ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

মেকি এক চাহনি! আহারে কি নায়কোচিত নিষ্পাপ আর নির্মল দৃষ্টি! অন্তরে যত কুটিল শয়তানি।

মানুষ কিভাবে এত মনুষ্যত্ব হীন হতে পারে? মানুষ কি ভাবে এমন স্বার্থপর হতে পারে? বিবেক বোধশক্তি কি ভাবে এত টা লোপ পেতে পারে? মানুষ কি ভাবে এতটা অমানুষ হতে পারে? অনেক গুলি প্রশ্ন। কিন্তূ উত্তর জানা নেই আমার। আসলে দিন রাত যারা লাইট- ক্যামেরা- আর এ্যাকশন এর মধ্যে বাহারি পোশাক পরে ফানুস সাজে, পুরা জীবন যাদের নিকট একেবারে অভিনয় মনে হয়, এই পৃথিবীটাকে যাদের মনে হয় এক লাল নীল সাদা রঙের এক রঙ্গ মঞ্চ তাদের আবার আবেগ! তাদের আবার জীবন! ধিক সেই জীবনের যেই জীবন মানবের ঋণ ভুলে যায়। শত ধিক্কার সেই জীবনের জন্য যেই জীবন কেবল নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অমানুষ নামক দানবটিকে বুকের মধ্যে পুষে রেখে বাইরে মানব নামের এক আদর্শ বাদী সাধু শয়তান সাজে।

আজ শুক্রবার। গেলো শুক্রবার আমার এক ছোট ভাই বাপির কক্সবাজারে সলিল সমাধি ঘটেছিল। বাপি বল্লেই অনেকেই চিনতে না পারে। আমি বলছি ক্লোজ আপ ওয়ান শিল্পী আবিদ এর কথা। আবিদ কে নুতন ভাবে কি আর পরিচয় করাবো। আজ আবিদ একটি ক্ষয়ে যাওয়া, মাঝ পথ থেকে ছুটে যাওয়া এক উল্কার নাম। যেই উল্কা আলোর ঝলকানি দেবার পূর্বেই পৃথিবী নামক এই অপ গ্রহ থেকে দূর ঐ সৃষ্টিকর্তার মহান সান্নিধ্যে চির দাসত্ব গ্রহন করেছে। নির্মল রাতের আকাশের পশ্চিম কোনে যদি কেউ তাকায় তবে দূরের ঐ নীল আকাশের বুকে মাঝে মাঝে নিভু নিভু করে ধ্রুব তারা হয়ে উকি দেয় বাপি। আর বলে হে নিষ্ঠুর পৃথিবী! তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিলে তোমার বুক থেকে। কিন্তু আমি তোমার পৃথিবী নামক যন্ত্রণা নামক গ্রহ থেকে অনেক ভাল আছি। আমি যেখানে আছি ভাল আছি। হে পৃথিবী! আমার বাবা- মা আর ছোট্ট ভাইটিকে জানিয়ে দিয়- আমি ভাল আছি। বেশ ভাল আছি।

আবিদের বাড়ি আজ যেন এক বিরান ভূমি! ঝড়ের সময় হাওয়া যেমন পৃথিবীর বুকে এক তাণ্ডব লীলা চালিয়ে যায় নিষ্ঠুর দানবের মতন। সেই তাণ্ডব শেষ হয় এক সময়। আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সেই তাণ্ডবের সাক্ষী বিরান ভূমি! আবিদের বাসার ড্রয়িং রুমে পা থেকে মাথা পর্যন্ত শুধু আবিদ আর আবিদের ছবি। ওর মা আজ পাগল প্রায়। বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় ওর মা ড্রয়িং রুমের অজস্র ছবির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে উদ্ভট সব কথা বলছে।

বাবা আবিদ তুই আজ অফিসে যাবি না? তুই আজ সকালে কি খেয়েছিস? তোর সোনা বৌ টি কেমন আছে? তোর বাবাকে ফোন দিয়েছিলি?এই বৎসরের ১১-১১-১১ তারিখে তোকে বিয়ে দেব! তোর ইচ্ছা স্মরণীয় ঐ দিন ১১-১১-১১ তারিখে তুই বিয়ে করবি। রাতে ঘুম হয়েছে তো? শরীরের দিকে যত্ন নিস। আমাকে তুই আজ ফোন দিসনি কেন?

এইরূপ কথা বলে আবিদের মা। সেই দৃশ্য দেখে চোখে জ্বল ধরে রাখা যায়না। আবিদের বাবা সে ও পাগল প্রায়। আবিদের বাবা খুলনার নাম করা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। একা একা গান গায়। সারা ঘর হাঁটেন আর গান-

তুমি রবে নিরবে!

এ যেন সন্তান হারিয়ে বাবা মার পাগল হয়ে যাওয়া কোন এক বাস্তব সত্য গল্প আমি বলছি। হ্যাঁ, এটাই সত্যি।

আজ সকালে আর এক নির্মম সত্য শুনতে হোল আমায়। পাঠক আপনারা জানেন আবিদ দেশের খ্যাতনামা অভিনেতা, নির্দেশক ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা মিঃ আফজাল হোসেনের মাত্রা নামের একটি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে কাজ করতো। এবং ঐ বিজ্ঞাপন সংস্থার কাজেই আবিদ সহ পুরা টিম কক্সবাজারে যায়। আর তার পরের ঘটনা গুলি সবার অজানা নয়। আবিদের মৃত্যুতে গোটা দেশ যখন শোকে শোকাহত তখন মিঃ আফজাল সাহেব ছিলেন এক স্বাভাবিক এক আবেগ বিবর্জিত মানব! আবিদের সাথে তার রক্তের সম্পর্ক তো নেই। তাই বোধ হয় এমন রুপ! ওর মৃত্যুর পর তাকে খুব বেশি বিচলিত হতে কেউ দেখেনি। এবং তার চরম অসহযোগিতার কারনে আবিদের লাশ কক্স বাজার থেকে ঢাকায় আনতে এবং পরের দিন তার নিজের দেশের বাড়ি খুলনায় আনতে অনেক দেরি হয়ে যায়। এই আবিদ মাত্রাকে অনেক কাজ পাইয়ে দিয়েছে। নিজের ফেস ভ্যালুর জন্য আবিদ ছিল সবার নিকট অতি গ্রহন যোগ্য এক মানুষ।

আবিদের লাশ ঢাকাতে আনার পর যখন এনটিভি ভবনে নেওয়া হয় তখন পুরা এনটিভি পরিবার শোকে ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু আফজাল সাহেবের ঐ সময়ের আচরন গুলি সবার নজর কাড়ে। মনে হয় আবিদ এক অতি সাধারন মানুষ যাকে তিনি চেনেন না। এই যেন এক অতি সাধারনের স্বাভাবিক মৃত্যু! নিজে একবার শোক প্রকাশ করে আবার চলে যান। তার পর আবিদের লাশ খুলনায় নিয়ে আসা হয়। কিন্তু মিঃ আফজাল লাশের সাথে তো আসেননি। বরং আবিদের বাবা- মার সাথে কথা বলার কোন সৌজন্য বোধ টুকু ও দেখাননি। অথচ এই আবিদ ছিল তার এক একান্ত সহকর্মী।

আর জানতে পারি যে আবিদের ব্যবহৃত ২টি মোবাইল ফোন মিঃ আফজাল সাহেব নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। তার লাগেজও তিনি আবিদের বাবা মার কাছে ফেরত দেননি। বা প্রয়োজন মনে করেননি। মোবাইল রেখে দেওয়ার জন্য যুক্তি হোল এই যে, বাপির ফোনে অনেক ক্লাইন্ট এর নাম্বার সেভ করা। যদি সেই গুলি হাত ছাড়া হয়ে যায়! তাহলে তো ব্যবসার ক্ষতি! তাছাড়া আর কিছু ঘটনা রয়েছে যেটি আবিদের বাবা মা প্রকাশ করতে চায়নি। এই আফজাল নামের সেলিব্রেটি গোটা সেলিব্রেটি জগতের কলঙ্ক! আবিদের বাবা অ্যাডভোকেট মিনা মিজানুর রহমান আফজাল সাহেবের বিরুদ্ধে কেস করবেন বলে জানা গেছে। আসলে কি লাভ মামলা করে? যার মধ্যে মানুষ নামের অমানুষের এক বসতি, সে কি করে বুঝতে পারবে এক সন্তান হারা বাবা মার যন্ত্রণা কত কষ্টের। আবিদ তার সন্তানের মতন। কারন তার প্রতিষ্ঠানে ছেলেটি কাজ করতো। এক কর্মী তো ঐ প্রতিষ্ঠানের সিইও এর সন্তান তুল্য। আর আবিদ তো অতি সাধারন কেউ নন। এই দেশের অন্তত ২ কোটি মানুষ ওকে চিনতো।

আবিদ কী দেখছিস ও ভাবে তাকিয়ে?

আসলে মরন তো আসবেই। এটি চির সত্য। জন্ম নিলে মৃত্যু অবধারিত। তবে এই মৃত্যু কি মেনে নেওয়া যায়? ২৫ এর টগবগে এক তরুন। প্রতিভাবান আর সম্ভাবনাময় এই তরুন ইতি মধ্যেই নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছিল। ক্লোজ আপ ওয়ানে নিজের প্রতিভা দেখিয়েই আগামীর পথ চলা সবে শুরু। আর সেই সময় এই অপ মরন! কে মেনে নেবে এই মৃত্যু? একটি প্রতিষ্ঠানের কাজে গিয়ে তার যেই পৃথিবী থেকে প্রস্থান সেই পৃথিবীর সেই প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তার এমন আচরন আমাদের কে কি ভাবতে শেখায়? অথচ এই আফজালরা যখন কোন টিভি প্রোগ্রামে লাইভ অনুষ্ঠান করে তখন তার ভিউয়ার্স এবং ভক্তদের কি মিথ্যা না এরা বলে! বাংলাভিশনে মুনমুনের উপস্থাপনায় আমার আমি নামক অনুষ্ঠানে এক বার মিঃ আফজাল এসেছিলেন। মুনমুন তাকে প্রশ্ন করে ছিল –
এক জীবনে আফজাল এর প্রাপ্তির কোন শেষ নেই। তবুও কি অপ্রাপ্তি আপনার?

মিঃ আফজাল বলেছিলেন- এই জীবনে যা পেয়েছি এত কিছুর প্রয়োজন ছিলনা আমার। তবে অপ্রাপ্তি আছে বৈকি। আর সেটা হোল মানব কল্যাণে নিজেকে জড়িত করা। পথ শিশুদের জন্য কিছু করা। আর দুস্থদের জন্য একটি আশ্রম গড়ে তোলা!

আহারে ভণ্ড মিথ্যাবাদী আমি তো মিডিয়ার অনেককেই হাড়ে হাড়ে চিনি। লাইভ প্রোগ্রামে এলে নিজেদের ভণ্ড মুখচ্ছবি কে বা দেখাতে চায়? দর্শক মনে যেই হিরোইজম সেটি না হয় থাক। আর তার জন্য না হয় নিজের অন্তঃমুখোশটি ঢেকে রেখে নাটকের অলিখিত এক স্ক্রিপ্ট এর মতন কিছু ডায়ালগ শুধিয়ে নিজের মনের কুটিলতা চেপে এক মুখোশ ধারি শয়তানের পাট গেয়ে যায়।

ধিক মিঃ আফজাল
ধিক শত ধিক- সেলিব্রেটির কলঙ্ক!
আবিদের আত্মার কষ্টে ধ্বংস হোক আপনার মাত্রা।

***
বিকাল- ৫.১৫
খুলনা- ৫ই অগাস্ট -২০১১