ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

সম্প্রতি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এম এল এম) বা ডিরেক্ট সেলস ব্যাবসা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে আমাদের দেশে। আর এদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে দেশের লক্ষ্ লক্ষ মানুষ। অত্যন্ত লোভনীয়, অকল্পনীয়, অফার আর অল্পদিনে কোটি পতি হবার স্বপ্ন নিয়ে ঝুঁকছে দেশের হাজার হাজার বেকার যুবক। শুধু বেকার যুবকই নয়, অনেক শিক্ষিত কর্ম জীবী লোকজন ও ছুটছে এই ব্যবসার দিকে। আলাদীন এর যাদুর প্রদীপ এর মত রাতা রাতি কোটিপতি হতে কে না চায়! কিন্তু আমাদের দেশের এম এল এম ব্যাবসা যেই ভাবে এগুচ্ছে তাতে করে এর ভয়াবহতা আমরা ইতি মধ্যেই টের পেয়েছি। সামনে ও পাবো হয়তোবা । আমেরিকার কনসেপ্ট মাথায় নিয়ে শ্রীলঙ্কার এক ভদ্র লোক আই লিঙ্ক নামের একটি প্রতিষ্ঠান এর মধ্যে দিয়ে এই দেশে এম এল এম ব্যবসার সাথে যুক্ত হন। সেই প্রতিষ্ঠানে রফিকুল নামে আর একজন কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি ডেস্টিনি ২০০০ লিঃ এর কর্ণধার। ডেস্টিনি কারো সাথে প্রতারণা করেছে কিনা আমার জানা নেই। তবে সম্প্রতি ব্যাঙের ছাতার মত আগানে-বাগানে অযাচিত ভাবে যেই সব এম এল এম কোম্পানি গড়ে উঠেছে, তাদের নিয়ে অভিযোগের কোন শেষ নেই।

এম এল এম কনসেপ্ট সম্পর্কে আমাদের ধারনা খুব ই কম। তাই প্রতারণার স্বীকার হচ্ছি আমরা

ইতি মধ্যেই সর্ব শান্ত হয়ে গেছে কয়েক লাখ মানুষ। uni pay 2 you bd এর খপ্পরে পড়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খুইয়েছেন অনেক সদস্য ও এজেন্ট। আইন এর মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকে তাদের টাকা রিফান্ড পাননি। সম্প্রতি এর ভয়াবহতা এত প্রকট হয়ে গেছে যে ঢাকার শহরের হাতির পুল ও মোতালেব প্লাযায় প্রায় ৩০ টির মত ভুয়া এম এল এম কোম্পানি ব্যাবসা করছে।প্রতিটা জেলা শহরে এখন ৫ থেকে ১০ টির মত সাব অফিস! প্রসাশন একেবারে নির্বিকার! অর্থ মন্ত্রনালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেমন যেন নিস্ক্রিয়! এইসব হায় হায় কোম্পানির মধ্যে একটি কোম্পানির কথা আমি জানি। এটির নাম “ আর্থ ডিস্টিবিউশন” এই কোম্পানির মালিক একুশে টিভির এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন সমাজের অনেক বড় ও প্রতিষ্ঠিত ব্যাক্তি তার সাথে পার্টনার হিসাবে আছেন। উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা , এমন কি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা ও নাকি জড়িত এই ব্যবসার সাথে। তাহলে বিষয়টি তো মারাত্মক! এম এল ব্যাবসা পৃথিবীর বহু দেশে আছে। এটি বৈধ। তবে বাংলাদেশে এ কি ভয়ঙ্কর অবস্থা! একটু আলোচনা করি।

আর্থ ডিস্টিবিউশন এর এজেন্ট শিপ নিতে হলে প্রথম ২৫০০০০ টাকা সদস্য হিসাবে, এবং ৭৫০০০০ টাকা দিতে হবে ডিলার শিপ বাবদ। ঠিক আছে দিলাম। তার পর। এক ভয়া বহ সিস্টেম! মাত্র ৬ মাসেই কোটি পতি। কিন্তু কিভাবে? আমরা জানি এম এল এম এর একটি দুষ্ট চক্র আছে। প্রথমে এক হাত। তার পর ২। ২ থেকে ৪। ৪ থেকে ৮। এইভাবে যত হাত বাড়বে তত বিল গেটস হবার হাতছানি! এই প্রতিষ্ঠান যে কোন অঙ্কের অর্থ মাত্র ৬ থেকে ১০ মাসে দিগুণ বানিয়ে দেবে! এম এল এম কোম্পানি যদি ১০ মাসে ২ গুন মুনাফা দেয়, তবে আমাদের দেশের ব্যাংক কি আঙ্গুল চুষবে? তারা কেন পারেনা ১০ মাসে ২ গুন দিতে? কেন তারা ডাবল বেনিফিট ৭ বছর পরে দেয়? কারন ১০ মাসে পৃথিবীর কোন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ২ গুন লাভ দিতে পারেনা। এক মাত্র হায় হায় কোম্পানি ছাড়া! এই প্রতিষ্ঠান অয়াল মেট, আর সাপের বিষ এর ব্যাবসা করবে বলে সদস্যদের কাছ থেকে জামানত সংগ্রহ করে। অত্যন্ত সহজ, সরল, গ্রামের পুরুষ, মহিলারা আগ্রহী হয়ে ওঠে। ইস যদি ১০ মাসে ২ গুন পাওয়া যায়। শুধু ২ গুন নয়, এর পরে ও আছে কমিশন। যত সদস্য বাগিয়ে আনতে পারবে, ততো কমিশন!

শুধু গ্রামের সহজ, সরল প্রান মানুষ গুলী কি প্রতারিত হচ্ছে? শহরের অনেক চতুর লোক ও ধরা খাচ্ছে। আমারই এক বন্ধু মান্না একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তা, সেও ধরা খেয়েছে! ব্যাচারা হিসাব বিজ্ঞানে মাস্টার্স, তারপরে এম বি এ। হিসাব বিজ্ঞানে পড়েও হিসাব মেলাতে পারেনি কেমন করে ১০ মাসে ২৮০০০০ টাকা ২ গুন হয়ে ২৮০০০০*২= ৫৬০০০০ টাকা হয়। এই হচ্ছে অবস্থা। কিছুদিন পূর্বে অর্থ মন্ত্রী বলেছিলেন,

এই সব হায় হায় কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। এবং এম এল এম ব্যবসার একটি সঠিক নীতিমালা প্রনয়ন করা হবে।

এমএলএম নীতিমালা প্রণয়নের জন্য অতিরিক্ত বাণিজ্যসচিব এম মর্তুজা রেজা চৌধুরীকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়। সেই কমিটি অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), আরজেএসসি, ঢাকা সিটি করপোরেশন এবং এমএলএম কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে।

এমএলএম কোম্পানির প্রতিনিধিরা এসব বৈঠকে বলেছেন, যেসব পণ্যের বাস্তব অবস্থান নেই, সেগুলোও এমএলএম পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। অনেকে দেশে বসে বিদেশে বাড়ির ব্যবসা করছেন বা কাল্পনিক সেবায় অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এমনকি বাংলাদেশে কোনো কার্যালয়ও নেই তাঁদের। অথচ কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশে।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন সাহেব সকলকে সতর্ক করে বলেছেন এই সব চক্রে যেন কেউ পা না দেয়।

সবার উদ্দেশ্যে একটি কথা বলতে চাই। হায় হায় এইসব কোম্পানি থেকে সাবধান! কোন বিনিয়োগ করার পূর্বে অবশ্যই আগে দেখে নিন, তাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এর অনুমতি আছে কিনা? ফাইনান্স মন্ত্রনালয় এর কি স্মারক রয়েছে?আর আবার ও বলি কোন অর্থ ১০ মাসে ২ গুন সম্ভব নয়। কাজেই সাবধান!