ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

মেয়েটি জন্মান্ধ ছিল না। দিব্যি সুস্থ্য, স্বাভাবিক। হাসতো, খেলতো, বেড়াতো। মেধাবী ছাত্রী ছিল সে। পড়তো ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি স্কুলে। রোল নম্বর কখনো পাঁচের নিচে নামেনি। এইভাবে … ক্লাস টেন। ১৯৮১ সাল। প্রিটেস্ট শেষ, টেস্ট শেষ … সামনে এসএসসি। হঠাৎ চোখে হারিয়ে যায় জ্যোতি। দৃষ্টিহীন হয়ে যায় বাঁ চোখ। ৭ দিন পর অন্ধত্ব গ্রাস করে ডান চোখ। তখন সে পুরোপুরি দৃষ্টিহীন। জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। থেমে গেল শিক্ষার চাকা!

স্বাভাবিকভাবেই অন্ধত্ব মেনে নিতে পারে না সে। শিক্ষক পিতার হাত ধরে চলে যান ভারত। তারপর … । প্রায় দেড় বছর উন্মাদ চিকিৎসা নিয়ে অন্ধকার চোখ নিয়েই ফিরে আসেন বাংলাদেশে। কিন্তু মেয়েটি অস্থির হয়ে ওঠে শিক্ষিত হবে বলে। কিন্তু কীভাবে পড়াশোনা সম্ভব? … অল্পসময়ে ব্রেইল পদ্ধতি আয়ত্ত্বে আনল মেয়েটি। আবার পড়াশোনা। মাঝখানে ৩ বছরের বিরতি। ১৯৮৪ সাল। ময়মনসিংহের এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউট থেকে মানবিকে দ্বিতীয় বিভাগ নিয়ে পাশ করে এসএসসি। মেয়েটি কোনভাবেই দমে না। ভর্তি হয় মমিনুন্নেসা কলেজে। এবারও দ্বিতীয় বিভাগ। ভয়ঙ্কর সাহস তার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন! ভর্তি পরীক্ষা দিলেন। অবাক করা বিষয়! সুযোগ পেলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হওয়ার। তখন দৃষ্টিহীনদের জন্য কোন কোটা ছিল না। স্বাভাবিক ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তাকে সুযোগ নিতে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১ বছর, ২ বছর করে পাস করেন অনার্স। সে বছর কোন ফার্স্ট ক্লাস ছিলনা। মেয়েটি সেকে- ক্লাস ফিফথ হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। তারপর মাস্টার্স।

বাংলাদেশের প্রথম দৃষ্টিহীন ছাত্রী, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেন। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। ডাকসু’র ভিপি আমান উল্লাহ আমানের সহযোগিতায় মেয়েটি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তাকে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা এবং আশীর্ব্বাদ করেন। এরপর যুদ্ধ শুরু তার কর্মজীবনের। পেয়েও যান একটি সরকারি চাকরি। বর্তমানে রিসোর্স টিচার।

জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বলতে বলতে মেয়েটি বারবার অন্যমনস্ক হচ্ছিলেন। দৃষ্টিহীন চোখে যেন ভর করে রাজ্যের স্বপ্ন। সেই সুখ-স্বপ্নের বৃষ্টিতে যেন ভিজে যায় তার দু’চোখ। মেয়েটি চেষ্টা করেন স্বাভাবিক হবার। হালকা স্বরে বলেন- ভবিষ্যত নিয়ে আর ভাবি না। যা হবার হবে! তবে অনেক বিষয়ে স্বপ্ন দেখি। সবার স্বপ্নই তো সাদা-কালো। আমারটাও তাই!
চমৎকার গানের কণ্ঠ তার। বললেন, গান শুনবেন! উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি হারমনিয়াম টেনে নিলেন। গেয়ে ওঠলেন- চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে / অন্তরে আজ দেখবো …। আর থাকা যায় না। দু’চোখ জলে ভিজে আসে এই প্রতিবেদকের। বাসার বাইরে থেকেও মৃদু আলো জ্বলা রুম থেকে ভেসে আসছিল শুক্লা’র গানের কণ্ঠ। জয়তু,
শুক্লা বিশ্বাস