ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী হানাদারের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে বাঙালিদের পাইকারীভাবে হত্যা শুরু করলে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে দাড়ায় হানাদাররা তাঁর সাথে বাইরের যোগাযোগ বন্ধ করে রাখার কারণে। কিন্তু রাজনীতি ও আন্দোলনের দক্ষ সংগঠক বঙ্গবন্ধু তাঁর মেধা ও সাহস দিয়ে সে বাধা ডিঙ্গিয়ে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে সক্ষম হন। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে তিনি দু‘টি মাধ্যম ব্যবহারের চেষ্টা করেন। একটি হলো টেলিফোন, অপরটি হলো মগবাজার ওয়ারলেস কেন্দ্রে স্বাধীনতার বার্তা প্রেরণ। দু‘ক্ষেত্রেই তিনি সফলকাম হন। দু‘ক্ষেত্রই তিনি মাধ্যম ব্যবহার করে থাকবেন যা স্বাভাবিক। কারণ, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি টেলিফোন ব্যবহার ছিল বিপদজনক। তাঁর টেলিফোনের সকল কথনে হানাদাররা আড়ি পাতবে। তিনি যে ভাষণটি বেতারে প্রচারের জন্যে পাঠিয়েছিলেন তা হতে পারে তিনি আগেই লিখে রেখেছিলেন অথবা কাউকে ডিকটেশন দিয়ে লিখিয়েছেন ও তা পাঠিয়েছেন। সব চাইতে বড় ব্যাপার ছিল ৬৯ সাল থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বাস্তব প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্নতর। তখন বাংলাদেশের নেতা ছিলেন একজন – বঙ্গবন্ধু ও দল ছিল আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিকলীগ। এর বাইরের দলগুলো ছিল একান্তই সীমিত কর্মী নির্ভর দল। স্বাধীনতার ঘোষণা অন্য কোন নেতা বা দল দিলে তা গ্রহণযোগ্য হতো না। স্মরনীয়, ‘৬৮তে আন্দোলন সূচনাকারী, বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলনের আপোষহীন রাজনীতিবিদ মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানী ৭১ এর মার্চ মাসে এসে বিভিন্ন সভায় বারবার বলেছেন, ‘শেখ মুজিব তুমি স্বাধীনতা ঘোষণা কর‘। ৭১ এর মার্চে এসে অন্য যেসব দলের নেতারা স্বাধীনতা চেয়েছেন তাদের সবাই স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য বঙ্গবন্ধুকে চাপ দিয়েছেন। তাই ‘৭১ এর বাস্তব প্রেক্ষাপটে এ কথা বলা চলে স্বাধীনতা ঘোষণার একক কর্তৃত্ব ছিল বঙ্গবন্ধুর। অন্য কারো এমনকি স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠনকারী ছাত্রলীগেরও সে অধিকার বা কর্তৃত্ব ছিল না। সেনাবাহিনীর পক্ষে মেজর জিয়া যে ঘোষণা দিয়েছেন তা জনগণ ও সেনাবাহিনীর দোদুল্যমান অংশকে আশ্বস্থ করেছে মাত্র। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে এর কোন সম্পর্ক খুবই ক্ষীন। মেজর জিয়া ঘোষণা দিয়েছেন ৭১ এর ২৭ মার্চ বিকেলে। চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২৫ মার্চ রাত থেকেই। এমনকি ২৬ মার্চ প্রথম ঘোষণার পূর্বেই শুরু হওয়া মিুক্তিযুদ্ধ কিভাবে বেতার নির্ভর হতে পারে? বাংলাদেশের তৎকালীন ১৭ জেলার প্রত্যেকটিতে যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২৫ মার্চ রাতে অথবা ২৬ মার্চ সকালে। প্রাথমিকভাবে জনগণ, ই.পিিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেনা নিবাস থেকে বিদ্রোহ করে চলে আসা অভতা পালিয়ে আসা সেনাবাহিনীর একাংশ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে এবং সেটা করে বেতারে ঘোষণার অনেক আগেই। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ২৬ মার্চ কাকডাকা ভোর থেকে সাইক্লোস্টাইল করে চট্টগ্রামে হাজার হাজার কপি করে বিলানো হতে থাকে। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, ভিএইচএফ‘এ পাঠানো এই ঘোষণা একই সাথে চাঁদপুর, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, চট্টগ্রামের মিরেরস্বরাই থানা, ফরিদপুর, খুলনা, শ্রীপুর, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বগুড়াতেও পৌঁছে দেন। ফলে নির্ভরতার সাথে সংগঠকরা যুদ্ধ সংগঠিত করতে থাকেন ২৬ মার্চ সকাল থেকেই। তবে এটা মূল কথা নয়। ১ মার্চ থেকে ছাত্রলীগের স্বাধীনতার পক্ষে জোর প্রচার, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইসতেহার পাঠ, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা এবং সব চাইতে বড় দিক – আক্রান্ত হলে হাতের কাছে যা কিছু আছে তাই দিয়ে পাকিস্তানীদের মোকাবেলা করার আহ্বান – এইসবই বাঙ্গালি জনগণকে ২৫ মার্চ রাতে আক্রান্ত হওয়ার পর শুধু অতীতের মত মার না খেয়ে পাল্টা আঘাতের অনুপ্রেরণা দেয় এবং বাঙ্গালিরা আঘাত শুরু অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। ২৭ মার্চ মেজর জিয়া যখন স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন তখনতো সারা দেশের সব অংশে পুরোপুরি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তাই বলে তাঁর কন্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের গুরুত্ব নেই, তা নয়। তাঁর ঘোষণার মাধ্যমে জনগণ প্রথম জানতে পারে যে সেনাবাহিনী যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। এটা জনগণকে অনেকটা আশ্বস্থ করেছে। সবচাইতে বড় বড় কথা হলো সেনাবাহিনীর একজন অফিসারের ঘোষণার গুরুত্ব যদি না থাকতো তবে চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগের নেতারা তাঁকে দিয়ে ঘোষণা পাঠ করাবেন কেন? তখনতো চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশের মাঠ পর্যায়ে নেতৃত্বতো আওয়ামীলীগের হাতেই। এখানে একটা মজার তথ্য দেই। রাজনৈতিক কারণে অনেকে বলেন তাঁরা মেজর জিয়ার ঘোষণা শুনে যুদ্ধে গেছেন। কর্ণেল অলির কথাই ধরুন। তিনি যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন ২৫ মার্চ রাত ১ টার দিকে। তিনিও বলেন মেজর জিয়ার ঘোষণা শুনে তিনি যুদ্ধে গেছেন। মেজর শওকত ২৫ মার্চ যুদ্ধ করেও একই কথা বলতেন। অবশ্য মৃত্যুর পুর্বে তিনি সত্য বলে গেছেন। একইভাবে যারা মেজর জিয়ার ঘোষণা শুনে যুদ্ধে গিয়েছেন বলে বলছেন তাদের যুদ্ধ ইতিহাস নিলে দেখা যাবে তাদের সবাই যুদ্ধে জড়িত হয়েছেন ২৫ মার্চ রাত বা ২৬ মার্চ সকাল থেকেই যখন এম এ হান্নানও স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেননি। তবে একটি সত্য স্বীকার করতে হয় বেতার সব সময়ই আমাদের যুদ্ধকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এবার চট্টগ্রাম থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা সম্পর্কিত বিষয়গুলোর পূর্বাপর আলোচনা করা যাক। ঘোষণাটি ছিল –
Message to the peoples of Bangaldesh and to the peoples of the world
‘Last night at about 0000 hrs, Pakistani Army suddenly attacked EPR HQ at Pilkhana & Police camp at Razarbag with tanks and machine guns & other heavy weapons killing hundreds of thousands of innocent lives. Peoples of Dhaka are fighting heroically with the enemy forces in the streets of Dacca….. Declared Independence. Peoples of Bangladesh are asked to resist the enemy forces at any cost at every corner of the country. Seek all possible help from the peace loving people of the world. May God bless you. Joy Bangla. ‘Sheik Mujibur Rahman, March 26, 1971.

বঙ্গবন্ধুর টেলিফেন যোগাযোগ প্রসঙ্গে এম আর সিদ্দিকি বলেন (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিল পত্রঃ ১৫ খন্ড) “২৫ মার্চ রাত আনুমানিক ৭ টায় বঙ্গবন্ধুর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে না পেরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশী জনাব মোশারফ হোসেন ও নাঈম গওহরের মাধ্যমে তাঁর সাথে অপ্রত্যক্ষ যোগাযোগ করতে সক্ষম হই। জনাব মোশারফ জানান, বঙ্গবন্ধু আমাকে বলতে বলেছেন যে, আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। আমি যেন বাঙালি সেনা সদস্য, ই পি আর, পুলিশ বাহিনীকে বলি, তারা যাতে অস্ত্র জমা না দেয়। জনগণ যেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ঢাকার নেতাদের সাথে এরপর আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

চট্টগ্রাম বেতারে অনুষ্ঠানমালা –

প্রথম অধিবেশনঃ ২৬ মার্চ দুপুর ১:১০ মিনিট
বেতারের প্রথম অধিবেশন প্রচারিত হয় চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। ওই সিদ্ধান্তে চট্টগ্রামের সব নির্বাচিত প্রতিনিধি ও আওয়ামীলীগের নেতারা জড়িত ছিলেন। যারা বেতার কেন্দ্রের সংগঠন ও কাজে জড়িত ছিলেন তারা হলেন জহুর আহমদ চৌধুরী, এম আর সিদ্দিকি, এম এ হান্নান, মোশাররফ হোসেন এমপি, ডাঃ এম এ মান্নান এমপি, আতাউর রহমান খান কায়সার, মীর্জা মনছুর, ডাঃ আবু জাফর, এম এ হালিম (সরকারি কর্মকর্তা), হাবিবুর রহমান, ছাত্র নেতা শাহ ই জাহান চৌধুরী, রাখাল চন্দ্র বনিকসহ চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃত্ব। সেনাবাহিনীর পক্ষে ক্যাপ্টেন রফিক পরিকল্পনায় সম্মতি দেন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা করেন।

বেতারের প্রথম অধিবেশন হয় ২৬ মার্চ দুপুর ১:১০ মিনিটে। আগ্রাবাদ বেতার চট্টগ্রাম শহরের মাঝখানে থাকায় নিরাপত্তা বিবেচনায় কালুরঘাট প্রচার কেন্দ্র থেকে বেতার চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাখাল চন্দ্র প্রথম বেতারে ঘোষণা দেন এবং এম এ হান্নান প্রথম বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেন।

বেতারের এই অধিবেশনে আরো ছিলেন আতাউর রহমান খান কায়সার, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, শাহ ই জাহান চৌধুরী, ডাঃ এম এ মান্নান, ডাঃ আবু জাফর, মীর্জা আবু মনসুর, মোহাম্মদ হোসেন প্রমূখ। বেতার চালুতে জড়িত ছিলেন – আঞ্চলিক প্রকৌশলী মীর্জা নাসিরউদ্দিন, বেতার প্রকৌশলী আবদুস সোবহান ও দেলোয়ার হোসেন। দুপুরে অনুষ্ঠিত এ বেতার অল্পক্ষণ চালু থাকে।

দ্বিতীয় অধিবেশনঃ ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭:৪০ মিনিট

রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি ২৬ মার্চ আরো বেশকিছু ব্যক্তি বেতার চালুর প্রচেষ্টা নেন। বেতারের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের এক অংশের আলোচনার স্থান ছিল ডাঃ শফি ও মুশতারি শফির বাসা। ওখানে বসে আলোচনা করে বেতার চালু করতে উদ্যোগ নেন বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, আবদুল্লাহ আল ফারুকসহ অনেকেই। প্রথমে তারা এ ব্যাপারে রাজনৈতিক সাহায্যের জন্য যান রেষ্ট হাউজে। ওখানে ছিলেন অধ্যাপক মোমতাজউদ্দিন আহমেদ। তাঁর সহায়তায় আওয়ামীলীগ অফিস থেকে একটি জীপ সংগ্রহ করেন। এরপর সামরিক সাহায্যের জন্য যান ক্যাপ্টেন রফিকের দপ্তরে। সে সময়ে জনাব রফিরের ওখানে খাবার নিয়ে উপস্থিত ছিলেন জাহরুল ঈমান চৌধুরী। তিনিও আলাপ করে বেতারের সাথে যুক্ত হন। বেলাল মোহাম্মদ, অধ্যাপক মোমতাজ, জাহরুল ঈমান সবাই এরপর যান মাহবুব হাসানের বাসায়। মাহবুব হাসানকে নিয়ে বেলাল মোহাম্মদ আসের আগ্রাবাদ বেতারে। মাহবু হাসান শামসুল আলমকে নিয়ে বেতারে ঢুকে তা চালানোর চেষ্টা করেন। আঞ্চলিক প্রকৌশলীর অসহযোগিতার কারণে ব্যর্থ হন। এরপর বেতারের কর্মকর্তাদের পরামর্শে কালুরঘাট প্রচার কেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২৬ মার্চ দুপুরের পর হতে বেতার চালুর আরেকটি উদ্যোগ নেন আগ্রাবাদের ডাঃ সৈয়দ আনোয়ার আলী, ইঞ্জিনিয়ার আশিকুল ইসলাম, দিলীপ চন্দ্র দাশ, কাজী হোসেনে আরা প্রমূখ। বেতার চালু করতে ও সহযোগিতা করেতে তারা সবাই যান আগ্রাবাদ বেতার কেন্দ্রে। একই সময়ে ডাঃ সুলতানুল আলমও পৌঁছেন আগ্রাবাদ বেতার কেন্দ্রে। ডাঃ আনোয়ার আলী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তার একটি কপি বেলাল মোহাম্মদের হাতে তুলে দেন। বেলাল গং, ডাঃ আনোয়ার গং এক হয়ে রওয়ানা দিলেন কালুরঘাট। এই অনুষ্ঠান যাতে হতে পারে এ জন্যে ভূমিকা রেখেছেন বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আবদুল কাহহার (পরবর্তীতে শহীদ), আঞ্চলিক পরিচালক নাজমুল আলম।
প্রাকৌশলিক দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন, আবদুস সোবহান ও মেকানিক আবদুস শুক্কুর। উপদেশক ছিলেন অধ্যাপক মো খালেদ, বেতারের চট্টগ্রামের বার্তা সম্পাদক সুলতান আলী। সার্বিকভাবে সহায়তা দিয়েছেন সেকান্দর হায়াত ও হারুনুর রশিদ খান।

এই অধিবেশনে আরো যুক্ত হন কবি আবদুস সালাম। তিনি কথিকা পাঠ করেন। বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ ও ডাঃ সুলতানুল আলম সন্ধ্যায় এ অধিবেশনে বিভিন্ন ঘোষণা পাঠ করেন এবং সংবাদ পড়েন। এ অধিবেশনেও জনাব হান্নান আবার স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রচার করেন।

তৃতীয় অধিবেশনঃ ২৬ মার্চ রাত ১০ টা

রাতে মাহমুদ হোসেন, ফারুক চৌধুরী (আগ্রাবাদ হোটেলের সহকারী ম্যানেজার), বেতার শিল্পী রঙ্গলাল দেব চৌধুরী রাত ১০ টায় বেতার চালু করেন। বেতারের অনুষ্ঠান ঘোষক জনাব কবির, জি পি ও‘র জাহরুল ঈশান তাদের সহযোগিতা করেন। ২৭ মার্চ রাতেই ফারুক চৌধুরী ও মাহমুদ হোসেন নিহত হয়েছিলেন।

চতুর্থ অধিবেশনঃ ২৭ মার্চ সকাল ১০:৩০ মিনিট

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছিল আন্দোলন ও প্রতিরোধ সংগ্রামের একটি অন্যতম ঘাটি। এটা স্বাধীনতাপন্থী ছাত্রলীগ কর্মীদেরও ঘাটি ছিল। ১৭ মার্চ আন্দরকিল্লার এক অস্ত্রের দোকান থেকে লুট করা প্রচুর অস্ত্র ছিল ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত ছাত্র সংসদ অফিসে। ২৫ মার্চে এই কলেজে ঘাটি গাড়ে পলিটেকনিক কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের নিউক্লিয়াস অনুসারীদের এক বিরাট অংশ। ২৭ মার্চ সকালে ওখানে অবস্থানরত মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের নেতা বেলায়েত হোসেন, আবু ইউসুফ চৌধুরী, মাহফুজুর রহমান, শাহাবুদ্দিন মাহমুদ, মাইনুল আহসান, পলিটেকনিক কলেজের ভিপি আবদুল্লাহ আল হারুন, আজিজ, খোরশেদ সবাই আলোচনা করলেন বেতার নিয়ে। এদের কেউই ২৬ মার্চ প্রচারিত বেতারের তিনটি অনুষ্ঠানের একটিও শুনেননি। স্বল্প সময়েই সিদ্ধান্ত হয় বেতার চালু করার। একটি গাড়ি সংগ্রহে ছাত্রসংসদের জিএস মাইনুল সহায়তা করেন। হারুন ড্রাইভিং সিটে বসেন। মাইনুল ছাড়া উল্লেখিত সবাই গাড়িতে বসেন। সোজা কালুরঘাট বেতারে উপস্থিত হলেন সবাই। হারুন বেতার চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হন। দাড়োয়ান থেকে ঠিকানা নিয়ে সবাই আসেন বাদুরতলা বা তোর পাশের কোন বাসায়। অস্ত্রের মুখে তুলে নেন বেতার টেকনিশিয়ানকে। বেতারে গিয়ে বেতার চালু করা হয়। এরই মধ্যে আসেন ডাঃ এম এ মান্নান। তিনি একটি ক্যাসেট দেন বাজানোর জন্য। এতে তাঁর ভাষণ ছিল। প্রথম ক্যাসেটটি বাজানো হয়। এরপর প্রথম সংবাদ পাঠ করেন মাহফুজ কোন স্ক্রিপ্ট ছাড়াই। এরপর বেলায়েত হোসেন ইংরেজী সংবাদ পড়েন। ইউসূফ একটি প্রতিবেদন পড়েন। ফাকে ফাকে ঘোষণা দেন শাহ ই জাহান চৌধুরী। তিনি আগে থেকেই বেতারে ছিলেন। কথিকা পড়েন কবি আবদুস সালাম। এই অধিবেশনে টিক্কাখানকে হত্যা করা হয়েছে বলে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছিল এবং এই অধিবেশনে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিশদের নামে নির্দেশ জারী করা হয়েছিল। জনাব হারুন সবাইকে তাদের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। এর মাঘে প্রায় বিহারী উচ্চারণে একটি টেলিফোন আসে। হানাদাররা আসছে মনে করে দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করে সবাই চলে আসেন মেডিকেল কলেজে তাদের কর্মস্থলে। পরে জানা যায় টেলিফোনটি ছিল মেজর জিয়ার।

পঞ্চম অধিবেশনঃ ২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৭ টা – বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়ার ঘোষণা

এদিন রাজনৈতিক ও বেতার কর্মীদের অনুরোধে সেনাবাহিনীর তৎকালীন সিনিয়র বাঙালি মেজর জিয়াউর রহমান বেতারে বাঙালি সৈন্যদের বিদ্রোহ করে বাঙারিদের পক্ষে যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারটি প্রচার করেন। প্রথমে তিনি যুদ্ধ ঘোষণার সংবাদটি পাঠ করেন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে। মেজর জিয়াকে সহায়তা দেন বেলাল মোহাম্মদ, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, অধ্যাপক মোমতাজউদ্দিন আহমদ, আবুল কাশেম সন্দীপ। অনুষ্ঠানটি এক ঘন্টার মত স্থায়ী হয়। মেকানিক আবদুস শুক্কুর ছিলেন প্রক্ষেপনের দায়িত্বে।

ষষ্ঠ অধিবেশনঃ ২৭ মার্চ রাত ৯:৩০ মিনিট- মেজর জিয়ার নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা
২৭ মার্চ মেজর জিয়া হঠাৎ করে বেতারে আসেন রাত ৯:৩০ মিনিটে। আবার বেতার চালু হয়। বেতারে ছিলেন আমিনুর রহমান ও আবদুস শুক্কুর। এবারে ভাষণে মেজর জিয়া নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দেন।

মেজর জিয়া তার প্রথম অধিবেশনেই নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন। বেলাল মোহাম্মাদ ও অধ্যাপক মোমতাজউদ্দিন তাকে বোঝানোর পর তিনি বঙ্গবন্ধুর নামে ঘোষণা দিয়েছিলেন। নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করার ইচ্ছার পিছনে সম্ভবতঃ কারণ ছিল একটিই, তিনি এ গণযুদ্ধকে বিদ্রোহ মনে করেছিলেন। বিদ্রোহ আর গণযুদ্ধ যে এক নয় তা তিনি তখনো বুঝতে পারেননি।

সপ্তম অধিবেশনঃ ২৮ মার্চ সকাল ৯টার পর

এই অধিবেশনে ছিলেন বেলাল মোহাম্মদ, হাবিবুর রহমান জালাল, রাশেদুল হোসেন, শারফুজ্জামান, কাজী হাবিবউদ্দিন, লে. শমসের মবিন চৌধুরী, ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুইয়া, সৈয়দ আশরাফ আলী, আবদুল মালেক খান, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, হারুনুর রশিদ খান, সেকান্দর হায়াত খান। এই অনুষ্ঠানে সম্ভবত মেজর জিয়ার ঘোষণা প্রচারিত হয় যাতে তিনি নিজেকে অস্থায়ী সাষ্ট্রপ্রধান বলে ঘোষণা করেছিলেন। এই ঘোষণায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ প্রসঙ্গে তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সাধারণ সম্পাদক সাবের আহমেদ আসগরী বলেন, ‘‘জিয়া নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণার পরপরই হান্নান সাহেব আমাকে ডেকে নির্দেশ দেন অবিলম্বে মেজর জিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে। মেজর জিয়ার কাছে যাওয়ার পথে কালুরঘাটের পর তার সাথে দেখা হয়। আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়ে দেই অবিলম্বে আপনার ঘোষণা বদলাতে হবে। না হলে আমরা অন্য সেনা অফিসার দিয়ে নতুন ঘোষণা দেয়াবো। জিয়া খানিক চিন্তা করে বেতারের দিকে চলে যান“। এ ঘোষণার পর ডঃ এ আর মল্লিক, এ কে খান, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সবাই এ ঘোষণা বদলানোর জন্যে মিজর জিয়াকে অনুরোধ করেন। সম্ভবতঃ এর পরই মেজর জিয়া অনুধাবন করে খাকবেন জনগণের প্রতিনিধিদের বক্তব্য না মানা হলে যুদ্ধের ক্ষতি হতে পারে এবং এ যুদ্ধ সেনাবাহিনীর একার নয়।

অষ্টম অধিবেশনঃ ২৮ মার্চ দুপুর ২টার পর
এই অধিবেশনে মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বিভ্রান্তির অবসান ঘটান। এই অনুষ্ঠানে জড়িত ছিলেন বেলাল মোহাম্মদ, অধ্যাপিকা তমজিদা বেগম, ওসমান গনি, লে, শমসের মবিন, ক্যাপ্টেন নাসির প্রমুখ। এরপর থেকে বেতারে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার বক্তব্য বারবার প্রচারিত হয়।

কালুরঘাট থেকে মোট ১৪টি অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। ৩০ মার্চ বেতারে বোমা বর্ষিত হলে বেতার বন্ধ হয়ে যায়।

[লেখাটি লিখেছেন ৭১ যুদ্ধকালিন সময়ের চট্টগ্রাম শহর হাই কমান্ডের সদস্য, বি এল এফ ও এফ গ্রুপ লিডার, বেতারের চতুর্থ অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী, ৬২ থেকে ছাত্রলীগ কর্মী ও স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নিউক্লিয়াস সদস্য ডঃ মাহফুজুর রহমান। তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সত্য ইতিহাসে আধারিত যে গবেষণা পুস্তক লিখেছেন, তারই কিয়দংশ এখানে মুদ্রণ করা হলো।]