ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বিতাড়িত এই ত্রি রাজনীতিবিদ আজ চোখের মনি !

আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো বাকি প্রায় আড়াই বছর। তবে এরি মধ্যেই ভোটের হিসাব নিকাশ শুরু হয়ে গেছে। ক্ষমতার ঐ কাংখিত মসনদ কে দখল করবেন তার জন্য চলছে নানান রকম তৎপরতা। রাজনীতির মঞ্চে মঞ্চস্থ হচ্ছে নানারকম যাত্রাপালা। কখনো শেষ বলে কিছু নেই, কখনো শত্রু থেকে বন্ধু; কখনো জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে তারে কেন দিতে এলে ফুল! কিংবা হয়তো তোমার কাছে এখন নইতো আর আমি প্রিয়, তবু ভালবাসা দিলাম দুটি হাত বাড়িয়ে নিয়ো!

এই সব অদ্ভুত সুন্দর যাত্রা পালার চিত্র নাট্য সাজাচ্ছেন আমাদের পরম প্রিয় ২ নেত্রী! যাদের কে আমি বঙ্গ মাতা বলেও মাঝে মাঝে সম্বোধন করি। যুগল এই চিত্রনাট্যকার দুইজন হচ্ছেন শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া। অত্যন্ত চমৎকার আর সাবলীল ভাষায় সুন্দর ভাবে তারা এই নাটক গুলি মঞ্চস্থ করে যাচ্ছেন। সঞ্চালক হিসাবে দায়িত্বে আছেন দুই যুগলের একান্ত আস্থা ভাযন মির্জা ফকরুল- খোকা জুটি এবং ওবায়দুল কাদের- নানক জুটি। আর এই যাত্রা পালার লাল নীল আলোয় খ্যামটা নাচ নাচছেন মিঃ বি চৌধুরী, মিঃ অলি আহমেদ এবং বীর উত্তম মিঃ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকি সাহেব! আরও আছেন নাম সর্বস্ব ১২ দল! আহারে কি ১২ দলরে? ১২ হাজার ভোট ও বুঝি নেই এই বাংলাদেশে। তবুও ১২ দল! ঢাল নেই, তরবারি নেই, বিধিরাম সর্দার! আর ঐ খ্যামটা নাচের দর্শক হচ্ছি আমরা ১৫ কোটি আম জনতা!

মূলত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এই দেশে জোট বদ্ধ ভাবে নির্বাচনের এক ট্রেডিশান শুরু হয়েছিল। সেই ধারা অব্যাহত ছিল গেলো নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। আর আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে এই জোট গত ভাবে আবারো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। মুলতঃ অষ্টম সংসদ নির্বাচনে হাসিনা জোট গত ভাবে নির্বাচন না করে যেই ভুলটি করেছিলেন তার মাশুল দিয়েছিলেন তিনি ৫ টি বছর। সেই বার একক ভাবে তার দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সরবচ্চ ভোট পেলেও আসন গত কারনে শেষ পর্যন্ত বি এন পি- জামাত এর ঐক্কের কাছে ধরাশয়ি হয়েছিলেন হাসিনার দল টি। যদিও ঐ অষ্টম সংসদ নির্বাচনে এরশাদ কে দলে ভেড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ ছিল হাসিনা সরকারের। তবে ওভার কনফিডেন্স এর কারনে একক ভাবে নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করেন। এবং তার ফল কি সেইটি সবার জানা। ঐ অষ্টম নির্বাচনের ফলাফলে খালেদা জিয়া এত বেশী আবেগি হয়ে গেলেন যে শেষ পর্যন্ত হাবল তাবল বকা শুরু করলেন। এমনকি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি বললেন “আওয়ামী লীগ ৫০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না,এমনকি তারা ৩০টার বেশি আসন ও পাবে না।“ কিন্তু ফলাফল হল উল্টো! তিন চতুর্থাংশ আসন নিয়ে বিজয়ি হলেন মহাজোট। আর তারা পেলেন সেই ৩০ টির একটু বেশি আসন। হাসিনা যদি পরম প্রতিহিংসাপরায়ণতা অবলম্বন করতেন তবে এরশাদ কে বিরোধী নেতা বানিয়ে বি এন পিকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে পারতেন। যাই হোক শেষমেশ এমন টি হয় নি।

বলছিলাম জোটগত নির্বাচন নিয়ে। আগামী নির্বাচনে মহাজোট কি থাকবে? আপাত দৃষ্টিতে কি মনে হয়? এরশাদ সাহেব তো ইতি মধ্যেই বলে দিয়েছেন যে মহাজোট আবারো ক্ষমতায় না গেলে আমাকে জেলের ভাত খেতে হবে।আর অন্য দিকে হাসিনা বর্তমানে এরশাদ কে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রয়োজনে জাতীয় পার্টিকে আরও মন্ত্রিত্ব দেওয়া যেতে পারে এই মর্মে তিনি নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে বাম দল গুলি নীতিগত কারনে জামাতের লেজুড় লাগা বি এন পিতে যেতে আগ্রহী নন। তবে এটি এক প্রকার নিশ্চিত যে মহাজোট থাকছে। তবে সমস্যাটি হচ্ছে ৪ দলীয় জোট টি নিয়ে। গেলো নির্বাচনে মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম এই জামাতের বিরুদ্ধে এত বেশি জনমত গড়ে তুলেছিলেন যে শেষ পর্যন্ত নুতন প্রজন্মের ৩২ থেকে ৩৮ শতাংশ ভোট কিন্তু এই জামাত এর বিপক্ষে পড়েছিল। এবং ঐ নির্বাচনে বি এন পির ঐ ভরাডুবির জন্য অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সরাসরি জামাত কে দায়ী করেছিলেন। আজ সেই জামাত যুদ্ধ অপরাধী পাপে পাপিষ্ঠ। ওদের বিচার প্রক্রিয়া ও চলছে। এবং এই বছরের শেষ নাগাদ সেটি সমাপ্ত হবে বলে সরকারের বিভিন্ন মহল জানিয়েছেন। আর এটি চরম মাথা ব্যাথার কারন বি এন পির। কারন ৪ দলের বৃহৎ শরিক হচ্ছে এই জামাত। তবে যুদ্ধ অপরাধের গন্ধ তারা গায়ে আপাতত আর মাখতে চাচ্ছেন না। কিন্তু জামাত নিরুপায়। তাই বাধ্য হয়েই এই জামাত বি এন পি কে সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নৈতিক সমর্থন দিচ্ছেন। যার ফলশ্রুতিতে দেখা যাচ্ছে যুগপৎ আন্দোলনের যেই রাজনৈতিক কর্মসূচী গুলি বি এন পি দিচ্ছেন তাতে জামাত পৃথক ভাবে সমর্থন করে রাজপথে থাকবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সরকারের হার্ড লাইনের কারনে এই জামাত এখন পর্যন্ত মাঠে নামতে তো পারেইনি। উপরন্তু তাদের কেন্দ্রীয় নেতা গুলিকে যেই ভাবে শিয়ালের মুরগী ধরার মতন সরকার ধরে ফেল্ল তাতে একটু টু শব্দটি ও করতে পারেনি। আযহারুল ইসলামের যত ফালা ফালি ঐ মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। বাস্তবিক পক্ষে তাদের আন্দোলন গুলি অন্তঃসার শূন্য হয়ে পড়ছে!

বি এন পি একটি বিষয় আজ স্পষ্ট অনুধাবন করতে পারছে যে আগামী নির্বাচনে এই জামাত তাদের ভোটের প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধি করতে পারলেও বাস্তবিক পক্ষে বর্তমান প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। তাই তারা আপাতত জামাতের সঙ্গে খুব যে একটি সখ্যতা রাখছেন সেটিও কিন্তু নয়। আবার একেবারে যে সম্পর্ক রাখছেন না তাও না। আসলে বি এন পি এইখানে পুরা পুরি ডিপ্লোম্যাটিক নীতি গ্রহন করছেন। মানে ঝোঁক বুঝে কোপ মারা। আর এই সমস্যাটি লাঘবে আপাতত তারা দল ভারী আর জোট বৃদ্ধি করণে বিকল্প মিত্র খুঁজছেন। ইতিমধ্যেই তারা পেয়ে গেছেন ১২ টি নাম সর্বস্ব ইসলামিক দল। যারা ইতি মধ্যেই হরতাল কর্মসূচী দিয়েছেন। এই বারটি দল এত বেশি নাম সর্বস্ব যে দৈনিক আমাদের সময় এর এক রিপোর্টার গিয়েছিলেন ঐ বার দলের এক নেতার কাছে হরতালের আগের দিনের এক রিপোর্ট করতে। কিন্তু মাঝহারুল হান্নান নামের ঐ নেতা ৫ টি দলের নাম বলতে পারলেও বাকি ৭ টি দলের নাম বলতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তিনি ফোন করেন অন্য নেতাদের কাছে। কিন্তু তারা ও সবাই ১২ টি দলের নাম বলতে পারলেন না। এই হচ্ছে ১২ দল! এই নিয়ে ঐ পত্রিকায় একটি রিপোর্ট ও লেখা হয়েছিল। বি এন পি এটির দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে ঐ ভুঁইফোড় ১২ দল দিয়ে কাজ হবেনা। তাই আবারো বিকল্প মিত্র খোজার চেষ্টা। এবং সেই চেষ্টা গুলি বেশ হাস্যকর ও বটে। কেন হাস্যকর এটি পরে আলোচনা করছি। তবে একটি কথা আজ বড় মনে পড়ে। প্রয়াত মান্নান ভুইয়া সাহেব এক বার বলেছিলেন স্রোতের বিপরীতে যারা একবার চলে যায় সেই সব রাজনীতিবিদদের মাজা ভেঙ্গে যায়। ফনা তুলে কেউটা সাপের মতন ফোঁস ফোঁস করলেও উঠে দাড়াতে পারেনা। উল্লেখ্য বি এন পি থেকে বি চৌধুরী, অলি আহমেদ, মেজর মান্নান সহ অসংখ্য প্রথম সারীর নেতৃবৃন্দ যখন গন হারে পদত্যাগ করলেন তখন ভুইয়া সাহেব ঐ উক্তি টি করেছিলেন।

মিঃ মান্নান ভুইয়া সাহেব আজ আর নেই। থাকলে দেখতেন আজ রাজনীতিবিদদের কত নৈতিক আর আদর্শিক পতন ঘটেছে। এই দেশের রাজনীতিবিদদের ২ টি হাত বুঝি ২ দিকে ধরার জন্য প্রস্তুত থাকে। একটি হচ্ছে গলায়, অন্যটি পায়ে। যখন দরকার গলার টুটি চেপে ধরে আবার অন্য হাত দিয়ে পা ধরার জন্য ও প্রস্তুত থাকে।

দেশের চলমান রাজনীতিতে ৩ জন রাজনীতিবিদ বর্তমানে বেশ সুপার পাওয়ার সমৃদ্ধ সুপার হিরো বনে গেছেন। বুঝে গেছেন কাদের কথা বলছি। হ্যা, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকি( বীর উত্তম) মিঃ বি চৌধুরী এবং মিঃ অলি আহমেদ। এক সময়ের রাজনীতিতে প্রচণ্ড প্রতাপশালী এই ত্রিরত্ন আজ কেবল ইতিহাসের এক নির্মম সাক্ষী। বনে বাদারে দলছুট খ্যাঁকশিয়াল যেমন হুক্কা হুয়া ডাকে তেমনি একটি অবস্থা এদের। অথচ এরাই কিনা এই দেশের রাজনীতিতে ছিলেন নুতন রাজনীতিবিদদের আইকন। সেই নক্ষত্র গুলি কালের আবর্তে আর সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। মনে হয় দূর আকাশে মাঝে মাঝে ভলকান হয়ে কালে ভাদ্রে উকি মারে! অথচ এরাই ছিল এক সময় পৃথিবী নামের গ্রহের গ্রহ দেবতা! সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্রহ বৃহস্পতি ও তারা শাসন করেছেন। এরা সবাই বিতাড়িত হয়েছেন দল থেকে। নুতন গ্রহ দেবতারা এদের মূল্যায়ন করতে পারেনি। কেউ কেউ হাউ মাউ করে কেঁদেও দল থেকে মাথা নিচু করে বিদায় নিয়েছেন।

এই তিন ভাগ্য বিতাড়িত আর বর্তমান ভাগ্যদেবী তাদের রুহে ভর করার কারনে তাদের নিয়ে কিছু না বল্লেই নয়।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকি ( বীর উত্তম)

এই দেশের মুক্তিবাহিনীর অহংকার গোটা বাঙ্গালী জাতির চেতনায় অম্লান স্ব মহিমায় ভাস্বর এই বীর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আজ অব্দি কোন মাংস তিনি খাননি। এটি তিনি নিজের মুখে বলেছেন। মাংস খেলে তার নাকি অভক্তি লাগে! মনে হয় জাতির পিতার মাংস খাচ্ছেন! নিজের শরীরে আজও জড়িয়ে রেখেছেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সেই মুজিব কোর্ট। বঙ্গবন্ধু হত্যার সশস্ত্র প্রতিবাদী এই বীরকে দল থেকে বিতাড়িত করেছেন তৎকালীন শাসক দলের কিছু কূট কৌশলীরা। কাঁদতে কাঁদতে দল থেকে চলে গেছেন এই বীর! কিন্তু যার শরীরে চির উন্নত মমশির সেই বীর কি করে রাজনীতি না করে থাকবেন? দল থেকে বিতাড়িত হবার পর টাঙ্গাইলের সেই উপনির্বাচনে তার নিশ্চিত জয় ছিনিয়ে নেবার এক হাস্যকর ন্যাকেড হামলা চালায় তৎকালীন শাসক দলীয় ক্যাডার। কিন্তু সম্ভব হয়নি। তার পর কিছু সহকর্মী নিয়ে গলায় গামছা পেচিয়ে তিনি গঠন করলেন “কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ”। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সেই দলের সম্মেলন করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনীর সামনেই পুলিশ প্রটেকশনে শাসক বাহিনীর ক্যাডার রা তার দিকে গুলি চালায়। সেই সাথে পণ্ড হয়ে যায় ঐ সম্মেলন। একাত্তরের ঐ বীরকে নিজের জীবন বাচাতে প্রেস ক্লাবে আশ্রয় নিতে হয়। তার পরের ইতিহাস সবার জানা।

মিঃ বি চৌধুরী

বি এন পির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ দলের দুর্দিনের কাণ্ডারি। শাবাশ বাংলাদেশ নামক একটি অনুষ্ঠান বানিয়ে তিনি বেশ আলোচিত হন। সেই সাথে ঐ বার নির্বাচনে বি এন পির জয়ের পেছনে ঐ অনুষ্ঠান টি বেশ প্রভাব ফেলে। এ টি এন বাংলায় প্রচারিত ঐ অনুষ্ঠানটি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের আওয়ামীলীগ এর সময়কার ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে। সেই মূল্যায়ন ও তিনি পেয়েছিলেন অষ্টম সংসদ নির্বাচনে। প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রী পরে রাষ্ট্রপতি! কিন্তু সেই সুখ বেশীদিন সহ্য করতে পারেনি মিঃ চৌধুরি। অতি নিরপেক্ষতার জন্য চোখের কাটা হয়ে যান দুর্নীতির বরপুত্র তারেক রহমানের। সেই সাথে কতিপয় নেতা ভুল বুঝাতে থাকেন তৎকালীন পি এম খালেদা জিয়াকে। আর সেই কূট কৌশলীদের কুট মন্ত্রের কাছে আদর্শের পতন ঘটে। অনাস্থার মুখে পদত্যাগ করেন মিঃ চৌধুরি। তার পর বিকল্পধারা গড়তে গিয়ে কত লাঞ্ছনা, গঞ্জনা। মেজর মান্নানের সানক্রেস্ট কোলা, বাবল আপ ফ্যাক্টরি জালিয়ে দেওয়া, মাহির উপর হামলা, মাহির সন্তানদের গাড়ীতে বোমা হামলা, বি চৌধুরির বাড়ীতে আগুন লাগানো, আর শেষ পর্যন্ত একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির উপর বর্বরোচিত হামলায় জাতি সেইদিন বিস্মিত হয়েছিল! হতবাক হয়ে শাবাশ বাংলাদেশের ঐ নির্মাতা রচনা করেন “ অবাক বাংলাদেশ” নামক এক কবিতা! সেই কবিতার প্রতিটি পাতায় পাতায় তিনি লিখে গেলেন তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণের এক গল্প! তার পরের ইতিহাস ও সবার জানা।

মিঃ অলি আহমেদ

বি এন পির এই বর্ষীয়ান নেতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। নিজের হাঁতে যে দেশটিকে স্বাধীন করলেন তিনি কি ভাবে মানবেন ঘাতকের গাড়ীতে পতপত করে উড়বে লাল সবুজ পতাকা! মন থেকে তিনি মানতে পারেন নি। তাই তো উপ নির্বাচনে জামাতের আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েই দলের রোষানলে পড়লেন। আবারো নগ্ন নীতির নিকট আদর্শের পতন। অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলায় তিনি দলে হয়ে উঠেন চরম উপেক্ষিত! তার পরের ইতিহাস ও সবার জানা। রেদয়ান এর বাড়িতে রাতে হামলা, আর ক্ষমতার দম্ভে সেই তাণ্ডব আজও জাতির মনে আছে।

উল্লেখ্য ২০০৮ সালের ২২ শে জানুয়ারির বাতিল নির্বাচনের আগে এই দুই নেতা মহাজোটে যোগ দিয়েছিলেন। নবম জাতিয় সংসদ নির্বাচনে অলি আহমেদ তার আসনটি ধরে রাখতে পারলেও বি চৌধুরী তার আসনটি হারান। অলি আহমেদ বর্তমানে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

যাই হোক আবারো আলোচনায় ফিরে আসি। এই বিতাড়িত আর লাঞ্ছিত নেতাগুলি আজ শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ার ৪ চোখের নয়নের মনি। লাজ শরম এর মাথা খেয়ে শেষ পর্যন্ত এই ত্রি নেতার বাড়িতে ধর্না দিচ্ছেন দুই নেত্রীর খলিফারা। তাই দেখে আজ অনেকে বগল বাজিয়ে যাচ্ছেন। আহারে রাজনীতি! কতনা নাটকীয়তা? এ যেন জীবন নাটকের চাইতেও এক নাটকীয়তায় ভরপুর! সাসপেন্স আর সাসপেন্সে! আদর্শের থুবড়ি ফোটানো ঐ সব দলের নেতৃবৃন্দ কি ভাবে তাদের কে দলে ভেড়াতে চায়, আর উনারা বা কি ভাবে আশ্বস্ত করেন ২ নেত্রিকে। ক্ষমতার পাপে আদর্শের এই পতন গুলি রাজনীতিবিদদের মুখোশ উন্মোচন করে দেয়। আমরা দেখি আর কেবল ভাবতে থাকি। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে তাকিয়ে চাতক পাখির মতন ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে নিজের কাছে প্রশ্ন করি এরা নাকি আমাদের চালিকা শক্তি! দেশ এরা চালায়। আমরা চলি। হায়রে চলা!

বি এন পি যেই মুহূর্তে কাদের সিদ্দিকির বাসায় যাচ্ছেন, তার পরেই যাচ্ছেন আওয়ামীলীগ। বি চৌধুরী আর অলি সাহেবদের বেলায় ও একি ঘটনার পুনারাবৃত্তি। এরি মধ্যেই শেখ হাসিনা দলের এক বৈঠকে নেতাদের বলে দিয়েছেন, দলের স্বার্থে যে কোন ছাড় দেবার মানসিকতা রাখতে হবে। প্রয়োজনে অর্ধেক মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিতেও প্রস্তুত এই দলটি। অন্যদিকে বি এন পি চাচ্ছেন জামাতের যেই গন্ধ তারা গায়ে মেখেছেন সেই গন্ধ দূর করতে। তাই তারা ও ঐ ত্রি নেতাদের দলে ভেড়ানোর জন্য ব্যাকুল। কারন বঙ্গবীর আর অলি সাহেব কে পেলে বি এন পির যুদ্ধ অপরাধের সমর্থন দাতা হিসাবে যেই দুর্নাম সেটি ঘুঝবে।কিন্তু আসল সমস্যাটি অন্যখানে। কাদের সিদ্দিকি আর অলি সাহেব ইতি মধ্যেই জামাত ইস্যুতে নাক সিটকিয়েছেন। বিষয় টি হয়তো এমন যে জামাত থাকলে তারা নেই। যদিও এই ত্রি রাজনৈতিক নেতা এখনো তাদের পক্ষে পুরাপুরি কোন যুক্তি বা আসলে তারা কি চাচ্ছেন বা আগামীতে কোন জোটবদ্ধ ভাবে নির্বাচনে আসবেন কিনা তা এখনো পরিস্কার করেন নি। তবে বি এন পির গন অনশনে এলডিপির পক্ষে এসে সংহতি জানিয়ে গেছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য রেদওয়ান আহমেদ । বি চৌধুরী প্রতিনিধি না পাঠালেও যুগপৎ আন্দোলনের একত্র ঘোষণা আগামীতে আসতে পারে বলে আভাষ দিয়েছেন। অনেকে এমনটি বলছেন বি চৌধুরী কি আবারো বি এন পিতে ফিরে যাচ্ছেন? না এমন টি ভাবা বোধ হয় ঠিক নয়। কারন মুন্নি সাহার এক সাক্ষাৎকারে কিছু দিন আগে বি চৌধুরী সাহেব বি এন পিতে আবারো ফিরবেন কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, নো-নেভার-নো। তবে দলে না ফিরেও দলগত সমর্থন দেবার একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন বি চৌধুরী এবং অলি সাহেব। তবে বঙ্গবীর কে নিয়ে এখনো সন্দিহান। কেননা তিনি যেই ভাবে বলেন শেখ হাসিনা তার সন্তান জয় আর পুতুল কে যেই ভাবে স্নেহ করেন আমাকেও সেরুপ করেন শেষ পর্যন্ত না হয় সেই পারিবারিক বন্ধনের মায়াজালে আবারো আবদ্ধ না হয়ে যান মিঃ সিদ্দিকি( বীর উত্তম)

আসলে ছোট ছোট এই সব দল গুলি নিয়ে বড় দলগুলির এইরূপ রশি টানাটানিকে বড় দল গুলির রাজনৈতিক দেউলিয়াপানা ছাড়া আর কি বা বলা যায়? অতীতের সকল তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে গিয়ে সকলের এহেন কর্মকাণ্ড বি এন পি – আওয়ামীলীগ সেই সাথে ঐ তিন নেতার যেই ভাবে ঘোর কেটে যাচ্ছে তাই দেখেই আমি মুলত বলেছিলাম রাজনৈতিক ঐ রঙ্গ মঞ্চের যাত্রাপালার কথা! আর ঐ যাত্রাপালার সঞ্চালক দের আমার প্রিয় এক রিপোর্টার পীর হাবিবুর রহমান কিছু প্রশ্ন করেছিলেন যেটি আমি এইখানে তুলে ধরলাম। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে প্রশ্ন ছিল_

যে বি চৌধুরীকে অপমানে তাড়ানো হয়েছিল, যার ওপর নগ্ন হামলা চালানো হয়েছিল সেই চৌধুরীর বৈঠকখানায় রাজনৈতিক ঐক্যের চায়ের কাপে চুমুক দিতে আপনাদের কেমন লাগছে? যাদের সভায় ও বাড়িতে হামলা চলেছে তাদের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তে কেমন বোধ করছেন?

উত্তরে কিছুটা চিন্তা করে তিনি বললেন,

ব্যক্তিগত ও দলীয়ভাবে গিয়েছি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে। দেশ ও জাতির জন্য। সরকার গঠন বা আসন ভাগাভাগির জন্য যাওয়া হয়নি। সংবিধান সংশোধনের কারণে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা দেশপ্রেমিক। অতীতের ঘটে যাওয়া ঘটনায় কোনো সমস্যা হবে না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্য গড়তে পারব।

আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদেরের কাছে প্রশ্ন ছিল_

বুকভরা কান্না দিয়ে যাকে বিদায় করা হয়েছিল, যার উপ-নির্বাচনের গণরায় ছিনতাইয়ের শেষ চেষ্টা হয়েছিল, যার দলীয় কাউন্সিল গুলিবর্ষণে পণ্ড করা হয়েছিল সেই বঙ্গবীরের বাড়িতে গিয়ে কথা বলতে কেমন লাগল?

খানিক চিন্তা করেই কাদেরের চটজলদি উত্তর ছিল_

রাজনীতিতে একসময়ের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়াশিংটন-মস্কোও আলোচনা করেছে। রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু-মিত্র বলে কিছু নেই। রাজনীতিতে ‘শেষ কথা’র স্থান নেই। মহাজোটে এখনো সবাই আছেন। আজ যিনি বন্ধু কাল তিনি শত্রু হতে পারেন। আজ যিনি শত্রু কাল তিনি বন্ধু হতে পারেন। দেশ ও জনগণের স্বার্থেই আমরা রাজনীতি করি। এটাই শেষ কথা।

আসলে রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কি কিছু নেই? তবে সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে হয়তো আবারো অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুটা সময়!

***
ছবিঃ প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, আমারদেশ