ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

দশকের কবিতা বা দশকী কবিতা কি, জানা যাক। ‘নব্বইয়ের কবিতা’ কথাটি বললে ‘আশির কবিতা, ও ‘শূন্যের কবিতা’ হাজির হয়। কারণ এগুলোও দশকী ব্যাপার-স্যাপার। ‘নব্বইয়ের কবিতা’ বলতে নব্বই দশকের সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রাকৃতিক ইত্যাদি পরিপ্রেতি নিয়ে রচিত কবিতাকে বুঝি। কেবল নব্বই দশকে লিখতে আসা তরুণদের কবিতা নয়, সম-পরিপ্রেতিসংলগ্ন নবীন-প্রবীণ সবার কবিতাকে বুঝি। অর্থাৎ চঞ্চল আশরাফদের কবিতা নয়, উক্ত সময়ের ঘটনাকে ধারণ করা আবু হেনা আবদুল আউয়ালদের কবিতাকেও বুঝি। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ তার গদ্যটিতে আবু হেনা আবদুল আউয়ালদের এ-জাতীয় কবিতাকে তুলে ধরে নব্বইয়ের কবিতা মাপার পাল্লাটিকে কাঠধরা করেননি। ওবায়েদ আকাশও শূন্যের ঘটনাঘনিষ্ট চঞ্চল আশরাফদের কবিতাকে শূন্যের কবিতা বলেননি। শামীম রেজাকে শূন্য দশকের কবিতা আলোচনা করতে বলা হলে তিনিও আউয়াল-আশরাফদের শূন্যের ঘটনাঘনিষ্ট কোনো কবিতাকে আমলে আনবেন না। শূন্যের কবি বলে আত্মজাহিরকারী সোহেল হাসান গালিব তো ইতোমধ্যে এ-তাদের আমলে না এনে শূন্যের কবিতা করে প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু নব্বই দশকের কবিতা বললে নব্বই দশকের পরিপ্রেতিসংলগ্ন কবিতাকে বোঝায়; এবং এজাতীয় কবিতা নবীন-প্রবীণ (সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, শামসুল ইসলাম, ব্রাত্য রাইসু, খালেদ মাহবুব মোর্শেদ প্রমুখ) যে কারো থাকলে, সবগুলোই নব্বই দশকের কবিতা। তালিকাপ্রিয় দশকপন্থীরা এ কথা সহ্য করবেন না, মানবেন না। মানতে গেলে তাদের দশকী পরিচিতি ধুলিসাৎ হয়। তাদের কাছে কবিতা নয়, কবি কথাটাই প্রিয়। পরিচয় রার্থে, তাই, কবিতা আলোচনা-কবিতাকাল বিবেচনায় আমার বোধকে আমলে আনবেন না। যদি না আনবেন, তবে কীভাবে (আবারো বলছি) চঞ্চল আশরাফদের কবিতাকে নব্বই এবং আবু হেনা আবদুল আউয়ালদের কবিতাকে আশির দশকের বলছেন, বোধগম্য নয়। ভাবকল্প বা বিষয়-বৈচিত্র্যের দিক থেকে? পরপর দু’দশকের কবিতার গঠনগত-ভাবগত দিকের তুলনা তুলে ধরতে বললে তারা অসংলগ্ন বক্তব্যই দিচ্ছেন, ধোঁয়াশাময় পরিস্থিতি দাঁড় করাচ্ছেন। খালেদ হামেদী ও হাফিজ রশিদ খানের বক্তব্য পড়লে ব্যাপারটি আঁচ করা যাবে। মনে হচ্ছে, তারা নব্বই দশকে লিখতে আসা তরুণদের কবিতাকে নব্বই দশকের বলে হৈচৈ করছেন। এটাকেই, বেশির ভাগ পাঠক নিশ্চিতভাবে, তাদের দশকী কবিতা নির্ণয়ের মানদণ্ড হিসেবে চি‎িহ্নত করেছেন।

দশকের কবিতা বা দশকী কবিতা কি, জানা যাক। ‘নব্বইয়ের কবিতা’ কথাটি বললে ‘আশির কবিতা, ও ‘শূন্যের কবিতা’ হাজির হয়। কারণ এগুলোও দশকী ব্যাপার-স্যাপার। ‘নব্বইয়ের কবিতা’ বলতে নব্বই দশকের সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রাকৃতিক ইত্যাদি পরিপ্রেতি নিয়ে রচিত কবিতাকে বুঝি। কেবল নব্বই দশকে লিখতে আসা তরুণদের কবিতা নয়, সম-পরিপ্রেতিসংলগ্ন নবীন-প্রবীণ সবার কবিতাকে বুঝি। অর্থাৎ চঞ্চল আশরাফদের কবিতা নয়, উক্ত সময়ের ঘটনাকে ধারণ করা আবু হেনা আবদুল আউয়ালদের কবিতাকেও বুঝি। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ তার গদ্যটিতে আবু হেনা আবদুল আউয়ালদের এ-জাতীয় কবিতাকে তুলে ধরে নব্বইয়ের কবিতা মাপার পাল্লাটিকে কাঠধরা করেননি। ওবায়েদ আকাশও শূন্যের ঘটনাঘনিষ্ট চঞ্চল আশরাফদের কবিতাকে শূন্যের কবিতা বলেননি। শামীম রেজাকে শূন্য দশকের কবিতা আলোচনা করতে বলা হলে তিনিও আউয়াল-আশরাফদের শূন্যের ঘটনাঘনিষ্ট কোনো কবিতাকে আমলে আনবেন না। শূন্যের কবি বলে আত্মজাহিরকারী সোহেল হাসান গালিব তো ইতোমধ্যে এ-তাদের আমলে না এনে শূন্যের কবিতা করে প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু নব্বই দশকের কবিতা বললে নব্বই দশকের পরিপ্রেতিসংলগ্ন কবিতাকে বোঝায়; এবং এজাতীয় কবিতা নবীন-প্রবীণ (সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, শামসুল ইসলাম, ব্রাত্য রাইসু, খালেদ মাহবুব মোর্শেদ প্রমুখ) যে কারো থাকলে, সবগুলোই নব্বই দশকের কবিতা। তালিকাপ্রিয় দশকপন্থীরা এ কথা সহ্য করবেন না, মানবেন না। মানতে গেলে তাদের দশকী পরিচিতি ধুলিসাৎ হয়। তাদের কাছে কবিতা নয়, কবি কথাটাই প্রিয়। পরিচয় রার্থে, তাই, কবিতা আলোচনা-কবিতাকাল বিবেচনায় আমার বোধকে আমলে আনবেন না। যদি না আনবেন, তবে কীভাবে (আবারো বলছি) চঞ্চল আশরাফদের কবিতাকে নব্বই এবং আবু হেনা আবদুল আউয়ালদের কবিতাকে আশির দশকের বলছেন, বোধগম্য নয়। ভাবকল্প বা বিষয়-বৈচিত্র্যের দিক থেকে? পরপর দু’দশকের কবিতার গঠনগত-ভাবগত দিকের তুলনা তুলে ধরতে বললে তারা অসংলগ্ন বক্তব্যই দিচ্ছেন, ধোঁয়াশাময় পরিস্থিতি দাঁড় করাচ্ছেন। খালেদ হামেদী ও হাফিজ রশিদ খানের বক্তব্য পড়লে ব্যাপারটি আঁচ করা যাবে। মনে হচ্ছে, তারা নব্বই দশকে লিখতে আসা তরুণদের কবিতাকে নব্বই দশকের বলে হৈচৈ করছেন। এটাকেই, বেশির ভাগ পাঠক নিশ্চিতভাবে, তাদের দশকী কবিতা নির্ণয়ের মানদণ্ড হিসেবে চি‎িহ্নত করেছেন।

উল্লেখ করেছি, কোনো দশকে লিখতে আসা তরুণদের কবিতাই কেবল সেই দশকের কবিতা নয়, সমসময়ের পরিপ্রেতি নিয়ে লেখা নবীন-প্রবীণ সবার কবিতাকে বিবেচনায় আনতে পারি।

… তোমার দিগন্ত-কাঁপানো আন্দোলনের গাথা
বাক্সময় হয় প্রতিটি নদীর উৎসমুখে
পাহাড়ী কুঠিরের বিষণ্নতায়,
বিপন্ন মানুষের আর্তিতে।
তোমার নাম আমাদের হৃদস্পন্দন,
আমাদের আক্রান্ত অতীতের
ইতিহাস, আমাদের আহত গৌরবের
সোনালী দুপুর,
আমাদের মৈত্রীর পূর্ণিমা-রাত।…
(শহীদ জননীকে নিবেদিত পংক্তিমালা,
এসো কোকিল এসো স্বর্ণচাঁপা (১৯৯৫)/ শামসুর রাহমান)

প্রখর সূর্যের নীচে মধ্যা‎হ্নের অন্ধকার
শকুনীদের মাংশাসী অভিবাদন
যখন খুবলে নিচ্ছিল গণতন্ত্রের টুঁটি-
নূর হোসেন তখন জীবনোষ্ণ এক ঘুমের গভীরে,
ঠিক ঘুম নয়- বিস্মরণের অতীত
এক নব জাগরণবোধ- পৃথিবীর হৃদয়ে তখন।
(জীবনোষ্ণ ঘুম, বত্রিশ নম্বর (১৯৯৭)/ বেলাল চৌধুরী)

শামসুর রাহমানের কবিতাটি নব্বই দশকের। কারণ এটি নব্বই দশকের ঘটনা (জাহানারা ইমাম ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করে যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারের দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছেন, তাঁকেই নিবেদন করে এই কবিতা) নিয়ে রচিত। বেলাল চৌধুরীর কবিতাটি আশি দশকের। কারণ এটি নূর হোসেনকে প্রসঙ্গ করে লেখা। গণতন্ত্রকামী নূর হোসেন আশি দশকে জীবন উৎসর্গ করেন। শুধু শামসুর রাহমান ও বেলাল চৌধুরীর নয়, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ, জিয়া হায়দার, দাউদ হায়দার, কেজি মোস্তফা, শিমুল মাহমুদ, হোসাইন কবির, টোকন ঠাকুর প্রমুখসহ তরুণতম নিতুপূর্ণা, মাদল হাসান, চন্দন চৌধুরী, কাজী নাসির মামুনদের দশকবন্দী কবিতা রয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘পঁচিশে মার্চ ১৯৮৮’, নির্মলেন্দু গুণের ‘প্রিন্ট অর্ডার ১৯৮৪’, মহাদেব সাহার ‘আমার কীসের ভয়’, নিতুপূর্ণার ‘গাণিতেক বোধ’, চন্দন চৌধুরীর ‘ইদানীং ইরাকের একটি চিঠি থেকে’- কবিতার নাম উল্লেখ করতে পারি।

বৃষ্টিতে বারুদের ঘ্রাণ, অস্থিমজ্জা হাড়ের আবাদ
আর আমাদের এক-একটা মানুষ হঠাৎ আকাশ হয়ে যায়
অজান্তে কখন ফোঁটা হয়ে ঝরে যায় হাত পা স্তন লিঙ্গ…
ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঝ’রে পড়ে পশ্চিমের পায়ে

এই কৃষ্ণপ দিনে লালকৃষ্ণচূড়াবৃষ্টি হয়
মাটি বালি বায়ু শরীরের লোম মেখে ওঠে রক্তিম সুন্দরে
এইভাবে আমাদের দেহ য়ে য়ে কখন যে বৃষ্টি হবে
আজ আর মাপি না সময়
(ইদানীং ইরাকের একটি চিঠি থেকে, লালকাঁকড়ার নদী (২০০৭)/ চন্দন চৌধুরী)

কবিতার েেত্র দশক ছাড়াও মুহূর্তের বিবেচনাও করা যায়। স্বাধীনতাযুদ্ধের নিকটপূর্ব ও নিকটপরের প্রভাব যে-সব কবিতায় রয়েছে, সেগুলোকে স্বাধীনতাযুদ্ধঘনিষ্ঠ কবিতা বলতে পারি। এভাবে চি‎িহ্নত করতে পারি সামরিক শোষণপর্বের কবিতা। বাঙালি কবি দ্বারা আদিবাসী জীবনসংলগ্ন কবিতা নির্মাণমুহূর্ত হিসেবে নব্বই দশককে চি‎ি‎‎হ্নত করা যায়।
সোনালি তলপেট মুক্ত করেছে
শীতের সকাল
দু’চোখে ঘুম নেই রাত্রী সরেছে
সে অনেক কাল

সুদূর ও-পাড়ার রোগখাঙ তীরে
ছোট্ট মাচাঙঘর
ভয়াল শীত রাতে প্রতারক ওম ঘিরে
গ্রষ্মের কেটেছে জ্বর

কুয়াশা বুকে গেঁথে থুরঙের চাপে-ভারে
অবঙ্গ্রি ওই যায়
দেখেনা দুই চোখে স্পষ্ট আকারে
তবু হাঁকে রাস্তায়

রে ফ্রি সা মু রে ফ্রি সা মু
চিরুনিপিঠা নিবি চিরুনিপিঠা নিবি কেউ
(রে ফ্রি সা মু, আদিবাসী কাব্য/ হাফিজ রশিদ খান)

রে ফ্রি সা মু : মারমা শব্দ (রে ফ্রি>চিরুনি, মু> পিঠা = চিরুনিপিঠা); রোগখাঙ: ঐ, শঙ্খনদী; থুরঙ : ঐ, পিঠে ভারি বোঝা বইবার পে উপযোগী ঝুড়িবিশেষ; অবঙ্গ্রি : ঐ, সকলে যাকে দাদি বা নানি বলে ডাকে।

উপরে উল্লেখিত কবিতাগুলো দশক তথা মুহূর্তের পর্বে আটকে পড়া। এমন কবিতার বেশির ভাগই, অন্য দশকে, মৃতবস্তুসদৃশ। চলমান পরিস্থিতিতে বা ঘটনা ঘটার পর কবির আবেগ-অনুভূতি কেমন থাকছে বা ছিল, তারই অনুরণন এসবে থাকছে।
দশকে দশকে যেমন দশকী কবিতা হচ্ছে, তেমনি শাশ্বত কবিতাও। শাশ্বত কবিতা এমন, যার মৃত্যু নেই, সর্বদা সমান আবেদন নিয়ে পাঠকের বোধে আঘাত করে, ভাবায়-হাসায়-কাঁদায়-জাগায়। শাশ্বত মেসেজ তথা নিত্যনতুন ভাবকল্প থাকছে বলে এগুলো এমন চরিত্রের- স্থায়ী। দশকী ঘটনার ছাপ থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে। থাকলেও মেজাজ ও ঢঙের কারণে দশকের দেয়াল টপকে চলে যাওয়া, শঙ্খের বহমান স্রোতের মতো। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ এেেত্র বিবেচ্য। কোন্ প্রোপট মাথায় রেখে তিনি কবিতাটি লিখেছেন, সবাই জানেন। স্বাধীনতা মানুষের আকাক্সা এবং প্রাপ্তির পর মানুষের আচরণ কেমন হতে পারে- এ ভাব্য ব্যাপার রয়েছে এ কবিতায়। রিজোয়ান মাহমুদের ‘হাসনুহেনা’ও বিবেচ্য। হাসনুহেনা বলতে তিনি বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানের দু’কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে ইঙ্গিত করেছেন। এই প্রতীক ব্যবহার এবং ‘যাকে সবাই হাসনুহেনা- এই নামে ডাকবে আবার’ জ্যোতিষিক উচ্চারণের কারণেই, মূলত, কবিতাটি শাশ্বত। ‘হাসনুহেনা’র স্থলে ‘শেখ হাসিনা’ ও শেখ রেহানা’ থাকলে এটি দশকী বা সাময়িক কবিতা হয়ে পড়তো।

মানষের প্রথম সার্থক আবিষ্কার,
মদ।
মানুষের প্রথম সার্থক প্রবর্তনা,
মুদ্রা।
মানুষের প্রথম সার্থক উদ্ভাবনা,
ঈশ্বর।
(মদ-মুদ্রা-ঈশ্বর, নিঞ্জনের পৃথিবী (১৯৮৬)/ নির্মলেন্দু গুণ

যখন কেউ কাউকে কথা দেয়
তখন একটি চোখ আঁকা হয়ে যায়।
তাকিয়ে থাকে সেই চোখ
নিষ্পলক।
হরিণের শিংয়ের মতো চারদিকে চিৎকার ছোটে-
দ্যাখে চোখ, সেই চোখ দ্যাখে,
কবর আমাকে কোল যখন দেবে
সেই চোখ যেন আমাকে জাগিয়ে রাখে।
(সেই চোখ, কবিতা সংগ্রহ (১৯৯৭), পৃ. ৪৮/ সৈয়দ শামসুল হক)

মানুষ সীমাহীন মতার অধিকারী, এর প্রমাণ আমরা জগতের দিকে তাকালেই পেতে পারি। মতার ব্যবহার নিজেদের প্রয়োজনেই করছে, অস্তিত্ব রার স্বার্থেই। মদের আবিষ্কার তথা মুদ্রার প্রবর্তনা তার মতারই সফল ব্যবহার। শুধু তা নয়, এ মানুষ ঈশ্বরের উদ্ভাবকও। মানুষ ও ঈশ্বরের এই যে সম্পর্ক (গুণের কবিতাটিতে ল করি), তা বহুলাংশেই বিতর্কিত। যারা সৃজনশীল তথা সন্দেহপ্রবণ, তাদের মাথায় এই বিতর্ক চিরকাল চলতে থাকবে, কখনো এর সীমারেখা টানা সম্ভব হবে না। প্রিয়পাত্রের প্রতি মানুষের অনুরক্তিও চিরকাল থাকবে, অন্যকে কথা দেওয়ার সময় দেহের মুদ্রা দৃষ্ট হবে এবং সাহচর্যে বেঁচে থাকার যুগপৎ ইচ্ছাপ্রকাশও থাকবে। এই যে শাশ্বত-দার্শনিক ব্যাপার, তা নির্মলেন্দু গুণ ও সৈয়দ শামসুল হকের নয়- ময়ুখ চৌধুরী, শামসুল ইসলাম, আবু হাসান শাহরিয়ার প্রমুখ কবিগণের কবিতাও লক্ষ করি।

এতো কোলাহল তবু মনে হয় বিষণ্ন নির্জন,
যা কিছু অপ্রাপনীয়, মনে হয় বেশি প্রয়োজন
যেভাবে বিদায় দিলে, এভাবে কখনো কেউ দেয়নি আমাকে;
দুঃখের চেয়েও তীব্র ভালোবাসা দ্রবীভূত চোখের ভাষায়
তোমার অন্যায় মুখ, সারারাত অসহ্য দহন।
যা কিছু অপ্রাপনীয়, কেনো মনে হয় বেশি প্রয়োজন।
(অনুরাধাগুচ্ছ-১/ ময়ুখ চৌধুরী)

এভাবেই যায়।

এভাবেই যেতে যেতে ফিরে আসে
প্রকৃত রমণী ঝাউবনে
দীর্ঘচুল, দীর্ঘশ্বাস
বাতাসে বাতাসে একাকার…

এভাবেই যায়।

এভাবেই যেতে যেতে নেমে যায়
অনন্ত বিরহ একাকিনী
ম্রিয়মাণ পাশাপাশি
থাকে শুধু বিদেহ সাঁতার।
(সাঁতার, কনেসুন্দরী আলো (১৯৯২)/ শামসুল ইসলাম)

নদীতে মাদুর পাতো, সে মাদুর ছন্দে ভেসে যাবে। বাতাসে বিছাও কান, পাখিরাও সুরে কথা বলে। মাঠে-মাঠে যত বৃষ্টি, সবই তারা জলের ঘুঙুর। এখন বেসুরো দিন, কথা কম, তর্ক হরে-দরে। রসময় ছন্দগুলো বেরসিকে বিরাগভাজন। তবু সুরে-সুরে আমি গেয়ে যাই প্রান্তরের গান। ছন্দে লেপে-মুছে রাখি কবিতার বাড়ির উঠান।
(ছন্দে লেপে-মুছে রাখি কবিতার বাড়ির উঠান/আবু হাসান শাহরিয়ার)

সরকার আমি, শামসুল আরেফিন, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, রিজোয়ান মাহমুদ, সরকার মাসুদ, আবু হেনা আবদুল আউয়াল, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, মারুফ রায়হান, আবদেল মাননান, চঞ্চল আশরাফ, কামরুজ্জামান কামু, আবু মুসা চৌধুরী, টোকন ঠাকুর, মাহবুব লীলেন, জাহানারা পারভীন, মুজিব ইরম, শাহনাজ মুন্নী, জফির সেতু, সজল সমুদ্র, সজল ছত্রী, আমজাদ সুজন, মাহমুদ শাওন, রুদ্র আরিফ, হেনরী স্বপন, শেলী নাজ, এমরান কবির, বদরে মুনীর, মাহমুদ সীমান্ত, ফুয়াদ হাসান, শাবিহ মাহমুদ, বিজয় আহমেদ, সফেদ ফরাজী, কামাল মুহম্মদ, কাজী জিন্নূর প্রমুখ এ সময়কার সক্রিয় কবিগণের কলম থেকেও শাশ্বত কবিতা বেরুচ্ছে। এই তাদেও লেখায় দেখতে পাই, সাময়িক ঘটনার পাশাপাশি চিরসত্য-চিরনান্দনিক বিষয়গুলো তাদের ভাবাচ্ছে-জাগাচ্ছে। তারা পাঠকের প্রত্যাশামাফিক, নতুন মেসেজসম্পন্ন শাশ্বত কবিতা নির্মাণে সদাসক্রিয় রয়েছেন।

আপেল বনে জমা হয়ে আছে বহু বছরের দীর্ঘশ্বাস
কেউ তার খোঁজ রাখে না।
দ্রুতগামী অশ্বগুলোকে ভুল পথে দৌড়–তে দেখলে
মনে বড় দুঃখ লাগে
কাকে বলবো পুরনো সেই দিনের কথা

অন্ধকার ঘর ভালো লাগে না।
আপেল বনে ঝড়
আপেল বনে জলোচ্ছ্বাস
প্রতিটি নিশ্চিত জয়ে কারো না কারোর
হৃদয় ভেঙে যায়।
(অন্ধকার ঘর ভালো লাগে না/ সরকার আমিন)

সরাবখানার পাশ দিয়ে যাতায়াত বেশিদিন হলো
তবু চায়ের স্টলের টান বুক থেকে সরে না এখনো…
কবরখানায় বসে প্রেম করা দেখে দেখে খাওয়া হলো স্যান্ডউইচ
তবু পশুহাইল ভাতের ঘ্রাণ ভুলি না কখনো…
(সীমাবদ্ধতা/ মুজিব ইরম)

দীর্ঘ প্রেম নাতিদীর্ঘ সঙ্গমের চেয়েও কঠিন
মানবিক বিশ্বাসও মেনে নেয়া যায় বেশিদিন?
দীর্ঘরাত মোহনায় বেঁচে থাকে না অধরা জল
সুষম সময় সবসময় করে না কোলাহল
দীর্ঘস্থায়ী কিছু নেই, দীর্ঘ কবিতা কবিতা হয় না।
(রাফখাতার কাটাকুটি- এক/ ফুয়াদ হাসান)