ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

জীবন নাটকের চাইতেও নাটকীয়। জীবন থেকে যেই ঘটনা গুলো নিয়ে সাদা কাগজের প্রতিটি পাতায় পাতায় ভরে ফেলা হয় অদ্ভুত সব চিত্র নাট্যে, আর তাতে রং মেখে ফানুস সেজে রঙ্গমঞ্চ কে রাঙিয়ে তুলে আমাদের আনন্দ দেওয়া হয়। তবে সেই আনন্দের মধ্যেও মাঝে মাঝে একটি ম্যাসেজ থাকে। যেটি হয়তো কেউ ধরতে পারে আবার কেউ ধরতে পারেনা। আমার কাছে তাই মনে হয় গল্প, নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের যেই সব দৃশ্য গুলো আমাদের হাসায় বা কাদায় সেই সব রং মাখা গল্প কাহিনীর চেয়েও আমাদের জীবন কাহিনী অনেক বেশি বৈচিত্র্য ময়। এবং কখনো কখনো সেটি বরং আর বেশি গুরুত্ব বহন করে। আজ আমি একটি গল্প বলছি। তবে এই গল্পে কোন অবাস্তবতার রং মাখা হয়নি। গল্পের প্রয়োজনে কোন অতিরিক্ত কাহিনীও লেজুড় করা হয়নি। বরং অনেক টা সেন্সর করে গল্পটি আমাকে বলতে হচ্ছে। গল্পের নাম টি হল আমার শিরোনাম।

ফারজানা। নামেই স্পষ্ট কোন লিঙ্গের। বয়স কত? বড় জোর ২৩। অজ পাড়া গায়ের অতি সাধারণ সহজ সরল একটি মেয়ে। আমাদের গ্রামের মেয়েদের অতি সরলা পনায় যে কত বিপদ নেমে আসে তাদের জীবনে সেটির কিছু দৃষ্টান্ত এই ফারজানার গল্প শুনলে বুঝা যায়। অভাবের তাড়নায় ঢাকায় এই ফারজানা একটি ময়দার মিলে চাকরি নেয়। বেতন চার হাজার টাকা। এই দিয়ে ৩ বেলা পেটের খাবার জোগাড় করা তার পর ঘর ভাড়া। এরপরও আছে। দেশের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা মার কাছে কিছু খরচ পাঠানো। তবুও কোন ক্ষোভ নেই। কারণ দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের তো দুঃখ বলে কিছু নেই। এই ভাবে চলছিল ফারজানার জীবন। ৬ মাস কাজ করার পর এক সময় মিল মালিক ফারজানাকে ডেকে কিছু নোংড়া প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সে তাতে সম্মত না থাকায় চাকুরী থেকেই পরের দিন ই তাকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। ফারজানার ভাষ্য হচ্ছে ইজ্জত এর চাইতে কোন কিছুই দামি হতে পারেনা। যাই হোক চাকুরী থেকে অব্যাহতি পেলেও ক্ষুধা থেকে তো অব্যাহতি পাবার কোন সুযোগ নেই। এবার সে আবার অন্য একটি মিলে চাকরি নেয়। তবে এবার বুঝি ফারজানার কপাল একটু খুলে গেল। আগের মিলের চাইতে এই মিলে বেতন একটু বেশি। এবারের বেতন পাঁচ হাজার। আরও আছে। দুপুরের খাবার টা এইখানে ফ্রি। ফারজানার সুখ এই বুঝি শুরু। এখন মাসে দুই হাজার টাকা জমানো যাবে।

এই ভাবে চলছিল বেশ কটা দিন। কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের প্রতি এই মানব জাতির যে একটি আকর্ষণ সেটি বিধাতা প্রদত্ত একটি সহজাত প্রবৃত্তি। আর সেই রিপুর তাড়নায় হোক কিংবা আবেগের বশবর্তী হোক এক সময় ফারজানা অনুভব করতে থাকে কে যেন তাকে ইশারা করে। ভালোবাসার কথা শুনায়। আশা দেখায়। দুঃখ ভাগ করে নিতে চায়। ফারজানা ও তাতে সাড়া দেয়। এক পর্যায়ে সেই ভালোবাসার দেয়াল ভেঙ্গে দুজনে এক ও অভিন্ন হয়ে পড়ে। কিছুদিন যেতেই ফারজানা তার শরীরের মধ্যে ক্ষুদ্র আর এক প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। বিচলিত ফারজানা তার সেই ভালোবাসার মানুষটিকে বিষয় টি জানায়। কিন্তু সেই সংবাদে সেই মানুষটি একটু বিচলিত হয়ে পড়ে। ফারজানাকে চাপ দিতে থাকে সন্তান টি নষ্ট করার জন্য। কিন্তু ফারজানা সেটি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি। এক পর্যায়ে ফারজানা তার সেই প্রেমিক কে বুঝাতে থাকে। একপর্যায়ে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এবং যথারীতি বিয়েও হয়ে যায়। কিন্তু বিয়ের ৪ মাস পর হঠাৎ একদিন ফারজানার স্বামী হারিয়ে যায়। কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। কিন্তু নির্বোধ আর সহজ ফারজানা নিজেও জানেনা তার স্বামীর বাড়ি কোথায়? তবে একবার নাকি তাকে বলেছিল বরিশাল আর একবার তাকে বলেছিল ঝালকাঠি।

এরপর একদিন তার সন্তান এই পৃথিবীর মুখ দেখে। যার নাম রাখা হয় ফয়সাল। সন্তান জন্মের পর হঠাৎ একদিন তার স্বামী অন্য একজনের ফোনে ফোন দিয়ে ফারজানাকে চেয়ে তার সাথে কথা বলে। ফারজানা কান্নাকাটি করে বলে তার পুত্র সন্তান হয়েছে। কিন্তু সেই কথা কিছুতেই তার স্বামী মানতে পারেনা। নিজের সন্তান কে অস্বীকার করে। এবং তার স্বামী বলে সে আগেই বিবাহিত। তার আসল বাড়ি চট্টগ্রাম। কোন ভাবেই সে ফারজানা কে মেনে নিতে পারবেনা। অসহায় মেয়েটা বুঝাতে থাকে। কিন্তু পাষণ্ড স্বামী কিছুতেই মানতে নারাজ। শেষ পর্যন্ত অসহায় ফারজানা মিল মালিক কে বিষয় টি জানালে মিল মালিক তাকে চরিত্রহীনা বলে আখ্যায়িত করে। লাজ লজ্জায় আবারো সে চাকরি ছেড়ে দেয়। কিন্তু এতদিন তো একমুখের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেয়ে যেতে হয়েছে। এবার দুই মুখের খাবার জোগাড় কি ভাবে সম্ভব? এর মধ্যেই নিমুনিয়ায় আক্রান্ত হয় ছোট্ট বাবু ফয়সাল। ভর্তি করানো হয় তাকে ঢাকা মেডিকেলে। কিন্তু ঔষধ কেনার কোন অর্থ তার কাছে নেই। তেমন একটি অবস্থায় এক পর্যায় আশিক নামের ইন্টার্র্নি ডাক্তার কে ফারজানা সব খুলে বলে। এবং ওই ডাক্তার এর দয়া হয় শিশুটিকে দেখে। সে সকল চিকিৎসার ঔষধ কিনে দেয়। ফারজানার সন্তান টি সুস্থ হয়ে ওঠে।

মা ফারজানার কোলে বিট্টু। ওদের সুখ দেখে কার না ভাল লাগবে।

৯ সেপ্টেম্বর ২০১১। এবার ভাগ্যদেবী ভর করে বসলো ফারজানার জীবনে। ওই দিন আমার এক আপু একটি রোগী দেখতে হাসপাতালে যায়। কাকতালীয় ভাবে ফারজানার সাথে কথা হয় সেই আপুর। আপু পেশায় ব্যারিস্টার। সেই সাথে একজন মানবাধিকার কর্মীও। ফারজানার সকল কথা শুনে আপু তাকে বলে সে কি তার বাসায় যাবে? প্রথমে বেশ লাজ লজ্জা থাকলেও এক সময় সে রাজি হয়। আপু ফারজানাকে বাসায় নিয়ে যায়। আপুর দুটি সন্তান। ওরা একজন ক্লাস নাইন আর একজন ফাইভে পড়ে। ওরা তো ওই বাচ্চা টিকে পেয়ে মহা খুশি। আদর করে ওরা ওকে এখন ডাকে বিট্টু বলে। বিট্টুর মার জন্য সার্ভেন্ট রুমের পাশেই একটি রুম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিট্টু এখন সেরেল্যাক, ফস্টার মিল্ক খায়। বিট্টুর সুখ আর দেখে কে? সারাক্ষণ আপুর কোলে। বাসায় না থাকলে তার ছেলে মেয়ে দুটি বিট্টুকে নিয়ে হই হুল্লা করতে থাকে। পরশুদিন আপুর বাসায় যাই। গিয়ে দেখি সবাই খুব চিন্তিত। বিট্টুকে আপু তার গাড়ীতে করে ওর মা সহ টিকা দিতে পাঠিয়েছে আরবান হাসপাতালে। কিন্তু আসতে একটু দেরি হচ্ছে। আপু মহা চিন্তিত। ভাইয়া ড্রাইভার কে বার বার ফোন দিয়ে রাগা রাগী করছে। এত দেরি কেন? এক সময় ফারজানা বিট্টুকে নিয়ে বাসায় এলো। আপু দৌড়ে গিয়ে বিট্টুকে কোলে নিয়ে দুই গালে চুমা দিল। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছি। রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। পরের সন্তান। কতদিন থাকবে তাও জানিনা। কিন্তু কেন এত ভালোবাসা?

আপু বলল আমি ওকে মানুষ করবো। ওকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াবো। আমি বললাম মাথা ঠিক আছে তো? আপু বলল আসলে ওকে আমি এই কয় দিনে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। ভাইয়া পারটেক্স থেকে দোলনা কিনে এনেছে। আপুর বাচ্চা দুটি ওদের বিছানায় নিয়ে দুষ্টুমি শুরু করে দিয়েছে। বিট্টুর সুখ দেখে ফারজানার সব কষ্ট বুঝি শেষ। আমি ফারজানা কে বললাম আপনি কি থাকবেন? ফারজানা বলল আমি না থাকলেও বিট্টুকে আমি এইখানে রেখে যাব। ফারজানার মুখ দিয়ে বিট্টু নাম শুনে আমার হাসি লাগলো। বললাম আপনিও ফয়সাল থাকে বিট্টু বানিয়ে দিলেন? ফারজানা বলল হা। ওর নাম বিট্টু। আপা মনি আর দুই বাবু ওকে যেই নামে ডাকে সেটি ই ওর নাম। তাই আমিও বিট্টু ডাকি ওকে।

আসলে এমনি হাজারো বিট্টু প্রতিদিন জন্ম নেয় আমাদের এই সমাজে। তবে কয়জন বা সেই ভাগ্য নিয়ে জন্মে? সৃষ্টি কর্তার নিকট আমার এই চাওয়া যে আমাদের এই ক্ষয়ে যাওয়া সমাজে অন্তত ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এবং ব্যারিস্টার আলফাজ রহমান দের মত কিছু সাদা মনের মানুষ দিয়ে ভরে দাও। আমার আপু বলে বলছিনা। আসলেই তারা সাদা মনের মানুষ।