ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 


মাননীয় বিরোধী দলিও নেত্রী,জানিনা এই লেখাটি আপনার চোখে পড়বে কিনা। তবুও বিবেকের তাড়নায় লিখতে হচ্ছে আমাকে। যদিও আমি রাজনীতির মত অতীব জটিল মারপ্যাঁচ বুঝিনা, বুঝতে চাই ও না। আর এই দেশের বর্তমান কোন রাজনীতিবিদদের প্রতি নূন্যতম শ্রদ্ধা বোধ ও আমার মাঝে নেই। (হাতে গোনা কয়েক জন ব্যতিত)। তাই অনেক তথা কথিত নেতাদের উপর শ্রদ্ধা দেখাতে পারলাম না বলে আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। ইতিহাস থেকে আমরা চরম কিছু শিক্ষা নিয়েছি।সব কথা বলতে গেলে অনেক সময় চলে যাবে।সংক্ষেপে যদি বলি তবে সুনীলের সেই কবিতার সুরে বলতে হয় “ কেউ কথা রাখেনি”। যাই হোক আজ “শুভ হরতাল”!

মাননীয় নেত্রী, আজ সন্ধ্যায় আপনাদের দলিও অফিসে একটি প্রেস ব্রিফিং হবে। তাতে মুখপাত্র হিসাবে ভুমিকা পালন করবেন মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর। এবং তিনি কিছু চির চেনা, অতি পরিচিত খুব পরিচিত কিছু কথা বলবেন। যা জাতি প্রায় ২০ বছর ধরে শুনে আসছে। তিনি অগনিত টিভি চ্যানেল, অগনিত মিডিয়ায় সামনে ব্রিফিং এ বলবেন, “ এই সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জাতি আজ সোচ্চার, তারা আজ সর্বাত্মক হরতাল পালন করেছে, আজকের হরতাল পুরোপুরি সফল হয়েছে।সেই সাথে বলবেন আমরা শান্তি পূর্ণ ভাবে মিছিল করছিলাম, পুলিশ বিনা উস্কানিতে আমাদের উপর হামলা চালিয়েছে” এই কথা শুনতে শুনতে জাতি আজ অভ্যস্ত, ক্লান্ত, বড়ই বিরক্ত। তার পর হামলার প্রতিবাদে ১০ দিনের কর্মসূচি। বিক্ষোভ আর কত কি কর্মসূচি আসবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো আগেই হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, হরতাল এর নামে অশুভ, বা জনমনে ভিতি বা অপ্রীতিকর কোন ঘটনা বরদাশত করা হবেনা। তার মানে হরতাল শুভ, প্রীতিকর হোক!

মাননীয় নেত্রী, আপনি হরতাল সফল হবার জন্য জাতিকে ধন্যবাদ জানাবেন। শুভেচ্ছা জানাবেন। আপনার শুভেচ্ছা গ্রহন করলাম অগ্রিম। কিন্ত প্রান প্রিয় নেত্রী, আজ আপনি যেই হরতাল দিলেন এটি কার স্বার্থে? কিংবা হরতাল কী কারনে? “নানান মানুষ, নানান পথ। দেশ বাচাতে ঐক্য মত, কিংবা দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও”এই সব স্লোগান আপনাদের। অর্থাৎ বি এন পির। নেত্রী, দেশ আজ বাঁচতে চায়, মানুষ আজ বাঁচতে চায়। আমাদের বাঁচান দোহাই “মা”, আপনারা দুই নেত্রী আমাদের “জননী” আমরা বাঁচতে চাই। যাই হোক বলছিলাম হরতাল কী কারনে?

মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী, দেশ আজ খুব একটা ভাল নেই আমরা জানি।আপনার বিএনপি সরকারের অপশাসনে কতখানি বিরূপ হয়ে জনগণ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করাতে গিয়ে একেবারে গোল্ডেন জিপিএ-ফাইভ দিয়েছে।কিন্তু সেই জি পি এ ফাইভ এখন জি পি এ ২.৫ কোঠায় নেমে এসেছে!

তবে আপনাদের রাজনীতিবিদদের মত এক কথায় বলবো না,” সরকার আজ সব ক্ষেত্রে বার্থ”। যেই আশা নিয়ে,যেই বিশ্বাস নিয়ে দেশের মানুষ বর্তমান ক্ষমতাসীন মহা জোটকে ভোট দিয়েছিল,অন্তত আপনাদের ক্ষমতা থাকাকালীন সময় এর জুলুম এর হাত দিয়ে বাঁচাতে মহাজোট যেই ওয়াদা করেছিল, নির্বাচনী সেই সব এজেন্ডা আজও বাস্তবায়িত হয়নি বহুলাংশে। ঘরে ঘরে চাকরি।চাকরি নামের সোনার হরিণ বাড়ির আশেপাশে দিয়ে ঘুরে বেড়ালেও ঘরে আর ঢোকে না ।দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, টেন্ডারবাজি, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, সম্প্রতি RAB এর কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকার বেশ বিব্রত।পানি, গ্যাস ,জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, এবং পরিবহন ভাড়া নিয়ে বর্তমান যে বিশৃঙ্খলা, বিরোধী দল হিসাবে আপনারা সরকারকে ঘায়েল করতে পারতেন এইসব বিষয় গুলি নিয়ে।কিন্তু পারেননি।আজকের হরতাল “ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল” কে কেন্দ্র করে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত এখানে আগামী দুটি নির্বাচন এই পদ্ধতিতে হতে পারে বলে মত দিয়েছেন। সংসদীয় কমিটি এই ব্যবস্থাকে বাতিল করেছেন। তবে তারা বলেছেন,”যেহেতু মহামান্য আদালত আগামী দুটি নির্বাচন এই ব্যবস্থায় হতে পারে বলে মত দিয়েছেন, তাই বিরোধী দল যদি আলোচনা করতে চায় তবে সুযোগ আছে” অর্থাৎ আগামী নির্বাচন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবেই না এমন কোন কথা কিন্তু সংসদীয় কমিটি বলেননি। কিন্তু আপনারা আলোচনায় গেলেন না। কী করলেন? রাতে স্থায়ি কমিটির বৈঠক ডাকলেন। আর জাতির জন্য জরুরি ফরমান জারি করলেন” আগামী ৫ই জুন সকাল সন্ধ্যা হরতাল” সাবাস!সেলুকাস! আর সেই জলন্ত আগুনে আবার ঘি ঢাললো জামাত। হরতাল সফল হোক, কেননা বি এন পির সকল কর্মকাণ্ড তো সবই দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য! তাই তারা বলে,” দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও” হরতাল হলে তাই আমরা ও বাঁচি! দূর পথের যাত্রীবাহী বাস আজ চলবে না, দোকান গুলি খুলবে না। হরতাল এর দোহাই দিয়ে জিনিস পত্রের দাম হুম করে বাড়বে একদিনে।শত কটি টাকার গাড়ী পুড়বে, দিন মজুর গুলি কাজ পাবে না, স্কুল কলেজ এর পরীক্ষা গুলী বন্ধ থাকবে, রাস্তায় বেরুলে জীবন টা হাতে নিয়ে বের হতে হবে যদি ইট পাটকেল মাথায় লাগে, কিংবা বোমা! সবই আমাদের কল্যাণের জন্নে। সাবাস হরতাল তুমি দীর্ঘ জীবী হও!

মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী, ৯৬ এর ১৫ই ফেব্রুয়ারির কথা কি মনে পড়ে? প্রহসনের সেই নির্বাচন এ আপনারা সরকার গঠন করেছিলেন। যার মেয়াদ ছিল মাত্র ১৫ দিন! কারন আপনারা রাজনীতিবিদেরা কতটা ক্ষমতা লোভী, সেইটা জাতি হিসাবে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই ঐ ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।আমাদের চরিত্র, পারস্পারিক বিশ্বাস, সততা, এখনও এমন একটা স্তরে পৌঁছায়নি যে, আমরা একটা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সেইটা মেনে নেব। আর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সেইটা ফ্রি, ফেয়ার নির্বাচন হবে সেই মন মানসিকতা, কিংবা সেই মহামানবটি যার অধীনে হবে নির্বাচন,সেই মহা মানব দলীয় সরকার আমদের দেশে এখনও আজ পর্যন্ত জন্ম গ্রহন করেছে বলে আমি জানিনি। কাজেই এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বাতিলের বিপক্ষে আমার অবস্থান। তাই বি এন পির সাথে এখানে আমি একমত পোষণ করছি। কিন্তু হরতাল কেন? তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো আগামী দুটি নির্বাচন করবেন। শেষ পর্যন্ত এটা হবেই। কেননা কেয়ার টেকার সরকার এর অধীনে যদি নির্বাচন না হয়, তবে আপনারা অর্থাৎ বি এন পি নির্বাচনে যাবেন না। আর আপনাদের পরম পিয়ারি জামাত তো আছেই। আর বি এন পি যদি নির্বাচনে না যায় তবে সেই নির্বাচন গ্রহন যোগ্য হবেনা। কাজেই আপনাদের কথিত ডিজিটাল কারচুপি করে যদি হাসিনা সরকার আবার ও ক্ষমতায় আসতে চায়, আর যদিও বা আসে তবে তার মেয়াদ হবে ১৫ দিন! যেমনটি হয়েছিল ৯৬ এর ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। মাত্র ১৫ দিনের মাথায় আপনারা লেজ গুটিয়ে পালালেন। প্রধান বিরোধী দল সাড়া নির্বাচন এ গেলে কি পরিণাম হয় সেইটা আপনার থেকে কে আর ভাল জানে নেত্রী? তাই হাসিনা ও জানেন বি এন পি ছাড়া নির্বাচন করে লাভ হবেনা। কাজেই আগামী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর অধীনে যে হবে তাতে কোন সন্দেহ আছে কি?

আপনারা জাতিকে আজ হরতাল উপহার দিলেন। জাতিকে হরতাল কি দেবে?হরতাল আজ যে কেউ চায়না, এটা সত্য, নির্মম সত্য , চরম সত্য। আজ আপনারা দুই নেত্রী এক সাথে যদি পল্টনে জাতির উদ্দেশে হাউ মাউ করে কেদে ও বলেন “ আগামী কাল হরতাল, আপনারা পালন করুন। তবে এই মর্মে আপনাদের নিশ্চয়তা প্রদান করছি যে,কেউ যদি দোকান, অফিস খোলা রাখেন, ভাংচুর করা হবেনা, পিকেটিং করা হবেনা”তবে আল্লার ওয়াস্তে বলছি একটি মানুষ ও আপনাদের দুই নেত্রীর প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করবে না,অর্থাৎ হরতাল পালন করবে না।অন্তত বর্তমান মুহূর্তে। আজ হরতালে দোকান বন্ধ হয়, হরতাল পালনের উদ্দেশে নয়। তার একমাত্র রুটি রুজির অবলম্বন দোকানটি যদি ভেঙ্গে দেয় পিকেটাররা, এই ভয়ে দোকানি দোকান বন্ধ রাখে। গাড়ি চলে না। কোটি টাকার গাড়ী টি যদি আগুন ধরিয়ে দেয়,সাধারন মানুষ ভয়ে রাস্তায় বের হয়না, যদি শরীরের উপর আঘাত আসে? তার মানে কি এই এরা হরতাল পালন করসে? রাজনীতিবিদেরা কেমন করে তাহলে নির্লজ্জের মত বলে হরতাল সফল হয়েছে?

দেশের চলমান যেই অবস্থা তাতে সরকারের অনেক জন গুরুত্ব পূর্ণ ক্ষেত্রে চরম ব্যার্থতার পরিচয় বহন করসে। সেই সব দিক গুলী নিয়ে সংসদে আলোচনা করুন। প্রতিবাদের ভাষা হরতাল নয়। সভ্য জাতির কোন দেশে হরতাল নামের আত্মঘাতী, মরণঘাতী এই মহা ব্যাধিটি নেই। আমরা হরতাল নামের এই শব্দটি থেকে চিরতরে মুক্তি চাই। যদিও আপনাদের দুই নেত্রীর কেউই হরতাল না দিয়ে থাকেননি। আশা করি আগামীতে ও হরতাল থাকবে। আমরা ও দেখবো তাকিয়ে তাকিয়ে। কারন প্রয়াত মান্নান ভুঁইয়া সাহেব একবার বলেছিলেন “ হরতাল একটি গণতান্ত্রিক অধিকার”।হাঁ তবে সেইটা বিশেষ ক্ষেত্রে। এরশাদের ক্ষমতা ছাড়তে হরতাল দরকার ছিল। শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আহসান উল্লাহ মাষ্টারকে যখন আপনার বাহিনী নির্দয় ভাবে হত্যা করেন তখন প্রতিবাদের জন্য হরতাল মেনে নেওয়া যায়। জীবন কৃষ্ণ মুহরির মত একটি নিরীহ মানুষের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে যখন গুলী করে মগজ বের করে দেওয়া হয়…। থমকে যায় মানবতা! ছবি রানী কে ধর্ষণ করে তার যৌন অঙ্গে বালি,কাচ আর মরিচের গুড়া যখন মিশিয়ে দেওয়া হয়……।বিবেক কেঁপে ওঠে! বাগেরহাটে আপনারই ক্ষমতা থাকাকালীন সময় এক মায়ের সেই আর্তনাদ: ‘বাবারা! আমার মেয়ে ছোট, তোমরা একজন-একজন করে আইসো।’ তখন বিপন্ন হয় গণতন্ত্র, লাঞ্ছিত হয় মানবতা। হরতাল তখন মেনে নেওয়া যায়। পল্টনে যখন গর্জন দিয়ে বলেন, নেতা কর্মীরা তৈরি হও, তাদের(আপনার বি এন পি) নেতা কর্মীদের মন বল চাঙ্গা করতে, মাঠ গরম করতে, যখন অপ্রত্যাশিত একটি হরতাল জাতিকে উপহার দিয়ে বলেন, হরতাল সফল হয়েছে………জাতি হিসাবে খুব লজ্জা লাগে।যখন কেয়ার টেকার সরকার এর জন্য আপনারা হরতাল ডাকেন, খুব হাসি পায়। কারন আপনাদের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলে সরকার নামের যেই “অবৈধ সন্তান”এর জন্ম আপনারা দিয়েছিলেন, সেই অবৈধ সন্তানটিকে এখন গলা টিপে আপনারাই হত্যা করতে চান। বেওয়ারিশ সন্তান জন্ম দেওয়া পাপ,মেরে ফেলা ও মহা পাপ। কারন আপনারাই জানেন, নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ভোট চুরি করা কত সহজ! আপনাদের চাইতে এই অভিজ্ঞতা আর কারো বেশী নেই। আপনাদের এক তরফা নির্বাচন এর জন্য আজকের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর জন্ম। তবে কি জন্মই আজন্ম পাপ হয়ে গেল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর! সরকারের আজ অনেক বার্থতা। আমরা সবাই জানি। সেই গুলী নিয়ে একটু প্রতিবাদ করুন দেখ বেন সাধারন মানুষ আপনাদের কাতারে এসে দাঁড়াবে। তবে আবার ও বলি সেইটা হরতাল দিয়ে নয়। প্রতিবাদের ভাষা কক্ষনো “হরতাল নয়”আমরা হরতাল চাইনা………চাইনা,চাইনা মা জননী! দোহাই মা। আমাদের জাতিকে হরতাল এর মত রাষ্ট্র বিধ্বংসী কর্ম ক্যান্ড থেকে আপনারা দুই নেত্রী রেহাই দিন। আপনারা এক কাতারে দাঁড়ান। কেন এত ইগো? কেন দু’জনার দুটি পথ দুই দিকে বেঁকে যায়? আপনাদের চাওয়া পাওয়ার আর কি বা আছে? সবই পেয়েছেন এই জীবনে। এবার পরকালের কথা ভেবে না হয়…………………? আপনারা কি হতে পারেন না সনিয়া গান্ধী, চন্দ্রিকা কুমারা তুঙ্গা, কিংবা একজন ভিখারির মত বেশে থাকা মমতা! আর কত, কত আর চাই বলতে পারেন? এবার এক হয়ে জাতিকে কিছু দিন না , আমরা যে অভাগা আপনাদের দুই নেত্রীর মুখ পানে চেয়ে আছি।

(শ্রদ্ধেয় ব্লগ সঞ্চালক, আজ হরতাল। জাতী হিসাবে আমরা আর হরতাল নামের দেশ বিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ড মানতে পারছিনা। প্রতিবাদের ভাষা হরতাল নয়। আমি এই বিষয় টি নিয়ে বলতে চেয়েছি। সঙ্গত কারনেই আজ হরতাল নিয়ে লিখতে হচ্ছে আমাকে। তাই আমার বিনীত অনুরোধ, হরতাল নিয়ে এই লেখাটি আজ ব্যানার করা হোক এবং টপ এ রাখা হোক। যদি আপনি মন:পুত মনে করেন)।