ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

আজকাল আমরা খুব ব্যস্ত। পড়াশুনা, চাকরি, ব্যবসা, ইত্যাদি কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত যে আমাদের নিজেদের দিকে, বিশেষ করে নিজেদের শরীরের দিকে খেয়াল রাখার কোনো প্রয়োজন মনে করি না। আমরা কাজের শেষে বা মাঝে গোগ্রাসে মজাদার সব খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে জীবনের আনন্দ খুজি। কিন্তু এর পরিণাম কি? হাঁ ওজন তো বাড়েই, সেই সাথে ভয়াবহ সব রোগ–ব্লাড প্রেসার, কোলেস্টেরল, ডায়বেটিস, হার্টের সমস্যা ইত্যাদিও হতে পারে। তাই কি করবেন?

সবচেয়ে সহজ, সস্তা, জনপ্রিয় এবং নিরাপদ ব্যায়াম
একটি সুখী, সুস্থ শরীর ও মনের জন্য কোনো না-কোনো ধরনের শরীরচর্চা প্রয়োজন। ব্যায়াম এবং সেই সঙ্গে সুমিত পানাহার হলো দীর্ঘজীবনের রহস্য, শরীর-মন তরতাজা রাখার রহস্য। আদর্শ ওজন বজায় রাখা সবচেয়ে বড় কাজ।এ ছাড়া আলসে কালক্ষেপণের একটি ভালো উপায় হলো ব্যায়াম করা। সবচেয়ে সহজ, সস্তা, জনপ্রিয় এবং নিরাপদ ব্যায়াম হচ্ছে হাঁটা। এটি কম পরিশ্রমে উপযুক্ত একটি ব্যায়াম সব বয়সের মানুষের জন্য।

গবেষকদের কথা
ইদানীং গবেষকেরা বলছেন, হূদযন্ত্র ও রক্তনালির সুস্বাস্থ্যের জন্য হাঁটা, জগিং ও দৌড়ানো সমান সুফল আনে। বস্তুত কারও কারও জন্য হাঁটা এর চেয়েও ভালো ব্যায়াম। কারণ, হাঁটলে শরীরের ওপর চাপ পড়ে না।দৌড়ালে অনেক সময় হাড়ের গিঁটে ব্যথা হয়, আহত হয় পেশি। এটা বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু হাঁটাহাঁটি করে আহত হওয়ার কথা শোনা যায় না।

হাঁটা বনাম অন্যান্য ব্যায়াম
বড় সহজ এই হাঁটা। বিশেষ কোনো পোশাক পরার দরকার নেই। ঘেমে-নেয়ে ওঠার প্রয়োজন নেই। আরাম-আয়েশেও হাঁটা যায় যত্রতত্র। সপ্তাহে ছয় দিন ৩০ মিনিট জোরে হাঁটাই যথেষ্ট। জগিং ও অ্যারোবিকসের মতো কঠোর ব্যায়াম হার্টকে ঘোড়ার মতো দৌঁড়াতে বাধ্য করে—রক্ত জোরে পাম্প করতে থাকে।একপর্যায়ে এটি হিতকরী। তবে পেশি যেহেতু এত কঠোর পরিশ্রম করে, সে জন্য এর প্রয়োজন হয় প্রচুর অক্সিজেন। ব্যায়ামে তৈরি হয় ল্যাকটিক এসিড। অম্লতা রোধের জন্য চাই প্রচেষ্টা। ল্যাকটিক এসিড জমা হওয়ায় পেশি হয় শক্ত ও বেদনার্ত।

কিন্তু হাঁটলে তেমন হয় না। হূৎপিণ্ড জোরে পাম্প করে, বাড়ায় রক্তপ্রবাহ। তবে পেশির ওপর এত কঠোর প্রভাব ফেলে না। শরীরে তৈরি হয় না ল্যাকটিক এসিড।তাই শরীরের ওপর কম চাপ প্রয়োগ করেও রক্ত সংবহনতন্ত্রের উজ্জীবনে সাহায্য করে। দেহের সঞ্চিত মেদ অবমুক্ত হয়ে বিপাক হয়।শরীরের ওপর যেহেতু এর চাপ কম, সে জন্য যে কেউ পুরো সপ্তাহ হাঁটলেও খারাপ লাগে না।

অনেক অসুস্থ মানুষও এই হাঁটাকে ব্যায়াম হিসেবে নিতে পারেন। শুরু হোক ধীরে ধীরে। প্রথম দিন ১০-১৫ মিনিট। এরপর গতি বাড়ান, সময় বাড়ান। ২০-৩০ মিনিট। এরপর শীতল হন ১০ মিনিট। পাঁচ-১০ মিনিট ধীরে হেঁটে শীতল হন। ব্যয়বহুল জিম থেকে নিখরচায় হাঁটা অনেক ভালো।

শুধু কি ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার, হৃদরোগ হলেই হাঁটব?
নিয়মিত হাঁটাকে রোগ প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসাবে মনে করে সুস্থ অবস্থা থেকেই হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিৎ। অথচ আমরা হাঁটি তখনই, যখন ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার, হৃদরোগ ইত্যাদি অসুখ ধরা পড়ে এবং ডাক্তার সাহেব বলেন যে ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি আপনাকে হাঁটতে হবে, তখন আমরা হাঁটি। পারলে দৌড়ানোর চেষ্টা করি।কিন্তু অসুখ হলেই হাঁটব এটা ঠিক নয়।সব সুস্থ মানুষের সুস্থতাকে ধরে রাখার জন্য হাঁটা আবশ্যক।

হাঁটার উপকারিতা:
হাঁটার উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না।স্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা গেছে-
১.হাঁটা রক্তচাপ কমায়
২.হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়
৩.অতিরিক্ত মেদ কমায়
৪.রক্তের সুগার কমায়
৫.ওজন কমায় ও নিয়ন্ত্রণ করে
৬.ব্লাড প্রেসার, কোলেস্টেরল, আন্থ্রাইটিস, ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রন করে
৭.হার্টের সমস্যা,স্ট্রোক হবার ঝুঁকি কমায়
৮.হাঁড় শক্ত করে
৯.রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে
১০.ফলে হার্ট ভালো থাকে, শরীরের সামগ্রিক শক্তি বা ফিটনেস বাড়ে
১১.ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা কমায়
১২.মাসেলের শক্তি বাড়ায়
১৩.হেলদি বিএম আই ধরে রাখে বা অর্জন করা যায়
১৪.হেলদি ওয়েস্ট টু হিপ রেসিও ধরে রাখে বা অর্জন করা যায়,
১৫.মেটাবলিজম বাড়ায়
১৬.শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ভালো থাকে
১৭.তারুণ্য ধরে রাখে
১৮.আয়ু বাড়ায়
১৯.ব্রেইনের কার্যকারিতা বাড়ায়
২০.ভালো ঘুম হয়
২১.স্মরণ শক্তি বাড়ায়
২২.মন প্রফুল্ল রাখে, মানসিক অবসাদ দূর করে ও মন ভালো করে
২৩.মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়
২৪.ভাল কলেষ্টেরল এইচডিএল বাড়ায় আর মন্দ কলেষ্টেরল এলডিএল কমায়
২৫.রক্ত নালীর দেয়ালে চর্বি জমতে দেয়না
২৬.হাঁটলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমে
২৭.ডায়াবেটিস হয়ে থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখে
২৮.হাঁটার ফলে পেশীর শক্তি বাড়ে
২৯.হাঁটা হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়ায়
৩০.শরীরের ওজন ঠিক থাকে আর শরীর থাকে ফিট

শুধু তাই নয় বিভিন্ন জটিল জটিল রোগের জন্য আলাদা আলাদা ব্যায়াম আছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে হাঁপানির মতো জটিল রোগও কিন্তু বিশেষ ধরনের ব্যায়ামের মাধ্যমে আরোগ্য হতে পারে।

কতক্ষন এবং কতদিন হাঁটব?
হাঁটার উপকার পেতে অবশ্যই নিয়মিত এবং সপ্তাহে অন্তত চার বা পাঁচ দিন হাঁটতে হবে, তবে সপ্তাহে সাত দিন হাঁটতে পারলে তা হবে সোনায় সোহাগা। হাঁটতে হবে ৩০/৪০ থেকে ৬০ মিনিট ধরে। প্রতিদিন তিরিশ মিনিট থেকে এক ঘন্টা হাঁটলে মুটিয়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সারসহ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি তিরিশ থেকে ষাট শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করা যায়।

সপ্তাহে ৪/৫ দিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট দ্রুত হাটলেই আপনার জীবনের অনেক উন্নতি হবে। যারা ব্যায়াম করেন না, তারা কিছুদিন হাটলেই বুঝবেন এর কত উপকারিতা, শরীরটা কত ঝরঝরে মনে হচ্ছে।বরযাত্রীর হাঁটা হাঁটলে কিন্তু হবে না। হাঁটতে হবে যথেষ্ট দ্রুত যেন শরীর থেকে ঘাম বের হয়। আপনি দৈনিক যত বেশি হাঁটবেন, মনে হবে আপনি ততই বেশি ভাল আছেন। ভাল থাকার ব্যাপারে আপনার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে।

কখন হাঁটবেন ?
হাঁটা হাঁটির সর্বোত্তম সময় হচ্ছে ভোর বেলা, যারা নামাজ পড়েন তাদের জন্য ফজরের নামাজের পর। এসময় গাড়ী ঘোড়া এবং কল কারখানা বেশী না চলার কারণে ভোরের বাতাস থাকে অনেকটা নির্মল। সকালে যাদের সম্ভব নয় তারা তাদের সুবিধা মতো যে কোন একটা সময় নির্ধারণ করে নিতে পারেন, তবে দুপুরের ভরা রোদে মোটেই নয়।

তবে আপনার সুবিধামত সময়ে হাঁটতে পারেন। তবে শরীরের কথা চিন্তা করলে বিকালে হাঁটা সবচেয়ে ভালো। কারণ তখন মাসেল ফ্লেক্সিবল থাকে।শরীরের তাপমাত্রা সকালের চাইতে বেশি থাকে। তখন সব কাজ শেষ করে টেনশন মুক্ত হয়ে হাঁটা যায়।কিন্তু সকালে হাঁটলে মাসেল ও জোড়া শক্ত হয়ে থাকে। আবার শরীরও ওয়ার্ম আপ হতে সময় বেশি লাগে।সে কথা চিন্তা করলে বিকালে হাঁটা উত্তম। কিন্তু বিকালে পরিবেশ দূষণ বেশি থাকে এটাও সমস্যা। সকালে দূষণ মুক্ত পরিবেশে হাঁটা যায়। তবে আপনি যখনি সময় পান সুবিধা মত সময়ে হেটে নিবেন। চেষ্টা করবেন প্রতিদিন একই সময়ে হাঁটতে।

কোথায় হাঁটবেন ?
চেষ্টা করুন সুন্দর, দূষণ মুক্ত পরিবেশে হাঁটতে। হাঁটার জায়গা যেন সমতল ও পরিষ্কার হয় তা লক্ষ্য রাখুন। বাড়ির বাগান, পার্কে, পরিষ্কার ফুটপাতে বা যেকোনো খোলা জায়গায় হাঁটতে পারেন। মাঝে মাঝে হাঁটার রাস্তা বা জায়গা বদল করুন। এতে একঘেয়েমি কাঁটবে।

হাঁটার সময় অন্যান্য কাজ
আপনি ইচ্ছে করলে হাঁটার সময়টুকুতে পরিকল্পিত ভাবে অন্যান্য কাজও সেরে নিতে পারেন। যারা লেখালেখি করেন তারা হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বিভিন্ন টপিক্স নিয়ে চিন্তা করতে পারেন। মোবাইলে রেকর্ডিং করে কুরআন, লেকচার আবং পছন্দের গান এবং আরো যা কিছু চান শুনতে শুনতে হাঁটতে পারেন।যে কাজটি করা সম্পূর্ণ নিষেধ তা হলো টেনশন। সর্বাবস্থায় টেনশন মুক্ত থাকতে হবে।

নতুন যারা
যারা নতুন ব্যায়াম বা হাঁটা হাঁটি শুরু করবেন তারা প্রথম দিন বেশী বেশী হাঁটবেন না। আপনার আশপাশে কাউকে খুব দ্রুত হাঁটতে দেখে আপনিও প্রতিযোগীতা বা যোশে পড়ে অতিরিক্ত করলেন তো সমস্যায় পড়লেন। এভাবে করতে গেলে হঠাৎ মাংশ পেশীতে অতিরিক্ত চাপ পড়ার ফলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে শরীর ব্যাথাতুর হয়ে যেতে পারে। তাই সাধারণ গতিতে প্রথম দিন ১৫/২০ মিনিট তার পর থেকে একটু একটু বাড়িয়ে এক ঘন্টা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন। প্রাথমিক অবস্থায় একটু আনইজি এবং আলসেমি লাগতে পারে। ধৈর্য্য ধারণ করে মাস খানেক চালিয়ে নিতে পারলে অভ্যাসে পরিণত হবে এবং তখন না হাঁটলেই আনইজি লাগবে।

খালি পায়ে হাটা
খালি পায়ে হাটা ও দৌড়ানো অনেক ক্ষেত্রেই জুতা পরে হাটার চেয়ে বেশি উপকারী। পায়ের বেশ কিছু রোগের জন্য আমেরিকার বিশেষজ্ঞ দল জুতা পরে হাটাকেই দায়ী করেছেন।যখন আপনি হিলওয়ালা জুতা পরে দ্রুত দৌড়ান তখন পায়ের একটি অংশে শরীরের সম্পূর্ণ ভর দেওয়া হয়, এবং অন্য অংশে কোন চাপ পরে না। এবং যদি খালি পায়ে হাটা হয় তখন সম্পূর্ণ পায়ে-ই একটা ভারসাম্য বজায় থাকে।এজন্য অবশ্য এমন ধরনের জুতা বানানো যেতে পারে যার মাধ্যমে পায়ের স্বাভাবিকতা বজায় থাকবে এবং পায়ের সাধারন চরাফেরায় ব্যঘাত হবে না।

হাঁটার নিয়ম কানুন
হাঁটা যতই সহজ হোক না কেন, এর অনেক উপকারিতা ও নিয়ম কানুন আছে।এগুলো জানা আবশ্যক। তা না হলে আপনি সঠিক ফল পাবেন না।বাইরে হাঁটার জন্যেও আপনাকে সঠিক নিয়ম কানুন জানতে হবে।তা না হলে ইনজুরি হতে পারে অথবা আপনি হাঁটার সঠিক ফল নাও পেতে পারেন।হাঁটার নিয়মের পাশাপাশি ব্যায়ামের কিছু সাধারণ নিয়মাবলী জেনে নিলেও ভালো।

কি ভাবে হাঁটা শুরু করবেন?
প্রথমে জানুন কেন হাঁটবেন? আপনি কি ওজন কমাতে চান? নাকি ফিট থাকতে চান বা ফিটনেস বাড়াতে চান?যদি আপনার কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে, তবে হাঁটা শুরুর আগে একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।হাঁটার শুরুতে আপনার ওজন, বি এম আই, ওয়েস্ট টু হিপ রেসিও দেখে রাখুন, প্রয়োজনে লিখে রাখুন।আপনি কোথায় হাঁটবেন? ঠিক করুন। বাড়ির বাগানে, পার্কে নাকি ট্রেড মিলে?প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটবেন ও ভালো ফল পাবেন –এভাবে মন স্থির করুন। ফাঁকি দিলে আপনিই ভুক্তভোগী হবেন। এটা বুঝুন।দরকার হলে একজন ভালো হাঁটার সঙ্গী যোগাড় করতে পারেন, যিনি আপনাকে নিয়মিত হাঁটার জন্য অনুপ্রানিত করবেন।

হাঁটার রুটিন ঠিক করুন
আপনার দৈনন্দিন কাজের রুটিন অনুযায়ী হাঁটার রুটিন ঠিক করুন ও সেটা মেনে চলুন। কবে, কখন, কতটা সময় হাঁটবেন আগেই রুটিন তৈরী করে নিন।সপ্তাহে ৫ দিন হলে ভালো হয়। ৬ দিন হলেও ক্ষতি নেই, তবে একদিন বিশ্রাম দিলে ভালো।৫ দিন সম্ভব না হলে কমপক্ষে ৩ দিন হাঁটুন।শুরুতে অনেক কষ্ট হবে, কিন্তু একটু ধৈর্য ধরলে, শরীরে কিছুদিন পরে সহ্য হয়ে যাবে। তাই শুরু করুন ৫-১০ মিনিট হাঁটা দিয়ে । বেশি বেশি করতে যাবেন না। শরীর কে প্রথমেই বেশি চাপ দিবেন না। ১০ মিনিট কিছুদিন হেটে যদি মনে হয় আপনি ভালো বোধ করছেন, তখন হাঁটার সময় ও স্পিড আস্তে আস্তে বাড়ান।যেমন : ১০ মিনিট থেকে ১৫/২০ মিনিট বাড়ান।আস্তে আস্তে বাড়িয়ে মোট হাঁটার সময় কমপক্ষে ৩০ মিনিট করুন। চাইলে এক ঘন্টাও করতে পারেন।

হাঁটার সময় লক্ষ্য রাখুন
হাটার সময় আপনার হার্ট রেট বা বিট খেয়াল রাখুন।হার্ট বিট বেড়ে গেলে হাঁটার স্পিড কমিয়ে দিন।খারাপ লাগলে বা হার্ট বিট খুব বেশি বেড়ে গেলে হাঁটা বন্ধ করে দিন।হাঁটার জন্য নিরিবিলি,শান্তিপূর্ণ জায়গা বেছে নিন, যাতে মনের আনন্দে হাঁটতে পারেন।ধুলো বালি, রোদ, শব্দ দূষণ, ময়লা আবর্জনা পূর্ণ পরিবেশ ইত্যাদি এড়িয়ে চলুন।হাঁটার মাঝে থামিয়ে অন্য কাজ করবেন না।মনোযোগ দিয়ে হাঁটুন ও আপনি হাঁটছেন বা ব্যায়াম করছেন এটা মনে রাখুন। তা না হলে ভালো ফল পাবেন না।হাঁটতে ভালো না লাগলে,আলসেমি ও মন খারাপ করে হাঁটলে কোনো লাভ নেই।হাঁটার মাঝে মাঝে অল্প পরিমানে পানি খান।হাঁটার শেষে ভালো মত গোসল করে নিন। কারণ হাঁটার ফলে যে ঘাম ও ময়লা জমে তা শরীরের জন্য খারাপ। তাই হাঁটার শেষে সাবান ও শ্যাম্পু দিয়ে ভালো মত গোসল করা উচিত।

হাঁটার প্রয়োজনীয় জিনিস
হাঁটার জন্য লাগবে ভালো মানের কেডস বা জুতা, মোজা। আরামদায়ক টি শার্ট বা গেঞ্জি এবং ট্রাউজার।একটি ছোট ঘাম মুছার তোয়ালে ও পানির বোতল।হাঁটার সময় চেষ্টা করবেন অপ্রয়োজনীয় ও ভারী জিনিস সাথে না রাখতে।

হাঁটা শুরু করার পদ্ধতি :
প্রথমেই ওয়ার্ম আপ করুন।ওয়ার্ম আপ করতে প্রথমে ধীরে হাঁটা শুরু করুন।প্রথমেই জগিং বা দ্রুত হাঁটতে যাবেন না। প্রথম ৫ মিনিট ধীরে হাঁটুন, তারপর পরবর্তী ৫ মিনিট একটু স্পিড বাড়ান। এভাবে ১০ মিনিট ওয়ার্ম আপ করুন ভালো মত।কমপক্ষে ৫ মিনিট ওয়ার্ম আপ করলে ভালো। এক জায়গায় দাড়িয়ে মার্চ করেও ৫ মিনিট ওয়ার্ম আপ করতে পারেন।শরীর গরম হলে বা হার্ট রেট একটু বাড়লে স্পিড বাড়িয়ে হাঁটা শুরু করুন।ওয়ার্ম আপ শেষ হলে ভালো মত স্ট্রেচিং করুন। আপনার মাসেল গুলো ভালো মত স্ট্রেচিং করে তারপর দ্রুত হাঁটুন। স্ট্রেচিং করলে মাসেলের স্থিতিস্থাপকতা বাড়বে, ফলে হাটতে সুবিধা হবে।স্ট্রেচিং শেষ হলে ধীরে হাঁটার স্পিড বাড়ান। প্রথমেই বেশি স্পিডে হাঁটতে যাবেন না।

আপনার অঙ্গস্থিতি ঠিক করুন :
হাঁটার সময় সঠিক অঙ্গস্থিতিতে এ না থাকলে, আপনার দেহের গঠন নষ্ট হয়ে ব্যাক পেইন, নেক পেইন ইত্যাদি হতে পারে।হাঁটার শুরু থেকেই অঙ্গস্থিতি ঠিক রাখতে পা দুটো সোজা রাখুন, পা থেকে কোমর, কোমর থেকে ঘাঁড়, ও মাথা একদম সোজা থাকবে। মাথা ও চোখ থাকবে সোজা সামনের দিকে। দুই কান থাকবে কাঁধ বরাবর ।চিন আপ অবস্থায় মাটির সমান্তরাল থাকবে, এতে আপনার ব্যাক ও ঘাড়ে কোনো ব্যথা হবে না। সামনে ১০-২০ ফুট দুরে তাকাবেন।ঘাড়, মাথা ও গলা স্বাভাবিক ও রিল্যাক্স অবস্থায় রাখুন।
শ্বাস প্রশ্বাস থাকবে স্বাভাবিক।পেট ভিতরের দিকে টেনে রাখবেন।

হাত দুটোকে কাজে লাগান :
হাঁটার সময় হাত দুটো সামনে,পেছনে দুলবে এবং সেক্ষেত্রে কনুই ও হাত থাকবে ৯০ ডিগ্রী কোনে। হাত দুটো থাকবে একটু বাকানো ও খোলা অবস্হায়। হাতের আঙ্গুলগুলো হালকা মুঠো করে রাখবেন। হাত দুটো বেশি চাপা চাপি করবেন না, রিল্যাক্স অবস্থায় রাখুন।একবার ডান হাত, একবার বাম হাত, এভাবে কনুই ভেঙ্গে এক একটি হাত সামনে , পেছনে পেন্ডুলামের মত দুলবে।কাঁধের সাথে হাত দুটো সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রী কোনে সামনে ও পেছনে দুলবে।পেছন থেকে কনুই শরীরের মাঝ রেখা বরাবর আসবে, সামনে নয়।

হাত থাকবে পায়ের বিপরীতে :
অর্থাত যে পা আগাবে সেই হাত পেছনে যাবে। এভাবেও বুঝতে পারেন ডান পা আগালে বাম হাত সামনে, তখন বাম পা পেছনে ও ডান হাত পেছনে।হাত দুটো শরীরের কাছাকাছি বা কনুই প্রায় শরীরের সাথে বা শরীরের মাঝ রেখা বরাবর লেগে থাকবে। শুধু মাত্র হাতের কব্জি শরীরের সামনের দিকে যাবে।হাঁটার সময় হাত দুটোকে কাজে লাগান, এতে আপনার বেশি ক্যালরি খরচ হবে, হাঁটায় শক্তি আসবে এবং শরীরের ব্যালান্স ঠিক থাকবে।পায়ের সাথে হাতেরও স্পিড বাড়বে। এতে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকার পাশাপাশি স্পিড উঠাতে সুবিধা হবে।

পায়ের স্টেপ :
সামনের পায়ের স্টেপ ফেলার ক্ষেত্রে পায়ের হিল বা গোড়ালি দিয়ে শুরু হবে, ঘুরিয়ে পায়ের আঙ্গুলের দিকে যাবে ও পা সামনে যাবে।তারপর পায়ের পাতা পেছনে নেবেন। পেছনে নেয়ার সময় হালকা চাপ দিয়ে নেবেন। পেছনের পা স্টেপ ফেলার সময় টেনে পেছনে নিবেন, তারপর একই ভাবে অন্য পা সামনে নেবেন। তারপর ঘুরিয়ে পেছনের পা সামনে নিবেন।এভাবে একটি ছন্দে হাঁটতে হবে ও প্রতিটি স্টেপ ফেলতে হবে।ছোট ছোট ও দ্রুত স্টেপ ফেলতে হবে।সামনের পায়ের চেয়ে পেছনের পায়ে চাপ দেবেন বেশি। পেছনের ও সামনের পা শরীর থেকে মোটামুটি বাইরের দিকে বা দুরে যাবে।খুব বেশি নয়।কোমর/ হিপ হালকা সামনে পেছনে ঘুরবে বা টুইস্ট করবে।

হাঁটার মাঝে দম নিন ও ছাড়ুন :
হাঁটার মাঝে মাঝে শ্বাস প্রশ্বাস ঠিক রাখতে লম্বা ও গভীর দম নিন ও ছাড়ুন। নাক দিয়ে দম নিয়ে, মুখ দিয়ে ধীরে ছাড়ুন।এতে আপনার শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও আরো হাঁটার শক্তি পাবে।
কিছুদিন পর পর আপনার কেমন উন্নতি হচ্ছে, তা লক্ষ্য করুন। যেমন: ওজন কত কমলো, বা ফিতা দিয়ে মেপে দেখুন স্বাস্থ্য কেমন কমলো ইত্যাদি। আপনার হাঁটার গতি, কত মাইল কত সময়ে হাঁটছেন,ইত্যাদি লক্ষ্য করুন ও কেমন উন্নতি হচ্ছে তা জানুন। প্রয়োজনে লিখে রাখুন। এতে করে আপনার উন্নতি দেখে ভালো লাগবে ও আরো উন্নতি করার অনুপ্রেরণা পাবেন।

পানি পান :
হাঁটার ১০ মিনিট আগে এক গ্লাস পানি পান করুন।সারাদিন এক ঘন্টা পর পর এক গ্লাস করে পানি খেলে হাঁটার সময় পানিশুন্যতা হবে না।হাঁটার সময় প্রতি ২০ মিনিটে এক কাপ করে পানি খাবেন।
হাঁটার শেষে এক থেকে দুই গ্লাস পানি খাবেন।

হাঁটার গতি:
সব সময় একই স্পিডে না হেটে মাঝে মাঝে স্পিড বাড়ান।হাঁটার সময় হার্ট রেট বেড়ে গেলে বা ক্লান্ত লাগলে স্পিড কমিয়ে দিন। হার্ট রেট কমে আসলে আবার স্পিড বাড়ান।হাঁটার সময় এভাবে স্পিড বাড়ালে ও কমালে আপনার ক্যালরি বেশি বার্ন হবে।তবে যারা নতুন হাঁটা শুরু করেছেন বা করবেন তারা ধীরে ধীরে স্পিড বাড়াবেন, কিছুদিন হাঁটায় অভ্যস্ত হয়ে তারপর।

কুল ডাউন করুন :
হাঁটা শেষ হলে কুল ডাউন করুন।কুল ডাউন মানে আপনার হার্ট ও মাসেল গুলোকে রিল্যাক্স করা। হঠাত করে হাঁটা বন্ধ করলে আপনার মাসেল পুল,ইনজুরি, হার্ট ফেইল ইত্যাদি হতে পারে।কুল ডাউন করতে শেষ ৫-১০ মিনিট ধীরে ধীরে হাঁটুন। তারপর আবার ভালো মত স্ট্রেচিং করুন।আগের স্ট্রেচিং গুলোই করতে পারেন। কিছু কুল ডাউন স্ট্রেচিং জানতে ক্লিক করুন।ভালো হাঁটার গড় স্পিড হতে পারে ঘন্টায় ৩/৪ মাইল।ধীরে ধীরে এই স্পিডে হাঁটতে চেষ্টা করুন, একদিনে এই স্পিডে হাঁটা আয়ত্ব করা সম্ভব না।

সপ্তাহে কতদিন ও কতক্ষণ হাঁটবেন ?
সপ্তাহের অধিকাংশ দিন, যেমন: ৪-৬ দিন, ৩০-৬০ মিনিট হাঁটুন।সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন শরীরকে বিশ্রাম দিন।শরীরকে বিশ্রাম দিলে আপনার ব্যায়াম ভালমত কাজ করবে।কারণ, বিশ্রামের ফলে মাসেল তৈরী হবে, শক্তি ফিরে আসবে ও ব্যায়াম কাজ করবে।আবার এক,দুই দিনের বেশি বিশ্রাম দিতে যাবেন না, তাহলে হাঁটার ফল পাবেন না।

হাঁটার সাথে আর কি ধরনের ব্যায়াম করতে পারেন?
হাঁটার ব্যায়ামের পাশাপাশি স্ট্রেচিং, পেটের ব্যায়াম ইত্যাদি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আগে ওয়ার্ম আপ করতে হবে ভালো মত।তারপর স্ট্রেচিং করবেন। পেটের ব্যায়াম করবেন সবার শেষে।কারণ হাঁটা শুধুই কার্ডিও ব্যায়াম। হাঁটার উপকারিতা পেতে স্ট্রেচিং, পেটের ব্যায়াম ইত্যাদি করতে হবে।তাহলেই আপনার স্লিম, সুন্দর ও সু-স্বাস্থ্য হবে।সেক্ষেত্রে কোনদিন হাঁটার সাথে কোন ধরনের ব্যায়াম করবেন তা আগে থেকে রুটিন তৈরী করে নিন।

হাঁটার ক্ষেত্রে সব সময় যা যা মনে রাখতে হবে তা হলো :
পুরা শরীর কে সঠিক ভঙ্গিতে রেখে, হাত ও পা ব্যবহার করে, মন স্থির করে, পর্যাপ্ত শক্তি দিয়ে হাঁটতে হবে।তাহলেই ভালো ফল পাওয়া যাবে।

শেষ কথা
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে যে, আপনি যত বেশি হাঁটবেন, তত আপনার ডায়বেটিস হবার সম্ভাবনা কম হবে। সেখানে আরো প্রকাশিত হয়েছে,গবেষকদের গবেষণায় এটা প্রমানিত হয়েছে যে, যিনি সপ্তাহে ৫ দিন প্রতিদিন ১০,০০০ স্টেপ হাঁটেন, তিনি ডায়বেটিস থেকে তত দূরে থাকেন যিনি প্রতিদিন ৩,০০০ স্টেপ হাঁটেন।তাই দেরী না করে আজই শুরু করুন নিয়মিত হাঁটা।২৫ বছরের উপরে যারা তাদের জন্য হাঁটা অত্যাবশক।

হাঁটা অন্যান্য ব্যায়ামের চাইতে সোজা, নিয়মিত হাঁটা একটি মজার কাজ। যাদের জিমে যাওয়া সম্ভব হয় না, তাদের জন্য হাঁটা একটি অনেক ভালো ব্যায়াম হতে পারে।তাছাড়া সব কাজ বাদ দিয়ে মনের আনন্দে নিয়মিত হাঁটলে মনটাও সতেজ থাকে।হাঁটার মাঝে কথা না বলে নিজের জন্য ভালো কথা চিন্তা করলে এটাকে বলা যায় এক রকম।ফলে আপনার জীবনে উন্নতি তো হবেই, আপনি আরো বেশি কাজ করার জীবনী শক্তি পাবেন।অতএব আসুন, আমরা নিয়মিত হাঁটা হাঁটির মাধ্যমে সুস্থ এবং দীর্ঘ জীবন লাভ করার চেষ্টা করি।আপনার প্রতিদিনের হাঁটা আনন্দময় হোক এই কামনা করি।

***
ইন্টারনেট এ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন আর্টিকেল অবলম্বনে