ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

ভারতীয় মোবাইল কোম্পানি ‘এয়ারটেল’কে বাংলাদেশের স্পর্শকাতর টেলিকম সার্ভিস ‘ব্লাকবেরি’ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে একটি সহযোগী চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ করেছে। এর ফলে রাষ্ট্রের গোপনীয়তা সংরক্ষণের কোন সুযোগ আর রাষ্ট্রের হাতে থাকবে না বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। এতে করে সরকারি-বেসরকারি যে কোন প্রতিষ্ঠানের যে কোন তথ্য অতি সহজেই পাচার করা যাবে। উল্লেখ্য, বিশ্বের অনেক দেশেই অত্যাধুনিক -ব্লাকবেরি সার্ভিস প্রদান বিদেশী সংস্থার জন্য নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করে একটি বিশেষ মহল ভারতীয় এয়ারটেলকে এ বিশেষ সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এর আগে, বাংলাদেশের টেলিকমিউনিকেশন বাজারে ভারতীয় এয়ারটেলের আগমন নিয়েও নানারকম প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। অস্বাভাবিক দ্রুততায় এই কোম্পানিটিকে বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের টেলিকমিউনিকেশন ব্যবসা ভারতের হাতে তুলে দেয়া এবং এর পেছনে সরকারের ভারততোষণ নীতি তথা ভারতের প্রতি সরকারের নতজানু মানসিকতার একটা সম্পর্ক রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জাতীয় প্রতিরক্ষার ওপর থেকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ক্রমশঃ হাতছাড়া হতে থাকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লী সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুটিকে ভারতের সাথে প্রায় একীভূত করে ফেলা হয়েছে। ভারতকে শুধু স্থল-নৌ-ট্রানজিট ও সমুদ্র বন্দর প্রদানই নয়। বাংলাদেশের নিরাপত্তা নীতি-কৌশলকেও বহুলাংশে ভারতের অংগীভূত করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ-তেল-গ্যাস-কয়লা ইত্যাদি ভারতের হাতে তুলে দেবার প্রক্রিয়া চলছে। বিগত সরকারের আমলে ভারতীয় টাটা কোম্পানির বিনিয়োগ উদ্যোগ জনগণের প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হয়ে যায়। তবে ভারতবান্ধব বর্তমান সরকার বাংলাদেশের কাছে ভারতের সকল প্রত্যাশা একসাথে বাস্তবায়ন চাইছে। ভারতের সন্তুষ্টির জন্য সরকার অতি দ্রুততার সাথে তাদের সকল চাহিদা পূরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো টেলিকমিউনিকেশন সেক্টরেও ভারতকে অবারিত সুযোগ করে দেয়ার প্রক্রিয়ায় এয়ারটেল বাংলাদেশে জায়গা করে নিয়েছে। এয়ারটেলকে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে অবৈধভাবে বিশেষ সুবিধা দেবার প্রশ্নে অন্যসব টেলিকমিউনিকেশন সংস্থা ক্ষুব্ধ।

এদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টিকে উপেক্ষা করে সরকার এয়ারটেলকে ব্লাকবেরি-সুবিধা দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলে ভিন্নমতও রয়েছে। তাদের মতে, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে এ ধরনের সুবিধা কোন বিদেশী মোবাইল অপারেটরকে দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বিটিআরসি’র পক্ষ থেকে সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক গোপন প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্লাকবেরি সার্ভিসের মাধ্যমে আপত্তিকর বা দেশের জন্য ক্ষতিকর যে কোন তথ্য ই-মেইলের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হলেও এর উৎপত্তিস্থল, ব্যবহারকারীর পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট ডাটা নজরদারি করা সম্ভব নয়। এ সার্ভিসটি এতটাই স্পর্শকাতর যে, সম্প্রতি সৌদি আরব, দুবাইসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ব্লাকবেরি সার্ভিস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় এয়ারটেলকে ব্লাকবেরি সুবিধা দানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সম্মতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এ সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেশের বাইরে পাচার হলেও অপরাধীকে ধরার কোন উপায় নেই। কিন্তু এতসব জানার পরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একটি চক্র ভারতীয় এয়ারটেলকে সার্ভিসটি প্রদানের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
দেশের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞগণ এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসা উচিৎ বলে মনে করেন। ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ এবং বর্তমান সরকার তাদের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারতের কাছে দেশের গোপনীয়তা পাচারসহ নিরাপত্তা-ব্যবস্থা তুলে দিতে ইচ্ছুক হলেও দেশের বৃহত্তর জনগণ সরকারের এই সিদ্ধান্তের ঘোরতর বিরোধী। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সরকারকে এ পথ থেকে সরে আসাই হবে উত্তম।

—————————————————————————————-
সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, রবিবার ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১ (মূল রিপোর্ট এখানে)