ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

‘আই ওয়ান্ট টু সি অল অব ইউ পিপল’। অর্থাৎ, আমি সব মানুষকে দেখতে চাই। হ্যাঁ রুমানা মঞ্জুর এর এই দেখতে পাওয়ার আকুতি স্রষ্টা বোধ হয় কানে শুনেছেন। অথৈ সাগরে কোন কুল কিনারা না যানা হাবু ডুবু খেতে খেতে মরে যাবার একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে দূর থেকে ভেসে আসা খড় কুটর গাদা ধরে তাতে ভেসে থাকার স্বপ্ন নিয়ে জীবন বাঁচানোর শেষ স্বপ্নটুকু বোধ হয় আজ সত্যি হতে চলেছে। এক বুক আশা আর সুন্দর এই পবিত্র পৃথিবীটি আবার ও দেখবার ক্ষীণ এক স্বপ্ন নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য সুদূর কানাডায় তার এই সাময়িক চলে যাবার এক শুভ ফিরে আসার প্রতীক্ষায় আমরা। সেখান কার চিকিৎসকরা আশার বানী শুনিয়েছেন। একটি চোখ একেবারে নষ্ট হয়ে গেলেও বাকি চোখ টি ফিরে পাবার এক সম্ভাবনার কথা তারা বলেছেন। সেই স্বপ্নে স্বপ্নিল হয়ে রুমানার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন ঐ খানকার তার সহপাঠী সহ কানাডা সরকার। খোদ ঐ দেশের পার্লামেন্টে এক মহিলা নেত্রী রুমানার পক্ষে কথা উত্থাপন করেছেন। এবং রুমানার পক্ষে সার্বিক সহযোগিতা দানের জন্য সরকারকে তিনি অনুরোধ ও করেছেন।

রুমানা মঞ্জুর ঐ দেশে বিমান বন্দরে নেমেই তার সহপাঠিদের বলেন,

আমি এখানে এসেছি চিকিৎসার জন্য, আমি তোমাদের প্রার্থনা চাই’।

রুমানা আশা করছেন, তিনি তার ডিগ্রিটি সম্পন্ন করতে পারবেন। ফুলব্রাইট স্কলারশিপের এ ছাত্রী উন্নয়নশীল দেশে জলবায়ুর প্রভাবজনিত থিসিস লিখবেন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে তার উন্নত চিকিৎসার জন্য অর্থের কোন অভাব পড়বে না। বৃটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ডেভেলপমেন্ট এন্ড সার্ভিসেস থেকে তার চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত ৪১ হাজার ডলার সংগ্রহ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের অনুদান দ্বিগুণ করতে যাচ্ছে। সে জন্য অনলাইনে সাহায্য চাওয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রুমানার জন্য ক্যাম্পাসে প্লাকার্ডসহ বিক্ষোভ করে এবং ফলশ্রুতিতে মূলধারার সিবিসি ও সিটিভি বিশেষ টেলিভিশন প্রতিবেদন প্রচার করে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের ধারণা, সামাজিক জীবনে এটির বিরূপ প্রভাব তাদের ওপর পড়বে বৈকি! রুমানার ওপর নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে কানাডার টরেন্টো স্টারও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। স্বামীর নির্মম নির্যাতনের শিকার কানাডার বৃটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউবিসি) শিক্ষার্থী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মনজুরকে বিশেষ ব্যবস্থায় কানাডায় সাময়িক অবস্থানের অনুমতি দিয়েছে।

কানাডা অভিবাসনমন্ত্রী জেসন কেনির প্রেসসচিব ক্যানডিস ম্যালকম সাংবাদিকদের বলেন,

রুমানার ওপর নিষ্ঠুর ও অমানবিক হামলার ঘটনায় কানাডার সরকার অত্যন্ত ক্ষুব্ধ।

ইউবিসির প্রেসিডেন্ট স্টিফেন টুপের সিনিয়র উপদেষ্টা ক্যাথরিন ডুভার্গনে বলেন,

তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এবং চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য রুমানা এ ফান্ড ব্যবহার করতে পারবেন।

ক্যাথরিন বলেন,

এটা পরিষ্কার যে তার দেশে (বাংলাদেশে) আর কোন চিকিৎসা সম্ভব নয়। এখানে তার চিকিৎসার কিছু সম্ভাবনা রয়েছে। ইউবিসির চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগ তার সেবাযত্নের ব্যবস্থা করবে। কী করতে হবে তা পরিষ্কার নয়, কারণ গত ৫ই জুন তার চোখে আঘাতের প্রায় এক মাস পার হয়ে গেছে

রুমানা তার মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করবেন বলেও তিনি আশা করেন। ভ্যাঙ্কুভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রুমানাকে স্বাগত জানাতে ভিড় করেন বৃটিশ কলাম্বিয়ায় তার সহপাঠী ও বন্ধুরা। সবাই ঘিরে ধরেন রুমানাকে, সান্ত্বনা ও তার পাশে থাকার আশ্বাস দেন। চিকিৎসকরা রুমানার দু’চোখই চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে বললেও হার মানতে নারাজ তার সহপাঠী ও বন্ধুরা। তারা জানান, বন্ধুর চোখের আলো ফিরিয়ে আনতে সব সময় তারা পাশে থাকবেন, রুমানার জন্য যা করা দরকার, তার সবই করবেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের রুমানা বলেন,

এতটা আমি প্রত্যাশা করিনি। জানি না, কিভাবে আমি তাদের ধন্যবাদ জানাব।

তিনি সহপাঠী ও বন্ধুদের উদ্দেশে বলেন, ‘

তোমাদের মাঝে এসে খুব ভাল লাগছে। তোমাদের মুখগুলো আমি আবারও দেখতে চাই।


রুমানার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়- চিকিৎসকদের এমন আশঙ্কা সত্ত্বেও বৃটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির (ইউবিসি) শিক্ষার্থীরা উদ্যোগ নিয়েছেন রুমানার উন্নত চিকিৎসার। তাদের বিশ্বাস, বন্ধুর চোখে আলো ফিরবেই। এ জন্য রুমানা মনজুরকে নেয়া হয়েছে ভ্যাঙ্কুভারে। রুমানার চিকিৎসায় যা কিছু প্রয়োজন, তার সবই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বৃটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি। এরই মধ্যে ৫৫০ জন ডোনারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থে ৪২ হাজার ডলারের একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল ৭০ হাজার ডলারে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে। রুমানা বলেন, আমার চোখের অবস্থা ভালো নয়। তবে এখানকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা চিকিৎসা করবেন। এতে আমি দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় বুক বেঁধে আছি। আমি সবার কাছে দোয়া চাই।

আমরা বিশ্বাস করি আলোর পথের এই যাত্রী, যার আলোয় আলোকিত হবে বিশ্ববিদ্যালয় এর গোটা ছাত্র ছাত্রী সমাজ। সেই মানুষ গড়ার আর এক কারিগর আমাদের মাঝে সেই একমুঠো আলো নিয়ে ফিরে আসবেন। দুই চোখের যেই আলো হারিয়ে গেছে ক্ষণিকের জন্য সেই আলো দিনের প্রথম প্রভাতের পূব আকাশের রক্তিম লাল সূর্যের মত আবারো উকি দিবে আমাদের এই বোন টি রুমানা মঞ্জুর এর চোখে। নিকষ কালো অন্ধকার জীবনের পথ জোছনায় ঝল মল করা সেই রুপালি নদীর জ্বলের মতন ঝিক মিক করে ভোরে উঠুক রুমানার দুটি চোখ।
সৃষ্টি কর্তার নিকট আমাদের অন্তরের প্রার্থনা, রুমানার দুই চোখ আলোয় ভোরে দাও প্রভু।

***
সকল তথ্য দৈনিক মানব জমিন থেকে নেওয়া হয়েছে।
ছবিঃ দৈনিক মানব জমিন।

***
ফিচার ছবি: ,,