ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 


‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
ফকির লালন কয়
জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে’

সাঁইজির এ বারামখানার সন্ধ্যানে মানুষ ছুটে চলেছে সাঁইজির সান্নিধ্য পাবার আশায়।সাইজির ধামে।
কুষ্টিয়া শহরসংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্বে, কুমারখালী উপজেলার পশ্চিম সীমান্তে ছেঁউড়িয়া গ্রামে মরা কালী নদীর তীরে লালন শাহ’র মাজার। কুমারখালী উপজেলার মধ্যে অবস্থিত হলেও মাজারটি কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। এখানকার সুদৃশ্য মান বিশাল প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করে পূর্বদিকে কিছু দূর এগুলেই লালন শাহের সমাধি। বিশাল গম্বুজের মধ্যে লালন ও তার স্ত্রী চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। সমাধি ঘিরে রয়েছে সারি সারি শিষ্যদের কবর। এটাকেই মূল মাজার বলা হয়। লালন ভক্ত-অনুসারীরা পরম শ্রদ্ধায় প্রার্থনা করেন। এই মাজারটিই বাউল ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান। দেশ-বিদেশের লালন ভক্তরা কুষ্টিয়ায় ছুটে আসেন এ মাজারের টানেই।


প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা এলেই আউল-বাউল, সাধু-বৈষ্ণব আর ফকির-দেওয়ানাদের পদনৃত্যে ভারী হয়ে ওঠে সাধুবাজার। গুরু-শিষ্যের মিলনমেলায় মনের মানুষের চোখে চোখ রেখে শুরু হয় ভাবের খেলা। ভাবজগতের মধ্যে বেজে ওঠে তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে। একতারা, দোতরা, ঢোলখোল, হারমোনি, বাঁশি, জোয়ারি, চাকতি, খমক হাতে একযোগে বাউলরা উড়াল তোলে। শোক বিয়োগের দিন হলেও ভক্তভারে ক্রমেই দৃশ্যগুলো তখন পাল্টে যেতে শুরু করে। খ- খ- মজমা থেকে তালের উন্মাদনায় দমকে দমকে ভাসতে থাকে ভাববাদী ঢেউ। স্মরণোৎসব শোকাচ্ছন্ন থাকে না, উল্টো আনন্দময় মচ্ছবে পরিণত হয়। দুটো বড় আয়োজন বাদেও প্রায় প্রতিদিনই সাধু-গুরুদের বাজার বসে আখড়াবাড়িতে। সাধুবাজারেই পাওয়া যায় বাউলিয়ানার সরেজমিন আচারনিষঠা।গুরু-শিষ্যর ভাবের আদান-প্রদান যেমন চলে, তেমনি চলে জীবনের তিরোধান, ভাব সাধন, আর দেহতত্ত্ব নিয়ে অপূর্ব সুর মূচ্র্ছনা। সাধু-ভক্তদের পাশাপাশি বাউল সম্রাটের মাজারটির টানেও আসে ঝাঁক ঝাঁক পর্যটক । আসে দেশি-বিদেশি গবেষকরাও।লালনের খ্যাতি এখন শুধু এই কুষ্টিয়ায় নয়, দেশের গ-ন্ডী পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।লালনের চিন্তা, আদর্শ, জীবনকর্ম এবং সংগীত এখন পৃথিবীজুড়ে গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কোন এক অচিন গাঁয়ের অচেনা মানুষ ফকির লালন এখানে বসেই জীবনভর সন্ধান করেছেন অচিন পাখিকে, সহজ কথায় বেঁধেছেন জীবনের গভীরতমগান। আধ্যাত্মিক দর্শন লাভের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে ভক্ত অনুসারীরা এখন এখানে আরও বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। নিরাপদ আশ্রয়, সংগীত, ভক্তি প্রদানে কোন সমস্যা হয় কিনা দেখভাল করার জন্য লালন একাডেমির সদস্যরা সবসময়ই নিয়োজিত। তাছাড়াও এখানে এখন নেয়া হচ্ছে নানা কর্মসূচি। নবীন শিল্পীদের সংগীত প্রশিক্ষণ, লালন গবেষণা, অডিটরিয়াম ও বিশালাকার ফাঁকা মঞ্চে নানা অনুষ্ঠানের প্রায় সবসময় মুখর থাকে এ তীর্থস্থান। লালন অনুসারী বাউলরা এ মাজারকে তাদের ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবেই মানেন। লালন ভক্তরা এখানে পরম শ্রদ্ধায় প্রার্থনা করেন। এ মাজারে একবার মাথা নোয়াতে পারলেই বাউল ধর্মাবলম্বীরা পুরো জীবনই ধন্য মনে করেন। মানব ধর্মের প্রচারক লালন শাহ’র মাজারকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল অডিটরিয়াম ও একাডেমি কমপ্লেক্স। পাশের কালী নদী ভরাট করে বানানো হয়েছে বিশালাকার খোলার মাঠ। সঙ্গে রয়েছে সুদর্শন মঞ্চ। তবে বড় বড় দালান-কোঠা উঠলেও লালনের মাজারে ভক্তদের প্রার্থনার রেওয়াজ পাল্টায়নি আজও। এখনো ভক্তরা আসন পেতে বসেন। একতারা হাতে গাইতে থাকেন সারাণ। আর সন্ধ্যা গড়ালেই শুরু হয় ভাব সংগীতের মূচ্র্ছনা। যে কোন পর্যটক বা অতিথি আসলেই গান দিয়ে বরণ করে নেন একাডেমির শিল্পীরা। অডিটরিয়ামের ফাঁকা নীচতলায় এজন্য তারা একতারাসহ অন্য যন্ত্রপাতি নিয়ে দল ধরে অপেক্ষায় থাকে। এখানে আসলেই অহিংস লালন ভক্তদের সীমাহীন বিশালতায় ও জাতহীন ভাবগাম্ভীর্যে মন ভরে ওঠে। মাজারে একবার ঢুকলে আর বের হতে মন চায় না।


লালনের জীবদ্দশা থেকে এখানে চলে আসছে চৈত্রের দোল পূর্ণিমা উৎসব।লালনের মৃত্যুবার্ষিকীতে (১৬ অক্টোবর) আরেকটি স্মরণোৎসব বসে। বছরের এ দু’টি উৎসবের দিনগুলোতে প্রতিদিনই লাখো মানুষের ঢল নামে। একতারা, দোতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে লালনভূমি ছেঁউড়িয়া। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বাউলরা দরদভরা কণ্ঠে গেয়ে চলেন লালনের রেখে যাওয়া সব আধ্যাত্মিক গান-
‘অনায়াসেই দেখতে পাবি
কোনখানে সাঁই বারামখানা’

তাদের সঙ্গে সুর মেলাতে ভুল করে না ভক্তরাও। লালনের গানে মানবতা বোধ, অহিসং ভাব ও অসাম্প্রাদায়িক চেতনার কারণে দিন দিন লালনের গানের ভক্ত ও অনুসারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।আমরা লালনকে নিয়ে অনেক মাতামাতি করি ঠিকই কিন্তু তার উপযুক্ত মরজাদা দিতে পারি নাই। আমার দাবি লালনের গান কবিতা আকারে আমাদের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। আগত অতিথি ও সাধু বাউলেদের জন্য লালন মাজারে একটি রেস্ট হাউজ নির্মাণ করাও জরুরি।

এত কিছুর পরও দুঃখের সঙ্গে জানাতে হয়, বাউলদের লালন একাডেমির সঙ্গে দ্বন্দ্বের এখনো কোন সুরাহা হয়নি। দীর্ঘ ১৯ বছরের আইনি লড়াই শেষে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের ৭ বছর পরও আখড়া ফিরে পায়নি বাউলরা। এই হস্তান্তরের ব্যাপারে কোন উদ্যোগও নেয়নি সরকার। দীর্ঘদিন মামলার পর সুপ্রিম কোর্ট ২০০৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি এক রায় ঘোষণা করে। এই রায়ে লালনের আখড়া পরিচালনার দায়িত্ব বাউলদের সংগঠন লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটির কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়।

কিন্তু দীর্ঘদিন পরও বাউলরা ফিরে পায়নি আখড়ার কর্তৃত্ব। লালন একাডেমি এখনো প্রতিবছর দু’টি অনুষ্ঠান করে আসছে। নিজস্ব শিল্পী এবং বাইরে থেকে শিল্পী এনে আখড়ায় দোল উৎসব ও স্মরণ উৎসবে গান করানো হয়। তবে এক সময় যেসব বাউলরা আখড়া পরিচর্যা করছে তাদেরকে ডাকা হয় না। তারা (বাউল) আসতেও চায় না, লালন একাডেমির অনুষ্ঠানে। লালনের ঘরের লোকদের নিয়েই এই বাউলরা সাঁইজির উৎসব করতে আগ্রহী। আর এই ইচ্ছায় বাধ সেধে আছে লালন একাডেমি। তাই ১৯৮৫ সালে আখড়া থেকে বিতাড়িত বাউলরা লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটির সভাপতি ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহ প্রকৃত বাউল আবদুর গণি বাদের শাহ’র বাড়িতে সাঁইজির স্মরণ উৎসব এবং পয়লা কার্তিকের অনুষ্ঠান করে আসছে। এই অনুষ্ঠানে বাউল ও বুদ্ধিজীবীরা যোগ দেন। সাধু সেবা থেকে শুরু করে লালনের ঘরের সব আয়োজনই এখানে সম্পন্ন হয়। ১৯৮৪ সালের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি লালনের আখড়ায় ধর্মসভা আহ্বান করে। বাউলরা এই সভার বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করলে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে আখড়া থেকে বের করে দেয়া হয়। আখড়ায় অধিকার ফিরে পেতে ১৯৮৫ সালের পয়লা জানুয়ারি বাউলরা আইনের আশ্রয় নেন। আইনের দীর্ঘ লড়াই শেষে গুরুবাদী মানব ধর্মের অনুসারী লালনপন্থি বাউল ফকিররাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে। তবে শাসক শ্রেণীর কাছে বারবারই হার মানছে বাউল আচার। পাকিস্তান আমলে লালনের আখড়া নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদ বা মাজার আঙ্গিকে। পরে পুরনো গাছ কাটা থেকে শুরু করে অসংখ্য অপরাধ করা হয়েছে এখানে। সবই নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে আখড়া বাড়ির বাউলরা। এখন শুধু আখড়া ঘরটি ছাড়া আশপাশের সব জায়গাই চলে যাচ্ছে শিল্পকলার মালিকানায়। অথচ ওই সম্পত্তির সবটুকুই ছিল লালনের নিজস্ব মালিকানায়। যা ১৮৯০ সালে লালনের মৃত্যুর পর থেকে বাউলরাই ভূমি কর পরিশোধ করে আসছিল। এখন বাউলদের একটাই দাবি তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক লালন সাঁইজির আখড়া। লালনপন্থি বাউল ফকিররা গুরুবাদী মানব ধর্মের অনুসারী। এই তীর্থস্থান কেন লালন একাডেমির কাছে থাকবে? বাউলদের সম্পদ বাউলরাই দেখাশোনা করবে। এখানে বাউলদের বাইরের লোকজন এসে শৃঙ্খলাই নষ্ট করছে।আমরা তো সেই ছোট বেলা থেকেই শুনে আসছি এবং পড়ে আসছি বাউল সম্রাট একজনই ‘লালন ফকির’। হঠাৎ করে সিলেটের এক সাধককে খুব করে বাউল সম্রাট বলা হচ্ছে। আসলেই কী তিনি বাউল সম্রাট?


বরেণ্য গবেষক ও লেখক অ্যাড. লালিম হক বললেন, বাউলদের জায়গায় অন্য মত ও পথের মানুষের এত মাথাব্যথা কিসের। লালন একাডেমি আখড়া দখলের পর থেকেই বাড়াবাড়ি করে আসছে। যা শুধু আখড়া নয়; পুরো লালনের ঘরের বাউলদের গায়ে লেগেছে। রায় যখন হয়েছে বাউলদের কাছে আখড়া বুঝে দিতে কেন এত গড়িমসি আমরা বুঝতে পারছি না।আমার মনে হয় পলিটিক্যাল জটিলতা ছাড়া আখড়া বাউলদের কাছে হস্তান্তরের কোন সমস্যাই নাই। তবে আমরা সবাই আশা করছি, অল্পদিনেই সব সমস্যার সমাধান হবে।

***
(কৃতজ্ঞতায় সিরাজ প্রামানিক,)