ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ছোটবেলা যখন আমরা সবাই মিলে একসাথে খেলতাম তখন যদি কাউকে পছন্দ না হতো কিংবা বনিবনা না হতো তাহলে আমাদের গ্রামের ভাষায় একটা কথা প্রায়ই বলতাম, হর (সরে যাওয়া) এখান থেকে। যাকে এই কথাটা বলতাম সে তখন ভাব জমানোর জন্য খুব করে আকুতি-মিনতি করতো আর আমাদের সাথে তাল মেলানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতো।

আজকের হরতাল সম্পর্কে চিন্তা করতে যেয়ে আমার সেই ছোটবেলার কথা গুলো খুব মনে পরছে। যুদ্ধাপরাধী মামলার আসামী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত করে আপীল বিভাগের দেয়া রায়ের প্রতিবাদে জামায়েতে ইসলাম বাংলাদেশের ডাকা ২ দিনের হরতালের পর, গুরুত্বপূর্ন কোন ইস্যু না থাকা সত্বেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন আজ হরতালের ডাক দিল তখন সেটাকে তাল মিলানো ছাড়া আর কিছু ভাবা যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়না। আজকাল একটা কথা খুব বেশী শুনা যাচ্ছে মানুষের মুখে, আওয়ামীলীগ সরকার নাকি বিএনপি কে ধ্বংস করার জন্য জামায়েতে ইসললাম বাংলাদেশের সাথে গোপনে সমযোতা করে যাচ্ছে। কেন জানি মনে হচ্ছে সেই সব কারনেই বিএনপি শুধুমাত্র জামাত কে খুশি করার জন্য কিংবা তাদের সাথে তাল মিলানোর জন্যই আজকের এই হরতাল টি আহ্ববান করেছে।

একটা সময় ছিল মানুষ যখন সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল ডাকতো তাহলে সরকারী অফিস-আদালত বন্ধ করে দেওয়া হতো, আর আজকাল আফিস-আদালত ঠিকই খোলা থাকে কিন্তু হরতালের প্রভাব দাবানল হয়ে আঘাত করে রাস্তার যানবাহনের উপর। আমি ভেবে পাইনা রাস্তার যানবাহন পুড়িয়ে হরতালের স্বার্থকথা কিভাবে অর্জন করা যায়! আমরা মানুষরা অবশ্য সবকিছুতেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পছন্দ করি। আমরাও হরতালের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের ধর্য্য শক্তিকে বাড়িয়ে নিয়েছি। কিছুদিন আগেও দেখতাম হরতাল হলে মহল্লার ছেলেরা ক্রিকেট ব্যাট হাতে রাস্তায় নেমে আসতো, কিন্তু বর্তমানে তাও আর সম্ভব না। কারন আমরা হরতালের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের কে এতটাই অভ্যস্থ করে ফেলেছি যে এখন আর হরতালে আমাদের তাল একটুও নড়বড়ে হয়না।

তার একটা ছোট উদাহরন দেই, আমি গতকাল গিয়েছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিশেষ প্রয়োজনে। ভাবলাম, আজ যেহেতু হরতাল তাহলে রাস্তা ফাঁকা পাওয়া যাবে আর আমিও খুব আরামেই যেতে পারবো। কিন্তু বাধ সাধলো তথাকথিত হরতাল। আমি যেমন ভেবেছিলাম রাস্তা ফাঁকা পাওয়া যাবে তেমনি হয়তো পুরা ঢাকা শহরের মানুষও ভেবেছেন, তাইতো আজ সাধারন দিনের তুলনায় রাস্তায় গাড়ীর সংখ্যাটাও তুনামুলকভাবে বেশী, যার ফলাফল ভয়ানক রকমের যানজট। যেখানে ঢাকা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে সাধারনত আমার সময় লাগে ১ঘন্টা ৩০মিনিট সেখানে আজ লাগলো ২ ঘন্টা ২৫মিনিট। ঢাকায় ফেরার অভিজ্ঞতা আরো ভয়াবহ, সর্ব সাকুল্যে আমি বাসায় ফিরতে পেরেছি ৩ঘন্টায়।

একদল আরেকদলের সাথে তাল মিলিয়ে হরতাল দিয়ে যাচ্ছে, আমরা সাধারন মানুষেরাও তাল মিলিয়ে তা সহ্য করে যাচ্ছি। কিন্তু এর ভবিষ্যৎ কি? আমরা সবাই শুধু তাল মেলানোর তালেই আছি, একটি বারের জন্যও কিন্তু আমরা এর থকে উত্তরনের উপায় খুজছি না। আমরা কি সারাজীবন শুধু তাল মিলিয়েই যাবো?