ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

সময়টা ১৯৭১। পাক বাহিনী শুরু করে দিল ইতিহাসের সব চাইতে নিষ্ঠুর গন হত্যা। নির্মম নির্দয় পৈশাচিক সেই হত্যা।নারকীয় সেই হত্যাকাণ্ড সেই সময় যারা দেখেছে শুধু তারা ই কেবল বর্ণনা করতে পারবে। আমরা যারা নুতন প্রজন্ম বা জন্ম যাদের ৭১ এর পর, আমরা কেবল ভিডিও ফুটেজ আর মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রচিত বই পড়ে জানতে পারি সেই সব দিন গুলির কথা। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে বিশ্ব বিবেক কেঁপে ওঠে। অনেকে কেঁদেসে আমাদের সেই জঘন্যতম হত্যা যজ্ঞ দেখে। তেমনি একজন ভারতের বিখ্যাত “পণ্ডিত রবি শঙ্কর”। পণ্ডিত রবিশংকর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বজনমত গড়ে তোলা এবং শরণার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য তাঁর শিষ্য-বন্ধু বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড বিটলেসর “শিল্পী জর্জ হ্যারিসনকে” নিয়ে এক অবিস্মরণীয় কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন।যার নাম “দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ”। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই অবিস্মরণীয় কনসার্ট টি, যা আমদের মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাসে কালের সাক্ষী হয়ে আসে। মূলত এই কারনে দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই পণ্ডিত রবি শংকর ও জর্জ হ্যারিসনের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা তৈরি হয় আমাদের মধ্যে।জাতী হিসাবে দায়বদ্ধতা ও রয়েছে তাদের উপর।

‘১৯৬৫ সালে এক রাতে রবিশংকরের সঙ্গে পরিচয় হয় জর্জ হ্যারিসনের। জর্জ বছর তিনেক সেতার নিয়ে অনুশীলন করেছিল রবিশংকরের কাছে। রবি সংকরের মাধ্যমেই বাংলাদেশের সঙ্গে জর্জের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে রবির যন্ত্রণার সঙ্গী হয়ে কনসার্টের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল জর্জ।জর্জ ও রবি বলেছিলেন বাংলাদেশের জন্য তাদের আরও কিছু করার ছিল।কনসার্টটির কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটা গভীর আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল জর্জ হ্যারিসনের। বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আর গণহত্যা তাঁর অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে হ্যারিসনের স্ত্রী অলিভিয়া বলেছিলেন, ‘জর্জের কাছে শুনেছি, একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যা, ধ্বংস আর হানাহানি বিপর্যস্ত করে তুলেছিল রবি শংকরকে। এ নিয়ে মনঃকষ্টে ছিল সে। অন্যদিকে নিজের রেকর্ডিং নিয়ে ব্যস্ত ছিল জর্জ। সত্তরে বিটল্স ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে ক্যারিয়ার গড়তে সে মনোযোগী হয়ে ওঠে। এ সময় রবিশংকর জানায়, বাংলাদেশের জন্য তহবিল সংগ্রহে একটি কনসার্ট করতে চায়। এ উদ্যোগে সে জর্জকে পাশে পেতে চায়। জর্জেরও মনে হলো, এ কাজে তার নিযুক্ত হওয়া উচিত। তার ডাকে অনেকে সাড়া দেবে, একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোর মাঝামাঝি সময়ে ওই কনসার্ট আয়োজন সময়োপযোগী ছিল। জর্জ তখন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রেস্টন, রিঙ্গো স্টার, লিওন রাসেল, ওস্তাদ আলী আকবর, ওস্তাদ আল্লা রাখা ও রবি শংকরকে নিয়ে কনসার্ট আয়োজন করে। ওই কনসার্ট দিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে জর্জের বন্ধন শুরু।’
অলিভিয়া হ্যারিসন ‘জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফ’-এর প্রতিষ্ঠাতা। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে তিন দিনের জন্য ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠানের কাজ দেখতেই এসেছিলেন ঢাকায়। তিনি ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দরিদ্র শিশু ও কিশোরদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কাজ দেখেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে শিশুদের জন্য কিছু কর্মসূচি চলে জর্জ হ্যারিসন ফান্ডের সহায়তায়। ভবিষ্যতে হাওর ও পার্বত্য চট্টগ্রামে শিশু-কিশোরদের নৌকা স্কুল কর্মসূচির জন্য সহায়তা নিয়ে অলিভিয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে ইউনিসেফের। এটাই ছিল তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর। বছরের পর বছর ধরে তিনি তাঁর প্রয়াত স্বামীর শুরু করা মানবিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন, যে কাজের সুফল পাবে বাংলাদেশের শিশুরা।

জর্জ হ্যারিসন যখন দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তখন বিটলেসর সহশিল্পীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্বস্তিকর ছিল না। তা সত্ত্বেও তিনি আত্মাভিমান ত্যাগ করে সহশিল্পী ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কনসার্টে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানান। বিটলেসর ড্রামার রিঙ্গো স্টার রাজি হয়েছিলেন এক কথায়। বিল প্রেস্টন, লিওন রাসেলও প্রথমবারেই রাজি হলেন। বব ডিলান ও এরিক ক্ল্যাপটনও প্রস্তাবটি বিবেচনার আশ্বাস দিলেন। কিছুটা অনিশ্চয়তার পর দুজনই অংশ নিয়েছিলেন।

জর্জ হ্যারিসন অনুষ্ঠানে হাজার হাজার শ্রোতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে শুরুতেই বলেন, ‘ভারতীয় সংগীত আমাদের চেয়ে অনেক গভীর।’ তারপর পণ্ডিত রবিশংকর ও ওস্তাদ আলী আকবর খান এবং সহশিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দেন। কনসার্টটির শুরুতেই পণ্ডিত রবিশংকর এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘প্রথম ভাগে ভারতীয় সংগীত থাকবে। এর জন্য কিছু মনোনিবেশ দরকার। পরে আপনারা প্রিয় শিল্পীদের গান শুনবেন। আমাদের বাদন শুধুই সুর নয়, এতে বাণী আছে। আমরা শিল্পী, রাজনীতিক নই। বাংলাদেশে অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশের পল্লিগীতির সুরের ভিত্তিতে আমরা বাজাব “বাংলা ধুন”।’ তিনি ‘বাংলা ধুন’ নামের একটি নতুন সুর সৃষ্টি করেছিলেন। সেটি দিয়েই আলী আকবরের সঙ্গে যুগলবন্দীতে কনসার্ট শুরু হয়েছিল। তবলায় ছিলেন ওস্তাদ আল্লা রাখা এবং তানপুরায় ছিলেন কমলা চক্রবর্তী।

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর বড় আকর্ষণ ছিলেন বব ডিলান ও জর্জ হ্যারিসন। অসাধারণ গিটার বাজিয়েছিলেন এরিক ক্ল্যাপটন। জর্জ হ্যারিসন আটটি গান গেয়েছিলেন। এর একটি ছিল বব ডিলানের সঙ্গে। বব ডিলান গেয়েছিলেন পাঁচটি গান (প্রথম লং প্লেতে পাঁচটি গান আছে, তবে ২০০৫ সালের ডিভিডিতে আছে চারটি গান)। রিঙ্গো স্টার ও বিলি প্রেস্টন একটি করে গান করেছিলেন। লিওন রাসেল একটি একক এবং ডন প্রেস্টনের সঙ্গে একটি গান করেছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষ পরিবেশনা ছিল জর্জ হ্যারিসনের সেই অবিস্মরণীয় গান ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল, একটি কনসার্ট হবে। কিন্তু সেদিন এত বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল কনসার্টটি যে পরে অনুষ্ঠানসূচি ঠিক রেখে, একই দিনে আরও একটি অনুষ্ঠান করতে হয়েছিল দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর।

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর পর দেশে দেশে মানবতার কল্যাণে কত বড় বড় কনসার্ট হলো দুনিয়া ভর। কিন্তু সেসবেরই পথিকৃৎ হয়ে আছে ৪০ বছর আগের দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। ২০০৫ সালে নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ অ্যালবামের ডিভিডি। দুটি ডিভিডির একটি সুদৃশ্য সেট এখনো পাওয়া যায়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অলিভার হ্যারিসন। একটি সিডিতে রয়েছে পুরো গানের অনুষ্ঠান। আরেকটি সিডিতে রয়েছে শিল্পী-কলাকুশলীদের সাক্ষাৎকার, যাতে কনসার্টটি আয়োজনের নেপথ্য কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। আরও আছে মহড়ার কিছু চিত্র ও গান। এর সঙ্গে আছে একটি সচিত্র পুস্তিকা। এই নতুন ডিভিডির ভূমিকায় পণ্ডিত রবিশংকর বলেছেন, ৭৫ বছরের সংগীতজীবনে যত কনসার্ট করেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ওই কনসার্টটিই। নতুন ডিভিডিতে সাক্ষাৎকারে এরিক ক্ল্যাপটন বলেছেন, এ অনুষ্ঠান সারা জীবনের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সংগীতশিল্পী হওয়াটা যে গর্বের একটা বিষয়, তা সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম। রিঙ্গো স্টার বলেন, অনুষ্ঠানটি যেন অনন্য সাজে সেজেছিল। দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতি ছিল বিশাল।

২০০৫ সালে পুনঃপ্রচারিত দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ ডিভিডি উপলক্ষে সঙ্গে প্রকাশিত পুস্তিকায় ইউএসএ ফান্ড ফর ইউনিসেফের সভাপতি চার্লস জে. লিওনসের লেখা থেকে জানা যায়, কনসার্টের টিকিট বিক্রি থেকে সংগ্রহ হয়েছিল প্রায় আড়াই লাখ ডলার। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত তিনটি রেকর্ডসহ অ্যালবাম এবং ১৯৭২ সালের মার্চের কনসার্ট নিয়ে তৈরি ফিল্ম থেকে আয় নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। পরবর্তী দশকগুলোতে এসব অর্থ দান করা হয় ইউনিসেফ পরিচালিত শিশুদের কল্যাণমূলক তহবিলে।

এসব কারণেই রবিশংকর, জর্জ হ্যারিসন এবং ওই কনসার্টের শিল্পীদের প্রতি আমাদের আগ্রহ ও আকর্ষণ ম্লান হয় না কিছুতেই, কোনো সময়েই নয়। বরং তা প্রেরণার অফুরান উৎস হয়ে ওঠে। যতবার দেখি, প্রথম দেখার মতো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি বারবার।

এসব মহৎ ও বিশ্বসেরা শিল্পীকে যদি বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো যেত, ঢাকায় যদি তাঁদের নিয়ে স্টেডিয়ামে একটি অনুষ্ঠান করা যেত! সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের সামনে যদি তাঁদের সংবর্ধনা দেওয়া যেত! এ রকম একটি দৃশ্যের কথা ভেবেছি বহুদিন—যে দেশটির জন্য, যেসব মানুষের জন্য একদিন তাঁরা সোচ্চার হয়েছিলেন সেই দেশে, এক বিশাল মঞ্চে তাঁরা আসীন। আর লাখ লাখ বাঙালি তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কৃতজ্ঞচিত্তে। পণ্ডিত রবিশংকর, ওস্তাদ আলী আকবর খান, বব ডিলান, জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টারসহ অনেকে (তাঁদের অনেকেই চলে গেছেন চিরতরে) কথা আর সুরের ঐশ্বর্যমণ্ডিত ভুবন রচনা করে চলেছেন। স্বপ্নের মতো এই দৃশ্যের কল্পনা করে এখনো আমরা আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়ি। তাঁদের প্রতি আমাদের যে ঋণ, তা তো শোধ হওয়ার নয়। সব ঋণ শোধ হয়ও না। সেসব স্মরণ রাখতে হয়, জানাতে হয় কৃতজ্ঞতা। সেই কৃতজ্ঞতা নিয়ে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের সম্মান জানানোর এই স্বপ্নও আমাদেরকে উজ্জীবিত করে রাখে আজও।।

কনসার্টে অংশগ্রহণকারীরাঃ
The Artists• Eric Clapton — guitars • Bob Dylan — vocals, guitar, harmonica • George Harrison — vocals, guitars • Billy Preston — vocals, keyboards • Leon Russell — bass, keyboards, vocals • Ringo Starr — drums, vocals, Tambourine • Ravi Shankar — sitar • Ustad Ali Akbar Khan — sarod • Ustad Alla Rakha — tabla • Kamala Chakravarty — tamboura The Band• Jesse Ed Davis — rhythm guitar • Tom Evans — acoustic guitar • Pete Ham — acoustic guitar • Mike Gibbins — percussion • Jim Keltner — drums • Joey Molland — acoustic guitar • Don Preston — guitars, backing vocals • Carl Radle — bass guitar • Klaus Voormann — bass guitar The Hollywood Horn • Jim Horn, Allan Beutler, Chuck Findley, Jackie Kelso, Lou McCreary, Ollie Mitchell The Backing vocals • Don Nix, Jo Green, Jeanie Greene, Marlin Greene, Dolores Hall, Claudia .

***
(ফিচার টি লিখতে আমি সাহায্য নিয়েছি ২০০৫ সালে নুতন ভাবে ডি ভি ডি ফরমেটে আসা”কনসার্ট ফর বাংলাদেশ” এর সিডিতে থাকা পুস্তিকা, দৈনিক প্রথম আলো, সম্পাদক মতিউর রহমান এর)

***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট