোন ব্যক্তিত্ব আমাদের জাতীয় জীবনে দেখা যায় নি, যিনি জাতির মাঝে একটা স্বপ্ন তৈরি করবেন এবং জাতিকে স্বপ্ন অর্জনের দিকে ধাবিত করবেন। বিশ্ব অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সমাজ-বাস্তবতাও পরিবর্তনের দিকে যেতে চাইছে। সেই নিম্ন পূঁজি, নিম্ন জীবনমান থেকে গণমানুষ মুক্তি খুঁজছে।”বেঁদের মেয়ে জোৎস্না”-র মিথ দেখে জনগণ তৃপ্তি এবং মজা খোঁজার চেষ্টা করলেও, এদেশীয় চলচ্চিত্রে নতুন এক মিথের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, যে মিথ জনগণকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করতে অনুপ্রাণিত করবে।

“স্টার ওয়ার” ‘৭০-র দশকে আমেরিকান জনগণের সাইকি-তে আলোড়ন তুললেও আমাদের এমন কেউ ছিল না। বা এমন ধরণের প্রয়োজনীয় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে পূঁজি করে কী এক অপরিহার্য আলোড়ন তৈরি করা যেত, তৈরি করা যেত নতুন এক মিথ। তা না হয়ে, গতানুগতিক বা নকল বিষয়বস্তুর মাঝে আমরা হাবু-ডুবু খেয়েছি। হওয়া উচিত ছিল, বিবিধ বৈচিত্রের চলচ্চিত্রের নির্মাণ যাতে থাকবে জাতির বা গণমানুষের সাইকী-তে নাড়া দেবার চেষ্টা। আমাদের চলচ্চিত্রে তা মোটেই হয় নি। মূল্যবোধের অবক্ষয় হলে সব কিছুতেই আপোষকামিতাই চোখে পড়ে বেশি। কিছু আর খাঁটি থাকে না, ভেজালে ভরে যায়। আমাদের পেশাদারী চলচ্চিত্র অঙ্গনও তাই হয়ে উঠে।

‘৬০ এবং ‘৭০ দশকে আগত নায়ক-নায়িকাদের পর নতুন দশকে আর্কিটাইপাল এমন কোন নায়ক-নায়িকা পাইনি যারা গণমানুষকেকে উদ্বেলিত করতে পারে। সেই তুলনার বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর সিরিজ নাটকগুলো জনগণের কাছে অনেক বেশি নন্দিত হয়েছে। হুমায়ুন আহমেদ রচিত “কোথাও কেউ নেই”-এর বাকের ভাই (আসাদুজ্জামান নূর অভিনীত) আর্কিটাইপাল একটা চরিত্র, যার ফাঁসির বিরুদ্ধে জনগণকে রাজপথে নামতে হয়েছে।

যদিও সিরিজ নাটকের বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত গন্ডিকে অতিক্রম করতে পারেনি, উপরন্তু বিনোদন বলতে গণমানুষের কাছে যা বোঝায়, তা থেকে যারপরনাই বঞ্চিত হচ্ছিল। এই শূন্যস্থান পূর্ণ করতে উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন ছিল আমাদের চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন। এই ফাঁকে বলিউডি চলচ্চিত্রের অপরিসীম প্রভাবকে এড়ানো একেবারেই সম্ভব হয় নি। গণমানুষ বলিউডি চলচ্চিত্রে রঙ এবং ফ্যান্টাসীর জগৎকে দারুণভাবে গ্রহণ করে নেয়। এর আবেদন তাদের সাইকী-র ক্ষুধা মেটাতে বেশ সক্ষম হয়। তদুপরি নিজস্ব ভাষা এবং কৃষ্টির অভাবের শূন্যতায় আমরা ধুঁকতে থাকি।

যে বলিউড “শোলে”-র মত চলচ্চিত্রের মিথ থেকে বেরিয়ে এসে, বিবিধ ফিল্ম নির্মাণ করে সাইকী-তে ঝড় তুলেছে, সেখানে বাংলাদেশ নিস্ফলা হয়ে শুধুই পেছনে তাকিয়েছে। ‘সালমান শাহ’-এর মত নায়কের আগমন নতুন কিছুর ইঙ্গিত দিতে পারেনি। বরং তার তিরোধান প্রমাণ করে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বন্ধ্যা সময় আরো দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বলিউডের আশির দশকের চলচ্চিত্রগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলে খুব সহজেই বোঝা যায়, তাদেরও চলচ্চিত্রশিল্পের আকাশও মেঘমুক্ত ছিল না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ‘৯০-এর দশকের এক বিরাট সংখ্যক প্রতিভাবান শিল্পী এবং কলাকুশলীদের আবির্ভাব গতানুগতিক ধারার ভারতীয় চলচ্চিত্রের ভিত্তি-ভূমিতে নতুন মাত্রায় বিষয়, ধরণ, দর্শন এবং দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে। বলা যায়, বর্তমানে ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটা বিপ্লব সাধিত হয়ে গেছে। দারুণভাবে বিকশিত হয়েছে তাদের চলচ্চিত্রের বিষয় এবং আঙ্গিক।

বলিউড যে বন্ধ্যাত্বটা ঘুচাতে পেরেছে, তাদের দীর্ঘদিনের চলচ্চিত্র চর্চা, শিক্ষা এবং সাধনার বদৌলতে, আমাদের সেখানে নতুন প্রতিভার আগমন তো ঘটেনি, বরং আধা এবং অশিক্ষিত শিল্পী ও কলা-কুশলীদের পদচারণায় চলচ্চিত্রের স্পিরিটের মৃত্যু ঘটে গেছে। যাদের দ্বারা সামান্য কিছু করা যেত, তারাও এই পরিস্থিতিতে পথ হারিয়েছে। মূলতঃ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মূল সংকট-টা তার কৈশোরেই তৈরি হয়েছে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ হারিয়েছে তার দিশা। সমাজ ব্যবস্থার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মূল্যবোধের সংকট আমাদের চলচ্চিত্রের সংস্কৃতিতে কৈশোরে কোন গভীর এবং দৃঢ় ভিত্তি দিতে পারে নি। গণমানুষের কাছে এই সংস্কৃতির (popular culture) কোন জোরালো এবং সন্মানজনক ভিত্তি তৈরি হতে পারে নি। ফলশ্রুতিতে, এই গণমাধ্যম নিয়ে নতুন প্রজন্মের মাঝে চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা-চর্চা বা ভাবনা-সাধনার কোন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে নি। গণরুচির সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে বা গণরুচিকে পরবর্তী স্তরে উন্নীত করতে সে বিষয়বস্তু বা আঙ্গিকের দেখা মেলেনি। অথচ ‘৭০ ও ‘৮০-র দশকে এক পাল প্রতিভাবান শিল্পী এবং নাট্যকলা-কুশলীর কারণেই বাংলাদেশের নাট্যান্দোলন বেগবান হয়ে সন্মানজনক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। কেননা, এখানে মেধা তৈরি ছিল। দর্শক ছিল গণমানুষের পরিবর্তে মধ্যবিত্ত। আর পূঁজির চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল।

যুদ্ধোত্তর বাস্তবতার জটিল-প্যাঁচ এবং দ্বন্ধগুলোকে কেউ সোজা-সহজ করে পরিবেশন করতে পারে নি। বিগত সোভিয়েত ইউনিয়নের চলচ্চিত্রকর আন্দ্রেই তারকোভস্কি-র “আন্দ্রে রুভলেভ” (Andrei Rublev)-এর মত মহাকাব্যিক ঐতিহাসিক ড্রামা আমরা নির্মাণ করতে পারি নি। জামার্নীর এডগার রেইজ-এর হাইমেট (Heimat, যার অর্থ মাতৃভূমি বা স্বদেশ)-এর মত বিস্তৃত সময় ও পটভূমির চলচ্চিত্র আমাদের নির্মিত হয় নি। আমরা লাইনচ্যূত হয়েই চলেছি। কারো কোন দায়িত্ব এসে বর্তায় নি যে, শিল্পে কোন সঠিক বার্তা নিয়ে এসে দাঁড়ায়। বা গণমানুষের আশা-আকাঙ্খা এবং মনোজগতের জটিল দ্বন্দ্বগুলোকে কেউ আন্তরিক অনুভূতিতে চলচ্চিত্রে রূপ দেয়। এই এক নিষ্ঠুর কঠিন পশ্চাৎপদ সময়। জনগণ তাদের জীবন ও মনস্তত্ত্বের কোন প্রতিফলন বা প্রতিচ্ছবি দেখতে না পেয়ে ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র বা প্রেক্ষাগৃহ-বিমুখী হয়। আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প তার সকল জৌলুস হারিয়ে তাই ‘৮০-র দশক থেকে হয়ে পরে একেবারে মৃতপ্রায়। এই অবস্থায় তাতে মৃদু অক্সিজেন ঢালতে মৃদু পদে যাত্রা শুরু করে স্বল্পদৈর্ঘ্য বা বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন।

‘৮০-র দশকের শুরুতে শুরু হওয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য বা বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রভাবে এখন পর্যন্ত যে চলচ্চিত্রগুলো নির্মিত হয়েছে, তার আবেদন আভ্যন্তরীন এবং আন্তর্জাতিকভাবে কিছু সফলতা নিয়ে এলেও মূল অঙ্গন আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প (film industry), বা পরিষ্কার করে বললে এফডিসি কেন্দ্রিক পেশাদারী চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনরূপ প্রভাব ফেলতে এখন পর্যন্ত সফল হয় নি। না বিষয়বস্তু চয়নে, না নির্মাণ কৌশল বা কুশলীতে। বরং তারা বেশি নজর দিচ্ছে বলিউড ঘরানার বিনোদনমূলক ফর্মূলা বা এ্যাকশানধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণে। বলিউড শুধু এ্যাকশানধর্মী চলচ্চিত্রই নির্মাণ করছে না, করছে বিবিধ ঘরাণার ও মানের অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্র। আর যারা নির্মাণ করছে, তাদের ভালভাবেই জানা আছে, চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা এবং ব্যাকরণ, তার ভাষা, যুগোপযোগী শিক্ষা ও জ্ঞান।। যারা নিজেদের চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যকে গর্বভাবে ধারণ করে, সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে বিনোদনের পাশাপাশি সিরিয়াস মাত্রার চলচ্চিত্রের বৈচিত্রসমৃদ্ধ হয়ে বিবিধ ধারায় গমনকেও অনায়াসে গ্রহণ করে। সে তুলনায় আমাদের অগ্রগতি বা সাফল্যের মাত্রা অনেক কম। ভারত একটা বড় দেশ, এই যুক্তি দেখিয়েই নিজেদের দৈন্য দশা হতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না।

এই শতাব্দীর শুরুতে বলিউডে এসে দাঁড়ায় এক ঝাঁক নতুনত্বে ভরা তরুণ পায়রা (নায়ক-নায়িকা)। যাদের বিনোদন দানের দক্ষতার সমতূল্য বাংলাদেশে দেখা দেয়নি। সুতরাং তাদের ধরণের বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হলে সেভাবে নৃ্ত্যকলায় উৎকর্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা আছে। তাদের ধর্ম এবং সংস্কৃতি এই বিষয়ে তাদের উৎসাহ যোগায়। কিন্তু বিপরীতে বাংলাদেশের ধর্ম এবং সংস্কৃতি তাতে বাধ সাথে। অথচ এই দেশের জনগণ বলিউড সুধা পানে ন্যূনতম কার্পণ্য দেখাতে ইতস্ততঃ করে না। এ এক অদ্ভূত হাস্যকর বৈসাদৃশ আচরণ। আত্মপরিচয়ের সংকটে দ্বিধাগ্রস্থ একটি জাতি বা জনসমষ্টি এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, বা এখনো তাদের আত্মপরিচয়ের উপাদানগুলো কী হতে পারে, সে সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসহীন এবং নিজেরা বিভক্তির রাজনীতিতে ঘুরপাকে রত, তারা কিভাবেই বা নির্ধারণ করবে, তাদের চলচ্চিত্রিক বৈশিষ্ট্য। একদিকে নাচ-গান, যাত্রা-পালা, এমনকি সিনেমার বা আমাদের আবাহমান ঐতিহ্যের প্রতি কট্টর এবং শক্তিধর মৌলবাদী ইসলামী গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু, অন্যদিকে এসব স্বতঃস্ফূর্ততার অভাবে শিল্পময় কারুকার্যের বা বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণে উপযুক্ত শিল্পমানের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভাব, এই বাস্তবতায় পেশাদার চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশের পথকে কখনো সাবলীল হতে দিচ্ছে না এবং দেবেও না।

এই ঢাকা শহরেই ‘৬০-এর দশকে যেমন সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র হয়েছে, তেমনি সম্ভবতঃ উপমহাদেশের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। শুরুতেই বলেছি, ঢাকাভিত্তিক আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের শুরুটাই ছিল দারুণ উজ্জ্বল। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা হলে আমাদের এখানেও কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। সম্ভব ছিলো, সাম্প্রতিক সময়ের ডিজিটাল প্র‍যুক্তি ব্যবহার করে অনেক কিছুই করার। যে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ বাংলাদেশে হয়েছে, সে জনশক্তিকে ব্যবহার করে এসব প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব হতো। আমাদের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় মান বাড়েনি।

অনেক কিছুই আমাদের নেই, কিন্তু অর্জন করা সম্ভব। অনেক সময় নিয়ে নিয়েছি আমরা এরই মধ্যে, পুরোনো এবং গতানুগতিকতাকে বাদ দিয়ে নতুনকে নিতে। এই মাধ্যমটা নিয়ে বোঝা পড়া আরো জোরালো হলে, উপকৃত আমরাই হবো। আমরা শ্রোতা-দর্শকের নাড়ীর টানকে উপলব্ধি করতে পারবো।

চলচ্চিত্রের মত একটা জটিল মাধ্যমকে আত্মস্থ করে যুগোপযোগী বা যুগের রুচি ও চাহিদা মিটিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ অবশ্যই সম্ভব। সম্ভব সে রকমের গল্প-চয়ন, সে রকমের পান্ডুলিপি নির্মাণ, সে রকমের চলচ্চিত্রের কাঠামো নির্মাণ। তার জন্য বোধ হয় আরো কিছুটা সময়ের দরকার। দরকার আরো কিছু বিকল্প ধারার সৃষ্টিশীল স্বাধীন (Independent) চলচ্চিত্র নির্মাণ। পেশাদার শিল্প (এফডিসি)-র ছত্রছায়ার বাইরে এরকম অনেকগুলো স্বাধীন চলচ্চিত্র সফলভাবে নির্মিত হলে এর প্রভাব এফডিসি-র উপর এসে পড়বেই। তখন আর তাদের মুখ ঘুরিয়ে থাকা সম্ভব হবে না। নতুন নতুন মেধা এবং প্রতিভাদের জন্য এর অঙ্গনকে ছেড়ে দিতেই হবে। তবে তা কবে হবে, এই মুহূর্তে নির্ঘাত বলে দেয়া যায় না। সময়েই তা বোঝা হয়ে যাবে। হতাশা কাটিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আলোর পথ দেখবেই!