ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

প্রচণ্ড গরমে ঘেমে নেয়ে উঠেছে সুরুজ মিয়া। গায়ের গেঞ্জি জবজবে ভিজা। এইমাত্র যাত্রী নামিয়ে কপালের ঘাম মুছছে সে। এমনি কোত্থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো ক’জন যুবক। কোন কথা নেই হুড়মুড় করে উঠে বসল রিকশায়। কড়া ধমকে বলল, এই রিকশা চল। যেন রিকশাওয়ালা বলতেও বাধে। বেচারা রিকশাওয়ালা কি বলতে গিয়ে থেমে গেল। অসহায় ভঙ্গিতে বলল কোথায় যাবেন? আরে ব্যাটা যা না! আরেক জনের ধমক। ওদের হম্বিতম্বি দেখে দুরুদুরু কাঁপে রিকশাওয়ালার বুক। চারটা তাজা তাগড়া জোয়ান দখল করে বসেছে রিকশা। এমনিতে ক্লন্ত বিধ্বস্ত সুরুজ মিয়া। সবে খ্যাপ মেরে গলা শুকিয়ে কাঠ। ক্ষুধায় পেটটা মোচড় দিচ্ছে। দু’গ্লাস পানি একটা রুটি না খাওয়া পর্যন্ত প্যাডেলে পা রাখতে পারবেনা। ষণ্ডামতো ছেলেদের দিকে তাকিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলল সুরুজ মিয়া। এই নির্জন দুপুরে আশপাশে অন্য রিকশাও নেই। আমতা আমাত করে কিছু বলতে যাচ্ছিল সে, তেমনি ধমক, দেখস না আর কোন রিকশা নাই। যা নামিয়ে দিয়ে আয়। অগত্যা রিকশার টান দিল সে। তার হাড়পাঁজরের মতই কড়কড় করে উঠল রিকশার কলকবজা। বিগড়ে যাওয়ার দশা। ভাঙ্গাচোরা রাস্তায় বিচিত্র আওয়াজ তুলে চলছে রিকশা, যেন পাষণ্ডদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। রিকশায় চড়ে ওদের সেকি খুনসুটি গুতোগুতি। অশ্লীল কথার তুবড়ি ছুটছে ওদের মুখ থেকে। রাস্তায় থাকে পায় তােিক নিয়েই তির্যক মন্তব্য, হাসাহাসি ডলাডল। যেন গোটা বিশ্বসংসার ওদের হাসির খোরাক। ছেলে বুড়ো কেই বাদ যায় না ওদের তীব্র কটাক্ষ থেকে। হঠাৎ কোন সুন্দরী মেয়ে পড়লে তো কথাই নেই। কথার চাবুকে খুবলে ফেলে।

প্যাডেলে কয়েক চাপ দিতেই হাঁপিয়ে উঠল সুরুজ মিয়া। শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে। জোরে চালাতে গিয়ে ফুলে উঠছে ঘাড়ের বগ। টানটান হয়ে যাচ্ছে হাত পায়ের শিকড় বাকড়। বুকের হাড়-পাঁজর বিচিত্র ভঙ্গিতে ওঠানামা করছে। পাকানো মাংসপেশী যেন শক্ত পাথর। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছে তার। ‘আরে ব্যাটা, জোরে চালা। তুই দেখি এখানেই শো শেষ করে দিবি।’ বলে ধমকে উঠল একজন। চুপ করে থাকে সুরুজ মিয়া। জানে, কিছু বলতে গেলে বিপদ। অযবা বিপদ ডেকে এনে কাজ নেই। চুপ থাকাটা বরং নিরাপদ। যুবকেরা আগের মতই হল্লা করে উঠে। ওদের দাপাদাপি হুড়োহুড়িতে চালকেরও বেগ পেতে হচ্ছে। বাগে রাখা যাচ্ছে না রিকশা। পাগলা ঘোড়ার মত কেবলই এদিক ওদিক হয়ে যাচ্ছে। ওদের চুপ করতে বলতে সে ভরসা পাচেছ না সে।

এক সময় এসে পৌঁছল গন্তব্যে। ভাড়া দেওয়ার সময় দেখা দিল আরেক বিপত্তি। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অর্ধেক চালকের হাতে গুঁজে দিয়ে হনহন হাঁটা ধরল ওরা। মুহূর্তে হারিয়ে গেল হাজারো মানুষের ভীড়ে। অসহায় সুরুজ মিয়া কেবল ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে রইল ওদের চলে যাওয়ার দিকে। নিজের অজান্তেই চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে এলো। চুপ করে গড়িয়েও পড়ল দু’ফোঁটা অশ্র“। ভিতরটা আলোড়িত হয়ে দীর্ঘশ্বাস উঠল। এক ধমকা গরম হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। পরক্ষণেই বিড়বিড় করে কী বলল সে নিজেই জানে আর জানে মহাপরাক্রমশালী অন্তর্জামী আল্লাহ।

এভাবে প্রতিনিয়ত কত অসহায় মানুষ যে নির্যাতিত হচ্ছে বখাটে মাস্তানদের হাতে। ওদের দৌরাত্ম আজ সীমাহীন। ওরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে না। তামাম দুনিয়াটা যেন ওদের বাবার তাল্লুক। সবাই যেন ওদের অধিনস্থ চাকর। যাকে যেমন চায় খাটাতে ওদের বিবেকে বাধে না। বিবেক বলতে কিছু নেই ওদের। সমাজের অনেক কর্তাব্যক্তি ওদের সমীহ করেন। গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে বাগে রাখেন। স্বার্থ হাসিল করেন। সেজন্য ওদের যত অন্যায় অপরাধ দেখেও না দেখার ভান করেন। এভাবে তো একটা সমাজ চলতে পারে না। চলতে দেওয়া যায়না। এভাবে চলতে দিলে অসহায় নির্যাতিতের বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসে আকাশ বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠবে। নেমে আসবে খোদায়ী গজব। তখন কিন্তু আমরাও পারব না নিজেদেরকে রক্ষা করতে।