ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

ছবি: উজ্জল ধর

১২ ফুট লম্বা ৫ ফুট প্রস্থের ভাঙা কাঠের পাটাতনে তৈরি তিনটি ছোট ডিঙি নৌকা। নৌকার একটি বাঁশে ছাউ মাছের মালা গেঁথে শুকাতে দেয়া হয়েছে। নৌকা তিনটির মধ্যে একটির বৈঠার হাতলও ভাঙা। একটির রয়েছে ভাঙা ছিদ্রওয়ালা কাঠের ছাউনি। দেখলেই বোঝা যায় ছাউনির ওপরে কোনরকমের জোড়াতালির পলিথিন দিয়ে বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা পাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা।

লাল সোয়েটার গায়ে সাদা পাকা চুল-দাড়িওয়ালা কপালে ভাঁজ পড়া চামড়া কালো বর্ণের বৃদ্ধ এক মাঝি নৌকার এক পাশে বসে প্রহর গুনছে পৃথিবীর কাছ থেকে বিদায় নেয়ার। শারীরিকভাবেও অক্ষম। পাশে বসে আছে ময়লা শাড়ি পরে এক নারী। ছেঁড়া ময়লা শার্ট-জামা গায়ে নৌকার আশপাশে বৃদ্ধকে ঘিরে খেলছে রুগ্ন তিনটি শিশু। এরা বৃদ্ধের মেয়ে ও নাতি-নাতনি।

কাছে গিয়ে বৃদ্ধ মাঝির নাম জানতে চাইলে বলেন ‘কালা মিয়া’। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে আজ, এক হাত সম্পূর্ণ অসার। চোখের জ্যোতিও নেই তেমন। কারো সাহায্য ছাড়া চলতে ফিরতে পারেন না। স্ত্রী মারা গেছে বছর দশেক আগে। এক সময় সে নিজেই নদী আর সাগরের বুকে বৈঠা হাতে বড়শি রশি জাল দিয়ে মাছ ধরতেন। ভাঙা ভারী গলায় অনেক কিছুই বলে গেলেন। তার অনেক কিছুই বোঝা গেলো না।

তিন নৌকাতেই ৫০০ বড়শি রশির তিনটি জাল। জালগুলোও ছেঁড়া। একটা নৌকার একপাশে জড়ো করে রাখা হয়েছে ছেঁড়া ময়লা কাঁথা। ছোট্ট একটা টিনের চুলার ওপর একটি সিলভারের হাঁড়ি। রাতের খাবার রান্নার জোগাড় চলছে।

মেঘনা নদীর বুকে এই ছোট তিন ডিঙি নৌকাতে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা এভাবেই যুগের পর যুগ ধরে বাস করছে ভোলার চর সেমাইয়ার কালা মিয়ার এক ছেলে দু’ মেয়ের পরিবারের ২৩ সদস্য। গাদাগাদি করে এক কাতারে রাতে ঘুমায় এরা। বৃষ্টি নামলে আর কুয়াশা পড়লে এক পলিথিন নিচে নৌকাতেই এক সাথে নেয় আশ্রয় সবাই।

আল্লাহ ওপর ভরসা করেই ৮০ বছর মেঘনা আর বঙ্গোপসাগরের বুকেই ভেসে পার করে দিলেন নদীভাঙনে বসতবাড়ি হারানো কালা মিয়া ও তার পরিবার।

একমাত্র ছেলে মোহম্মদ আলীম ,তার স্ত্রী, ৫ ছেলে, ২ মেয়ে আর অক্ষম বাবা কালা মিয়াকে নিয়ে মোট ৯ জন এক নৌকায়। বড় মেয়ে রবেজান বিবি ৬ মেয়ে ও ১ ছেলেকে নিয়ে ৮ জন একটিতে । ছোট মেয়ে কমিমজান বিবি স্বামী, ৩ মেয়ে আর ১ ছেলেকে নিয়ে ৬ জন ছাউনি দেওয়া নৌকাটিতে বাস করে আসছে। তিন পরিবার এক সাথে থাকলেও খাবার খায় আলাদা।

কালা মিয়ার ৪৫ বছর বয়সী ছেলে আলীম বলেন, নৌকার ওপরই তার আর বোনদের জন্ম ও বিয়ে। তাদের সন্তানদের জন্মও। নৌকাতেই মারা যায় তার মা। পুরো পরিবারেই নেই কোন গোপনীয়তা।

শিশুরা মেশে না ঘাটের আশপাশের শিশুদের সাথে রবেজান, কমিমজান আর আলীমের সন্তানদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় কত অভাবে এই বিশাল পরিবারের দিন কাটায়। মানুষের কাছে হাত পেতে অনেক সময় খাবারের ব্যবস্থা করে তারা।

প্রতিবছর শীতের সময়ে গত ১৫ বছর ধরে তারা নোঙর করে সন্দ্বীপের জাহাজঘাট এলাকায়। বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই ফিরে যাবে ভোলার মনপুরা চরে। দাঁড় টানা ছোট ডিঙি নৌকাগুলো দিয়ে মনপুরা-দৌলতখাঁ চর-হাতিয়া হয়ে সন্দ্বীপে এসে পৌঁছাতে কালা মিয়াদের সময় লেগেছে তিন দিন তিন রাত। এ সময়ে জলদস্যু আর পথ হারানোর ভয়ে রাতে তার‍া নৌকা চালায় না।

২৩ সদস্যের ৩ পরিবারের ছোট সদস্যটির বয়স মাত্র ৪ মাস। যে শিশুটি নাকি কোনো টিকা নেয়নি। শুধু তা নয় তাদের পরিবারের অনেকেই নাকি কোনো প্রকার টিকা গ্রহণ করেনি। পরিবারের কেউ কখনো অসুস্থ হলে ঘাটের ফার্মেসি হতে ওষুধ এনে চিকিৎসা শেষ করে, কখনো যায়নি ডাক্তারের কাছে।

প্রতিদিন রাতে পরিবারের সব সদস্য এমন কি চার মাস বয়সী শিশুটিকেও সাথে নিয়ে নদীতে বড়শি রশি জাল ফেলে মাছ ধরতে যায়। বড়শিতে ধরা পড়ে পাঙ্গাস, গাগরা, গুলা আর কাটা মাছ। এই মাছ বিক্রয়ের টাকাতেই ২৩ সদস্যের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চাহিদা মেটানো হয়। নদীতে যেদিন প্রবল স্্েরাত থাকে সেদিন আবার মাছ ধরতে পারে না। স্রোতের টানে বড়শি ছিঁড়ে যায়। মাছ ধরা শেষে প্রতিদিন রাতে আবার তীরে ফিরে আসে।

গত ৮০ বছরে মাত্র ৩ বার বিপদে পড়েন বলে জানান কালা মিয়া। ৯১’র ঘূর্ণিঝড়ে ভোলার মনপুরা থেকে ভেসে যায় তার নৌকা। বর্ষার এক রাতে ভোলার দৌলতখাঁ চরে বাতাসে উল্টে যায় নৌকা। সে সময় পাশের নৌকার লোকজন তাদের উদ্ধার করে। আরেকবার সন্দ্বীপের টেংগার চরে জলদস্যুদের কবলে পড়ে পরনের কাপড় ছাড়া খাবার, টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় সব কিছুই নিয়ে যায়। এরপর অনেক কষ্টে সন্দ্বীপের জাহাজঘাট এলাকার মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে নৌকা তৈরি করে আবার ভাসান দেন মেঘনা নদী আর সাগরের বুকে।

জলদস্যুদের তিনি চেনেন। গলা কেটে সাগরে ভাসিয়ে দেবে এই ভয়ে তাদের কিছুই বলেন না বলে জানান কালামিয়ার একমাত্র ছেলে আলীম।

তিন ডিঙি নৌকার একটিতেও নেই রেডিও। পানির ঢেউ আর বাতাসের বেগ দেখে বুঝতে পারেন সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই সময় তারা তীরে ফিরে আসেন।

ভোলার চর সেমাইয়ার নদী ভাঙনে বসতবাড়ি হারিয়ে আল্লাহ্ ওপর ভরসা করেই ৮০ বছর নদী আর সাগরের বুকেই পার করে দিলেন কালা মিয়া ও তার পরিবার। জীবনের শেষ সময়ে এসেও পায়নি কোনো সরকারি দুস্থ ভাতা বা কোনো সংস্থার সহায়তা।

এভাবেই বংশানুক্রমে মেঘনা নদী আর বঙ্গোপসাগেরর বুকেই বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে পড়বে কালা মিয়া আর আলীমের পরিবারের প্রতিদিনের শত সহস্র করুণ নিঃশ্বাস।

****
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম