ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

মধ্য দুপুর। ফার্মগেট এলাকা। হলিক্রস কলেজের উল্টো দিকের ফুটপাত। ১৬/১৭ বছর বয়সী একটি মেয়ে উচ্চস্বরে কাঁদছে। মেয়েটির একটা হাত মরা মানুষের ওপর। অন্যটি দিয়ে সে কপাল আর বুক চাপড়াচ্ছে। বলছে- আল্লারে, মারে, মরছিরে, গেলামরে … …। ওরে তুই কই গেলিরে, আমি এখন কী করুমরে, মরছিরে, গেছিওরে, ও বাবারে…।

মেয়েটির অমন কান্নায় যে কোন মানুষের চোখ ভিজে আসা স্বাভাবিক। লাশের চারদিকে ভীড় জমে গেছে। সামর্থ্য অনুযায়ী পথচারী নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। এমন সময় ষাটোর্ধ্ব একজন বৃদ্ধ এলেন। হাত রাখলেন মেয়েটির মাথার ওপর। বললেন- মারে, অনেক হইছে। এইবার থাম। লাশ দাফন করতে হইবো। এতো কানলে, মুর্দা কষ্ট পাইবো। তরুণ বয়সী একজন সেই বৃদ্ধকে লক্ষ্য করে বললেন- চাচা, খাটিয়া লাগবো না? চলেন, লইয়া আহি। আর ইকটু পরে তো গোরস্তানে যাওন যাইবো না। চলেন, তাড়াতাড়ি করি। চাচা বললেন- চল যাই। যাবার আগে মেয়েটিকে আবার বললেন- তুই থাক। আমি খাটিয়া লইয়া আহি। মেয়েটি বলল- না, আমিও যামু।

যাবার আগে মেয়েটি লাশের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা টাকাগুলো ভাঁজ করে গুণে নিল। সেখানে আছে প্রায় ১৯শ টাকা। হঠাৎ করে মেয়েটি আবার চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। বলল- ভিক্ষার টেহা দিয়া তর দাফন করুম নারে। আমি তরে ছাইড়া যামু নারে…। একজন পথচারী ছলছল চোখে বললেন- আর দেরি কইরো না। অহন যাও।

মেয়েটি লাশ রেখে খাটিয়ার কথা বলে চলে গেল। তখনও অনেক মানুষ লাশের চারপাশে। বেশ কিছু সময় গড়িয়ে যায়। মেয়েটি আর আসে না। এমন সময় ১৪/১৫ বছর বয়সী একটি ছেলে লাল লম্বা দাঁত বের করে সবার উদ্দেশে বললো- আপনারা দাঁড়াইয়া আছেন ক্যান? যান গা। আপনেগো অই ছেড়ি ব্যাক্কল বানাইছে। এমন কথা শুনে সবাই যেন চমকে উঠলেন। একজন বললেন- তোমার কথা কিছুই বুঝলাম না? ছেলেটি বললো- না বুজার কি আছে? আপনেরা হুদাই টেকা দিছেন? কেউ মরছে?

অন্য একজন বললেন- কেন, ঐ যে লাশ? ছেলেটি বললো- দেহেন, কাপড় তোলেন? একজন পথচারী কাপড় তুলে দেখেন কাপড়ের নিচে একটা আস্ত কলা গাছ, তিনটা ইট, চারটা লাকড়ি এবং একটি বালিশ। ওমন দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবার চোখ ছানাবড়া। ছেলেটি আবার বললো- গেছে, ওই মাইয়া ভাগছে। আর আইবো না। ওই মাইয়া ঢাহা শহরের অনেক জায়গায় মানুষরে বেক্কল বানাইয়া এরকম কইরা ভিক্ষা করে। যারা হ্যার সাথে কথা কইছে, সবাই হ্যার লোক। উপস্থিত সকল মানুষ এ ঘটনা শুনে একে অপরের দিকে তাকায়। সবার চোখেই যেন এক ধরনের অপরাধবোধ। তাদের চোখ যেন বলছিল- এই শহরে আমরা কাকে বিশ্বাস করবো? মানুষের আবেগ পুঁজি করে এমন ভিক্ষাবৃত্তিতে যেন ছেয়ে গেছে ঢাকা শহর। এখন কোন কিছুতেই কারো হৃদয় গলে না। দিন দিন আমরা না কি পাষাণ হচ্ছি? আসলেই কি তাই? কে জানে!