ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ঘটনাস্থল পাথরঘাটা জলিলগঞ্জ। চার দিকে অন্ধকার। সরু গলি। গলির দুই প্রান্তে দুই প্রতিপক্ষ। একে অপরের উপর বৃষ্টির পাথর নিক্ষেপ করে চলছে। পুলিশ নীরব দর্শক। পুলিশের মত আমরা ফটো সাংবাদিকরা ব্যগ থেকে ক্যামেরা বের করে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু ছবি তুলতে পারছিনা । অন্ধকারে কখন না পাথর গায়ে এসে পড়ে। এরই মধ্যে এক পক্ষের ২০/২২ বছর বয়সী এক কিশোর এসে বললো “আমাদের ছবি তুলবেন না, তুললে ক্যামেরা ভেঙ্গে ফেলবো। এরা আমাদের মা-বোনদের ইজ্জতের উপর হামলা করেছে। ওরা যদি এক পা সামনে এগিয়ে আসে তো একটাকেও রেহায় দেবনা।”

কয়েকজন পুলিশ কর্মকতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে দুইপক্ষকে শান্ত করার চেষ্ঠা করছে। কোন প্রকারেই শান্ত করতে পারছেনা । কিছুতেই থামছে না পাথর ছোঁড়াছোঁড়ি । হঠাৎ একটা ছেলে আমার হাত ধরে জোরপূর্বক টেনে নিয়ে যাচ্ছে মুহুর্তে আমি ভয়ার্ত আর বিচলিত হয়ে পড়ি। ভয়ে শরীরের লোমগুলো শিহরিত হয়ে যাচ্ছে। টেনে নিয়ে গিয়ে আমাকে একটা ছোট মন্দিরের সামনে দাড় করালো দেখুন ওরা আমাদের করেছে । ৬/৭ জন মহিলা খুব কান্নাকাটি করছে তার মধ্যে একজনের শাড়ীর আঁচল ছেঁড়া। মন্দিরের সামনে ছড়িছে ছিটিয়ে রয়েছে প্রচুর ইটের টুকরো। জানালার কাঁচ ভাঙ্গা। এইগুলোর ছবি তুলুন বলে ছেলেটি চিৎকার করে ওঠে। অনেকটা বাধ্য হয়ে ছবি তুলে ওই স্থান থেকে বের হয়ে আসি।

বাইরে এসে দেখি পুলিশের সংখ্যা বেড়েছে স্থানীয় মহিলা কাউনিন্সলর দুই প্রতিপক্ষের মাঝামাঝি অবস্থান নিয়ে সবাইকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্ঠা করে যাচ্ছে। পাথর নিক্ষেপ একটু থেমেছে। নিজ থেকে সাহস করে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। দুই-চারটা ছেলে আমাকে ঘিরে ফেললে । তাদেরই একজন বলে উঠলো ভাই দেখুন হিন্দুরা আমাদের মসজিদে হামলা করেছে আমাদের সব কিছু ভেঙ্গে ফেলেছে । দেখলাম মসজিদের ভিতর কয়েকটি ২/৩ টা পাথরের টুকরো ছড়িয়ে আছে। হঠাৎ ছেলেগুলোর মধ্যে একজন আমার শার্টের কলার চেপে বলে উঠলো ‘এই তোর নাম বল তুই হিন্দু না মুসলিম। তোরা কাল পেপারে আমাদের বিরুদ্ধে লিখবি । তোর কার্ড দেখা।’ অবস্থা বেগতিক দেখে সেখান থেকে বের হয়ে আসার পথ খুঁজার চেষ্ঠা করছি। আবারো ছেলেটি নাম জানতে চাইলে তাৎনিকভাবে আমি আমার পরিচয় গোপন করে নাম বললাম “সোহেল রানা আমি আজাদীতে কাজ করি।’ আরেকটা ছেলে বলে উঠলে ‘ওর পেন্ট খুলে দেখ। ’

অবস্থা পুরোপুরো নাগালের বাইরে। পুলিশ এসে আমাকে তাদের কাছ থেকে বের করে আনলো। দেখি আমার দেশের সাংবাদিক মিনহাজ হেলমেট মাথায় পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে বললাম তোমার হেলমেট আছে আমারতো নাই কোন সময় না পাথর এসে মাথায় পরে। “ নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর ”শ্লে­াগান দিয়ে লাঠি বাঁশ হাতে মিছিল করছে এই ফাঁকে আমি কয়েকটা ছবি তুলে ফেললাম । সিদ্ধান্ত নিলাম আমার কাজ শেষ এবার অফিস ফিরবো। শ্লোগানধারীদের ভিতর থেকে মুহুর্তে আমার মাথায় ছুঁড়ে মাররো বিশাল পাথর। দাঁড়ানো অবস্থান থেকে মাথা চক্কর দিয়ে মাঠিতে লুঠিয়ে পড়ে গেলাম। মাথায় হাত দিয়ে দেখি তীব্র রক্ত ক্ষরণ। এরই মধ্যে আবার শুরু হয়ে গেলে দুই পক্ষের পাথর নিক্ষেপ । আর কোন কিছুর জন্য অপেক্ষা না করে নিরাপদ স্থানের দিকে ছুটে আসি। সহকর্মীরা তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ভর্তি করালো । আর ডাক্তার মাথায় এক ঘন্টা ধরে অপারেশন করে সুঁই ফুটিয়ে একে একে করলো বারটি সেলাই । ডাক্তার বললো আগামী ৭২ ঘন্টা সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন বমি না হয়। এখন মাথাটা বেশ ভারি হয়ে আছে , মাঝে মাঝে চক্কর দিয়ে উঠছে , হালকা যন্ত্রণাও করছে। তুচ্ছ মোবাইল নিয়ে দুই ছেলে ঝগড়া এরপর কতো ভংকর সব ঘটনা। চোখেন সামনে আগুন লাগিয়ে দেয়া হল গরীব জেলেদের কয়েকটি বাড়ীতে। দাউ দাউ করে জ্বলছে অসহায় মানুষগুলোর সারা জীবনের অর্জিত সম্বলগুলো। আর মনে মনে ধিক্কার দিয়ে বলছি কোথায় যাচ্ছে দেশ…… কোথায় যাচ্ছে আমাদের মানবিকতা, চিন্তাধারা, ধৈয্যশীলতা।