ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানীর ৩৫ তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ ১৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানীর অবদান বিশেষ স্বরণীয়। সুবিধা বঞ্চিত মানুষের তিনি ছিলেন এক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। তাঁর আদর্শকে স্বরণে রেখে সমপ্রতি নিউইয়র্কে গঠিত ভাষানী ফাউন্ডেশনের আত্ম প্রকাশকে স্বাগত জানাই। ঐতিহাসিক প্রোপট যারা জানেন তারা অবহিত আছেন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের মহান প্রতিষ্ঠাতা ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ভাষানীর বহু আগে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সার্বিক চেষ্টা করে গিয়েছিলেন।

১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীকে ভাষানী সর্বপ্রথম ‘ওয়ালাইকুম আস্সালাম’ বলেন এবং ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি পেশ করেন। আসলে অবিভক্ত বাংলার সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী সোহ্রাওয়ার্দী ১৯৪৭ সালের ২৭ এপ্রিল দিল্লীতে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে প্রকাশ্যে স্বাধীন-সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলার প্রস্তাব পেশ করে বলেছিলেন, ‘স্বাধীন বাংলা হবে ভারতের মধ্যে সবচেয়ে ধনাঢ্য ও সমৃদ্ধিশালী দেশ, যেখানে জনগণ উন্নত জীবন যাত্রার সন্ধান পাবে এবং সেখানে একটি মহান জাতি তার উৎকষ্রের শীর্ষতম সোপানে পৌঁছাতে সম হবে। সত্যিকার অর্থে প্রাচুর্যভরা দেশ হবে বাংলা।’ সোহ্রাওয়ার্দী সে সময় দলমত নির্বিশেষে সকল বাঙ্গালী মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র গঠনের পে যুক্তি দেখিয়ে তাদেরকে স্বমত্তে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তবু শেষ পর্যন্ত তখনকার সর্বভারতীয় কংগ্রেসের কতিপয় রেনতার ও শাসক ইংরেজ সরকারের বিরোধিতার মুখে তা বাস্তবায়িত হতে পারেনি। ঐ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর বাংলা (পূর্ব বাংলা, পশ্চিম বাংলা, আসাম এবং বিহারের বাংলা ভাষা-ভাষী পূর্ণিয়া জেলা) হতে পারত আট কোটি বাঙ্গালী অধ্যুষিত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। পূর্ব বাংলাকেও চব্বিশ বছরকাল পাকিস্তানের গোলামী করতে হত না। স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে তখনকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে সোহ্রাওয়ার্দী ও তাঁর অনুসারীরা মুসলিম লীগের স্বপে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করেন।

সোহরাওয়ার্দীর আশীর্বাদ, সমর্থন ও মনোনয়ন নিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানীকে সভাপতি করে ‘পূর্ব বাংলা আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠিত হয়। পূর্ব বাংলা তখনকার নবজাত পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের একটি প্রদেশমাত্র ছিল। সোহ্রাওয়ার্দী চাইলেই নিজে এই প্রাদেশিক আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হতে পারতেন। কিন্তু তিনি প্রাদেশিক পর্যায়ের নেতা হতে ইচ্ছুক ছিলেন না বলেই ভাষানীকে সমর্থন দিয়ে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি করেন। পরবর্তীতে কেন্দ্রে ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করে সোহ্রাওয়ার্দী পর্যায়ক্রমে নিজে এর আহ্বায়ক ও সভাপতি হন। ১৯৫৭ সালে দলীয় প্রধান সোহ্রাওয়ার্দীর সাথে মতানৈক্য ঘটলে মওলানা ভাষানী আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। সোহ্রাওয়ার্দীর একান্ত অনুসারী শেখ মুজিবর রহমান (বঙ্গবন্ধু হন ১৯৬৯ সালে) সে সময় পূর্ব বাংলা আওয়ামী মুসলিম লীগের (পরবর্তী নাম পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহ্রাওয়ার্দীর মৃত্যু হলে ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সার্বিক নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান পরবর্তীকালে তাঁর ‘রাজনৈতিক পিতা’ হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর এককালীন লালিত স্বপ্নের আংশিক বাস্তবায়ন করেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে। তবে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানী নিঃসন্দেহে একজন বড় মাপের নেতা ছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান বিশেষ স্বরণীয়। তিনি ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস তাগ করেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুক। এবং সেই সাথে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।