ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

গ্রামে একটি কথার বেশ প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। কেউ যদি কোন কাজে ব্যর্থ হয় তবে ময় মুরুব্বীরা একটি কথা শুনাতে ভুল করেন না। আর সেটি হোল ছাগল দিয়ে আর যাই হোক জমি চাষ করা যায়না। কথাটি শুনতে বেশ খারাপ লাগলেও বাস্তবিক পক্ষে এটির যথেষ্ট তাৎপর্য রয়েছে। আর আমি ছাগল টাকে রিমেক করে যদি একটু অন্যভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করি তবে শ্লীল ভাবে বলা চলে ২ টাকার ব্লেড দিয়ে মুখের দাড়ি বা গোঁফ কাটা গেলেও ঐ ব্লেড দিয়ে এক টাকার বাবলা গাছ কাটা যায়না। যাই হোক আলোচনায় ফিরে আসি। আজকে কিছু কথা এই ব্লগের মাধ্যমে প্রধান মন্ত্রীর সবিনয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমি এও জানি এই কথা গুলি মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর দৃষ্টি একেবারেই এড়িয়ে যাবে।

মাননীয় নেত্রী, মা জননী, দেশের বর্তমান পুজি বাজার কোন দিকে যাচ্ছে? ঐ ছাগলের প্রচলিত কথার মতন আজ এই কথা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে দেশে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আর যাই হোক পুজি বাজার ধ্বংস হয়ে যায়। আসলে আওয়ামীলীগ সরকার দিয়ে কোন ভাবেই দেশের পুজি বাজার শাসন বা নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব নয়। এটি সত্য সত্য এবং চরম ভাবে সত্য। দেশের সকল মানুষ আজ এই বিষয় ওয়াকিবহাল। দেশের শেয়ার বাজার আজ এক মৃত্যুপুরী। আমি আগেই একটি লেখায় বলেছিলাম দেশের পুজি বাজার আজ ধর্মের ষাঁড়ের মতন এদিক সেদিক ঘোরা ঘুরি করছে। কোন নিয়ন্ত্রন নেই। এ যেন ২ কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে সরকারের এক বীভৎস, নিষ্ঠুর আর জঘন্য এক খেলা। যেই খেলায় সর্ব শান্ত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে এই আওয়ামীলীগ সরকার থাকাকালীন হাজার হাজার মানুষ। ১৯৯৬ এর ঘটনা যাদের জানা নেই কিংবা ভুলে গেছেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, কতিপয় অসাধু ব্যক্তির কারসাজিতে বিভিন্ন কোম্পানীর শেয়ারের দাম মাটি থেকে আকাশে উঠানো হয়েছিল। ২০০০ টাকার শেয়ার উঠানো হয়েছিল ২০০০০ টাকায়। এবং তারপর হঠাৎ একদিন সেই মুল্য মাটিতে নেমে আসে। যার ফলশ্রুতিতে সর্বশান্ত হয়েছিল অসংখ্য বিনিয়োগকারী।

১৯৯৬ সাল আর বর্তমান প্রেক্ষাপট এক নয়। ঐ সময় মোট বিনিয়োগকারীর সংখা ২০ থেকে ৩০ হাজার এর বেশি ছিলনা। সকল লেনদেন ডাক প্রথায় পরিচালিত হোতো। ভুয়া কাগুজে শেয়ার বাজারে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান ট্রেডিং হয় অন লাইনে। সি ডি বি এল নামক সফটওয়্যারে সার্বক্ষণিক বাজার মনিটরিং করার সুযোগ রয়েছে। আর বর্তমান বিনিয়োগ কারির সংখ্যা অমনিবাস হিসাব সহ প্রায় ৪০ লাখ! আজ ৪০ লাখ মানুষ দিগ্বিদিক হয়ে এদিক সেদিক ছুটা ছুটি করছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে তাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। সেই সাথে সর্বহারা হতে চলেছে ৪০ লাখ বিনিয়োগকারীদের সাথে অন্তত ৫ জন করে সদস্য ও যদি থাকে তবে ২ কোটি মানুষ!

গেলো বছরের ডিসেম্বর মাসে ভয়াবহ এক ধস নামে দেশের ২ পুঁজিবাজারে। পৃথিবীর পুঁজিবাজারের ইতিহাসে বাংলাদেশের পুজি বাজারে এক নির্মম আর নিষ্ঠুর ক্রাশ হয়ে যাওয়া দ্যাখে দেশের মানুষ। সেই ভয়াবহতা এত ভয়ানক যে ৫ থেকে ৬ জন বিনিয়োগ কারি আত্মহত্যা করে। এ নিয়েও ব্লগে লিখেছিলাম। মাত্র ১৫ দিনেই ইনডেক্স নেমে যায় ৩০০০ এর মতন। সেই ধসে আতংকিত হয়ে মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ডি এস ই ভবন সহ সারা দেশ রণক্ষেত্রে পরিনত হয়। মতিঝিল হয়ে ওঠে এক আতংকিত জায়গা। প্রতিদিন দেখা যেত ১১ টা বাজার আগেই ডি এস ই , এস ই সি, ও সি এস ই ভবন গুলি হাজার হাজার দাঙ্গা পুলিশ ঘিরে রাখতো। অর্থ মন্ত্রী মুহিত আর অর্থ উপদেষ্টা মশিউর সাহেবের উদ্ভট সব উক্তি আর সেই সাথে ২ দরবেশ লোটাস কামাল আর সালমান এফ রহমানের দস্যিপনা আর বে হুদা গভর্নর আতিউর রহমানের নির্বোধ নীতি দেশের পুজি বাজার একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছায়। খোদ সরকার দলীয় সাংসদরা সংসদে সরকারের বিরুদ্ধে এই নিয়ে প্রতিবাদ জানায়। এক সময়ে অর্থ মন্ত্রী তার ভুল স্বীকার করে। তার পর তদন্ত শুরু হয়। ইব্রাহীম খালেদ সাহেব কে প্রধান করে এক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্ত রিপোর্টে বেরিয়ে আসে সরকার দলীয় ও বিরোধী দলীয় একাধিক জুয়াড়িদের নাম। সেই রিপোর্ট আজও আলোর মুখ দেখেনি। অর্থাৎ রিপোর্ট প্রকাশ হলেও তার কোন কার্যকারিতা এখনো লক্ষ্য করা যায়নি।

দেশের পুজি বাজারে বিনিয়োগকারীদের ইনভল্ব করার জন্য রোড শো, শেয়ার মেলা, প্রধান মন্ত্রীর আহবান সবই ছিল হাস্যকর এক বিষয়। হাস্যকর এই অর্থে তারা বিনিয়োগকারীদের বাজারে আসতে আগ্রহী করে তুল্লেও চরম দুঃসময়ে কোন নীতি নির্ধারক কর্তা ব্যাক্তিরা কিন্তু বিনিয়োগকারীদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। সেই দুঃসময়ে সাধারন ইনভেস্টররা অনেক ধৈর্য ধরেছে। নিজেদের কে তারা নিজেরাই শক্তি যুগিয়েছে।তার পর আস্তে আস্তে বাজার টি আবারো তার স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে আসছিল। কিন্তু জুলাই এর শেষ আর অগাস্ট শুরু তে আবারো সেই ধস! গেলো ৭ কর্ম দিবস আবারো সেই ক্রাশ মুভমেন্ট চলছে বাজারে। আবারো অস্থির দেশের ২ পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরা আবারো আতংকিত হয়ে উঠেছে। ডি এস ছি প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভি ইতি মধ্যেই সরকারের অদূরদর্শিতার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

রেগুলারিটি নিয়ন্ত্রন করে কে? সরকার না বিনিয়োগকারী? এস এস ছি র আনাড়ি প্রেসিডেন্ট জিয়া উদ্দিন কে অপসারণ করে খাইরুল সাহেব কে নিয়োগ দেওয়া হোল। সদস্য হিসাবে চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন ( এফ ছি এ) কে নিয়োগ দেওয়া হোল। লাভ টা কি? বিড়াল কালো না সাদা তাতে দরকার নেই। বিড়াল শিকার জানেনা কিনা এটি বিবেচ্য। বিড়াল শিকার জানে। তবে বিড়াল কে যদি শিকারের লিমিটেশান বেঁধে দেওয়া হয় বিড়াল ঐ লিমিটের বাইরে শিকার করতে পারবেকি? তদন্ত রিপোর্টে যাদের নাম এসেছে তার বিচার করা সরকারের পক্ষে সম্ভব কিনা এটা আমরা সবাই জানি। ৯৬ এর সেই আওয়ামি পাপের পুঁজিবাজারের হোতাদের বিচার হয়নি। তারা আজ অতি উৎসাহী। আবারো সেই গ্যামব্লিং। সেই সাথে সরকারের নিরব ভুমিকা অতি রহস্যজনক।

আজ যখন আমি লিখছি ডি এস ই এর জেনারেল ইনডেক্স ৬১০০ এবং সি এস ই এর ইনডেক্স ১১১৫০ ( দুপুর ১২-২২)। তার মানে গেলো ডিসেম্বর মাসে যারা বিনিয়োগ করে তাদের শতকরা ৫০ ভাগ নাই। কিন্তু সেই অবস্থার উত্তরন কিন্তু হয়েছিলি জুলাই এর শুরুর দিকে। আবারো আশায় বুক বেধেছিল ইনভেস্টর রা। রিইনভেস্টে গিয়েছে অনেকে। কিন্তু মাত্র এক মাসে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার এমন কি পরিবর্তন হয়ে গেলো যে প্রতি দিন ২০০ করে ইনডেক্স কমছে? দেশে কি সুনামি হয়েছে? নাকি জাপানের মত মহা প্রলয়! ভূমিকম্প? না এমন কোন কিছুই হয়নি। বরং সত্য হচ্ছে এই আওয়ামীলীগ সরকার পুঁজিবাজার বান্ধব নয়। যেমন বাণিজ্য মন্ত্রনালয় কেমন যেন দেশের মানুষের মন বান্ধব নয়।

দুঃখের আসলে কোন শেষ নেই। পৃথিবীর কোন পুঁজিবাজার বাংলাদেশের মতন এমন উদ্ভট আচরন করে কিনা এটি কাউকে ব্যাখ্যা করার দরকার নাই। সকলেই জানে জাপানের ভূমিকম্পে সেই দেশ বিদ্ধস্ত হয়ে যাবার পর তার পরের ৭ দিনের মধ্যেই সেই দেশের শেয়ার বাজার ক্রাশ করে। কিন্তু সরকারের চরম সদিচ্ছায় মাত্র ১ মাসে আবার ঘুরে দাড়ায় জাপানের পুঁজিবাজার। বোম্বে সেন্সেক্স চরম ধস নামে এক সময়। কিন্তু সেই থেকে তারা বেরিয়ে আসে মাত্র ২ মাসে। এরূপ হাজার ও উদাহরণ তামাম পৃথিবীর পুঁজিবাজার। কিন্তু ব্যাতিক্রম কেবল এই দেশে। সেলুকাস! সব ই হজম হইয়া যায় একটি ১ টাকার প্রান হজম ক্যান্ডি খাইলে। এই হোল অবস্থা!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভয়াবহ এক দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আপনার সরকার। বলতে বাধা নেই। বাণিজ্য মন্ত্রী পৃথিবীর ইতিহাসে সব চাইতে অথর্ব এক ব্যক্তিত্বে পরিনত হয়েছে। তার ভাই আজিজ খানের আচরন গুলি ও সকলের জানা। কে পি সি এল আর সামিট পাওয়ার নিয়ে টাল বাহানায় চরম বিতর্কিত হয়েছে দেশের পুজি বাজার। আল্লার ওয়াস্তে একটু নজর দিন দেশের পুঁজিবাজারে। এই দেশের ২ কোটি মানুষকে বাঁচান। যদি এখনি লক্ষ্য না করেন তবে এই ২ কোটি মানুষের সামান্য কিছু ভোট কিন্তু বুমেরাং হতে পারে আপনাদের ভাগ্যে।
মা জননী- ভেবে দেখুন।

***
ফিচার ছবি: আন্তর্জাল