ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

গতকাল বিকালে হঠাৎ করেই শুরু হল এক পশলা বৃষ্টি। অফিসের জানালার ভারটিকেল খুলে দেখছিলাম বাইরের রিম ঝিম বৃষ্টি ঝরার অপরূপ দৃশ্য। বৃষ্টির প্রতি আমার দুর্বলতা সেই ছোট্ট বেলা থেকে। সেদিনের সেই সব দিন গুলোতে বৃষ্টি এলেই আমাকে পায় কে? কাদা জ্বলে ভিজে একাকার। বাবার আদর কিন্তু মায়ের বকুনি আর মাঝে মাঝে দুই এক চড় থাপ্পড় খেয়েও বৃষ্টিতে ভিঝেছি যে কত বার তার হিসাব নেই। জানালা দিয়ে যখন উকি মেরে বৃষ্টি দেখছিলাম তখন শৈশবের কথা গুলো বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিল। ল্যাপটপে খুব আস্তে বাজছিল শাকিলা জাফরের এই গান টি-

“ কতদিন বৃষ্টি দেখিনি, শুনিনি রিমঝিম গান। কত দিন মেঘের ভেলায় ভেসে, যায়নি ছুটে উতলা প্রাণ”।

বেশ ভালই লাগছিল। কিন্তু সেই বৃষ্টি খুব বেশি সময় কাদেনি। ২০ মিনিট পর পূব আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। দেখলাম হাল্কা একটা রংধনু। আরে বাহ এই মাত্র বৃষ্টি তার পর আবার রংধনু! সোনায় সোহাগা। যাই হোক সন্ধ্যা হতে বাকি নেই। ভাবলাম মাগরিবের নামাজের পর বের হব। সন্ধ্যা ৭ টার আগে আমার দপ্তর থেকে বের হলাম। শরীর টা কেমন যেন ম্যাজ ম্যাজ করছে। চা- কফি খেলে ভালই হয়। এই ভেবে পা বাড়ালাম রাস্তার দিকে। কিন্তু দুই পা বাড়াতেই দেখলাম একজন বৃদ্ধ বড় একটা চায়ের ফ্লাক্স নিয়ে সামনে দাঁড়ানো। বলছে চা খাবেন বাবা।

বৃষ্টিতে রাস্তা একটু ভিজে গেছে। স্যাত স্যাতে কাদা ও দেখা গেল। তাই চা খেতে দূরে আর যেতে মন চাইলনা। সামনে ভ্রাম্যমাণ চা ওয়ালা চাচার কাছ থেকে চা খেলে মন্দ হয়না। উনাকে বললাম দেন তো এক কাপ।চাচা আর দেরি করলেন না। তাড়াতাড়ি কাপ ধুয়ে এক কাপ চা দিলেন আমার হাতে। পাশেই আমার এক বন্ধুর দোকান। বললাম বসেই খাই। চা খাচ্ছি। ভালই লাগছিল। কিন্তু চা ওয়ালা চাচা হঠাৎ করে আমার কাছে প্রশ্ন করলো “বাবাজি আপনার বাবা মা আছে?” আমি বললাম “বাবা নেই, মা আছে।“ তিনি বললেন বাবা মার দিকে খেয়াল রাখবেন। তাদের মনে কষ্ট দিবেন না। উনার কথায় আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ঠিক বুঝলাম না কেন তিনি এটি বললেন। তবে উনার মধ্যে এক ধরনের চাপা কষ্ট অনুভব করলাম। বললাম “চাচা আপনার কে কে আছে?” উনি “বললেন আমার কেউ নেই।“ কেউ নেই শুনে আমি ভাবলাম আসলে কেউ নেই। চা খাওয়া শেষ। আমি মানি ব্যাগ দিয়ে টাকা বের করে তার হাতে দিলাম। তিনি ২ টি চায়ের দাম ৬ টাকা রেখে বাকি টাকা আমার হাতে দিলেন। আমি তার হাতে ৫০ টাকার নোট দিয়েছিলাম। আমাকে যখন ৪৪ টাকা ফেরত দিল তখন আমি বললাম চাচা ফেরত দিতে হবেনা। আপনি নিয়েনেন বাকি টাকা। উনি বললেন আমি কাজ করে খাই, ভিক্ষা করে খাইনা। তাই এই টাকা নেবনা।

কথা বলতে বলতে করিম আলি এক সময় বিষণ্ণ হয়ে যায়।

উনার কথায় আমার মেজাজ টা একটু খারাপই হল। ভাবলাম উনি বোধহয় ভাব দেখাচ্ছেন। আমি বললাম ঠিক আছে দেন আমার টাকা। এই বলে ৪৪ টাকা আবারো ফেরত নিলাম। কিন্তু উনি বুঝতে পারলেন আমি মাইন্ড করেছি। তাই তিনি বললেন “ বাবা মনে কষ্ট নিয়না। যাদের দেওয়ার কথা তারাই দেয়না। আর তুমি আমার কেউ হও না। তোমার কাছ থেকে কেন নেব?” আমি ঠিক বুঝলাম না কি বুঝাতে চাইলেন আমাকে। তবে বুঝলাম এক ধরনের ক্ষোভ আছে তার মনে। আমি আবারো বললাম “চাচা আসলে কি কেউ নেই আপনার?” এইবার তিনি বললেন যে ছিল সে ১৭ বছর আগে চলে গেছে ( স্ত্রী)। আর দুই রত্ন আছে। দুই রত্ন বলতে তিনি তার ২ টি ছেলের কথাই বললেন। আমি বললাম তারা কোথায় থাকে? চাচা বললেন “ একজন পাথর ঘাটায় ইলিশ মাছের ব্যবসা করে আর একজন চট্টগ্রাম কাঠ মিস্ত্রীর কাজ করে”। বললাম আপনি এই খানে কেন? ছেলেদের কাছে থাকেন না কেন? এই কথা বলতেই তিনি হাউ মাউ করে কেদে উঠলেন। বললেন আমি ওদের বোঝা। বোঝা কে বৈতে চায়? আমি শুনে অবাক কি বললেন উনি? বাবা সন্তানের কাছে বোঝা! ভাবতেই নিজের কাছে ঘৃণা লাগছে। আমি বললাম আপনার কাছে ওরা কেউ আসেনা? উনি বললেন বড় জনের সাথে ৭ বছর দেখা হয়না। আর ছোট জন গত বছর এসেছিল এক বার। ২ ঘণ্টা থেকেই আবার পাথঘাটায় চলে যায়”

করিম আলি টাকা গুনে দেখছেন যেটি পেলেন সেটি দিয়ে ৩ বেলা ভাত জুটবে তো?

আমি কি আসলে ঠিক শুনছি? প্রায় ৮০ বছরের এই বৃদ্ধ বাবার দুটি সন্তান থাকতেও চা বিক্রি করে। কিছুই যে মাথায় আসেনা। আমি বললাম চাচা একটু খুলে বলবেন আপনার জীবন সম্পর্কে? উনি বললেন সেই গল্প বলে শেষ করা যাবেনা। তার পর বলা শুরু করলেন এই ভাবে-

আমি ব্রিটিশ দেখেছি। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করিনি তবে মুক্তি যোদ্ধাদের আমি রান্না করে খাইয়েছি ৭ মাস। আমি একজন জেলে ছিলাম। ট্রলারে বঙ্গোপসাগরে যেতাম ইলিশ মাছ ধরতে। ভালই ছিলাম। আমার প্রথম সন্তানটি জন্মের সময় মারা যায়। সেটি কন্যা ছিল। পরে আরও দুটি পুত্র সন্তান হয়। ওদের লেখা পড়া শিখাতে চেয়েও পারিনি। একজন আমার আগের ব্যবসা মাছ ধরার পেশায় জড়িত। অন্য জন মিস্ত্রী। ১৯৯৫ সালে কি এক অসুখে আমার স্ত্রী মারা যায়। তার পর সন্তানদের বিয়ে দেই। কিন্তু বিয়ের পর ওরা আর আমাকে সহ্য করতে পারেনা। এক সময় আমি একজনের বাড়িতে ১৫ দিন খাই আর বাকি ১৫ দিন অন্য এক ছেলের ঘরে খাই। এই ভাবে চলতে থাকে বছর খানেক। এর মধ্যে ওদের ঘরে সন্তান জন্ম নেয়। তার পর আমার দুই পুত্রের পুত্র বধূরা আমাকে বলে আপনাকে আর আমরা খাওয়াতে পারবোনা। আপনি একটি দোকান দেন। এই কথা আমি আমার দুই পুত্র কে বললাম। কিন্তু তারা তাদের বৌ দের কথার উপর কোন কথাই বললেন না। তাই এক সময় মনে কষ্ট নিয়ে ভোলা থেকে কাউকে না বলে খুলনায় চলে আসি। কিন্তু কি করবো? কোন কাজ পাইনা। এক সময় হোটেলে বাবুর্চির কাজ করি কিছুদিন। তার পর রিক্সা ও চালাই। কিন্তু শরীর এখন আর চলেনা। তাই চা বিক্রি করি। ২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে রেল কলোনির বস্তিতে একটি রুম নিয়েছি। ফজরের আজান দিলে উঠি। তার পর চুলা জালাই। চা বানাই। এক ফ্লাক্সে যা ধরে সেটি নিয়েই বেরিয়ে পড়ি। তার পর দুপুর পর্যন্ত বেচি। মাঝে মাঝে শরীর ভীষণ খারাপ লাগে। তখন আমি কোন মসজিদের বারান্দায় গিয়ে ঘুমিয়ে যাই। একবার এই ঘুমের জন্য আমার ফ্লাক্স টি চুরি হয়ে গিয়েছিল। দুপুরে বাসায় গিয়ে শরীরে কুলালে রান্না করি। শুধু ভাত আর আলু ভর্তা। চা বেচে দিনে ১০০ টাকার বেশি থাকেনা। চিনি আদা আর গরম মসলার দাম অনেক বেশি। কোন মতে দিন যায়। মাঝে ১৪ দিন জ্বরে বিছানায় পড়ে ছিলাম। পাশের এক দয়াবান রিক্সা ওয়ালা আমার সেবা করে কিছুদিন। আমাকে ১৪ দিন খাবার ও দেয়। যদি শরীরে জুত বুঝি তবে সন্ধ্যার পর আর একবার বের হই চা বেচতে। আসলে যে টাকা পাই সেটি দিয়ে ঘর ভাড়া আর ৩ বেলা খাবার জুটানো যায়না। তাই মাঝে মাঝে বাড়তি আয়ের জন্য ২ বেলা চা বেচি। আমার সন্তানরা কেউ আমার খোজ নেয়না।

সুস্থ সবল এই লোকটি এসেছে ভিক্ষা চাইতে! আমি ওকে ভিক্ষা দেইনি। করিম আলি যদি এখন ভিক্ষা করে তবে সে প্রতিদিন ২০০ টাকা পাবে। কিন্তু তিনি সেটি না করে এখনও চা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সালাম করিম আলি তোমাকে। শ্রদ্ধা তোমাতে।

আমি কথা শুনে হতবাক হয়ে যাই। মনে হচ্ছিল ওই দুইটি কুলাঙ্গার কে আমার সামনে পেলে গুনে গুনে ১০ টা চড় মারতাম দুই গালে। ধিক্কার জানালাম ওদের। ওদের সন্তান রা যদি দুই বেলা খেতে পারে তবে এই বৃদ্ধ বাবা কেন পারবেনা? আমি ও এক সন্তান। তবে আমার ও লজ্জা হচ্ছিল ওই দুইটি ইবলিশ মার্কা সন্তান এর নাম শুনে। গোটা সন্তান জাতির নাম অপবিত্র করলো ওরা। কি ভাবে সম্ভব এটি? যে বাবা মার জন্য এই পৃথিবীর আলো দেখলাম। ভোগ করছি অপরূপ এই পৃথিবীর রং রূপ রস গন্ধ। আর সেই জন্মদাতা পিতার কোন খোজ নেয়না তার সন্তান রা। ছি এমন সন্তান দুনিয়ার বুক থেকে মহান আল্লাহ উঠিয়ে নিয়ে যাক। আমি ভিতরে ভিতরে বেশ ক্ষেপে যাচ্ছিলাম। বললাম চাচা বরগুনার এস পি আমার ভগ্নি পতি। আপনি ওই হারামজাদার ঠিকানা দেন। ওরে ধরে নিয়ে আসি। চাচা কেঁদে বলল না বাবা ওরা সন্তান হয়ে ভুল করে ফেললেও আমি বাবা হয়ে ভুল করতে পারিনা। ওরা ভাল থাক। আমি মনে মনে বললাম কুলাঙ্গার সন্তানরা তোরা দেখ তোদের বাবা কি করলো তোদের জন্য।

এক সময় চাচা বলল আমি উঠি বাবা। আর ১০ কাপ চা থাকতে পারে। এটি বেচে আসি। আমি বললাম আপনি বসেন। সব চা আমাকে দেন। চাচা বলল পাগল নাকি তুমি ১০ কাপ চা কেউ খায়? আমি বললাম হা খায়। এই বলে হাদিস পার্কে কত গুলো টোকাই দেখতে পেলাম। ওদের ডেকে বললাম তোরা চা খাবি? ওরা রাজি হয়ে গেল। এক সময় আমি বললাম চাচা এই টাকা টা নেন। এই বলে ৫০০ টাকা তার হাতে দিতে চাইলাম। তিনি বললেন না। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। এত অভাব কিন্তু অন্তরে কোন লোভ নেই! মানুষ এমন হয়? যে তিন বেলা ঠিক মতন খেতে পায়না সে ৫০০ টাকার কোন লোভ করলনা। আমি হতভম্ব হয়ে যাচ্ছি। বার বার জোর করেও ১০ কাপ চা এর দাম ৩০ টাকার বেশি দিতে পারিনি তার হাতে। একসময় উনি বললেন এখন চলে যাব বাবা। আমি বললাম চাচা আপনি কোন সমস্যায় পড়লে আমাকে স্মরণ করেন বলে একটি দোকান দেখিয়ে দিলাম। বললাম এই দোকানে এসে আমাকে খুঁজলে আমাকে পাবেন। আমি না থাকলেও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। চাচা বললেন ঠিক আছে।

এই বলে তিনি হেটে চললেন তার গন্তব্যর দিকে। পিচ ঢালা রাজপথ মাড়িয়ে এক সময় তিনি পৌঁছে গেলেন তার ঠিকানায়। সবাই তো ঘরে ফেরে। উনি ও ফিরলেন তার শান্তির নীড়ে। অতি অর্থের জন্য যাদের রাতের ঘুম হারাম সেখানে করিম আলী নিঃস্ব হয়ে ও রাতে ঘুমাতে পারে। করিম আলী কাল ভোরে ও উঠবে। আবারো চা বানাবে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বলবে চা গরম চা গরম। এই ভাবেই কেটে যাবে হাজারো করিম আলির জীবন। এক করিম আলির গল্প না হয় আমি জানি। বাকি সব করিম আলিরা কেমন আছে?

কেউ কি জানি?
———————————
২১ শে সেপ্টেম্বর ২০১১
রাত ১২-৩০
খুলনা।