ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

দিনটি ছিলো বৃহ:বার। প্রত্যুষে উঠেই মনে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে চলছে। রক্তিম আভায় আলোকিত মন। আলোকিত সারা জাহান। তারই ফাঁকে সূয্যি মামার হাসি। আমার মনের অগোচরেও এক পসলা হাসির ঝিলিক বয়ে গেলো। মনে মনে শরমিন্দা হলাম প্রভুর আয়াতের প্রতি ল্য করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা কম হাসো, বেশি কাঁদো।” (সূরা আনফাল) অশান্ত মনকে শান্ত করলাম। উস্তাদ মহোদয় তৈরী হতে বললেন। আমিও তৈরী হয়ে মেঘনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। অটোরিক্সা, নৌকা, বাস ইত্যাদিতে চড়ে ‘লাহাড় হাট’ এসে পৌঁছলাম। সামনে বিশাল নদী; নৌকা যেতে ভয় পায়। ট্রলারে পার হবার সিদ্ধান্ত নিলাম, চড়েও বসলাম। অথৈ পানির মাঝে ছুটে চলেছে আমাদের ছোট্ট তরী। মাঝে মাঝে নদী-বরে স্থলচর আমাদের সুখের তরীকে আটকে দিচ্ছে; সহ্য হচ্ছে না। তবে আনন্দও কম হচ্ছে না। অথৈ নদীর মাঝে হাঁটু সমান জল। বিশ্বাসই হচ্ছে না। জলরাশি; তার ফাঁকেই জেগে ওঠা ডুমচর, পাওয়ারচর, মনপুরা ইত্যাদি খুব চমৎকার লাগছে। হাজারও ব্যাকুলতার পর গিয়ে পৌঁছলাম ‘ভেদুরিয়া’। তারপর বাস যোগে ভোলা বোরহান উদ্দিন। সেখানে রাত্রি যাপন করলাম। পরদিন শুক্রবার আমরা যাব মেঘনার তীরে। আগ থেকেই সিএনজি কন্ট্রাক করা ছিলো। আমরা সূর্যাস্ত দেখবো। ঠিক ভোর রাত্র, যখন ৪.৩০মি: বাজে তখন আমরা গাড়িতে চেপে বসলাম। তখন প্রকৃতির রূপ হলো নিস্তব্ধ নিথর, জনমানবহীন, দুর্গম গিরি। নেই কোন কোলাহল, মাঝে মাঝে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ, চামচিকার ছুটোছুটি। ঘুম ঘুম শব্দ; তারই মাঝে ছুটে চলছে তো চলছেই, যেন চলার শেষ নেই আমাদের আরোহন সিএনজি।

ছুটতে ছুটতে এসে পৌঁছলাম মেঘনার সন্নিকটে। একটি সিডর কবলিত মসজিদে। ফজর নামাজ আদায় করলাম। এখনো প্রকৃতি সাজেনি আপন সাজে। মেঘনার তীরে বসে অপোর প্রহর গুনছি, কখন হবে সূর্যাস্ত? হঠাৎ পূর্ব আকাশের বুক প্রথম লাল হয়ে উঠলো । মনে হলো কেউ কৌতুক করে ওর বুকে এক গামলা রং ঢেলে দিয়েছে। সেই লালের উপর সোনালী আভা, যেন নববধুর লাল চেলীর উপর সোনালী জরী চিক চিক করছে। আকাশের বুক যেন মস্তবড় আয়না। মুহূর্তে মুহূর্তে নদীর বুকে এর রংয়ের প্রতিফলন ঘটছে। লাল রং সরে গিয়ে এখন আকাশের বুকে সূর্যের সোনালী উদ্ভাস। নদীর বুকে মাথায় সেই সোনালী রোদের হাসির নর্তন। এভাবেই দেখা হলো সীমাহীন আকাক্সার রক্তঝরা সূর্যাস্ত। এবার মেঘনার লবনাক্ত জল। খলখল করে ছুটে চলছে কোন অজানার উদ্দেশ্যে। এর যেন কূল নেই। কিনারা নেই। অগাধ পানির উপর কতগুলো ছোট তরী ঢেউ- এর তালে তালে বড় বেশি উঠা নামা করছে। ঠিক যেন মোচার খোলের মতো। এক সময় তীরে নোঙ্গর গাড়লো। আমি তরীতে উঠে নিজ হস্তে পান করলাম স্বচ্ছ লবনাক্ত জল। যেন অমৃত! ঠিক দুপুর ২:৪৫মি:। নামাজ আদায় করে গন্তব্যে ফিরার পালা। বিদায় নিতে হলো মেঘনা থেকে। প্রভু যদি সদয় হন, তবে হয়তো আবারো দেখা হবে কোন অচেনা মুখ। এই প্রত্যাশায় বিদায়!