ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

মুজিব ছিলো মুজিব আছে মুজিব থাকবে!
ওই তো তাকে দেখা যায়!
মুজিব! মুজিব!
জনকের নাম এত সহজেই কি মোছা যায়?

আজ রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট।সেই কলংকিত কৃষ্ণ দিন। রক্তের অক্ষরে লেখা ধন্য সেই মহামানবের বিয়োগব্যথায় বিহ্বল হওয়ার শোকাবহ দিন। যাঁর নামের উপর রৌদ্র ঝরে। চিরকাল গান হয়ে নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা। যাঁর নামের উপর কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সেই পুরুষ তিনি। কে সেই জন? তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাংলা মায়ের সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের এই কৃষ্ণদিনে বাংলাদেশ হারিয়েছে তার স্রষ্টাকে। জাতি হারিয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিকে।আর আমরা হারিয়েছি আমাদের জনক কে। আজ বঙ্গবন্ধুর ৩৬ তম শাহাদাতবার্ষিকী, জাতীয় শোক দিবস। আজ সেই অন্তিম শোকার্দ্র বাণী পাঠের দিন।
“ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহি রাযেউন।”

সেদিন আকাশে শ্রাবণের মেঘ ছিল, ছিল না চাঁদ।

হ্যাঁ সত্যি সেদিন শ্রাবণের মেঘ ঢেকে দিয়েছিল পুরা বাংলাদেশকে। তবে সেই কৃষ্ণ মেঘ নিষ্ঠুর ভাবে গ্রাস করেছিল রাজধানী ঢাকাকে। আর সেই কৃষ্ণ কালো রাতে রচিত হয় ইতিহাসের সবচাইতে নির্মম নিষ্ঠুর জঘন্যতম ঘৃণ্য কলঙ্কিত এক হত্যা যজ্ঞের। একাত্তরের পরাজিত শক্তির ঘৃণ্য সর্বনাশা চক্রান্তে একদল ঘাতক পৈশাচিক ভাবে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে। সেই দানবের নিষ্ঠুর রক্তের হলি খেলার বলি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর পরিবার-পরিজনও। হায়েনারা সেদিন রচনা করেন ইতিহাসের সেই কলঙ্কিত অধ্যায়। ঘাতকচক্র সেদিন আমাদের জাতীয় ইতিহাসে যেই কলংকের কালিমা লেপন করেছিল সেই পথ ধরে জাতির জনকের নামটি মোছার অনেক অপচেষ্টা হয়। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, মিথ্যার ধুম্রজাল সৃষ্টি হয় মহান স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে কি ঢাকা যায় ইতিহাসের অমোঘ সত্যকে? তামাম বিশ্ব জানে বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ।বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা। সেই চরম সত্যটি বিধৃত হয়েছে কবিতায় এই ভাবে-

কফিনের দরজা খুলতেই চোখে পড়ল,শুয়ে আছেন একটি লোক,লোকটির নাম বাংলাদেশ। শেখ মুজিবুর রহমান।

কি ঘটেছিল ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্টের সেই কৃষ্ণ রাতে?

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী (রেসিডেন্ট পি এ) জনাব আ ফ ম মোহিতুল ইসলাম ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে সেই রাতের পুরো বর্ণনা করেছেন এই ভাবে-

১৯৭৫ সালে তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে কর্মরত ছিলেন। ১৪ আগষ্ট (১৯৭৫) রাত আটটা থেকে ১৫ আগষ্ট সকাল আটটা পর্যন্ত তিনি ডিউটিতে ছিলেন ওই বাড়িতে। ১৪ আগষ্ট রাত বারোটার পর ১৫ আগষ্ট রাত একটায় তিনি তাঁর নির্ধারিত বিছানায় শুতে যান। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম তা খেয়াল নেই। হঠাৎ টেলিফোন মিস্ত্রি আমাকে উঠিয়ে (জাগিয়ে তুলে) বলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনাকে ডাকছেন। তখন সময় ভোর সাড়ে চারটা কী পাঁচটা। চারদিকে আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু ফোনে আমাকে বললেন, সেরনিয়াতের বাসায় দুস্কৃতকারী আক্রমণ করেছে। আমি জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করলাম। অনেক চেষ্টার পরও পুলিশ কন্ট্রোল রুমে লাইন পাচ্ছিলাম না। তারপর গণভবন এক্সচেঞ্জে লাইন লাগানোর চেষ্টা করলাম। এরপর বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে নিচে নেমে এসে আমার কাছে জানতে চান পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে কেন কেউ ফোন ধরছে না। এসময় আমি ফোন ধরে হ্যালো হ্যালো বলে চিৎকার করছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু আমার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বললেন আমি প্রেসিডেন্ট বলছি। এসময় দক্ষিণ দিকের জানালা দিয়ে একঝাঁক গুলি এসে ওই কক্ষের দেয়ালে লাগল। তখন অন্য ফোনে চিফ সিকিউরিটি মহিউদ্দিন কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। গুলির তান্ডবে কাঁচের আঘাতে আমার ডান হাত দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। এসময় জানালা দিয়ে অনর্গল গুলি আসা শুরু হলে বঙ্গবন্ধু শুয়ে পড়েন। আমিও শুয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ পর সাময়িকভাবে গুলিবর্ষণ বন্ধ হলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। ওপর থেকে কাজের ছেলে সেলিম ওরফে আবদুল বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবী ও চশমা নিয়ে এলো। পাজ্ঞাবী ও চশমা পরে বঙ্গবন্ধু বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বললেন আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি এত গুলি চলছে তোমরা কি কর? এসময় শেখ কামাল বলল আর্মি ও পুলিশ ভাই আপনারা আমার সঙ্গে আসুন। কালো পোশাক পরা একদল লোক এসে শেখ কামালের সামনে দাঁলো। আমি (মোহিতুল) ও ডিএসপি নূরুল ইসলাম খান শেখ কামালের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নরুল ইসলাম পেছন দিক থেকে টান দিয়ে আমাকে তার অফিস কক্ষে নিয়ে গেল। আমি ওখান থেকে উঁকি দিয়ে বাইরে দেখতে চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি গুলির শব্দ শুনলাম। এসময় শেখ কামাল গুলি খেয়ে আমার পায়ের কাছে এসে পড়লেন। কামাল ভাই চিৎকার করে বললেন, আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল, ভাই ওদেরকে বলেন।

মোহিতুল ইসলামের এজাহারের বর্ণনায় আরও বলেন-

আক্রমণকারীদের মধ্যে কালো পোশাকধারী ও খাকি পোশাকধারী ছিল। এসময় আবার আমরা গুলির শব্দ শোনার পর দেখি ডিএসপি নূরুল ইসলাম খানের পায়ে গুলি লেগেছে। তখন আমি বুঝতে পারলাম আক্রমণকারীরা আর্মির লোক। হত্যাকান্ডের জন্যই তারা এসেছে। নূরুল ইসলাম যখন আমাদেরকে রুম থেকে বের করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন তখন মেজর বজলুল হুদা এসে আমার চুল টেনে ধরলো। বজলুল হুদা আমাদেরকে নিচে নিয়ে গিয়ে লাইনে দাঁড় করালো। কিছুক্ষণ পর নিচে থেকে আমরা বঙ্গবন্ধুর উচ্চকণ্ঠ শুনলাম। বিকট শব্দে গুলি চলার শব্দ শুনতে পেলাম আমরা। শুনতে পেলাম মেয়েদের আত্মচিৎকার, আহাজারি। এরইমধ্যে শেখ রাসেল ও কাজের মেয়ে রুমাকে নিচে নিয়ে আসা হয়। রাসেল আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে মারবেনা তো। আমি বললাম না তোমাকে কিছু বলবে না। আমার ধারণা ছিল অতটুকু বাচ্চাকে তারা কিছু বলবে না। কিছুক্ষণ পর রাসেলকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে রুমের মধ্যে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরপর মেজর বজলুল হুদা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর ফারুককে বলে, অল আর ফিনিশড।

অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ফারুক রহমানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেন-

খোন্দকার মোশতাকের নির্দেশে তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তিনি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অভিযান পরিচালনা করেন। ওই বাসভবনে অভিযানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন তিনি। অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল রশিদ দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গভবনে, অবসরপ্রাপ্ত মেজর ডালিম ছিলেন বেতার কেন্দ্রে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সামরিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বন্টন করেছেন তিনি (ফারুক) নিজেই।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ তিনটি বাড়িতে সংঘটিত খুনিদের এমন নারকীয় পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের এমন ভয়াল বীভৎসতার হৃদয় স্পর্শী বর্ণনা দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ পিএসসি। তার বর্ণনায় তিনি ব্যক্ত করেন এইভাবে-

কী বীভৎসতা! রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাচ, মেঝে ও ছাদে। রীতিমতো রক্তগঙ্গা বইছে যেন ওই বাড়িতে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র। প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর পড়ে আছেন ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া চেক লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরা স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু লাশ। তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। নিথর দেহের পাশেই তাঁর ভাঙ্গা চশমা ও অতিপ্রিয় তামাকের পাইপটি। অভ্যর্থনা কৰে শেখ কামাল, টেলিফোন অপারেটর, মূল বেডরুমের সামনে বেগম মুজিব, বেডরুমে সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, নিচতলার সিঁড়ি সংলগ্ন বাথরুমে শেখ নাসের এবং মূল বেডরুমে দুই ভাবির ঠিক মাঝখানে বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলের লাশ।

ইতিহাসের এই রাখাল রাজা নিজের জন্য কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখেননি কোনদিন। বঙ্গবন্ধু খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন স্বাধীন দেশের কোন বাঙালী তাঁর নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না।আর সে জন্যই একজন প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গভবনের পরিবর্তে থাকতেন তাঁর প্রিয় ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর ধানমন্ডির সেই চরম অরক্ষিত বাড়িটিতে। বাঙালীর স্বাধীকার, স্বাধীনতা, আন্দোলন সংগ্রামের এই তীর্থ ভূমী তুল্য বাড়িটি অসম্ভব প্রিয় ছিল বঙ্গবন্ধুর। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ছিল তাকে কোনো বাঙালি হত্যা করবে না। বাস্তবিক পক্ষেও বিষয় টি তেমন ই দাড়ায়। তাইতো খুনিদের প্রথম গ্রুপটি তার চরম ব্যক্তিত্বের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় দলটি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। প্রথম আক্রমণে আসা মেজর মহিউদ্দিন বঙ্গবন্ধুকে বারবার আত্মসমর্পণ করার অনুরোধ জানান। মহিউদ্দিনকে থামিয়ে বঙ্গবন্ধু কয়েকটি টেলিফোন করেন। পরে মেজর বজলুল হুদাকে সিঁড়িতে দেখে বঙ্গবন্ধু গর্জে উঠে বলেন-

এই তোরা কি চাস?

মেজর হুদা জবাব দেন-

স্যার আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।

বঙ্গবন্ধু আবারো গর্জে উঠেন। বলেন-

তোদের এত বড় সাহস? পাকিস্তান আর্মি আমাকে মারতে পারেনি। আমি জাতির পিতা। বাঙালি জাতি আমাকে ভালোবাসে। আমি তাদের ভালোবাসি।

হুদা বলেন-

স্যার এসব নাটকীয় কথা বন্ধ রাখুন। আমাদের সঙ্গে চলুন।

হুদার এই বক্তব্যের পর বঙ্গবন্ধু নমনীয় হন। বঙ্গবন্ধু বলেন-

আমি যাব। আমার তামাক আর পাইপটা নিয়ে আসি।

বঙ্গবন্ধু আবার শোয়ার কক্ষে প্রবেশ করেন। তার পেছনে মেজর হুদা ও মহিউদ্দিন। তিনি রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়িতে পা রাখতেই গুলি ছোড়ে মেজর নূর। একই সময় শেখ মনির বাড়ি থেকে অপারেশন শেষ করে আসে রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন। কারো কারো মতে গুলি করেছে মুসলেহ উদ্দিন। আবার কারো মতে, মেজর নূরই বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে।

ইতিহাসের মহানায়ক তিনি তো জনগনের নেতা। জনগণের খুব কাছে থাকতে চাইতেন বঙ্গবন্ধু। ব্যক্তি জীবনে চরম সাদাসিদে জীবনযাপন করতেন। পোশাক হিসাবে ব্যবহার করতেন পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। সারাটি জীবন দেশের জন্য নিবেদিতপ্রান এই মহা মানব কোন সময়ই ব্যক্তি নিরাপত্তা কে প্রাধান্য দেননি। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তাকে বার বার সতর্ক করে দিলেও নিজ নিরাপত্তা নিয়ে কখনো তিনি চিন্তা করেন নি। কে মারবে তাকে? এত বড় হিম্মত কার? পাক বাহিনীরা যার এক চুল ক্ষতি সাধন করতে পারেনি,ফাসির হুকুম দিয়েও বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের এক চুল টনক নাড়াতে পারেনি যেই পাক বাহিনী। আর যেই দেশের জন্য তার সারাটি জীবনের জন্য সংগ্রাম সেই দেশের মানুষ তাকে হত্যা করবে? তাই তিনি ইন্দিরা গান্ধীর ঐরকম সতর্ক বার্তায় হেসেছেন। কিন্তু দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারী তথা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এদেশীয় দোসরদের চরম বিশ্বাসঘাতকতার কাছে জাতির জনকের বিশ্বাসের দৃঢ় প্রত্যয় ভেঙে পড়েছিল ১৫ আগস্টের সেই নৃশংস কালরাতে। কিন্তু জনক যদি সেদিন নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে বাস করতেন সেনাবাহিনীর বিচ্ছিন্ন কিছু লোক কিছুতেই তাকে সেইদিন হত্যা করতে পারত না। বাংলাদেশ কিছুতেই অভিভাবকহীন হতো না।

সেইদিন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী রক্ত পিপাসু নর ঘাতকের দল শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি। নিষ্ঠুর কায়দায় একে একে হত্যা করে- বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, বঙ্গবন্ধুর অনুজ পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ নাসের, ভগ্নিপতি পানি সম্পদমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ছেলে আরিফ ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু, ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবি সেরনিয়াবাত, আবদুর নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলসহ কয়েক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী। বঙ্গবন্ধু ও তার স্বজনদের রক্তে সেদিন পুরো বাড়িটি হয়েছিল প্লাবিত। ১৫ আগস্ট সুবেহ সাদেকের সময় পবিত্র আজানের ধ্বনিকে ম্লান আর বিদীর্ণ করে দেয় ঘাতকের স্টেইন গানের ঝাঁঝালো সেই গুলি। বারুদের গন্ধে ভরে যায় গোটা ধানমণ্ডি। ঘাতকদের মেশিনগানের ঝাঁক ঝাঁক গুলিতে শেষ হয়ে যায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার এক অপূর্ণ মহৎ স্বপ্ন।

বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনঃ

আসলে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কয়েক হাজার পৃষ্ঠা লিখেও শেষ করা সম্ভব নয়। রাজনীতির এই মহাকবি বঙ্গবন্ধু বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন দিয়ে রচনা করেছেন স্বাধীনতা নামক মহাকাব্য। স্বাধীনতার ইতিহাসে তার অবস্থান সর্বোচ্চ । ১৯৭১ সালে এই মহানায়ক বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নির্যাতিত নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখান। শুধু স্বপ্ন নয় সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীনতার পথ নির্দেশনা দেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক এবং ইতিহাসের সেই দুর্লভ ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। ৭ই মার্চের সেই অগ্নিঝরা সময়ে রেসকোর্স ময়দানে বজ্র কণ্ঠে রাজনীতির এই মহাকবি শুনায় তার বানী-

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

সঙ্গত কারনে পৃথিবীর ইতিহাসে ঐ ভাষণটি আজও এক শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তার সেই প্রবল জ্বালাময়ী বক্তৃতায় নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে উজ্জীবিত করেছিল। আজ আমরা যেই স্বাধীন দেশে বসবাস করছি, স্বাধীনতার সুঘ্রাণ উপভোগ করছি, বিশ্ব দরবারে স্বাধীন জাতি হিসাবে এই দেশের যে পরিচয়, সেই সার্বভৌম রাষ্ট্রের কোনটিই সম্ভব হতো না যদি বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হোতো! তিনি সর্বপ্রথম বাঙালিকে বুঝাতে সক্ষম হন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সর্বোপরি বাঙালি জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে হবে। আর এই আলোকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানিদের তাদের অধিকার আদায়ে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। নিজের অসাধারন প্রজ্ঞা, মেধা, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, ত্যাগ, জনগনের প্রতি আস্থা এবং অকৃত্রিম ভালবাসা সেই সাথে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালিকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেন বঙ্গবন্ধু।

দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে মৃত্যু তার প্রতি পদে পদে তাড়া করলেও এই অকুতোভয় বীর পরোয়া করেনি কোন কিছুকে। পাকিস্থানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ তেইশটি বছর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রনায়ক। যৌবনের প্রায় অধিকাংশ সময় টি তিনি কাটিয়েছেন পাকিদের অন্ধকার কারাগারে। নিজের সব চাওয়া পাওয়া বিসর্জন দিয়ে আমৃত্যু এই বীর ভেবে গেছেন দেশের মানুষ দের নিয়ে। তিনি যেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্বপ্ন দেখেছিলেন আর সেই সাথে অসহায় আর নির্যাতিত নিপীড়িত পূর্ব পাকিস্থানি বাঙালি দের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সেই স্বপ্নর সফল সমাপ্তি ঘটান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদ্বয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের। যেই পাকিস্তানিরা মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাস বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে বন্দী রেখেও জল্লাদরা বঙ্গবন্ধুর কেশাগ্র পর্যন্ত স্পর্শ করার সাহস দেখাতে পারেনি। সেই পাকিস্থানের হাত থেকে চির মুক্তি দিয়ে যেই মহানায়ক আমাদের মুক্ত করলো সেই দেশের মানুষ তার জাতির পিতাকে হত্যা করলো। ছি, পৃথিবীর সব অশ্লীল ভাষা আর সব ঘৃণা ওদের জন্য।

জাতির জনককে হত্যা করেই সেইদিন ঘাতকরা খ্যান্ত হননি। ইতিহাসের জঘণ্যতম বর্বর হত্যাকান্ড ১৫ আগষ্ট হত্যাকাণ্ডকে বিচারের আওতামুক্ত রাখতে খোন্দকার মোশতাক ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করেন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। পরবর্তীতে জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তার অনুগত জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী পাস করিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট হতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত জারি করা সকল সামরিক আইন-বিধি কার্যক্রমকে বৈধতা দেন। শুধু তাই নয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দায়ে যাদের বিচার হবার কথা, সেই খুনিদের আখ্যায়িত করা হলো ‘সূর্যসন্তান’ বলে! পুনর্বাসন করা হলো উচ্চপদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে। জেনারেল জিয়া এবং এরশাদের সামরিক ও অসামরিক অবস্থানের সরকার তা বহাল রাখল বহু বছর। এরপর থেকে ক্ষমতাসীন কোন সরকারই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়নি, বরং খুনিদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে এমনকি পুরস্কৃতও করেছে।

যুগে যুগে পৃথিবীর বহুদেশে রাজনৈতিক হত্যা সংঘটিত হলেও সেই সব হত্যার বিচার হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, আব্রাহাম লিংকন, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল লিয়াকত আলী খান, বেনজির ভুট্টো, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসা পর্যন্ত বহু রাজনৈতিক নেতা হত্যার ইতিহাস এখনও জলন্ত। এমনকি জন এফ কেনেডির হত্যাকারী লি হার্ভে অসওয়াল্ডকে মেরে ফেলার জন্যও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে জ্যাক রুবিকে।কিন্তু বাংলাদেশে হয় উল্টো। এখানে বিচারের বানী নিভৃতে কেদেছে বহুকাল। বিশ্বাসঘাতক মোশতাক জিয়া গং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো ঘৃণ্য আইন জারি ও তা বহাল রাখল দীর্ঘ ২১ বছর। কি ভয়ানক ২০০১ সালে বি এন পি ক্ষমতায় এসে জাতীয় শোক দিবস এবং ছুটি বাতিল করে। আর জাতির পিতার শাহাদাৎ বার্ষিকীতে খালেদা জিয়া শিপন শাড়ী পরে খ্যামটা নাচ নেচে বিকৃত রুচিহীন আর নির্লজ্জ ভাবে বানোয়াট জন্মদিন পালন করে। ছি।
বিশ্বের ইতিহাসে এত নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের নজির নেই বললেই চলে। তবুও কী আশ্চর্য, এই ভয়ঙ্কর হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানোর জন্য ৩৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। জাতি দেখেছে এই দীর্ঘ সময়ে নিষ্ঠুর সেই সব ঘাতকদের প্রকাশ্য পুরস্কৃত করার ঘৃণ্য চিত্র।প্রকৃতির প্রতিশোধ বড় নির্মম। খন্দকার মোশতাক আর জিয়ার মৃত্যু কি ভাবে হয়েছিল সেটি জাতি দেখেছে।

২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি মধ্যরাত ।জাতি কিছুটা কলঙ্কমুক্ত হোল সেই দিন। রাত ১ টার মধ্যেই কার্যকর হয়েগেল ৫ খুনির মৃত্যুদণ্ডাদেশ । ওদের ফাঁসির পরে যখন কফিন নিয়ে যাওয়া হয় তখন দেখা গেল হাজার হাজার মানুষ সেই কফিনে জুতা নিক্ষেপ করছে। থু থু মেরেছে। সেদিন প্রায় সারারাত জেগেছিল বাংলাদেশ।পরের দিন ২৮ শে জানুয়ারি গোটা দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু জাতি পুরোপুরি কলঙ্কমুক্ত হয়নি আজও। জনক ও তার পরিজন হত্যাকারী আরও পলাতক ৬ খুনি লে. ক. (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশীদ, মেজর (বরখাস্ত) শরীফুল ইসলাম ডালিম, মেজর (অব.) নূর চৌধুরী, রিসালদার মোসলেহউদ্দিন, লে. ক. (অব.) রাশেদ চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন (অব.) মাজেদকে এখনো পালিয়ে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। যতদিন পর্যন্ত ঐ বাকি জানোয়ার গুলিকে ফাঁসির দড়িতে না ঝুলানো যাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত জাতি একেবারে কলঙ্কমুক্ত হতে পারবেনা।

আজ জাতীয় শোক দিবসে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছে গোটা জাতি। আমরা নূতন প্রজন্ম আমাদের দায়িত্ব রয়েছে বহু। সঙ্গত কারণেই নবীণ প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে নিজের জীবনের চাইতেও যে মানব দেশ আর দেশের মানুষকে ভালবেসে গেলেন, নিশ্চিত ফাসির আদেশ জেনেও যিনি পাকিস্তানি কারাগারে বসে আপোষ করেননি স্বাধীনতার প্রশ্নে, যার জীবনের স্বরনালি সময়টুকু কাটিয়েছেন জেলে, বারবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যিনি চেয়েছিলেন এ দেশের স্বাধীনতা আর জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক মুক্তি, এ জাতি তারই উত্তরসূরি। আমরা সেই জাতির সন্তান। আর সেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। যিনি ১৫ আগস্ট সেই কৃষ্ণ রাতে ঘাতকদের মেশিনগানের মুখেও ছিলেন অকুতোভয়! বীরের মতন ঘাতকের দিকে চেয়ে হুংকার দিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন-

তোরা কী চাস,কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?

সেই সিংহ হৃদয় আর লৌহ মানবের মিশেলে প্রখর ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুর দৈহিক বিনাশ ঘটলেও তার আদর্শের বিচ্যুতি ঘটতে পারেনা। তার মৃত্যু নেই। চিরঞ্জীব সেই মহামানব।মানুষ মরে যায়, কিন্তু আদর্শ মরে না। বঙ্গবন্ধু শুধু মাত্র একজন ব্যক্তি নয়।বঙ্গবন্ধু হাজার জনমের বর্ণীল আর স্বপ্নিল আদর্শের অন্য আর এক নাম। অবিনশ্বর সেই আদর্শ।সেই আদর্শে চলুন এগিয়ে যাই। ঘাতকের বুলেট আমাদের জাতির জনক কে কেড়ে নিয়ে ভেবেছিল আমাদের মাঝ থেকে বঙ্গবন্ধুকে কেড়ে নিয়েছে। তার আদর্শ আর দেশ প্রেম কেড়ে নিয়েছে। ঐ সব নির্বোধরা বোধ হয় জানেনা-

“ভালবাসায় যারা বেঁচে রয়, মৃত্যু তাদের ছোঁয় না।”

তথ্য সূত্রঃ
সকল তথ্য নেওয়া হয়েছে ডঃ মিজানুর রহমানের হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু নামক গ্রন্থ থেকে।
দৈনিক সমকাল ও দৈনিক জনকণ্ঠ থেকেও কিছু তথ্য নেওয়া হয়েছে।
লেখার ভেতরের কবিতার পংতি গুলি সংগৃহীত।
কোটেশন গুলি হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে।