ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ভারত কি বিএনপি’র পক্ষে নাকি বিএনপি ভারতের পক্ষে? যাই বলা হোক না কেন অর্থ একটাই। বাংলাদেশের ভূ-ম-ল এমন একটা অক্ষে- যা বাংলাদেশকে যেভাবে না উপকারে দিয়েছে তারচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার করেছে বেশি। মূলত বিশ্বে এমন একটি দেশের নাম বলা যাবে না যে দেশের রাজনীতি একটু হলেও বহির্বিশ্বের দ্বারা এবং এর পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দ্বারা প্রভাবিত নয়। কিছুদিন আগের মার্কিন নির্বাচনও খানিকটা প্রভাবিত এই সূত্রের দ্বারা। বারাক ওবামার যত না জনপ্রিয়তা আমেরিকায় পরিলক্ষিত হয় তারচেয়েও বেশি জনপ্রিয়তা দেখা যায় বিশ্বে অন্যান্য ছোট বড় দেশগুলোর মধ্যে।

একে তো ভারত একাই এক পরাশক্তি (তৃতীয় শক্তি)। অন্যদিকে আমেরিকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ একটা মদদ ভারতের কোর্টে রয়েছে সব সময়ই। আর তাই তো বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির ভবিষ্যত চিন্তা করেই যে বিএনপি চেয়ারপারসন ভারত সফর করেছে এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের। শুধু তো আর ভারত সফর নয় তার আগে গণচীন সফরেও আসন্ন নির্বাচনের একটা টোপ কেন্দ্রিক সফর যে বেগম জিয়া দেননি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভারত সফরে বেগম খালেদা জিয়া প্রথম দিনই বিকেলে সাক্ষাত করেন দেশটির বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথে। এরপর একে একে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এরপর প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর সাথে বৈঠকে লিপ্ত হন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা শমসের মবিন চৌধুরী অবশ্য বলেছেন খালেদা জিয়া টিপাই মুখ, ফারাক্কা বাঁধ, সীমান্তে হত্যা বন্ধুসহ নানা দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেছেন। কিন্তু দ্বি-পাক্ষিকতার অন্তরালে বিএনপি কি তাদের নির্বাচনী সফরের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেননি? নিশ্চয়ই! তা নয় তো দীর্ঘ মাস খানেক এ বিষয়টি কেনই বা আলোচনায় উঠে আসবে যে, ‘এটি একটি আগা গোড়াই নির্বাচনী সফর।’ তবে বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম জানান যে, খালেদা জিযা তার সফরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আসন্ন নির্বাচন এবং নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কোনো কথা বলেন নি বা আলোচনা করেন নি। এই সফরের কারণে বিএনপি’র ভারত নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। বিএনপি চায় সমতার ভিত্তিতে সব সমস্যার সমাধান। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা বা প্রাপ্য দাবির কথা বলা ভারত বিরোধিতা নয়।

এদিকে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষালের একটি রিপোর্টে উঠে আসে, ভারতীয় নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত সচেতন ও সুপরিকল্পিতভাবে এই সফরের আয়োজন করাচ্ছে। বাংলাদেশের নির্বাচন আসন্ন। শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধিতার হাওয়া বইছে। ফলে সেখানে যদি পালাবদলের ঘটনা ঘটে যায় তার জন্য তৈরি থাকতে চাইছে ভারত। জয়ন্ত ঘোষাল লিখেছেন, ‘ভারতীয় এই কৌশলে হাসিনার সরকারের মধ্যে একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। খালেদা যখন দিল্লিতে থাকবেন তখন বাংলাদেশের হাইকমিশনার তারিক করিম গরহাজির থাকবেন। এটা কোন ধরনের কূটনীতি! কয়েক মাস আগে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন দিল্লিতে গিয়েছিলেন তখনও এক ধরনের অস্বস্তি ছিল।

সুচতুর এরশাদ ভারতীয় নেতৃবৃন্দকে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন হাসিনাকে দিয়ে আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করা যাবে না। একগাদা অভিযোগ করেছিলেন। এরপর থেকেই এরশাদ যেন মহাজোট থেকে এক পা বাহির করে ফেলেন।’ তবে একথা মানতে নারাজ আওয়ামী লীগ নেতারা তারা বলেছেন এটি শুধুই প্রচারণা সফর। কিন্তু কথার প্রচারণায় চিড়া ভিজে না। আবার কেউ বা বলেছেন নালিশ করার জন্য ঘুরতে যাওয়া। এমনটি অবশ্য এসেছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ থেকে। আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর তো সরাসরিই মিডিয়াকে বলেছেন বেগম খালেদা জিয়া ভারত যাচ্ছেন শুধু নালিশ করতেই। এর বেশি কিছু নাকি তিনি করতেই পারবেন না। তার এ বক্তব্য বিএনপি চেয়ারপার্সনের সফরে যাওয়ার পূর্বের কথা। এখন বিএনপি সত্যিই সফরে গিয়ে কোন একটা কিছু করে ফেলেছে কিনা এ নিয়ে কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ গুজে সপ্তাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও ভারত যাওয়ার তাল উঠেছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেছেন বিএনপি এখন ভারতের দিকে ঝুঁকেছে। তাই তাদের অতীত রাজনীতি নাকি ভুল ছিল!

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নূহ-উল আলম লেলিন ঠিকই সময়োচিত মন্তব্য করে বলেছেন, সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে গোপন কোনো চুক্তি হলো কিনা। নূহ-উল আলম লেলিন আরো বিশদভাবে তুলে ধরে বলেন, প্রথমত এই সফরে যে বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে তা হচ্ছে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষিয় সম্পর্কের উন্নয়ন। খালেদা জিয়া যেসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাতে যদি ঐকমত্যে পৌঁছানো যায় তাহলে সেটা হবে খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এই ইতিবাচকটাকি সরকার না বিএনপির জন্য তা নিয়ে সরকার কি ভাবছে এ প্রশ্নের জবাবে লেলিন জানান, বিএনপির ভারত নীতিতে অতীতের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক আরো জোরদার হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত খালেদা জিয়া সফরে বলেছেন, তার দল ক্ষমতায় গেলে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেবেন না। যদিও তার এই কথার মধ্যদিয়ে অতীতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জায়গা দেয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। এই বিষয়টি খুবই অর্থবহ। কারণ এর আগে খালেদা জিয়ার সরকার চীনের সঙ্গে এক নীতি অনুসরণ করে বাণিজ্য চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু ছেলে তারেক রহমান সেই চুক্তি উপেক্ষা করে তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্য করে। এতে চুক্তির বরখেলাপ হওয়ায় আমাদের পূর্বমুখী বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুশকিলে পড়তে হয়েছে। সুতরাং প্রতিশ্রুতি দেয়াটা বড় কথা নয়। রক্ষা করাটাই বড় কথা। সর্বশেষ যে বিষয়টিতে এখানে গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে সফরে গোপন কোনো চুক্তি হলো কিনা। মিডিয়াতে যা প্রকাশ পাচ্ছে তার বাইরে আরো কোনো বিষয় আছে কিনা। কারণ বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য গোপন চুক্তিতে অভ্যস্ত বলেও মত দেন তিনি। ২০০১ সালে ভারতে গ্যাস রফতানির গোপন প্রতিশ্রুতি দিয়েই বিএনপি ক্ষমতায় আসে। আমাদের নেত্রীকেও সেই প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু জনস্বার্থ বিরোধী সেই প্রস্তাবে তিনি রাজি হননি। এ কারণেই হয়ত ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। পর্দার আড়ালের চুক্তি সব সময়ই দেশবিরোধীই হয়। বিরোধী দল ক্ষমতায় যেতে সক্ষম হয় কিনা আর ক্ষমতায় গেলেও কী করে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলেও মত প্রকাশ করেন নূহ-উল আলম লেলিন।

বর্তমান সময়ে জামায়েত শিবির যে নাশকতা চালাচ্ছে দেশব্যাপী এর পেছনে ভারতের ইন্ধন আছে বলেও মনে করা হচ্ছে। যদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয় তবে দেখা যাবে বিরোধী দলীয় নেত্রী ভারত সফরের পর থেকেই বিএনপির প্রধানতম সহযোগী এই সংগঠনটি উগ্রতা দেখাতে শুরু করে। একটি স্বাধীন-দেশের পুলিশের ওপর কিভাবে একদল গোষ্ঠী হামলা চালাতে পারে তা আমাদের মাথায়ই আসে না। এতো বড় সাহস এতো বড় স্পর্ধা কি করে এরা পেল এই নিয়ে ভাববার আছে বিস্তর। তবে একটি কথা সুস্পষ্ট ভারতের সাথে আঁতাতে প্রচেষ্টাকারী বিএনপি’র ভোট ব্যাংক নিয়ে প্রশ্ন উঠে। আর এর একমাত্র কারণ জামায়াত। ধারণা করা হচ্ছিল খালেদা জিয়ার ভারত সফরের কারণে চরম নাখোশ তারা। জামায়াতের গড় আনুপাতিক ২৫ ভাগ ভোট আর বিএনপির বাঙ্ েপড়বে না। কিন্তু এ কথা এখন ভিত্তিহীন হয়ে পড়েছে। সহোদর স্বরূপ জামায়াতকে কাছে টেনে বিএনপি পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। আর তাই তো জামায়াতে ইসলামীর প্রচার সম্পাদক তাসনিম আলম এক সভায় বলতে বাধ্য হয়েছেন ভারত সফর বেগম খালেদা জিয়া করতেই পারেন। এটা নাকি স্বাভাবিকও! বিএনপি রাজনৈতিক চাল হিসেবে তাদের ব্যবহার করে সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করার প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করে দিয়েছে। তার ফলশ্রুতিতে একের পর এক নাশকতা ও অস্থিরতায় সরকার এখন নাজুক হয়ে পড়েছে। দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে তারা বিদেশের কাছ সরকারকে ছোট করতে মরিয়া, এমনটাও এখন স্বীকারে বাধ্য হয়েছেন অওয়ামী লীগের কেউ কেউ। শুধু তাই নয় বিএনপির জনসভা ও ঘোষিত কর্মসূচিগুলোতে জামায়াতকে দেখা যাচ্ছে একাত্তরে স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার বন্ধ করতে ব্যানার, ফ্যাস্টুন নিয়ে বিশাল শো ডাউনে নামতে। গত ২৯ নভেম্বর বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা বলেছেন, জামায়াতকে তাদের আন্দোলন করতে দিতে!

এমতাবস্থায় বিএনপির পূর্ণাঙ্গ চেষ্টা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ও দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে। উল্টো এতে বিএনপির ইমেজে যাতে একবিন্দুও দাগ না লাগে এ বিষয়ে দলটি ঠিকই সচেতন। আর একটি বিষয় খুবই দৃঢ়তার সাথে বলা যায় ভারত সফরে নিশ্চিতভাবে এমন এক সাহস বিএনপি চেয়ারপার্সন নিয়ে এসেছেন যার বদৌলতে মাঠ ভরা জনসভায় তিনি আর একবার সুযোগ দিন বলে বক্তব্য রাখেন। সরকার যতই বলুক ভারত সফরে ভারতের প্রাণ সোনিয়া গান্ধীর সাথে খালেদা জিয়ার দেখা হয়নি বিধায় এ সফর ব্যর্থ কিন্তু এই না দেখা হবার বিষয়টিই যে একটা টেকনিট তা এখন বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ তাদের বছর খানেক আগের রাজনৈতিক খেলা নিয়ে এখনও অটল। অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে। তাদের ভাবনা অন্তর্বর্তীর অধীনে নির্বাচন হবে এবং কোন এক কারণে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না অথবা নির্বাচন বর্জন করবে। এতে দ্বিতীয় বার আওয়ামী লীগই ক্ষমতা নেবে। কিন্তু এই অন্তর্বর্তী সরকারই কি আওয়ামী লীগের শেষ বারের ক্ষমতা কিনা একথার আড়ালে শুধু একটাই প্রশ্ন ভারত বিএনপির পক্ষে?

***
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে: দৈনিক জনতা