ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

মাতৃভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি এদেশের ছাত্র-জনতার বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। ভাষাশহীদদের আত্মদানকে চিরঅম্লান করে রাখার উদ্দেশ্যে সেদিন ঢাকা মেডিক্যলি কলেজের ছাত্ররা রক্তভেজা সেই স্থানে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ছাত্রদের ওই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পেছনে ঢাকার এক সর্দার অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তিনিই নিজের ইট, বালি, সিমেন্ট ও রড দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে ছাত্রদের সাহায্য করেন। কিন্তু এত বছর পরও সেই সর্দার সেদিনের ভূমিকার সরকারী স্বীকৃতি পাননি, তাকে দেয়া হয়নি ভাষাসৈনিকের মর্যাদা।

এককালে ঢাকা শহরে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। পঞ্চায়েত প্রধানকে সর্দার বলা হতো। ২২ জন মনোনীত সর্দার দ্বারা ঢাকা পরিচালিত হতো। পাকিস্তান সৃষ্টির পরও কিছুকাল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা বহাল ছিল। মাতৃভাষা আন্দোলনে ঢাকার সর্দারগণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন। তবে তাঁদের মধ্যে একজন সর্দারের ভূমিকা ছিল অসামান্য। তিনি হচ্ছেন পিয়ারু সর্দার। সেদিন তাঁর সাহসী ভূমিকার কারণেই প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছিল।

পিয়ারু সর্দার (১৮৯৩-১৯৬১) ছিলেন বকশিবাজার,হোসেনী দালান, নাজিমউদ্দিন রোড, পলাশী, আজিমপুর, নুরফাতা লেন,চানখারপুল ও উর্দু রোড এলাকার সর্দার। সর্দারগিরির পাশাপাশি তিনি প্রথমশ্রেণীর ঠিকাদার ছিলেন। পিয়ারু সর্দার ছিলেন উদার প্রকৃতির, শিানুরাগী এবং দানশীল ব্যক্তি। তাঁর মহল্লার উত্তর পাশেই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা তিনি যৌবনেই দেখেছেন এবং এর গড়ে ওঠার পেছনে বাক্তিগত বহু সহযোগিতা করেছেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাতৃভাষা আন্দোলন পিয়ারু সর্দারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রায়ই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ত। পুলিশের তাড়া খেয়ে তারা রেললাইন পার হয়ে পিয়ারু সর্দারের মহল্লায় এসে আশ্রয় নিত। তারা হোসেনী দালানে এসে নিরাপদ বোধ করত। পুলিশ এসে তল্লাশি করতে চাইলে পিয়ারু সর্দার বাধা দিতেন, পরিস্থিতি সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা করতেন এবং ছাত্রদের প্রিত্রিস্নেহে আগলে রাখতেন । এসব কারণে ছাত্রদের মধ্যেও পিয়ারু সর্দারের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি ছিল। ছাত্ররা তাকে সমীহ করত এবং বিভিন্ন পরামর্শ নিত ।

৫২-র ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসমাজ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। সেদিন একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা আমতলায় ঐতিহাসিক সমাবেশ শেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল নিয়ে আসে। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের উত্তর-পশ্চিম দিকের নিকট পৌছালে পুলিশ মিছিল লক্ষ করে গুলিবর্ষণ করে। সেদিন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার প্রমুখ শহীদ হন। আহত হন আরও অনেকে। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে ছাত্র-জনতার বীরোচিত মৃতু্ পিয়ারু সর্দারকেও নাড়া দেয়।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদদের স্মরণে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা সেই রক্তভেজা স্থানে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়। এসময় মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রাবাস সম্প্রসারণের কাজ চলছিল। কলেজের মধ্যেই ইট, বালি, রড স্তূপাকারে ছিল। তালাবদ্ধ একটি গুদামে ছিল সিমেন্ট। ওই গুদামের চাবি ছিল পিয়ারু সর্দারের কাছে। ছাত্ররা পিয়ারু সর্দারের কাছে গিয়ে নিজেদের অভিপ্রায় জানায় এবং তার গুদামের সিমেন্ট ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনা করে। পিয়ারু সর্দার ছাত্রদের কথা শুনে কালবিলম্ব না করে ঘরের ভেতর থেকে চাবি এনে ছাত্রদের হাতে দেন। বলেন, যত প্রয়োজন হয় সিমেন্ট ব্যবহার কর। আর সিমেন্ট নেয়া হলে গুদামে তালা মেরে চাবি ফেরত দিয়ে যেও। তিনি সেদিন শুধু সিমেন্ট ব্যবহার করার অনুমতি দেননি, দু’জন রাজমিস্ত্রিও দিয়েছিলেন ছাত্রদের সাহায্য করার জন্য এবং ছায়ার মত তাদের পাশে ছিলেন যাতে কেউ তাদের ক্ষতি করতে না পারে। ২২ শে ফেব্রুয়ারি এক রাতের শ্রমে নির্মাণ করা হয় ভাষা শহীদদের উদ্দেশে দেশে প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ।পরবর্তীকালে ভিন্ন নকশায় সেখানে গড়ে ওঠে আজকের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।

সেদিন যে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পিয়ারু সর্দার ভাষা শহীদদের উদ্দেশে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে এগিয়ে এসেছিলেন তা ছিল দুঃসাহসিক কাজ। তখন কেবল পাকিস্তান রাষ্ট্রটির সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টিতে মুসলিম লীগ সমর্থক ঢাকার সর্দারদের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। তখন সরকারে ছিল মুসলিম লীগ। এরকম অবস্থায় ছাত্রদের আন্দোলনে সমর্থন দান এবং শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলার জন্য ছাত্রদের ইট, বালি, রড ও সিমেন্ট দিয়ে সাহায্য করার পরিণতি হতে পারত ভয়াবহ।

সেদিন ছাত্রদের সাহায্য করার অভিযোগে তিনি রাজরোষে পড়ে সর্দারি হারাতে পারতেন, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জড়িয়ে তিনি জেলে যেতে পারতেন, তার প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদারি লাইসেন্স বাতিল হতে পারত। এসব হলে তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা ধুলায় মিশে যেত। তারপরও তিনি এসব ঝুঁকি নিয়ে সেদিন তিনি ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেদিনের সে ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে আজকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। একুশে ফেব্রুয়ারি আজ সারা বিশ্সে সমাদৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কিন্তু পিয়ারু সর্দার কী পেয়েছেন ভাষাসৈনিকের মর্যাদা? তিনি সমূহ বিপদ জেনেও কর্তব্যকাজ থেকে পিছু হটেননি। অথচ এত বছর পরও সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা সৈনিকের মর্যাদা দেয়া হয়নি।পিয়ারু সর্দারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাষাসৈনিকের মর্যাদা প্রদান এবং তার নামে ঢাকা শহরের একটি রাস্তা নামকরণের জন্য সরকারের কাছে আশু দাবি জানাচ্ছি।