ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

২০১২ সালে আমার বশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সুবাদে শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের ৪০-৪৫ মিনটটের বক্তব্য শুনার সৌভাগ্য হয় আমার। আর তার এই স্বল্প সময়ের বক্তব্য আমাকে বুঝিয়ে দেয় একজন মানুষের সাথে একজন রজনীতিবিদের পার্থক্য।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একজন সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক তথা একজন বুদ্ধিজীবী, তাকে কিনা মাফ চাইতে বলা হল একটি ভুল তথ্যের ভিত্তিতে মহান সংসদের কাছে!
সাংসদদের ভাষায় তিনি নাকি সংসদকে অবমাননা করেছেন সাংসদ ও মন্ত্রীদের চোর-ডাকাতের মতো আচরণ এবং শপথ ভঙ্গ করার কথা বলে।
ভাগ্যিস এই সাংসদরা বাস, চা এর দোকান, পার্ক কিংবা বাজারে জান না। তাহলে হয়তো সংসদকে অবমাননার দয়ে দেশের জনগনকে মাফ চাওয়াতে চাওয়তে মুখের ফেনাই বের করাতো।
কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বলেছিলেন ‘একটা চোর চুরি করলে বা ডাকাত ডাকাতি করলে দুর্নীতি হবে না। কারণ দুর্নীতির সঙ্গে নীতি সম্পর্কিত। আর চোর বা ডাকাতের নীতিই নেই। তাই তাদের ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিষয়টি আসেই না।” এবং…
“যদি কোনো মন্ত্রী এই বলে শপথ নেয় যে, তিনি শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ না করে সবার প্রতি সুবিচার করবেন এবং সেটা যদি ভঙ্গ করেন তাহলে তা দুর্নীতি হবে।”
যার মাথায় থাকে যা, লাফ দিয়ে উঠে তা… এটাই কি প্রমানিত হল আমাদের সাংসদদের আচরনে?
একজন নয়, দুই জন নয়, তিন জন সাংসদ করলেন একই ভুল আর তাতে সায় দিয়ে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আলী আশরাফ বলে বসলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে সংসদে এসে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাইতে হবে!! ( নাই কাজ খই ভাজ)
আলী আশরাফ সাহেব কি একবারও ভেবে দেখননি যে তিনি একজন বুদ্ধিজীবীকে মাফ চাইতে বলছেন !
প্রথমে সাংসদ ফজলুল আজিম বললেন ‘‘একজন বুদ্ধিজীবী দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেছেন। তাঁর এ বক্তব্য দুঃখজনক। এসব বক্তব্য গণতন্ত্রের জন্য সুফল বয়ে আসবে না। আমরা এখানে জনগণের রায় নিয়ে এসেছি। অনেকেই আছি যাঁরা বারবার নির্বাচিত হয়েছি। আমরা কেউ ধোয়া তুলসী পাতা নই। ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। সে জন্য আইন আছে। ভুল করলে জনগণ বিচার করবে। গত নির্বাচনে আমরা তা দেখেছি।’
এই মহান সাংসদ একজন বুদ্ধিজীবীকে বললেন দায়িত্বজ্ঞানহীন!!
জনাব ফজলুল আজিম আপনার মতো জনগণের রায় নিয়ে সংসদে কিন্তু সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, নিজামি, লুতফর জামান বাবর এবং এই রকম আরও অনেকেই এসেছিলেন। আর জনগণ আপনাদের কি বিচার করবে ? জনগনের তো বাক স্বাধীনতাই আপনারা রাখেননি।

এবার আসি মুজিবুল হক চুন্নু সাহেবের বক্তব্য এ, তিন বললেন … দেশের সব অর্জনের পেছনে রাজনীতিবিদদের ভূমিকা রয়েছে। জনগণ ভোট দিয়ে সাংসদদের নির্বাচিত করেছেন। আবু সায়ীদকে আমরা শ্রদ্ধা করি। কিন্তু এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ভোটারদের অবমাননা করেছেন।
মুজিবুল হক চুন্নু আপনি কি জানেন না যে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা আপনাদের থেকে কতো বেশি? নির্বাচনের আগে আপননাদের প্রপাগানডা কারা তৈরি করে দেন?? আর এটাও কি ভুলে গেছেন যে আবু সায়ীদ স্যারও একজন ভোটার। আপনাদের শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ অসাধারন!! আমারাও কিন্তু আপনাদের এভাবে শ্রদ্ধা করি!!
তারপর শেখ ফজলুল করিম সেলিম বললেন“এই বক্তব্য গণতন্ত্র এবং সংসদের ওপর আঘাত।বুদ্ধিজীবীরা জাতির বিবেক হয়েছে। বিপদে তাঁদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ থাকে, তবে প্রমাণসহ উপস্থাপন করেন। সেই মন্ত্রী পদত্যাগ করবেন। কিন্তু ঢালাও অভিযোগ করা যাবে না।“
তিনি অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন যেসব বুদ্ধিজীবী সরকারের সমালোচনা করেন, তাঁদের আয়ের উত্স কী, তা খতিয়ে দেখেন। এক-এগারোতে তাঁরা কী করেছেন, তা আমাদের জানা আছে। একজন শিক্ষক এত দামি গাড়িতে কী করে চড়েন। নির্বাচিত সরকার থাকলে তাঁদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। অনির্বাচিত সরকার থাকলে তাঁরা পদ পান।“
শেখ ফজলুল করিম সেলিম আপনাকে বলছি বুদ্ধিজীবীরা আসলেই জাতির বিবেক, আপনি বলেনতো সোহেল তাজ কেন পদত্যাগ করলেন? আর ভুল তথ্যের ভিত্তিতে একজন বুদ্ধিজীবীকে মাফ চাইতে বলা গণতন্ত্রে কিসের ইঙ্গিত??
আপনি অর্থমন্ত্রীকে বলেছেন যেসব বুদ্ধিজীবী সরকারের সমালোচনা করেন, তাঁদের আয়ের উত্স কী, তা খতিয়ে দেখতে। তারমানে কি আপনাদের সমালোচনা না করলে আয়ের উত্স কোন ব্যপার না? আর বুদ্ধিজীবীরা পদ এর আশা করলে আপনারা ভাত পেতেন কোথায়? আপনাদের বেতন এর সাথে জীবনযাপনের সামঞ্জস্য কততুকু? কেনই বা আপনারা নিজেদের বৎসরিক আয়ের হিসেব দেয়ার পদ্ধতি বিলুপ্ত করলেন?

এবং সবশেষে স্পিকারের আসনে বসা আলী আশরাফ সাংসদদের বক্তব্যকে যথার্থ বলে মন্তব্য করেন! তার মতে, ‘এ দেশের মালিক হচ্ছে জনগণ। তারাই আমাদের নির্বাচিত করেছে। এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে ভালো ইঙ্গিত নয়। গণতন্ত্রের আকাশে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। সংসদকে অবমাননার মাধ্যমে দেশের জনগণ এবং সংবিধানকে অবমাননা করা হয়েছে। এতে সাংসদদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। এটা বিচ্ছিন্ন কোনো বক্তব্য নয়। সে জন্য তাঁকে (আবু সায়ীদ) বিশেষ অধিকার কমিটির মাধ্যমে নোটিশ করে আমরা এ সংসদে তলব করতে পারি। কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তাতে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। কারণ সংসদকে অবমাননা করার অধিকার কারও নেই।“
শ্রদ্ধেয় আলী আশরাফ আপনাকে বলছি ইঙ্গিত একেকজনের কাছে একেক রকম। ১৯৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে পাকিস্তনের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা হতো রষ্ট্রদ্রোহী আর রাজাকাররা হতো দেশ প্রেমিক!! তবে গণতন্ত্রের আকাশে কালো মেঘ সত্যিই দেখা যাচ্ছে। আপনারা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চান ভাল কথা তবে পারলে ভাল কোন কাজের মধ্যমে করুন। এভাবে নয়।
এসবের একদিন পরই ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী বললেন… একটি পত্রিকা দেখে, বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে না জেনে তাঁর মতো সম্মানিত ব্যক্তিকে নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করা ঠিক হয়নি। একজন সংসদ সদস্য ভুল করতে পারেন। তাই বলে তিনজন ভুল করবেন, এটা তো ঠিক না।’
তার মতে, এ ধরনের আলোচনা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দেওয়া উচিত ছিল।
তাহলে ভুল কে বা কার? সাংসদ আলী আশরাফ ,ফজলুল আজিম ,মুজিবুল হক চুন্নু এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাকি ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী সাহেবের? নাকি আমরা বলব রতনে রতন চেনে।
আলী আশরাফ ,ফজলুল আজিম ,মুজিবুল হক চুন্নু ,শেখ ফজলুল করিম সেলিম আপনারাতো জানেনই যে এক হাড়ি দুধ নষ্ট করার জন্য একফোঁটা লেবুর রসই যথেষ্ট। তবে আপনাদের কি মনে হয় না যে সংসদ অবমাননার জন্য আপনারাও তাই। আমি কিন্তু হাড়ির একটি ভাতের উদাহরন দেইনি কারন এখানে শওকত আলী সাহেবের মতো মানুষও আছেন।

তবে এখন কি সাংসদেরা নিজেদের ভুলের জন্য মাফ চাইবেন বুদ্ধিজীবীদের কাছে? কেননা এখানে কেবল একজন বুদ্ধিজীবীকে নয়, সকল বুদ্ধিজীবীদের বিতর্কিত করা হয়েছে। বিতর্কিত করা হয়েছে দশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।
যে দেশে বিতর্কিত করা হয় নোবেল পুরুস্কারকে, বিতর্কিত করা হয় বুদ্ধিজীবীদের, সে দেশে সাধারন জনগনকে কিভাবে মূল্যায়ন করা হতে পারে? আর আদৌ কি করা হয়? শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবী মহল দয়া করে এবার সামনে আসুন বাচান আমাদের মতো সাধরন জনগনকে। কথা দিচ্ছি আমরা আপনাদের সাথেই থাকব।

আসুন সবাই মিলে একটি কবিতা পড়ি……..

তারা যখন কমিউনিস্টদের ধরে নিয়ে যেতে এলো,
আমি নীরব ছিলাম,
কারণ আমি কমিউনিস্ট নই।

তারা যখন শ্রমিক ইউনিয়নের লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেল,
আমি কথা বলিনি,
কারণ আমি শ্রমিক নই।

তারপর তারা ফিরে এলো ইহুদিদের ধরে নিয়ে যেতে,
আমি চুপ করে ছিলাম,
কারণ আমি ইহুদি নই।

এবার তারা ফিরে এলো ক্যাথলিকদের ধরে নিয়ে যেতে,
আমি কোনো কথা বলিনি,
কারণ আমি ক্যাথলিক নই।

শেষবার তারা ফিরে এলো
আমাকে ধরে নিয়ে যেতে।
কেউ আমার পক্ষে কথা বলল না,
কারণ তখন আর কেউ বেঁচে ছিল না।