ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

বাংলায় মোঘল শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সুবাদার এই অঞ্চল শাসন করতে থাকে। ১৭৪০ এ সুবাদার সরফরাজ খান এর অযোগ্যতার কারনে বিহারের শাসক আলীবর্দি খান বাংলার মসনদ দখল করেন। তার মৃত্যুর পর আলীবর্দি দৌহিত্র সিরাজুদ্দৌলা বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার নবাব হিসাবে ক্ষমতার উত্তরাধিকার হন। সদ্য কৈশোর পেরোনো এই তরুন নবাবের সরলতা, রাষ্ট্র পরিচালনার অনভিজ্ঞতা, এবং তার পারিষদদের গোপন শত্রুতাকে পুঁজি করে ইংরেজরা দখল করে নেয় বাংলার মসনদ। ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে অনিবার্য এক যুদ্ধে সেনাপতি মীরজাফর আলী খান এর বিশ্বাস ঘাতক তায় ধূর্ত সেনা লর্ড ক্লাইভ এর বাহিনীর হাঁতে পরাজিত ও নিহত হন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা আর এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ২০০ বছরের জন্য পরাধীনতার আধারে ডুবে যায় বাংলা সহ গোটা ভারত বর্ষ।

ভারত বর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাস ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। এই সংগ্রামে এমন কিছু ব্যক্তি ছিলেন যাদের নাম না বল্লেই নয়। মহাত্মা গান্ধি যার অন্যতম। তিনি চাইছিলেন না ভারত ভেঙ্গে হিন্দু মুসলমান ভাইয়ে ভাইয়ে আলাদা হয়ে যাক। এই কারনে তিনি মুসলিম লীগ প্রধান নেতা কায়েদে আযম মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ এর স্মরণাপন্ন হন। ১৯৪৪ এর ৯ই সেপ্টেম্বর দিল্লির জিন্নাহ এর বাড়ীতে গিয়ে হাজির হন গান্ধীজী। ভারত ভাগ ঠেকাতে ১৮ দিন আলোচনা চালান তারা। কিন্তু মুসলিম লীগ নেতারা একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন এর পক্ষে অনড় থাকেন। এই রকম অবস্থায় ১৯৪৬ এর মার্চে ব্রিটিশ ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি এর কতিপয় দল ভারতে আসেন ভারতের স্বাধীনতার ব্যপারে আলাচনা করতে। এবং তারা ভারতের বড় বড় নেতা গান্ধী, জিন্নাহ সহ অনেকের সাথে আলোচনা চালান। এর ই ধারাবাহিকতায় সিমলায় ডাকা হয় ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সম্মেলনের।মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, জহর লাল নেহেরু, আব্দুল গফফার খান, সরদার বরলভ প্যাটেল এর মতন বাঘা বাঘা নেতারা সেইখানে স্বাধীনতার রুপ রেখা নিয়ে চুল চেরা বিশ্লেষণ করে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেইখানেও কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারা এক হতে পারেনি। ফলে ১২ই মে ঐ বৈঠক ভেঙ্গে যায়। ১৬ ই অগাস্ট মুসলিম লীগ নেতা কায়েদে আজম অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রতিহতের জন্য ডাইরেক্ট একশন ডে ঘোষণা করেন। কংগ্রেস এই কর্মসূচী প্রতিহত করার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠে। হিন্দু মুসলমান এর মধ্যে ভয়াবহ এক দাঙ্গা কলকাতায় শুরু হয়ে ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে নোয়াখালী সহ বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ছড়িয়ে পড়ে ত্রিপুরা এবং পাঞ্জাবে। দাঙ্গা থামাতে প্রথমে গান্ধী জী অনশন এবং পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফর শুরু করেন। তিনি যান নোয়াখালীতে। তিনি বুঝাতে থাকেন

হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই। এই দাঙ্গায় কার কোন লাভ নাই।

তার আপ্রাণ চেষ্টা ও মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি সহযোগিতায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়।

মূলত তৎকালীন ভারত বর্ষ এবং বর্তমান বাংলাদেশের মধ্যে ঐ প্রথম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। তার পর নানান ইতিহাস। ১৯৪৭ এর মধ্য অগাস্ট দ্বি জাতিতত্ত্ব এর ভিত্তিতে শুরু হয় পাকিস্তান এর। ১১০০ মাইলের ভৌগলিক দুরস্ত থাকা অবস্থায় ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এর ৭ কোটি মানুষ ভেবেছিল পশ্চিম পাকিস্তান এর শাসনে তারা মুসলিম পরিচয় সমুন্নত রেখে তারা সুখ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হয়নি। প্রথমেই তারা হিংস্র থাবা চালায় বাংলাদেশের হাজার বছরের মায়ের ভাষা বাংলা কে। তার পর ভাষা আন্দোলন। স্বাধীনতা আন্দোলন অনেক কিছু। বিশ্ব মানচিত্রে ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন একটি রাষ্ট্র। আজকের এই বাংলাদেশে। সেই বাংলাদেশে কখনো আর কোন দিন সাম্প্রদায়িকতার জন্য রক্তক্ষয়ী কোন সংঘর্ষ বাধেনি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অপূর্ব এক মিল বন্ধন দেখা যায় এই বাংলাদেশে। এত ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িক স্বাধীনতা বিশ্বের আর কোন দেশে নেই। এই বাংলাদেশে রমজান মাসে এক দিকে মসজিদে তারাবীর নামাজ পড়া হয়। অন্য দিকে হিন্দু ধর্মাবালম্বী দের দুর্গা পুজা চলাকালীন সময় উচ্চ সরে মাইকে কীর্তন, শ্যামা সঙ্গীত, আরতি সহ ধর্মীয় আলোচনা করে। কোন মুসলমান ভাইয়েরা কিন্তু বাধা দেয়না। সকল ধর্মের বিশেষ দিন গুলিতে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পৃথিবীর অন্যকোনো দেশে এমন দৃষ্টান্ত নেই। খোদ ভারতের অনেক জায়গাতে ফজরের আযান মাইকে প্রচার করা নিষেধ। তাই সকল ধর্মের লোকদের কাছে এই বাংলাদেশ এক অভয়াশ্রম।

যদিওবা ২০০১-২০০৬ তৎকালীন বি এন পি –জামাত জোট সরকার ক্ষমতা থাকাকালীন সময় এই দেশের সংখ্যালঘুদের উপর এক স্ট্রিম রোলার চালায় বিএনপি-জামাত গং। এই দেশের হিন্দু ভোট মানেই কেমন যেন আওয়ামীলীগ এর কেনা সম্পত্তি। এইরূপ এক ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে তৎকালীন সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সংখ্যালঘুদের উপর এক নিষ্ঠুর হত্যা যোগ্য, ধর্ষণ, লুটতরাজ, সম্পত্তি দখল এর এক মহোৎসব চালায়। ঐ সময়টিকে যদিও বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা বলা চলেনা। বিষয় টি ছিল রাজনৈতিক। তবুও ক্ষমতায় যেহেতু ইসলামি লেবাস ধারি দল ছিল, এবং তৎকালীন জোট এর হাঁতে নির্যাতিতদের অধিকাংশই ছিল এই দেশের হিন্দু সম্প্রদায়। তাই অনেকেই একে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলে থাকেন।জদিয় বি এন পি এটি মানতে নারাজ। তারা বিষয়টিকে রাজনৈতিক বলতে আগ্রহী। যার পরবর্তীতে এই দেশের সর্বপ্রথম জঙ্গি উত্থান যেটি হয়েছিল জোট সরকার এর ঐ আমলে।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকালে যথেষ্ট। ২০০২ সালের গুজরাটের সেই হিন্দু- মুসলিম দাঙ্গা আজও এক ভয়াবহ সৃতি বহন করে। একটি ট্রেনে অগ্নিসংযোগের ফলে ৬০ জন হিন্দু নিহত হওয়ার ঘটনায় সৃষ্টি হয় ওই দাঙ্গা। হিন্দুদের অভিযোগ ছিল, ওই অগ্নিসংযোগ করেছে মুসলমান প্রতিবাদকারীরা। তবে প্রাথমিক এক তদন্তে দেখা যায়, ট্রেনে কেউ আগুন দেয়নি। এক দল বিচ্ছিন্নতাবাদী হিন্দুরা ইস্যু বানাতে নিজেরাই ঐ ট্রেনে আগুন লাগায়। তার পর সেই ভয়ানক খন। সরকারী হিসাবে প্রায় ১৫০০ লোক ঐ দাঙ্গায় নিহত হন। কিন্তু বাস্তবতায় নিহতদের পরিমান ছিল প্রায় ৫০০০ এর মতন। যার মধ্যে অধিকাংশই ছিল মুসলিম। হিন্দু মুসলমান দের ঐ দাঙ্গাকে উস্কে দেয় গুজরাটের তৎকালীন মুখ্য মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেছিলেন ,

হিন্দুরা মুসলমানদের প্রতি যেন তাদের ক্ষোভ মেটাতে পারে, পুলিশকে সে ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মুসলমানরা যাতে পুনরায় এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে না পারে, সেজন্য তাদেরকে উচিত শিক্ষা দেয়ার এটি মোক্ষম সময়।”

তৎকালীন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কিছু বীভৎস ছবি দেখলে ই বুঝা যায় কি ভয়ানক ছিল ঐ সময় টি। উগ্রবাদী হিন্দুরা ঐ সময় কার অনেক গর্ভবতী মুসলমান নারীদের পেটের মধ্যে তরবারি ঢুকিয়ে ভ্রুন বের করে উল্লাস করেছিল। রাস্তায় দুই হাত পা ধরে সিমেন্ট এর তৈরি ছেলাফ দিয়ে মুসলমানদের মাথা থেতলে দিয়ে ছিন্ন বিছিন্ন করেছিল। নিচের কিছু ছবি দেখলে বুঝা যায় সাম্প্রদায়িক উস্কানি কত ভয়াবহ?

আমাদের দেশে এমন জঘন্য ঘটনা কোন দিন ও হয়নি। ইনশাআল্লাহ্‌ হবেও না।

শুধু ভারত নয়। মিশরের মুসলিম ইহুদী, ফিলিস্তিন ইসরাইল সহ বিশ্বের বহু দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলেছে বহুবার। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, স্বাধীনতা লাভের জন্য যেই যুদ্ধ সংঘটিত হয় ২ টি দেশের মধ্যে, তার চাইতেও ভয়াবহতার রুপ নেয় জাতী গত, আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

নিজের চেহারার ছবি হাতে , এখন কি অবস্থা!

বাংলাদেশের বর্তমান যেই পরিস্থিতি তাতে এক বাককে বলা চলে এই দেশ অহিংস ধর্ম নীতিতে বিশ্বাসী। যদিওবা মাঝে মাঝে ধর্মভিত্তিক কিছু রাজনৈতিক দল জঙ্গি বাদের শুঁড় সুরানি দিয়েছে। কিন্তু এই দেশের মানুষদের প্রবল সচেতনতায় সেই জঙ্গিবাদ নিপাত গেছে। এই দেশ কে আফগান বা পাকিস্থান বানানোর এক হীন প্রচেষ্টা ও চলেছিল এক সময়। তাই ঐ সময় কতিপয় রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা স্লোগান দিয়েছিল

আমরা হব তালেবান, বাংলা মোদের আফগান।

কিন্তু সেই জঙ্গিবাদ সুমলে আজ অনেকটা বিনষ্ট হয়ে গেছে।

ব্লগে সাম্প্রদায়িক উস্কানি!

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিডি নিউজ ২৪ এর ব্লগ মুক্ত চিন্তা, বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যে কেউ ই চাইলে ই লিখতে পারে এই খানে। সম্পাদনার নামে খড়গ কাচি চালিয়ে ব্লগারদের কণ্ঠ রোধ কখনই করেনা বিডি ব্লগ। আর এই সুযোগে কতিপয় নামধারী শয়তান, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিশ্বাসী, জামাতের ভাড়া করা ভাওড়া এবং তাদের নিজেদের কিছু ফ্লাডিং মন্তব্য কারক এই অপ শক্তি ব্লগিং পরিবেশ কে নষ্ট করছে। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো, ভিত্তিহীন, বানোয়াট আর কল্পনাতীত লেখা লিখছে। সেই সাথে একটি সাম্প্রদায়িক ব্লগ বানাতে হীন চেষ্টা তারা করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই এই সব নাম ধারি শয়তান বাংলাদেশ কে দিল্লি বানিয়ে ফেলেছে। হিন্দু নিধন এর জন্য মাঠে নেমেছে। বিভিন্ন লেখায় তারা মুসলমানদের উসকিয়ে দিচ্ছে হিন্দুদের বিরুদ্ধে। ঐ সব সাম্প্রদায়িক বন্য শুয়োর গুলী বিভিন্ন ব্লগে বিভিন্ন নামে ব্লগিং করে। এবং দেখা যায় তাদের লেখায় ঘুরে ফিরে একই মন্তব্যকারীরা মতামত দেয়। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত আর নিয়মিত ব্লগার রা ঐ সব জানোয়ারদের লেখায় সমর্থন দেয়না। ঐ সব সাধু শয়তান দের ব্যাপারে ব্লগের সকল কে সাবধান থাকার অনুরোধ জানাই।সেই সাথে ব্লগ টিম কেও বিনীত অনুরোধ জানাই।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই দেশ যেই ভাবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে এক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসাবে, সেই দেশের তরে মাথা নত করি। এই দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান, আস্তিক, নাস্তিক, সাদা কালো বর্ণ সকলের। এই দেশে কোন সাম্প্রদায়িক অপ শক্তি যেন মাথা উঁচু করে না দাঁড়াতে পারে। কতিপয় কুট কৌশলী উপজাতি পাহাড়ি বাঙ্গালি আর এই বাংলাদেশীদের মধ্যে মাঝে মাঝে সাম্প্রদায়িক এর উস্কানি দেয়। আর তাতেই পাহাড়ি অঞ্চল গুলী মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আর বিশ্ব দরবারে ঐ অপশক্তি গুলি বাংলাদেশকে ধর্ম বর্ণ জাতী বৈষম্য কারী এক দেশ হিসাবে চিহ্নিত করতে চায়। ঐ সব দেশদ্রোহী দের থেকে সাবধান! এই দেশে সকলে মিলেই বসবাস করবে। জাত ধর্মের কোন বালাই থাকবেনা এই দেশে। যার ধর্ম সেই পালন করবে। এবং এটি হচ্ছেও। যুগ যুগ ধরে যেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে দেশের ১৫ কোটি মানুষ, সেই সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাক সারা জীবন।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বেঁচে থাক সাম্প্রদায়িক অপশক্তি নিপাত যাক!

***
(সকল ছবি বিভিন্ন ওয়েব সাইট থেকে সংগৃহীত।)