ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

মহানায়ক! তোমায় শ্রদ্ধা!

আজ ২৪ শে জুলাই। মহা নায়ক অরুণ কুমার চ্যাটার্জীর ৩১ তম মহাপ্রয়ান দিবস। অরুন কুমার! সে আবার কে? এই অরুন বা কবে মহানায়ক হয়ে গেল? হ্যা আমি মহানায়ক উত্তম কুমারের কথা বলছি। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী এই মহানায়কের আজ মৃত্যু দিন। এক সময়ের অখ্যাত কোলকাতা পোর্টে একজন সাধারণ কেরানী হিসেবে চাকরি শুরু করা এই অরুন কুমার ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কোলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। আর চলচ্চিত্রে এসে তিনি হয়ে গেলেন উত্তম কুমার। উত্তম মানে বিস্ময়! আজও টেলিভিশনে হারানো দিনের সেই সব চলচ্চিত্র গুলি যখন অন এয়ার হয় লক্ষ্য কোটি দর্শক শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় টি ভি পর্দায় দিকে চেয়ে রয়। এক পিন পতন নীরবতার মধ্য দিয়ে উপভোগ করে মহানায়কের সেই হৃদয় নিংড়ানো আর মনের সাথে মিশে যাওয়া সেই অভিনয়। কেউ কেউ আবার অতীতে ফিরে গিয়ে একটু নস্টালজিক হয়ে যায়। মহানায়ক উত্তম বলে কথা!

http://www.youtube.com/watch?v=fknHrM-kLhM&feature=related

‘মায়াডোর’ শিরোনামের একটি ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ারের সূচনা করেন মহানায়ক । কিন্তু নানা জটিলতার মুখে শেষ পর্যন্ত ছবিটি রিলিজ হয়নি। কিন্তু যার রক্তে মিশে আছে অভিনয়, যে হবেন মহানায়ক সে কি হারতে জানে? এর পর তিনি অভিনয় করেন ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে। নিতীন বসু পরিচালিত এ ছবিই প্রথমবারের মতো দর্শকের সামনে তুলে ধরে উত্তম কুমারকে। তবে সত্যিকার লাইম লাইটে আসা বলতে যা বুঝায় সেইটি তিনি পান ‘বসু পরিবার’ ছবিটির বেলায়। এ ছবির মধ্য দিয়েই মূলত উত্তম কুমারের মহানায়ক হয়ে ওঠার গল্প শুরু।

১৯৫২ সাল। এক অখ্যাত রমা নামের একটি মেয়ের সাথে “ সাড়ে চুয়াত্তর” নামের একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বক্স অফিস কাপিয়ে দেন। সারা দেশে ছড়িয়ে যায় উত্তম এর অভিনয়ের সুখ্যাতি। আর পেছনে ফিরতে হয়নি উত্তমকে। নিজে হয়েছেন মহানায়ক! আর “ সাড়ে চুয়াত্তর” এর মাধ্যমে তিনি অখ্যাত এক রমা কে বানিয়েছেন মহানায়িকা স্বপ্ন রানী সুচিত্রা সেন। তার চেয়েও বড় কথা, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিটিতেই প্রথম জুটি হন উত্তম-সুচিত্রা। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে অনন্য এক ইতিহাসের জন্ম দেয়। পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে বহু ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেন তারা। হারানো সুর, পথে হল দেরি, সপ্তপদী, চাওয়া পাওয়া, বিপাশা, জীবন তৃষ্ণা এবং সাগরিকা’র মতো অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আজও সৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন এই মহানায়ক উত্তম কুমার। ছবিগুলোতে উত্তম-সুচিত্রার অভিনয় এ জুটিকে অমরত্ব এনে দেয়। ১৯৫৭ সালে অজয় কর নির্মিত ‘হারানো সুর’ ছবিটি পুরো ভারতের দর্শকের মনে নদীর ঢেউয়ের মতো দোলা দেয়। একই সঙ্গে অর্জন করে রাষ্ট্রপতির সার্টিফিকেট অব মেরিট পুরস্কার। মজার তথ্য হচ্ছে, ছবির প্রযোজক ছিলেন উত্তম কুমার নিজেই।

কালজয়ী জুটি উত্তম- সুচিত্রা

এই মহা নায়ক অস্কার বিজয়ী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ এবং ‘চিড়িয়াখানা’ শিরোনামের দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন দুটো ছবিই প্রশংসিত হয়। ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ভারতের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ‘নায়ক’ ছবিটিও ব্যাপক সমাদৃত হয় দর্শকের কাছে। এক অখ্যাত অভিনেতার নায়ক হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে তৈরি হয় নায়ক ছবিটি। ছবিটি উত্তম কুমারের জীবনের গল্পের সঙ্গেও বেশ মিলেমিশে গিয়েছিল। জানা যায়, এ জন্যই এক আলোচনায় সত্যজিৎ বলেছিলেন, উত্তম কুমার সম্মত না হলে ‘নায়ক’ ছবিটি তিনি নির্মাণই করতেন না।

ব্যাক্তি জীবনে এই মহানায়ক বেশ রোমাঞ্চ প্রিয়। সুচিত্রা সেন এবং সাবিত্রির সঙ্গে প্রেমের টানাপোড়েনে স্ত্রী অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদও তার জীবনের আলোচিত ঘটনা।সুচিত্রা আর উত্তমের প্রেম ছিল এক অসম প্রেম! দুজন ই ছিলেন বিবাহিত। তারপর ও তাদের প্রেম ভালবাসা নাকি ছিল স্বর্গীয়! কথিত আছে উত্তম-সুচিত্রা এত বেশি একসাথে অভিনয় করেছিলেন তারা একসময় দুজনের প্রতি দুজনে দুর্বল হয়ে পড়েন। তবে সেটা পরিণয় এর দিকে পা বাড়ায়নি। উত্তম যখন মারা যান তখন উত্তম এর স্ত্রী নাকি সুচিত্রা সেনকে বলেছিলেন,

সারা জীবন তো তুমি উত্তম এর গলায় মালা পরালে, আজ সৎকার এর পূর্বে তুমিই প্রথম ওর গলায় মালা পরাও

সুচিত্রার মোট ৬৩ টি ছবির মধ্যে ৩২ টির নায়ক ছিল উত্তম কুমার।

উত্তম কুমার অভিনীত চলচিত্র

‘বসু পরিবার’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘মনের ময়ূর’, ‘গৃহে প্রবেশ’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘অ্যান্থনি ফিরিঙ্গি’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘জীবন জিজ্ঞাসা’, ‘আলো আমার আলো’, ‘রাজদ্রোহী’, ‘সবার উপরে’, ‘শ্যামলী’, ‘শিল্পী’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নায়ক’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘ঈন্দ্রানী’, ‘রাজলক্ষ্নী ও শ্রীকান্ত’, ‘সপ্তপদী’, ‘নায়িকা সংবাদ’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘গৃহদাহ’, ‘কখনো মেঘ’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘মৌচাক’, ‘স্ত্রী’, ‘তিনকড়ি হালদার’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘পথের দাবী’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘রাজকুমারী’, ‘সিস্টার’, ‘জয় জয়ন্তি’, ‘গলি থেকে রাজপথ’, ‘বাঘবন্দি’, ‘অগ্নিশ্বর’, ‘সন্যাসী রাজা’, ‘হারানো সুর’, ‘চৌরাঙ্গী’, ‘আনন্দাশ্রম’, ‘দেশপ্রেম’, ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র মতো অসংখ্য চলচ্চিত্র বহুকাল মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতেই থাকবে।

তবে শুধু বাংলা চলচ্চিত্রে নয়, উত্তম কুমার অভিনয় করেছেন বেশ কিছু হিন্দী ছবিতেও। তাঁর অভিনীত হিন্দী চলচ্চিত্রের মধ্যে ছিল ছোটিসি মুলাকাত, অমানুষ এবং আনন্দ আশ্রমসহ আরও কিছু ছবি। এসবের বাইরে ছবিতে সুরকার হিসেবেও কাজ করেছেন

বহুরূপী মেধা আর মননের অধিকারী এই মহানায়ক বিপুল কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে বাংলাভাষাভাষী মানুষের মনে আনন্দ দেয়ার এ গুরম্ন দায়িত্ব থেকে ১৯৮০ সালের আজকের দিনে চির অবসর নেন উত্তম কুমার। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির সেটে আকর্ষিক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ৫৪ বছর বয়সী এ অভিনেতার মহা প্রয়াণের পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও আজও টালিগঞ্জে একটি উত্তম এর জন্ম হয়নি। এখনও তাঁকে অতিক্রম করতে পারেননি কোন অভিনেতা। আজ এই মহানায়কের ৩১ তম মহাপ্রয়ান দিবস। আজকের দিনে তার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।