ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

প্রিয় পাঠক, ভাল আসেন আশা করি। আমি আজ একটি গল্প বলবো। এই গল্পের প্রধান চরিত্র হোল “রমা” নামের একটি মেয়ের গল্প। কে এই রমা? যাকে নিয়ে লিখতে হবে? পাঠক একটু ভাবুন তো “রমা” নামের কাউকে আপনি চিনতে পারেন কিনা? যদি না পারেন তবে “ কৃষ্ণা সেন গুপ্ত” এই নামে কাউকে কি চিনেন? চিনছেন না, এইতো! বেশ ভাল। আচ্ছা আপনি না চিনলেও আপনার বাবা, কাকা,কিংবা কারো কারো নানা,নানি,দাদা,দিদারা চিনবে। আমার বয়স ৩০ হলেও আমি কিন্তু চিনি। আপনারা এতক্ষণ বূঝে গেছেন কার কথা বলছি? জ্বি, আমি বাংলা চলচ্চিত্রের সেই উজ্জ্বল নক্ষত্র, সেই আলোকিত উল্কা,ভার্সেটাইল আইকন,সেই স্বপ্নের সোনালি রঙ্গিন প্রজাপতি,যার নাম সুনা মাত্র অনেকে নস্টালজিক হয়ে যায় আজও,আমি সেই স্বপ্নের রানী “সুচিত্রা সেন”র কথা বলছি।

তুমি যে আমার।


কে এই মহারানী?
আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে, ১৯৩১ সালের ৬ই এপ্রিল অবিভক্ত ভারতবর্ষ বর্তমানে পাবনা জেলার গোপালপু্রে একটা সাধারন স্কুল শিক্ষক বাবা করুণাময় দাস গুপ্ত ও মা ইন্দিরা দাশ গুপ্তর ঘরে জন্ম নিয়ে ছিলেন এই মহারানী “সুচিত্রা সেন” কে জানত সেদিনের সেই সাধারন রমা নামের মেয়েটি হবে ভুবন বিখ্যাত “সুচিত্রা সেন” ।

শিক্ষা জীবন
পাবনা মহাখালি পাঠশালায় শুরু এবং পরবর্তী তে পাবনা গার্লস স্কুল এ ক্লাস টেন। এর পর আর পড়াশোনা হয়েছে বলে জানা যায়নি।

সুচিত্রা সেন হবার গল্প!
১৯৫২ সাল,ভাগ্য দেবী বড় বেশি ভর করেছিল জেন সুচিত্রা সেন এর উপর। “শেষ কোথায়” নামের একটি চলচ্চিত্র দিয়ে শুরু হোল স্বপ্নের রাণীর ক্যারিয়ার। কিন্তু বিধি ভাম! শুরুতেই কঠিন ধাক্কা খেলেন।ছবিটি রিলিজ হলনা। কিন্তু তাতে কি? স্বয়ং বিধাতা যাকে স্বপ্ন রানী বানিয়ে রেখেছেন সে কি পেছনে যেতে পারে? তাতে যতই বাধা আসুক। এ বছরই তিনি মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে অভিনয় করেন। আর তাতে ই শুরু হোল ইতিহাস। বাংলা চলচ্চিত্রের নুতন জুগের সুচনা শুরু হোল। বক্স অফিস কাঁপিয়ে দিল “ সাড়ে চুয়াত্তর” শুরু হয় উত্তম সুচিত্রার হিরন্ময় অধ্যায়। এর পর আর পেছনে তাকাতে হইনি রমা নামের মেয়েটিকে। উত্তম-সুচিত্রা প্রায় বিশ বছর বাঙালী হৃদয়ের আরাধ্য জুটি হিসেবে ভালোবাসায় সিক্ত হন। তিনি বাংলা চলচিত্রের কিংবদন্তিতুল্য অভিনেত্রীর স্বীকৃতিও অর্জন করেছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক জুটি হিসেবে উত্তম-সুচিত্রার উপমা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। ধ্রুপদ ধারার অভিনয়েও সুচিত্রার সুখ্যাতি সুবিস্তৃত। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম অভিনেত্রী যিনি সর্বাগ্রে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সাত পাঁকে বাধা’ ছবির জন্য ১৯৬৩ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালের দেবদাস ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেন, যা ছিল তার প্রথম হিন্দি ছবি।

উল্লেখ যোগ্য চলচ্চিত্র
সুচিত্রা সেনের অভিনীত চলচ্চিত্র ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩), ‘ওরা থাকে ওধারে’ (১৯৫৪), ‘অগ্নিপরীক্ষা’ (১৯৫৪), ‘শাপমোচন’ (১৯৫৫), ‘সবার ওপরে’ (১৯৫৫), ‘সাগরিকা’ (১৯৫৬), ‘পথে হলো দেরী’ (১৯৫৭), ‘হারানো সুর’ (১৯৫৭), ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’ (১৯৫৯), ‘শপ্তপদী’ (১৯৬১), ‘বিপাশা’ (১৯৬২), ‘চাওয়া পাওয়া’ ‘সাত পাঁকে বাধা’ (১৯৬৩), ‘হাসপাতাল’, ‘শিল্পী’ (১৯৬৫), ‘ঈন্দ্রণী’ (১৯৫৮), ‘রাজলèী ও শ্রীকান্ত’ (১৯৬৩), ‘সূর্যতোরণ’ (১৯৫৮), ‘উত্তর ফাল্গুনি’ (১৯৬৩) [উত্তর ফাল্গুনি চলচ্চিত্রটি পরবর্তীকালে হিন্দিতে ‘মমতা’ (১৯৬৬) নামে পুন:চিত্রায়ণ করা হয়।] ‘গৃহদাহ’ (১৯৬৭), ‘ফরিয়াদ’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ (১৯৭৪), ‘দত্তা’ (১৯৭৬), ‘প্রনয়পাশা’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘আলো আমার আলো’, হিন্দি ছায়াছবি ‘দেবদাস’ (১৯৫৫), ‘মুসাফির’ (১৯৫৭), ‘চম্পাকলি’ (১৯৫৭), ‘বোম্বেকা বাবু’ (১৯৬০)সহ আর অনেক। প্রতিটি চলচ্চিত্র অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জণ করে। বিশেষভাবে উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনীত ‘সপ্তপদী’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘হারানো সুর’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘বিপাশা’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘সাগরিকা’, ‘শিল্পী’র জনপ্রিয়তা আজও কোন বাংলা চলচ্চিত্র অতিক্রম করতে পারেনি।

ব্যক্তি জীবনে রোমাঞ্চ

১৯৪৭ সালে দিবানাথ সেনের সঙ্গে সাতপাঁকে বাধা পড়েন সুচিত্রা। কথিত আসে উত্তম-সুচিত্রা এত বেশি একসাথে অভিনয় করেছিলেন তারা একসময় দুজনের প্রতি দুজনে দুর্বল হয়ে পড়েন। তবে সেটা পরিণয় এর দিকে পা বাড়ায়নি। উত্তম যখন মারা যান তখন উত্তম এর স্ত্রী নাকি সুচিত্রা সেনকে বলেছিলেন, “ সারা জীবন তো তুমি উত্তম এর গলায় মালা পড়ালে, আজ সৎকার এর পূর্বে তুমিই প্রথম ওর গলায় মালা পরাও”। সুচিত্রার মোট ৬৩ টি ছবির মধ্যে ৩২ টির নায়ক ছিল উত্তম কুমার।তার একমাত্র কন্যা মুনমুন সেনও পরবর্তীতে অভিনয়ে সুখ্যাতি পান। মুনমুন সেনের দুই কন্যা রিয়া এবং রাইমা সেন।

স্বীকৃতি ও পুরস্কার
সুচিত্রা অভিনীত ছবিগুলো আজও জনপ্রিয়তার শীর্ষ ধারার বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রদর্শিত হয় এবং মানুষকে টিভির সামনে পিনপতন নীরবতার মধ্যে মোহাবিষ্ট করে রাখে।অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত এই মহারাণী ২০০৫ সালে অস্কার পুরস্কার মর্যদায় লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। কিন্তু অন্তরাল থেকে বের হয়ে মানুষের সামনে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সরাসরি পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে পুরস্কার থেকে তার নাম প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু সুচিত্রা সেনকে সম্মানিত করার জন্য ভারতবাসীর ইচ্ছাটি উড়ে যায়নি। ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রনালয় ফালকে পুরস্কার প্রদানের আটত্রিশ বছরের নিয়ম বদলানোর চিন্তা-ভাবনা ছিল। তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করেছিলেন। নিয়ম বদলানো সম্ভব হলেও বাঙালির ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকা মহা নায়িকা সুচিত্রা সেন শেষ পর্যন্ত নিয়ম ভেঙে পুরস্কার গ্রহণে সম্মত হননি।

কেন আড়ালে চলে গেলেন?
১৯৭৮ সালে সুদীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসরগ্রহণ করেন। এর পর তিনি লোকচক্ষু থেকে আত্মগোপন করেন এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় ব্রতী হন।এবং আজ পর্যন্ত তাঁকে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক, মেয়ে মুনমুন, মেয়ে জামাই,আর দুই নাতনি রাইমা, ও রিয়া সাড়া কেউ তাঁকে আর দেখেনি। কিন্তু কেন? কেন এই অন্তরালে একাকী নিভৃতে বসবাস? ভারতীয় একটি চ্যানেলে মীরাক্কেল আক্কেল চ্যালেঞ্জার ফাইভ দেখার সুবাদে গেস্ট বিচারক হিসেবে উপস্থিত হওয়া রাইমা, রিয়া এবং মুনমুন সেন সযত্নে মীরের প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলেন। এটি অবশ্য নতুন কিছু নয়। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে সুচিত্রা সেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে। দীর্ঘ ৩২ বছর রাইমা, রিয়া, মুনমুন সেন আর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছাড়া আর কেউ তাকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন এমন কথা কেউ বলতে পারবেন না। তার স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার কী কারণ? কী রহস্য?- একেক জন এক-এক ভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ তার এই নির্বাসন গ্রেটা গার্বোর নির্বাসনের সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু সত্যিকার কারণ আজও অজানা। এখানেই হয়তো সুচিত্র সেন- দর্শকের ভালোবাসায় চির-অম্লান।

শেষের দিকের বার্থতা
গুলজার পরিচালিত ‘আন্ধি’ (১৯৭৪) ছবিতে তিনি রাজনৈতিক নেত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন। ইন্দিরা গান্ধির রাজনৈতিক দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে এই চরিত্রে অভিনয় করলেও ইন্দিরা গান্ধির প্রধান মন্ত্রিত্ব কালীন জরুরি অবস্থার কারণে ছবিটি পর্দায় নিষিদ্ধ করা হয়। ষাট ও সত্তর দশক পর্যন্ত তার অভিনীত প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্র জনপ্রিয়তার শীর্ষ ধারা অব্যাহত রাখে। কিন্তু একটা সময় ৭৬ এর শুরু ৭৭ এর শেষ দিকে তিনি কিছুটা জনপ্রিয়তা হারান। এবং সেখান থেকে তিনি আস্তে আস্তে করে বিদায় নেন। যদিও ব্যর্থতার গ্লানি খুব বেশি তাঁকে স্পর্শ করেনি। কিন্তু তিনি হয়তো এটাই ভেবেছিলেন, দর্শক এর মনের মাঝে হৃদয় রানী থাকা অবস্থায়ই তিনি বিদায় নিবেন।

শেষ করতে চাই যে কথাটি বলে
তার মায়াবি লক্ষী টেরা চোখ, মায়া ভরা মুখ, লজ্জাবতী হাসি, সময় এর আবর্তে আজ হয়তো হারিয়ে গেসে। বয়স হয়েছে অনেক। কিন্তু দর্শক তাঁকে যেই ভাবে চিনতো ঠিক সেই ভাবেই মনের মনি কোঠায় লালন করুক এই চিন্তা থেকে তিনি বোধ হয় কারো সামনে আর আসেন না। কারন কারো সামনে আসলে তাঁকে হয়তো দেখতে হবে নানি কিংবা দাদি হিসাবে, এটা কি সম্ভব? এটা মহারানী কি করে মানবেন? রমা দাসগুপ্ত নামটির সঙ্গে মনে পড়ে ‘পথে হলো দেরী’ চলচ্চিত্রের কথা। উত্তম কুমার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে বারবার রমা রমা নাম উচ্চারণ করছিলেন। যার সঙ্গে জুটি বেধে সুচিত্রা সেন বাঙালির ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন, আরাধ্য হয়েছেন অথচ তার সত্যিকার নামটি উচ্চারণের ডাবিংয়ে উত্তম কুমার কণ্ঠ দিতে পারেননি। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না, রমা রমা ডাকটি উত্তম কুমারের নিজের কণ্ঠের নয়। এই ডাকে কণ্ঠ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বাংলা গানের আর এক কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। যে নামের সঙ্গে আমরা পরিচিত নই, সেই রমা দাসগুপ্তই পরবর্তী সময়ে সুচিত্রা সেন হয়ে বাঙালীর হৃদপিণ্ডের লাব-ডাব শব্দটিকে অসম্ভব বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।তিনি আজ ও স্বপ্নের রানী।

একজন শিল্পীর কোন দেশ, জাতী, ধর্ম, কিছুই নেই। একজন শিল্পী গোটা পৃথিবীর সম্পদ। তাই তো আমরা মেহেদি হাসান এর গান সুনি, তালাত, সতিনাথ, মান্নার গান সুনি। নাদিম সবনম এর মুভি দেখি, রবিন ঘোষ এর গান সুনি। সোয়ার্জনিগার বা মাইকেল জ্যাকসন সবাইকে ভালবাসি। এরা দেশের গণ্ডী পেরিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের মনে ঠাই করে নিয়েছে।

তেমনি সুচিত্রা সেন ও আমাদের! যদি এখানে কেউ বলতে চান,না সুচিত্রা সেন ভারতের সম্পদ।তাদের কে বলতে চাই, যদি সে ভারতের সম্পদ হয়ে থাকে কোন ক্ষতি নেই।তার জন্ম কোথায়? আমাদের এই বাংলাদেশে। এই বাংলার ধুলি কণায় তার বিচরন ছিল প্রায় ১৬ টি বছর। যত দূর জানি পাবনায় যেই বাড়িতে রমা নামের মেয়েটি জন্ম নিয়ে ছিলেন সেই বাড়িটি আজ ও আসে। কালের বিবর্তনে হয়তো জরাজীর্ণ হয়ে গেসে। বাংলাদেশ সরকার এর প্রতি আনুরোধ, আমরা যেন এই মহারানীর সৃতি বিজড়িত বাড়িটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম দেখতে পারি এই ব্যবস্থা করুন প্লিজ। স্বপ্নের সুচিত্রা সেন যেন বেঁচে থাকে আমাদের স্বপ্নের মাঝে।

আমরা যেন সেই হারান দিনের গানের মত বলতে পারি “তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার”

***
(পরবর্তী লেখাটি আসবে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু জর্জ হ্যারিসনকে নিয়ে ……………পড়ার আমন্ত্রন রইল।)
( লেখাটি লিখতে আমি কোলকাতার বিশষ্ট সাংবাদিক ” অরপনা সেন” এর প্রতি ক্রিতজ্ঞতা প্রকাশ করসি”