ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

‘আই ওয়ান্ট টু সি অল অব ইউ পিপল’। অর্থাৎ, আমি সব মানুষকে দেখতে চাই।

এই লাইনটির মাঝে কোন এক সময় কোন এক দেশের কোন এক মানুষের কণ্ঠের চরম এক আকুতি ফুটে ওঠে। এই দেখতে চাওয়ার মাঝে কোন পাপ ছিলনা। ছিলনা কোন সামাজিক অবক্ষয় কিংবা অশ্লীলতা দেখবার কোন অন্তিম ইচ্ছাও। এই সভ্যতা, সমাজ, সংসার, নির্মল আর স্বপ্নিল এই পৃথিবী দেখাবার আকুতি বিধাতা কেন জানি শুনেও কানে শোনেনি। পাথরের চোখ দিয়ে চোখের রিপ্লেস করা যায়। টানা টানা ডাগর ডাগর চোখে পরিণত করা যায়। লেন্স ব্যবহার করে লাল, নীল, মেরুন, ক্যাট,গোলাপি কতইনা রূপ দেওয়া যায়। কিন্তু পাথরের চোখ দিয়ে কি জ্বল ঝরে? পাথরের চোখের কোন ক্ষয় নেই। পাথরের চোখের কোন অনুভূতি নেই। পাথরের চোখে কোনদিন দুখের খরা স্রোত নদীর কষ্ট গুলো স্পর্শ করতে পারেনা। পাথরের চোখ মনের কথা বা ভাষা ও প্রকাশ করতে পারেনা।পাথরের চোখ অবিনশ্বর!

রুমানা মঞ্জুর। নামটির সাথে কি এক অজানা কিন্তু চেনা কিছু কষ্ট মিশে আছে। সেই কষ্টের ভাষা গুলো অদ্ভুত। কখনো বৃষ্টি হয়ে ঝরে আবার কখনো বহতা নদীর মত কেবল ছুটে চলে অজানা এক মোহনায়। অবিরাম এই ছুটে চলার মাঝে কোন ক্লান্তি নেই যেন। চোখের আলো নিভে গেলেও যার মনের আলো নিভে যায়না, অদম্য আর অসীম মনের পরাশক্তি দিয়ে জয় করতে চায় যে গোটা জগত সংসার, তামাম পৃথিবীর সকল পার্থিব বিষয়গুলোর কাছে চোখের আলো যার কাছে এখন বিশাল মরুভূমির একটি বালুকার মত, তার হার নেই। সে আগামীর পথের দুঃসাহসিক এক যোদ্ধা! স্যালুট তোমায় হে অপরাজিতা মহীয়সী নারী রুমানা মঞ্জুর। তোমায় সালাম।

নিষ্ঠুর, নির্দয় এক হায়েনা সেদিন কেড়ে নিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রুমানা মঞ্জুরের চোখ। কিন্তু আশা ছিল চিকিৎসায় ভালো হবে। এই বছরের ১৫ ই জুন প্রথমে ভারতে তাকে নিয়ে যাওয়া হলেও চেন্নাই এ শঙ্কর নেত্রালয়ের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ ভেনকি রুমানার চোখ দেখে বলেছিলেন তাদের করার কিছু নেই। তার পর কানাডার বিখ্যাত চক্ষু হাসপাতাল ভ্যানকুভারে রুমানাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং প্রথম দিকে চিকিৎসকরা আশার বানী ও শুনায়।কিন্তু সেই আশা আশাহত হয়ে যায়। ১৫ জুলাই শুক্রবার সকালে রুমানার চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়। সেই খান কার ৫ সার্জন তার ডান চোখ প্রতিস্থাপন করেন। কিন্তু চোখের অপটিক নার্ভ কাজ না করায় সব আশাই শেষ হয়ে যায়। সেখানকার সার্জন রা বলেছিলেন

অপটিক নার্ভ কাজ না করায় রুমানা আর দেখতে পারছেনা। এবং আর কোন দিন দেখতে ও পারবেনা!

রুমানা মঞ্জুরের ঘটনায় গোটা দেশ প্রতিবাদে ফেটে পড়লেও আস্তে আস্তে একসময় সব হারিয়ে যায়। প্রতিবাদ, আন্দোলন, ফেসবুক, ব্লগে রুমান মঞ্জুর এতো বেশি আলোচিত হয়েছিল শেষ পর্যন্ত অনেকটা বাধ্য হয়ে পাষণ্ড সাইদ কে পুলিশ ধরতে বাধ্য হয়। বর্তমানে সাইদ জেলে থাকলেও রুমানা মঞ্জুর কেমন আছে কেউ কি জানি? হা রুমানা ভালো আছে। শুধু চোখ দুটি নেই। আর সবই যেন আগের মত আছে যেমনটি ছিল এই বছরের কলঙ্কিত জুন মাসের পূর্ব মুহূর্ত গুলো।

বর্তমানে রুমানার আপডেট-

কানাডার ভ্যাংকুভার সান পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রুমানা মঞ্জুর বলেছেন,

আমার চোখ নষ্ট হয়েছে, কিন্তু স্বপ্ন মরেনি। আমি এই জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে চাই। সবার আগে আমি থিসিস সম্পন্ন করতে চাই। কারণ শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটালে আমার ওপর হামলাকারীর বিজয় হবে। আমি চাই না সে বিজয়ী হোক। আমি পরাজিত হতে পারি না। আমার কাছে আমার মেয়ের অনেক চাওয়া। রুমানা বলেন, একটি শিশু যখন দৌড়ানোর আগে হাঁটা শেখে, তিনি তেমনই একটি শিশু।

রুমানা মঞ্জুর এখন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (ইউবিসি)-র ছাত্রী। অন্ধদের জন্য প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি ব্রেইল রপ্ত করছেন তিনি । রুমানা মঞ্জুর বলেন, আমার একাডেমিক ক্যারিয়ার নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন স্বামী। ভ্যানকুভারে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ, ছাত্রছাত্রী, প্রশাসকরা তার চিকিৎসা ও খরচের জন্য ৮৫ হাজার ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছেন। এজন্যে সকলের কাছে রুমানা কৃতজ্ঞ। রুমানা মঞ্জুর সিএনআইবি ইন্সট্রাক্টরদের কাছে শিখছেন কি করে রান্না করতে হয়, কি করে নিজেই সাজাতে পারেন বাড়ি, বাড়ির আশপাশ এবং শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়াতে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যাতে তার কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে পারেন। এজন্য তিনি ও তার মেয়ে দু’জনেই পরামর্শ নিচ্ছেন। মেয়ের প্রসঙ্গ টেনে রুমানা মঞ্জুর বলেন,

সে আমার কাছে জানতে চায়, আমি কোনদিন দেখতে পাবো কিনা, আমি কি আগের মতো দেখতে হব কিনা, আমি কি তাকে স্কুল থেকে বাসায় আনতে যাবো কিনা। তার প্রশ্নের জবাবে আমি বলি, অবশ্যই। কিন্তু আসল সত্য হল, তিনি মেয়েকে প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই কথা রাখতে পারছেন না।

তিনি আরও বলেন,

আমার মেয়ে খেলতে গিয়ে আমাকে মিস করে, পেইন্টিং করতে গিয়ে আমাকে মিস করে-আমি সবই বুঝি। তাই তার সঙ্গে ভিন্ন কোন উপায়ে খেলতে চেষ্টা করি।

রুমানা মঞ্জুরের একই সাক্ষাৎকারটি কানাডার আরেকটি জনপ্রিয় দৈনিক গ্লোব এন্ড মেইল পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ছাত্র-শিক্ষকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কানাডার সিটিজেনশীপ ও ইমিগ্রেশন মন্ত্রী জেসন কেনি রুমানা ও তার পরিবারের টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিট মঞ্জুর করেছেন।

আগামীর স্বপ্ন গুলো বাস্তবে ধরা দেবে আবারো রুমানার জীবনে। হয়তো আবারো ব্যস্ত হবেন তার কর্ম ক্ষেত্রে। মানুষ গড়ার কারিগর আমাদের সমাজের সব চাইতে পরম শ্রদ্ধার এই ব্যক্তি গুলো আমাদের আলোর পথ দেখায়। কিন্তু কখন কিভাবে যেন তাদের চোখের আলো গুলো ঝরে যায় এক অজানা ঝড়ে। সেই ঝড় থেমে যায়। বিরানভূমি পড়ে রয়। আবার মানুষ জেগে ওঠে। নূতন করে ঘর বাধে। কেননা পৃথিবী ছুটছে। মানুষ কেন বসে রবে? জীবন কেটে যাবে জীবনের নিয়মে। এটাই বাস্তব।

শুভ কামনা আমাদের রুমানার জন্য।

************************

তথ্য সূত্র বেঙ্গলি টাইমস।