ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

image_531_119195

ইদানিং, বেশির ভাগ লেখকের মধ্যে, দশকী কবি হওয়ার এবং করার প্রবণতা লক্ষ করি। শুধু তা নয়, তাদের যেখানে-সেখানে ‘দশক, দশক’ করে সভা-সেমিনার করতেও দেখি। ঢঙে বোঝা যায়, এই না-করলে তারা কবি হতে পারবেন না। আবার এমন লেখকও দেখি, যাদের দশকী পরিচিত জানতে চাওয়া হলে লজ্জাবনত হন। কেন তারা লজ্জাবনত হন, তা জানার আগ্রহ প্রকাশ করি না। অবশ্য একসময় আমিও দশকপ্রথায় বিশ্বাস করতাম, এখন করি না। এই গদ্যে দশকী কবি হওয়ার এবং করার প্রবণতা, দশকে দশকে কি কেবল দশকী কবিতাই রচিত হচ্ছে, তা নিয়ে একটু আলোচনা করব। কাজটি শেষ করব তিনটি সংকলন (অনিরুদ্ধ আশি: এক দশকের কবিতা, আশির কবিতা শূন্যের কবিতা), একটি কবিতাবিষয়ক গদ্যগ্রন্থ কবির সন্ধানে কবিতার খোঁজে, তিনটি সম্পাদকীয় (স্রোতচিহ্ন, শালুকদুর্বার) ও কিছু কবিতাবিষয়ক গদ্যের ওপর ভিত্তি করে। কোন প্রেম নেই, কোন বিদ্বেষ নেই; কেবল হাতের কাছে আছে বলে এগুলোর সহযোগিতা নিচ্ছি। সততা এবং স্বচ্ছতা প্রদর্শনপূর্বক আলোচনার মাধ্যমে মন্তব্যে উপনীত হব।

শুরুতেই সংকলন ও নামধারী ছোটকগজগুলোর দিকে দৃষ্টি দিই, এগুলো কবি ও অকবিদের দশকী খেতাব দিল এবং দিচ্ছে। অনিরুদ্ধ আশি : এক দশকের কবিতা (১৯৯১) সংকলনটি, সংকলক – সৈয়দ তারিক, তেইশ জনকে আশি দশকের কবি (!) হিসেবে তকমা দিল। তারা হলেন – খোন্দকার আশরাফ হোসেন, রেজাউদ্দিন স্টালিন, মোহাম্মদ সাদিক, ফরিদ কবির, দারা মাহমুদ, কাজল শাহনেওয়াজ, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, বদরুল হায়দার, মোহাম্মদ কামাল, সাজ্জাদ শরীফ, শোয়েব শাদাব, আবদুল হ্ইা সিকদার, মঈন চৌধুরী, আযাদ নোমান, বিলোরা চৌধুরী, সুহিতা সুলতানা, মাসুদ খান, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার ও সৈয়দ তারিক। অন্যভাবে বললে, এটা সংকলকের আশি দশকের কবির (!) তালিকা। রামকিশোর ও অন্যান্য তাদের তালিকাটি প্রকাশ করেন আশির কবিতা (১৯৯৭) সংকলনে। এতে বাংলাদেশের যারা আছেন – অঞ্জনা সাহা, আনিসুল হক, আহমাদ হক, আহমাদ মাযহার, জুলফিকার হোসেন তারা, ফেরদৌস নাহার, প্রদীপ মিত্র, সমরেশ দেবনাথ, জাহিদ মুস্তাফা, আবু হেনা আবদুল আউয়াল, গোলাম কিবরিয়া পিনু, রোকসানা লেইস, রেজাউদ্দিন স্টালিন, ফরিদ কবির ও আসলাম সানী। আবার সোহেল হাসান গালিব শূন্যের কবিতা (২০০৮) সংকলন প্রকাশের মাধ্যমে কামাল মুহম্মদ, গৌতম কৈরী, জাহানারা পারভীন, ইমরান মাঝি, এমরান কবির, কাজী নাসির মামুন, অতনু তিয়াস, অরূপ কিষাণ, আমজাদ সুজন, নিতুপূর্ণা, চ্যবন দাশ, নির্লিপ্ত নয়ন, নায়েম লিটু, মাহমুদ শাওন, পিয়াস মজিদ, মৃদুল মাহবুব, ফেরদৌস মাহমুদ, শাহিব মাহমুদ, রুদ্র আলিফ, সফেদ ফরাজী, সিদ্ধার্থ শংকর ধর, মামুন খান, পাভেল মাহমুদ, সৈয়দ আফসার, সঞ্জীব পুরোহিত, ইশরাত জাহান মিথিলতা, তুষার কবির, কাজী জিননূর প্রমুখসহ মোট ১১৯ জন তরুণের নামের সাথে ‘শূন্য দশকের কবি’ (!) জুড়ে দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন। ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, “আমাদের সময়ের তিনশোর অধিক কবিনামের তালিকা থেকে একশ ঊনিশজন কবিকে নির্বাচন করা হয়েছে এই গ্রন্থে” (পৃ : ৮) এবং “..এই গ্রন্থ পাঠের মধ্য দিয়ে এই দশকের কবিতার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারবেন অগ্রজ কবি ও গবেষকেরা” (পৃ. ১১)। স্রোতচিহ্নর, সম্পাদক – সুমন সুপান্থ, ফেব্রুয়ারি ২০০৫ সংখ্যার সম্পাদকীয়: ‘নব্বই দশকের কবিতা, গল্প এবং আশির দশকের গল্পের উপর গদ্য লিখেছেন সুপরিচিত কবি ও গল্প লেখক। কোন পন্ডিতি জাহিরি নয়, বোধ ও অনুধাবন নিজস্ব ভঈিতে প্রকাশ করেছেন’। সুপরিচিত কবির (সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের) গদ্য থেকে বোঝা গেল সম্পাদক কামরুজ্জামান কামু, বদরে মুনীর, ব্রাত্য রাইসু, টোকন ঠাকুর, মাহমুদ সীমান্ত, চঞ্চল আশরাফ, ওবায়েদ আকাশ, জাফর আহমদ রাশেদ, রহমান হেনরী প্রমুখ কবিগণের কবিতাকে নব্বই দশকের কবিতা বলে ডঙ্কা পেটাচ্ছেন। এটা সম্পাদক ও গদ্যকারের নব্বই দশকের কবির (!) তালিকা। আবার দূর্বার, সম্পাদক – গাজী লতিফ, ফেব্রুয়ারি ২০০৫ সংখ্যার সম্পাদকীয়: “শূন্য এবং ৯০ দশকের (প্রাপ্ত লেখার মধ্য থেকে বাছাইকৃত) গুচ্ছ কবিতার জন্য মনোনীত দুটি গ্রুপের কবিতা সম্পর্কে বোদ্ধাদের নিকট থেকে মূল্যায়নধর্মী গদ্য লিখিয়ে নেয়ার মাশুল হিসেবে গচ্ছা গেল চারটা মাসেরও বেশি কিছূ দিন..” এবং “প্রিয় পাঠক আপনারা জানেন, দু’একজন ব্যতিক্রম বাদে কারো সম্পর্কেই সমকালে ১০০% মূল্যায়ন করা যায় না – করা হয় না। তবুও শূন্য দশকের (গুচ্ছ কবিতায় অন্তর্ভুক্ত) কবিদের উপরে কবি ও সম্পাদক শামীম রেজা (বন্ধুবরেষু) সমান মনোযোগে অনামি নতুনদের সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন। আমরা নিবন্ধটি শূন্য দশকের ক্রোড়পত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছি”। ক্রোড়পত্রে অন্তর্ভুক্ত শূন্য দশকের কবিরা (!) হলেন – আমজাদ সুজন, জাহানারা পারভীন, ফেরদৌস মাহমুদ, সজল সমুদ্র, সফেদ ফরাজী, সারফুদ্দিন আহমেদ, আহমেদ জামাল উদ্দিন, জাহিদ সোহাগ, মাসুদ হাসন, মাহমুদুল হাসান, মেহেদী রাসেল, রূপম রোহান ও সাঈদ জুবেরী। শামীম রেজা এদেরকে নিয়ে ‘নতুন শতাব্দীর সূচনায়, নতুন কবিতার খোঁজে’ শিরোনামে নিবন্ধটি লেখেন। এই তালিকা নিবন্ধকারের নয়, সম্পাদকের। কারণ নিবন্ধকার উল্লেখ করেন, “এই নিবন্ধে আলোচিত চৌদ্দজনের তালিকাটা আমাকে করতে দিলে সম্ভবত চিত্রটা অন্যরকম হতো..”। ওবায়েদ আকাশ নব্বই দশকের সক্রিয় কবির (!) তালিকা প্রকাশ করেছেন তার সম্পাদিত শালুকর আগস্ট ২০০৭ সংখ্যায়। এতে যাদের নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন: আলফ্রেড খোকন, আশরাফ রোকন, ওবায়েদ আকাশ, কাজল কানন, কুমার চক্রবর্তী, চঞ্চল আশরাফ, জফির সেতু, জাফর আহমদ রাশেদ, টোকন ঠাকুর, পাবলো শাহি, বায়তুল্লাহ্ কাদেরী, মজনু শাহ, মাহবুব লীলেন, মুজিব ইরম, মোস্তাক আহমাদ দীন, শাহ্নাজ মুন্নী, সরকার আমিন ও হেনরী স্বপন। সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছেন: এই তারা নিরন্তর নিরীক্ষা-প্রতিনিরীক্ষারত, বাংলা বাঙালি আর তার আত্মপরিচয় তুলে ধরার দর্শনে প্রয়াসী এবং তাদের হাতে বাংলা কবিতা তথাকথিত আধুনিকতার মোড়ক ছিঁড়ে উপস্থাপিত হয় – নতুন নতুন চিত্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে নিজস্ব হতে থাকে অতিমাত্রায়। সম্পাদক আরও উল্লেখ করেন, নব্বই দশকে প্রায় দেড়শত তরুণ কবিতা লিখতে এসেছেন এবং উল্লেখিত নামের কবিরা এখনও সক্রিয়।

সংকলন ও কাগজগুলোর, দেখলাম, কোনোটাতে আশি – কোনোটতেই নব্বই বিংবা শূন্য দশকের কবি নামের (!) ব্রততি প্রকাশ পেল। কোনোটাতে সংকলকের, কোনোটাতের সংকলকের, কোনোটাতে সম্পাদক বা গদ্যকারের নির্মিত ব্যক্তিগত তালিকা রয়েছে। এর প্রমাণ, একটাতে যাদের নাম রয়েছে, অন্যটাতে তাদের কয়েকজনের নামসহ / বাদে নতুন নামের অন্তর্ভুক্তি পরিলতি। কিন্তু কোন্ কোন্ গুণগ্রাম বর্তমান থাকার কারণে এগুলো আশির, ওগুলো নব্বই কিংবা শূন্য দশকের কবিতা বা কোন্ কোন্ গুণগ্রাম থাকার কারণে এরা আশির, ওরা নব্বই কিংবা শূন্যদশকের কবি বা কোন্ কোন্ আশির কবিতা থেকে নব্বইয়ের কবিতা স্বতন্ত্র- এ-জাতীয় বিশ্লেষণধর্মী-মূল্যায়নধর্মী আলোচনা সম্পাদকীয়তে তো নেই, ভেতরে গদ্যগুলোতেও রাখা হয়নি। অনিরুদ্ধ আশিতে খোন্দকার আশরাফ হোসেন ‘আশির দশকের কবিতা : ঐতিহ্যসূত্র ও নবনির্মিতি’ গদ্যে আশির কবিতার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এগুলো গ্রহণীয় নয়। কারণ এগুলো এর আগের কবিতায় যেমন বিদ্যমান, তেমনি পরে কবিতায়ও। ওবায়েদ আকাশ নব্বই দশকের কবিদের (!) ভূমিকার কথা উল্লেখ করে পরোভাবে সে-দশকের কবিতার যে বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন, তা স্বতন্ত্র কিছু নয়। কেননা যাদেরকে আশির কবি (!), শূন্যের কবি (!) বলা হচ্ছে, তাদের কবিতায়ও স্বাজাত্যবোধ, দেশাত্ববোধ, উত্তর-আধুনিক চেতনা এবং নতুন নতুন চিত্রকল্প ল করা যায়। তার মতো সোহেল হাসান গালিবও নিজের দশকের কবিতার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলেছেন, “শূন্য দশকের কবিতার ঝোঁক আশলে ছন্দহীনতার দিকে” (পৃ. ৮)। কিন্তু শূন্য দশকে চর্চিত (রচিত) কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য ছন্দহীনতা নয়। কারণ যারা এ সময়ে কবি হওয়ার ইচ্ছাবোধে লিখেছেন তারা প্রবহমানের পাশিপাশি সুখপাঠ্য – শ্রুতিসুখকর করার জন্য কবিতায় ছন্দের ব্যবহারও রাখছেন। আর ঐ তাদের লেখায় থাকছে না, যারা (বেশির ভাগই) ছন্দ জানেন না, হ্যালোপ্রিয়, তীর্থের কাক; রাতারাতি দলাদলি করে দশকী কবি (!) হওয়ার বা নতুনত্বের ধুয়া তুলে ছন্দহীন কবিতা / অকবিতা রচনার পক্ষপাতী। দুর্বা থেকে উপরে, যে দুটি উদ্ধৃতি হজির করলাম, প্রথমটিতে লক্ষণীয় – কতিপয় তরুণকে শূন্য দশকের কবি (!) খেতাব দেয়ার জন্য সম্পাদকের আপ্রাণ প্রয়াস এবং দ্বিতীয়টিতে – প্রয়াসের বাস্তবরূপ দিতে পারার পরিতৃপ্তি অনুভব। দশকী খেতাব দেয়ার জন্য সংকলক ও সম্পাদকদের কত কষ্ট করতে হচ্ছে! শুধু দেয়া নয়, তলে তলে পাওয়ার অভিলাষও থাকছে। আনন্দ বাবু হওয়ার খায়েশ তাদেরও আছে। কেউ ‘কবি’ বলে ডাক দিলে যা না মজা! সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের নব্বইয়ের কবিতা (নারদ! নারদ!)’ গদ্যের শেষের দিকে পড়লেই বোঝা পাবে স্রোতচিহ্নর সম্পাদক কোন অভিপ্রায়ে এটি তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন এবং ছেপেছেন। অভিপ্রায় একটাই, নব্বই দশকের কবি (!) তিনিও। একই মতলকে সৈয়দ তারিক অনিরুদ্ধ আশি এবং সোহেল হাসান গালিব শূন্যের কবিতা করেছেন। অন্য কেউ এমন ধরনের সংকলন করলে তাদের হুঁকো নাও দিতে পারেন – ভেবেই কষ্টসাধ্য কাজটা করতে গেলেন, পাঠক এভাবেই দেখবেন। শুরুতে, সংকলক ও সম্পাদকরা অকবিদের দশকী মেডেল দিচ্ছেন, উল্লেখ করলাম। শামীম রেজার গদ্যে পরিলতি – কতিপয় তরুণের লেখা নিয়ে, (এইমাত্র খড়িমাটি হতে নিয়েছেন, কলম ধরতে দেরি আছে, লেখকের চাল ধরেছেন)। গাজী লতিফ তার কাছ থেকে গদ্য হাসিল করেছেন এবং তাদেরকে দশকী পোশাক পরালেন। অনিরুদ্ধ আশির মোহাম্মদ সাদিক, মোহাম্মদ কামাল, শোয়েব শাদাব, আযাদ নোমান ও বিলোরা চৌধুরী এখন কোথায় আছেন, কেমন। নিরস্ত হলেন কেন? এদেরকে কি তেজারতি লোভ দেখিয়ে কাব্যাঈনে ডেকে আনা হয়েছিল? কবিতার সাথে তাদের মাসতুতো সম্পর্ক ছিল; কৃতনিশ্চয় ছিলেন না বলে পালিয়েছেন। তাই কি? এখানেও চার্লস ডারউইনের বক্তব্যের বাস্তবতা – ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’। কবি সবসময় টিকে থাকছেন ।

সংকলক ও সম্পাদকরা রীতিমতো, উপরে উল্লেখ করেছি, দশকের কবির (!) তালিকা প্রকাশ করছেন। বেশির ভাগ লেখক চানও এমনটা। চান আয়ুষ্মান হতে, আল হেলাল হতে! ব্যাপারটা তদের কবিতাবিষয়ক গদ্যে জাজ্বল্যমান। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের উদ্ভাবিত আপত্তি- “আশির কবিতার প্রামাণ্য সংকলন ‘অনিরুদ্ধ আশি’ খুলুন। আমি তাতে নাই। এইটা আমার মায়ের পেটের শিক খোন্দকার আশরাফ হোসেন, আমার মায়ের পেটের বন্ধু ও সহপাঠী সৈয়দ তারিককে দিয়ে করিয়েছিলেন। তারিক অবশ্য পরে কঁচুমাচু বলেছিল, ‘তোমার তো উল্লেখযোগ্য কোনো কবিতা এখনো ছাপা হয় নাই, তাই’। অনুজপ্রতিম মাহবুবের অবশ্য এরূপ কোনো সমস্যা হয় নাই। সে আম্লনবদনে আমার তাতে না-থাকার কোনো কারণ দর্শানোর প্রয়োজনই দেখে নাই; তা-না দেখুক, কিন্তু সে যে আবার আমার কাছ থেকে বইয়ের দমাটাও আদায় করল এই দঃখ আমার গেল না। নব্বইয়ের কবিদের উপরে আমার আক্রোশের এইটাও একটা কারণ বটে”। গোমেজের দশকবন্দী হতে চাওয়ার বাসনাটা ‘আমার মায়ের পেটের শিক / বন্ধু ও সহপাঠী’ এবং ‘কোনো কারণ দর্শানোর প্রয়োজনই দেখে নাই’ বাক্যখণ্ডে নিহিত। খালেদ হামিদী কবির সন্ধানে কবিতার খোঁজে (২০০৭) গদ্য গ্রন্থে কতিপয় কবির দশকী পরিচয় তুলে ধরার মাধ্যমে, কৌশলে, নিজে যে আশি দশকের কবি (!), তা প্রকাশ করেছেন। এই মতলবে, বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন মহীবুল আজিজ, হাফিজ রশিদ খান, শাহিদ আনোয়ার, ওমর কায়সার, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, ফরিদ কবির, সাজ্জাদ শরীফ, মাসুদ খান, সুব্রত খান, সুব্রত আগাস্টিন গোমেজ ও জুয়েল মাজহারের কবিতার গতিপ্রকৃতি, বিষয় আশয়। নিজে যে আশি দশকের কবি (!) শূন্য দশকের কবির (!) নামব্রততি প্রকাশের মাধ্যমে, সুস্পষ্ট রূপ দিয়েছেন। উদ্দীপ্ত তরুণ হিসেবে দেখেছেন কেবল ফুয়াদ হাসান, চন্দন চৌধুরী ও সাইদুল ইসলামকে। এ ব্যাপারে তার উদ্ব্যক্তি – ‘চলমান শূন্যদশকে স্বদেশে আমরা ফুয়াদ হসান, চন্দন চৌধুরী এবং সাইদুল ইসলামকে পাই, যারা নব্বইয়ের ওই পশ্চাৎমুখি, স্থিতাবস্থার সমর্থক এবং সৃজনশীলতাবিরোধী তত্ত্বের কৃষ্ণ প্রভাববলয়ের একেবারে বাইরে সক্রিয় থেকে জগতের দিকে চোখ মেলেছেন এবং চোখের গভীরে গ্রহণ করে চলেছেন আপন আপন চেতনালোকিত সামষ্টিক সম্ভাবনা এবং স্বপ্নের বিনাশ। তাদের কবিতায় তাই দ্রষ্টব্য বিস্ময়কর সহজতা, নির্ভীক উচ্চারণের স্পষ্টতা এবং কাব্যপ্রেমের স্বচ্ছতা’ (পৃ৭৯)। খালেদ হামিদীর শূন্য দশকের তলিকায় আবদ্ধ হওয়ার মতো (যেহেতু তিনি তলিকাবাদী) সারাদেশে আরো অনেক তরুণ (যারা তালিকাবাদী) রয়েছেন। বোধ হয়, নিজের তাকে হাতড়ে পেয়ে এই তিনজনকে দশকের দাস বানিয়েছেন। যদি তা-ই, তবে তার শূন্য দশকের তলিকা তৈরির কাজ অসম্পূর্ণ থেকে গেল, বলব! এই তালিকায় তুষার কবির, মাদল হসান, ফেরদৌস মাহমুদ, নিতুপূর্ণা, গৌতম কৈরী, কাজী নাসির মামুন, মং সিং ঞো, থোঙাম সন্জয় প্রমুখ তরুণের নামও অনুবিদ্ধ হতে পারত। প্রকশিত কাব্যগ্রন্থ এদেরও রয়েছে! এদের যারা (যাদের দশকী মেজাজ রয়েছে) হামিদীর বইটি পড়েছেন, তাদের মনে খপখপানি জেগেছে, নিঃসন্দেহে বলা যায়। যে তিনজনকে সামনে রেখে তিনি করতাল দিলেন, তাদের প্রকাশ-বিকাশ চট্টগ্রমেই। যদি স্থানিক পপাত দেখান এবং এ তিনজনকে তাক থেকে বের না-করে থাকেন তবে রুদ্র অনির্বাণ, নায়েম লিটু, নাজমুল হুদা, মুয়িন পার্র্ভেজসহ আরো অনেকের কবিতা সম্পর্কে বক্তব্য দিতে প্রয়াসী হতেন! তিনি শেষ নামের আগে ‘এবং’ যুক্ত না করে শেষে ‘প্রমুখ’ যুক্ত করে তার শূন্য দশকের কবির (!) তালিকা তৈরি করতে পারতেন, কেউ কেউ মনে করেন! মূল কথা হল, খালেদ হামিদীর উদ্দেশ্য নব্বই ও শূন্য দশকের কবিদের (!) সম্পর্কে কিছু বলা নয়, নিজের দশকী পরিচয় তুলে ধরার জন্য কিঞ্চিৎ বলা দরকার জেনেই বলেছেন। এই বলা যৌক্তিক না অযৌক্তিক হচ্ছে – কে দেখবে! অবশ্য তিনি নাঈমুল ইসলাম খান সম্পাদিত সাপ্তাহিক কাগজর চতুর্থ সংখ্যা, ১৩ মার্চ ২০০৮-এ প্রকাশিত ‘কবিতার প্রতিবেশী ৪’-এ তার তালিকায় কবিনামের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। আশি দশকের কবি (!) হিসেবে নতুন করে অনুবিদ্ধ হয়েছেন আহমেদ রায়হান, বিষ্ণু বিশ্বাস, শোয়েব শাদাব, শান্তনু চৌধুরী ও কাজল শাহ্নেওয়াজ। শূন্য দশকের কবি (!) হিসেবে যুক্ত করেছেন তারিক টুকু ও নওশাদ জামিলের নাম।

এবার তরুণদের নিয়ে তরুণদের এবং প্রবীণদের দশকী তালিকা প্রকাশের ধরন এবং সৃষ্ট জটিলতা দেখানো যাক । খলেদ হমিদীর তালিকাটি একটু আগে , অন্য প্রসঙ্গে , তুলে ধরা হল । হাফিজ রশিদ খান ‘এই সময়ের কবিতা : কাল – পুরাকালের সম্ফনি (শিল্প সাহিত্য, দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ১২ জানুয়ারি ২০০৭)’ গদ্যে তার তালিকা প্রকাশ করেছেন । এতে আছেন – আলম সৈয়দ, সবুজ তাপস, মংসিঞো, থোঙাম সন্জয়, কন্থৌজম সুরঞ্জিত, ফুয়াদ হাসান প্রমুখ। উল্লেখ করেছেন, “শূন্যদশকের কবিতায় লোকজীবনের প্রবাদ-প্রবচন, মায়াবী আত্মীয়তা, সান্দ্র ভাবুকতা, শেকড়খোঁজার প্রবণতা ওঠে আসছে। সেই সঙ্গে যোগ হচ্ছে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠিসমূহের মিথকেন্দ্রিক নানা কল্পনা, স্মৃতি, নস্টালজিয়ার নানাটান”। খালেদ হামিদীর মতো তিনিও তালিকা তৈরির কাজে চট্টগ্রামকে প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং তালিকাভুক্ত তরুণদের নামে ভাষ্য রচনা করেছেন। এখানে একটা মজার কথা বলি, হামিদীর শূন্য দশকের তালিকার সাইদুল ইসলাম ও চন্দন চৌধুরী হাফিজের তালিকায় নব্বই দশকের কবি (!) হিসেবে আছেন। একই ঘটনা সুমন সুপান্থ ও কাজী নাসির মামুনকে নিয়েও। সুব্রত আগাস্টিন গোমেজের তালিকায় সুমন সুপান্থ নব্বইয়ের, আর সোহেল হাসান গালিবের তালিকায় শূন্য দশকের কবি(!) রূপে স্থান পেয়েছেন। কাজী নাসির মামুন গাজী লতিফের তালিকায় নব্বইয়ের (উল্লেখিত সংখ্যায় দ্রষ্টব্য), আর গালিবের তালিকায় শূন্য দশকের কবি (!) রূপে রয়েছেন। কেন এমন হলো? কেন এমন হয়? দশকী তালিকা প্রকাশ করলে এমন হবেই। প্রশ্ন, প্রবীণরা কেন তারুণ্যের দশক নির্ধারণ করতে যান? সহজে বলা যায় , তরুণরা তাদের পোঁ ধরে দৌড়ঝঁপ দেন বেং এখানে-ওখানে গুণগান করেন। অন্যভাবে বললে, তারা যে আরেকটা দশকের কবি (!), তার জানান দেওয়ার জন্য তালিকা প্রকাশের প্রকল্প হাতে নেন। তরুণরাও নিজেদের দশকবন্দী কবি (!) হিসেবে উপস্থাপন করতে কাছা মেরে নেমেছেন। একে অপরকে শূন্য দশকের কবি (!) স্বীকৃতি দেয়ার জন্য গদ্য লিখছেন, বক্তব্যে রাখছেন রাতারাতি কবি বনে যাওয়ার ধড়পড়ানি। নামধারী ছোটকাগজ ইস্টিশনর, সম্পাদক- রুদ্র হক ও তানিম কবির, ১৯ মাঘ, ১৪১৩ সংখ্যায় ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ গদ্যে কামাল মুহম্মদের শূন্য দশকের কবিনামের (!) ব্রততি প্রকাশ পায়। এতে যারা আছেন অরূপ কিষাণ, অতনু তিয়াস, এমরান কবির, মামুন খান, মানস সান্যাল, কামাল মুহম্মদ, সবুজ তাপস, আমজাদ সুজন, সজল সমুদ্র, এহসান হবীব, রুদ্র আরিফ, বিজয় আহমেদ, ফেরদৌস মুহমুদ, মাহমুদ শাওন, ঈশান সামী, সফেদ ফরাজী, চন্দন চৌধুরী, নিলিপ্ত নয়ন, রবু মেঠ, গৌতম কৈরী, জাহানারা পারভীন, কাজী জিন্নূর, রাজীব আর্জুনি, অশোক দাশগুপ্ত, সারফুদ্দিন আহমেদ, বিল্লাল মেহেদী, ইকতিজা আহসান, দেবাশীষ তেওয়ারী প্রমুখ। আবার বিভিন্ন কাগজ ঘেঁটে চন্দন চৌধুরীর গদ্য পড়লে শূন্য দশকের কবির (!) ফর্দ পাওয়া যায়। তার তালিকায় যারা থাকছেন- বিজয় আহমেদ, জ্যোতির্ময় ঠাকুর, ফুয়াদ হাসান, সাইদুল ইসলাম, সবুজ তাপস, স্বরূপ ভট্টাচার্য্য, চন্দন চৌধুরী, নায়েম লিটু, রুদ্র অনির্বাণ, আলী প্রয়াস, মাদল হাসান, ফেরদৌস মাহমুদ, নিতুপর্ণা প্রমুখ। তারা তালিকা প্রকাশের কাজটা পরিজ্ঞাত বা সমমনাদের নাম অন্তর্ভূক্ত করেই সারছেন। সূত্রটা এমন : আমার তালিকায় তোমাকে রেখেছি, তোমারটাতে আমাকে রাখবে, কেমন’। তাদের কারো কারো প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ রয়েছে। উদ্ভট এবং অন্তঃসারশূন্য বাক্য জুড়ে দিয়ে এগুলোর আলোচনাও করছেন। একটাই উদ্দেশ্য, ধানাপানাই লিখে হলেও, একে অপরকে শূন্য দশকের কবি (!) রূপে তুলে ধরা। একটা উদাহারণ তুলে ধরলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। ফেরদৌস মাহমুদের ‘সাতশো ট্রেন এক যাত্রী’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনায় তামের কবির উল্লেখ করেছেন,“শূন্য দশকে অনেকেই আছেন প্রতিশ্রুতিশীল কবির তালিকায়।….নিঃসন্দেহে ফেরদৌস মাহমুদ শূন্য দশকের অন্যতম কবি” (উল্লেখ, তৃতীয় সংখ্যা, ফেব্র“য়ারি ২০০৭, সম্পাদক – আমজাদ সুজন।)। প্রতিশ্র“তিশীল কবির তালিকায় কে কে আছেন, প্রশ্ন করলে, তিনি যাদের নাম উল্লেখ করবেন, আরেকজন অন্যদের নাম ( কয়েকজনের নাম মিলেও যেতে পারে)। ব্যাপারটা কামাল মুহম্মদ ও চন্দন চৌধুরীর তালিকার দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। অবশ্য সোহেল হাসান গালিব শূন্যের কবিতায় উল্লেখ করেছেন, তালিকাটিতে তিনশোর অধিক কবিনাম রয়েছে। মাশাল্লাহ্, হরি বল। প্রতিশ্রুতিশীল কবিদের তালিকা বা তিনশোর অধিক কবিনামের তালিকা কে বা কারা বানালেন, (এ ধরনের আলোচকদের) প্রশ্ন করা হলে জবাব পাওয়া যাবে না । আবার এটারও জবাব পাওয়া যাবে না, যদি প্রশ্ন করা হয় – এ-তালিকা কি আজিজ সুপার মার্কেটে তৈরি করা হয়েছে তৈরি করা হয়েছে (ঝুলানো হয়েছে), নাকি চেরাগীর মোড়ে? কোন মানদণ্ডে উল্লেখিত সংখ্যক কবিনামের তলিকা থেকে একশ উনিশজনকে শূন্য দশকের কবি (!) বলা যায়, প্রশ্নটার সন্তোষজনক জবাব নেই। শূন্যের কবিতার ব্যাপারে বক্তব্য, গালিব যারা ২০০৭ সালে লেখালেখিতে আত্মসমর্পিত হয়েছেন, তাদের লেখা প্রকাশ করে, তাদের আবার আত্মগোপন করে পরবর্তী দশকে আসন খুঁজে নেয়ার পরামর্শ দিয়ে বোকামি করেছেন। তাদের লেখা প্রকাশ না করে কথাটা বলা যেত! মূল কথা হল, কবি বনে যাওয়ার এবং অন্যকে কবি হিসেবে উল্লম্ব করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মানসিকাতায় বেশিরভাগ নবীন-প্রবীণ ‘দশক , দশক’ করে চিল্লাচিল্লি করেছেন।
………………………………………………………………………………….
(এটি উপর্যুক্ত শিরোনামের গদ্যটির প্রথম অংশ—-লেখক)