ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

আবু হাসান শাহরিয়ার এলিয়টের বরাত দিয়ে বলেছেন, ‘নবিশ কবিরা নকল করে, আর পাকা হাতের কবিরা করে চুরি’। তার এ-উদ্ধার থেকে বোঝা যায়, কাঁচা হাতের কবিরাই নবিশ কবি। কিন্তু এ-গদ্যে (‘কবিতা অকবিতা অল্পকবিতা’) তিনি কারোর একটি কবিতায় পূর্ণাঙ্গ নকলরূপ তুলে ধরতে সক্ষম হননি। পূর্ণাঙ্গ নকল হিসেবে আমি উত্তরআধুনিক আশীষ সেনের ‘এক কান্ত পদাতিক’ (২০০৭, আদিত্য প্রকাশন, চট্টগ্রাম) কাব্যের ‘মশালের আলোয় দেখা’, ‘আমার স্বপ্ন ও আমার পৃথিবী’ এবং ‘ভালোবাসার মতন’ নির্দেশ করতে পারি। এখানে কেবল প্রয়াত খান শফিকুল মান্নানের ‘কখনো কোথাও’ (পদাতিক, একুশে সংখ্যা, ১৯৭৮, সম্পাদক- মাহাবুব-উল-আজাদ চৌধুরী)-এর সাথে আশীষ সেনের ‘মশালের আলোয় দেখা’ পড়া যাক-

কখনো কোথাও মাহুত মাতাল হয়/ম্যাপের কোনায় রক্ত ফিনকি দিয়ে
কখনো কোথাও লালের আভাস রাখে/কখনো কোথাও হরিণ পালায় বনে
খাতার পাতায় ঝড়েরা বন্দী থাকে/মোমের বাতিটি নীরবে জ্বলিয়া যায়
প্রাচীন প্রাণীর লেজের মহিমা আজো/বঙ্গসাগর উথাল পাতাল করে
ছুটেছে মহিষ লবণ মাঠের বুকে/বেপথু ঝড়ের ছোবল বারংবার
বিপুল নখরে ছিঁড়েছে সাইকলপ্স/ইথাকা এখনো বিরান পাহাড়ভূমি
বেদিয়া পাখীরা অনেক গাঙের চিল/হাতিরা কখনো মাঝারি শূকর হয়
কখনো ইঁদুর বিলাসী হোটেল ঘরে/অশোক কাননে সোনার লঙ্কা জ্বলে।

(কখনো কোথাও/খান শফিকুল মান্নান)

এবং

কখনো কোথাও মাহুত মাতাল হয়/ম্যাপের হৃদয়ে রক্ত ফিনকি দিয়ে
কখনো সে লাল ভোরের আভাস রাখে/জাগে লোকালয় হরিণ পালায় বনে।
খাতার পাতায় ঝড়েরা বন্দী থাকে।/মোমের বাতিটি নীরবে জ্বলে ফুরায়
প্রাচীন প্রাণীর লেজের তাড়ন আজো/বঙ্গসাগর উথাল-পাতাল করে।
ছুটছে মহিষ লবণ মাঠের বুকে/ঝড়ো খুরে হানে ছোবল বারংবার,
সুবিধাবাদীরা ছিঁড়ছে পুঁথির পাতা/শয্যাসঙ্গী পানাহার হলাহল।
ইথাকা এখনো বিরান পাহাড়ভূমি/বেদে-পাখিরাও খোঁজে নিজ বাসাবাড়ি
হস্তী কি কভু শুকরের পাল হয়/রাজা হতে কভু ইঁদুর নাহি তো পারে।
অশোক কানন নিরাপদ যতো হোক,/ তবুও সেখানে সোনার লঙ্কা জ্বলে।

(মশালের আলোয় দেখা/আশীষ সেন)

আবু হাসান শাহরিয়ার পাকা হাতের কবির চুরিকর্ম হিসেবে জয় গোস্বামীর‘দাগী’ এবং ময়ুখ চৌধুরীর চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি’ নির্দেশ করেছেন। এগুলো যে তাদের চৌর্যবৃত্তিক ফসল, প্রমাণের স্বার্থে তুলে ধরেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘উত্তরাধিকার’ ও আবিদ আজাদের ‘কবিতার দিকে’। সত্যিই কাব্যপাঠকের কাছে মনে হবে, ‘উত্তরাধিকার’ থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘দাগী’। ময়ুখ চৌধুরীর ‘চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি’ নিয়ে তিনি যা বলেছেন, তাও বক্তব্য। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে, তিনি (ময়ুখ চৌধুরী) আবিদ আজাদ’র ‘কবিতার দিকে’ ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘কোনদিনই পাবে না আমাকেই-’কে সামনে রেখে ‘চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি’ পৌঁছলেন।
চন্দ্রমল্লিকার মাংস ঝরে আছে ঘাসে
‘সে যেন এমনি চলে আসে’
হিমের নরম মোম হাঁটু ভেঙে কাৎ
পেট্টলের গন্ধ পাই এদিকে দৈবাৎ
কাছাকাছি
নিজের মনের কাছে নিত্য বসে আছি
দেয়ালে দেয়ালে
হাটের কাচকড় কুপি অনেকেই জ্বালে
নিভন্ত লন্ঠন
অস্তিত্ব সজাগ করে বারান্দার কোণ
বসে থাকে
কোনদিন পাবে না আমাকে-
‘কোনদিনই পাবে না আমাকে!’

(কোনদিনই পাবে না আমাকে-/শক্তি চট্টোপাধ্যায়)
– কোনদিকে যাবে, বাঁয়ে?
– না।
– কোনদিকে যাবে, ডানে?
– না।
– কোনদিকে যাবে, উত্তরে দেিণ পুবে পশ্চিমে?
– আমি কবিতার দিকে যাবো।
– কোন পথে যাবে?
– সবপথে যাবো, সবপথই গেছে কবিতার দিকে।
(কবিতার দিকে/আবিদ আজাদ)

শক্তির কবিতার ‘চন্দ্রমল্লিকা’, ‘কোনদিন পাবে না আমাকে’ এবং আবিদ আজাদের কবিতার স্ট্রাকচার, ‘সবপথে যাবো, সবপথই গেছে কবিতার দিকে’ মাথায় রেখে ময়ুখ চৌধুরীর ‘চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি’ পড়া যাক-
– এই রিক্সা যাবে নাকি?
– যাবো স্যার; কোথায় যাবেন?
– যাবো চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি।
এই বলে খুব তাড়াতাড়ি
রিক্সায় বসেছি ছেপে; দেখেছি ঘড়িটা বারবার।
যদিও এখান থেকে কোলকাতার ডায়মন্ড হার্বার
বহুদূর, তবু আমি আরেক কাউকে
খুঁজে ফিরি এ শহরে এখানে ওখানে-
চিত্রপ্রদর্শনী, মিনি সুপার মার্কেট কিংবা বইয়ের দোকান;
ততণে চন্দ্রকলা মেঘের আড়ালে।
– এবার কোন্ দিকে স্যার?
– সবদিকে যাও। চন্দ্রমল্লিকা যেহেতু নেই কোনোখানে,
তার মানে সবদিকে আছে।
তুমি আরও যেতে থাকো,-
আকাশে আরেক চন্দ্রমল্লিকার ইশারা তো পাবে!
চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি বুকের ভেতর নিয়ে
পাল্টে দিই সড়কের নাম;
এইভাবে পথে-পথে প্রতিটি গলির মোড়ে
অন্যনামে খোঁজ করি ক্রিসেনথিমাম।
রেখে যাই প্রণয়প্রণাম

সূত্র: ঢেউ, অষ্টম সংখ্যা, ২০০৯। এটা আমার ‘দৃষ্টান্তবাদী দৃষ্টিতে কবিতার সৌন্দর্যোপভোগযাত্রা’ গদ্যের প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে।