ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

যে কোনো ধরণের ব্যায়াম শরীরের জন্য সর্বদাই উপকারি। যা অতীত কাল থেকে পরীক্ষিত সত্য। কিন্তু আমাদের বাঙালি সমাজের মতো শিক্ষায় পশ্চাদপদ সমাজে ও ধর্মীয় রক্ষণশীল সমাজে এখনো ব্যায়ামের কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না । আজকাল শিক্ষিত পরিবার সমুহে অনেকেই ব্যায়াম করতে ভালবাসেন এবং অন্যকেও অনুপ্রেরণা দান করেন। যা আমাদের মত রক্ষণশীল সমাজের জন্য একটি সুখবর ।

আজকাল ব্যায়াম ছাড়াও আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম খাবার দাবার ইত্যাদি কিভাবে শরীরের পুষ্টি হিসাবে কাজে লাগে ও স্বাস্থ্য রক্ষা হয়, এব্যাপারে সাধারণ বিজ্ঞান বইতেও অনেক তথ্যাদি সহ্নিবেশিত করা হয়েছে। এতদ্ব্যতীত ডাক্তারদের পরামর্শ ছাড়াও লাইব্রেরি কিংবা বইয়ের দোকানে স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় অনেক বই পুস্তক পাওয়া যায়। পত্রিকাতেও প্রকাশ করা হয় স্বাস্থ্য সম্পর্কীত বিভিন্ন প্রবন্ধাদি। যা পাঠ করে সচেতন যে কোনো মানুষ তাঁর নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করে চলতে পারেন। রক্ত, হরমোন, পিটুইটারী গ্ল্যান্ড, পিত্ত পাথর, লিভার এনজাইম, ক্যালশিয়াম, আয়রণ বা লৌহ, হেমোগ্লোবিন, ক্যানসার, টিউমার, ডায়বেটিক্স তথ্য ইত্যাদি সম্বন্ধে আজকাল প্রচুর মানুষের জ্ঞান রয়েছে। পরিবারের রোগী, চলতি অসুখ, আত্মীয়-স্বজনদের অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণনা করা বিভিন্ন রোগের বাস্তব অভিজ্ঞতার কাহিনী থেকে মানুষ দিন দিন বহুমুখি অভিজ্ঞতা লাভ করছে। অনেকে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধির পথ্যাবলী সম্বন্ধেও অনেক জ্ঞান রাখেন। একারণে অতীতে একটি প্রচলিত প্রবাদ ছিল “পৃথিবীতে রোগী অপেক্ষা ডাক্তার বেশি”।

আজকের এই নিবন্ধে আমি ব্রেষ্ট ক্যানসার ও ব্যায়ামের উপকারিতা নিয়ে কিছুটা বলবো। সাধারণ ভাবে বলা যায় ক্যানসার হচ্ছে ‘দুষিত কোষের পচনশীল প্রক্রিয়া’। এই পচনশীলতা হাড়গোড়ের মধ্যে ও আক্রান্ত হয়। আমাদের শরীর কোটি কোটি সেল বা কোষ দ্বারা গঠিত, কোষগুলো একটি প্রাকৃতিক নিয়মের আওতায় জমাট বেধে টিস্যু বা কলা তৈরি করে, টিস্যু থেকে তৈরি হয় শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। কোষের অভ্যন্তরে রয়েছে “জীন” নামক অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু যা বংশ ধারার চিহ্ন বা প্রমাণ বহন করে। এই জীনকে বুঝতে হলে মিউটেশন সিসটেম এবং ডি.এন.এ এবং আর.এন.এ. সর্ম্পকে জানতে হবে; যা এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে বলা সম্ভব নয়। যাই হোক প্রাকৃতিক নিয়মে এই সকল কোষ, টিস্যু ও জীনগুলো এক শৃঙ্খলার আবর্তে কাজ করে। যার ফলে আমরা স্বাস্থ্যবান হিসাবে বেড়ে উঠি ও জীবন অতিবাহিত করি। কিন্তু কোনো কোনো সময় কিছু কিছু কোষ ও জীন নির্দেশিত পথে কাজ না করে এলোমেলো ভাবে তার কাজ শুরু করে। যার ফলে কোষগুলি জমাটবদ্ধ হয়ে টিউমারের সৃষ্টি করে অথবা তা রক্তে বিস্তারিত হবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ইহা এতই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র থাকে যা সনাক্ত করা যায় না। এমনকি শরীরে এমন কোনো পূর্বলক্ষণ ও দেখা যায় না, যার ফলশ্রুতিতে এটাকে ক্যানসারের বীজ হিসাবে সনাক্ত করা যায়।

সুতরাং ক্যানসারের প্রাথমিক জন্ম এবং তার আবির্ভাব একটি জটিল ব্যাপার। আমরা বলতে পারি এটা প্রকৃতির একটি অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যা অতীতে ছিল এবং আজো আছে। কিন্তু অতীতে এর প্রকোপ ছিল খুবই কম। রোগটি নির্ণয় করা বা এই রোগটির নাম ক্যানসার তা আবিস্কৃত হয় মাত্র ৪০ বৎসর আগে। অর্থাৎ ১৯৭১ সালে। আমেরিকান গবেষক ‘আলফ্রেড জর্জ নাডছন’ একটি টিউমারের পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে ক্যানসার রোগের আবিস্কার করেন যা ‘নাডছন হাইপোথেসিস’ নামে খ্যাত। সুত্রটির প্রাথমিক সুত্রপাত করেন সুইডেনের পদার্থবিদ কার্ল নর্ডিংটন ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে। আজকাল বহু ধরনের ক্যানাসারের প্রকোপ দেখা যায় এর মধ্যে পুরুষের প্রষ্টেট ক্যানসার আর নারীদের ব্রেষ্ট ক্যানসার অন্যতম। একজন মানুষ পৃথিবীতে অনেক বেশি পাপ করেছে একারণে তার ক্যানসার হয়েছে এরকম আত্ম-বিশ্বাস কিংবা ধর্মীয় ধারণা বিজ্ঞানের কাছে হাস্যকর ব্যাপার। ক্যানসার রোগ যে কোনো মানুষের হতে পারে। পাপ-পুণ্যের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। গবেষণায় দেখা গেছে যে সমস্ত মহিলাদের ব্রেষ্ট ক্যানসার হয় তাদের মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রথমত: জেনেটিক; অর্থাৎ মা নানী দাদী নানী ফুফু বা খালাদের ক্যানসার হলে সন্তানদেরও হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দুই: স্তনের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে যাবে এই ধারণায় যারা সন্তানদের মোটেই স্তন্যপান করাতে দেননি। তিন: দীর্ঘকাল অবিবাহিত থাকা কিংবা সন্তানহীন অর্থাৎ বন্ধ্যা অবস্থায় থাকা। চার: যে সমস্ত মাছ, মাংশ ও তরি-তরকারি অতিরিক্ত সার কিংবা বহুমুখি ক্যামিকেল প্রয়োগে উৎপাদন করা হয়েছে তা বেহিসাবির মত ভক্ষণ করা। পাঁচ: যারা অতিরিক্ত বাছাবাছি করে খানপিনা করেন। কারণ তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের রাসায়নিক উপাদানগুলোর ঘাটতি হয়। ছয়: যারা টাটকা ফলমুল কিংবা শাক-সবজি ইত্যাদি খেতে মোটেই পছন্দ করেন না।

সুতরাং যে কোনো রোগ শরীরে আক্রমন করার পুর্বে, যদি স্বাস্থ্য সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্ভন করা যায় তাহলে আমরা রোগের ঝামেলাকে এড়াতে পারি। রোগ হয়ে গেলে ডাক্তারের শরনাপন্ন হওয়া ছাড়া গতি নেই। অতএব শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি তৈরি করা যায় যেমন; ব্যায়াম, সুষম খাদ্য, নিয়মিত বিশ্রাম ইত্যাদি তাহলেই আমরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে উত্তম ব্যায়াম শরীরকে সুস্থ রাখতে ৭০ ভাগ সহায়তা করে। স্তন বা ব্রেষ্ট ক্যানসার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হলে উপরে উল্লিখিত বিষয়ে নারীদের সতর্কতা অবলম্ভন করা উচিত। আর ব্যায়ামের ব্যাপারে ও অধিক মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। আমরা জানি আমাদের বাঙালি সমাজে মেয়েদের ব্যায়াম বলতে কিছুই নেই। ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কারণে মেয়েরা খেলাধূলা ইত্যাদিতে অংশ গ্রহণ করতে পারেনা, তদ্রূপ বিভিন্ন ধরণের নাচ কিংবা শরীরে ঝাঁকুনি খায় এধরণের কিছু করার কোন প্রচলন নেই। অতীতে গ্রামীন সমাজের মেয়েরা ধান, সরিষা, তিসি বাছাই ও ভাঙ্গার কাজে ব্যস্ত থাকার ফলে কাজের ভিতর দিয়েই তাদের ব্যায়াম হয়ে যেত। হামান-দিস্তার ব্যবহার, কুঠার দ্বারা কাঠ কেটে ছোট্ট করা, ঢেঁকিতে ধান ভানা, ফসল মাড়াই, চিড়া, মুড়ি, সন্দেস, পিঠা তৈরি করা ও মশল্লা পেষণ করা ছিল অনেকটা নৈমিত্তিক কাজ। এ সমস্ত কাজের মধ্যে দিয়ে নারী তার বাহু, হাত, উরু প্রভৃতি ব্যবহার করতো প্রচুর, যে কারণে বুক ও স্তনের রক্তবাহী নালী সহ অন্যান্য শিরা উপশিরা গুলোর একটি উত্তম ব্যায়াম কার্য হয়ে যেতো অনায়াসে। আজকাল অধিকাংশ মেয়েদের এসব কিছু করতে হয়না। অপরদিকে তারা স্তনের জন্য আঁটসাট ব্রা বা বক্ষবন্ধনী ব্যবহার করেন সব সময়। অধিকাংশ বক্ষ বন্ধনীতে থাকে কৃত্রিম বা সিনথেটিক কাপড় ও অর্ধবৃত্ত আকারের শক্ত প্লাষ্টিকের নল। যা ব্যবহার করা হয় নারীর স্তন যুগল খাড়া ও সুডৌল ভাবে আকর্ষণীয় হয়ে থাকার জন্য। সুতরাং দেখা যাচ্ছে নারীর স্তন যুগল কিংবা বক্ষ দেশের আশপাশ স্থানগুলো সর্বদাই ব্যায়াম থেকে বঞ্চিত। অতএব নারীর স্তনের ব্যায়ামের জন্য নিম্ন লিখিত ব্যবস্থাগুলো অনুকরণ করা হলে নারীরা স্তন বা ব্রেষ্ট ক্যানসারের সম্ভাবনা থাকে খুব কম।

১। মেয়ে শিশু জন্ম নেয়ার পর একমাস থেকে চার মাসের মধ্যে শিশুর বুকের নিপল এলাকায় চাপ দিয়ে সাদা সাদা দুধের মত আটাল পানি বের করে নেয়া। যা আমাদের মা, দাদীরা, করে থাকেন একটি প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে।
২। বুকের ব্যায়ামের জন্য বাজারে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও পাওয়া যায়। এই ভিডিও দেখে দেখে সপ্তাহে কমপক্ষে দু’দিন ব্যায়ামের অনুশীলন করা।
৩। ব্যাডমিন্টন ভলিবল ও টেবিল টেনিস খেলার অভ্যাস করা।
৪। প্রত্যেক দিন গোসলের পর স্তন ও আশেপাশের এলাকায় উত্তম ভাবে তৈল মর্দন করা
৫। বিবাহিত হলে মিলনের পূর্বে দীর্ঘ সময় নিয়ে স্তন ও স্তনের আশপাশ এলাকায় বহুমুখী শৃঙার কার্য করা
৬। খাদ্যের ব্যাপারে বাছাবাছি অভ্যাস ত্যাগ করা
৭। দুধের শিশু থাকলে, শিশুকে নিয়মিত স্তন্য পান করতে দেয়া
৮। আঁটসাট বক্ষবন্ধনী ব্যবহার না করা।
৯। ফলমূল ও শাকসবজি ভক্ষণে অবহেলা না করা।