ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

পূর্বাভাসটা রাতের লোকাল খবরেই জানতে পেরেছিলাম। কিছুটা চিন্তিত হলেও এ নিয়ে আতংকিত হওয়ার তেমন কোন কারণ দেখিনি। আমেরিকার ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্টের আনপ্রেডিকটেবল আবহাওয়ার সাথে চার বছরে কিছুটা হলেও পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপ দাহে চামড়া পুড়ে যেমন B-B-Q হয়, আবার একই চামড়া শীতের প্রচণ্ডতায় ফিরে পায় তার আসল রং, বোনাস হিসাবে যোগ হয় এক ধরণের সোনালী আভা। মধ্য জুনে ৪০-৪২ ডিগ্রী তাপমাত্রার রাজত্ব অনুধাবন করতে চাইলে পাচ মিনিট রাস্তায় হাঁটাহাটি যথেষ্ট। মুখ হতে জিহ্বা বেরিয়ে আসতে চাইবে, বুক হতে হূৎপিণ্ডটা লাফ দিতে চাইবে। ভাগ্যের চাকা সচল রাখতে এসব মেনেই পৃথিবীর এ অংশে জীবন গড়তে হয়। এখানে প্রতিবাদের সুযোগ নেই, প্রতিরোধের উপায় নেই। ফোরকাস্ট ছিল সকালের দিকে প্রচন্ড বাতাস বইবে, সাথে থাকবে অবিরাম তুষারপাত। তবে তা শহরে নয়, পাহাড়ের দিকে। এঞ্জেল ফায়ার ও তাওসের দিকেই অনুভূত হবে এর তীব্রতা। ওদিকে তুষারপাত মানেই স্থানীয় ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যে শুভ সংবাদ। স্কী সিজন এখন। অঙ্গরাজ্যের অনেক শহরের অর্থনৈতিক ভিত্তি স্কী-প্রেমী পর্যটকদের পকেট। গ্রীষ্মে প্রায় জনশূন্য হয়ে পরলেও শীতের আগমনের সাথে জেগে উঠে পাহাড়ের মানুষ। প্রকৃতির বিস্ময়কর প্যানোরমা, সাথে তুলনামূলক সস্তা জীবন স্কী প্রেমিকদের চুম্বকের মত টানে পৃথিবীর এ অঞ্চলে। প্রকৃতির এ নয়নাভিরাম পরিবর্তন চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

সময় মত পৌছাতে চাইলে ভোর সাড়ে পাঁচটার ভেতর বাসা হতে বেরুতে হয়। ১০০ কিলোমিটার দুরের পথ। হাইওয়ে আই-২৫ ধরে গাড়ি চালালে এক ঘন্টার পথ। স্পীড লিমিট ঘন্টায় ১২০ কিলোমিটার হলেও রাস্তার উঠানামা আর বাতাসের তীব্রতার কারণে চাইলেও এক ঘন্টার আগে যাওয়া যায়না। তুষারপাতের দুশ্চিন্তাটা মাথায় রেখেই সময় মত বেরিয়ে পরলাম বাসা হতে। গন্তব্য অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সান্তা ফে। আলবুকেরকে এমনিতেই ছোট শহর, জনসংখ্যার বিচারেও এর স্থান নীচের দিকে। উল্লেখ করার মত তেমন কোন অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নেই এখানে। প্রথমে এলে মনে হবে মধ্য আমেরিকার কোন শহর, যেমন নিকারাগুয়ার মানাগুয়া অথবা হন্ডুরাসের তেগুচিগালপার মত শহরে এসেছি। সীমান্তের ওপার হতে আসা মেক্সিকানদের ভীড়ে শহরটাকে আমেরিকার কোন শহর হিসাবে চিনতে ভুল হবে। স্পেনিশ ভাষার রাজত্ব অঙ্গরাজ্যের সর্বত্র। এ অঙ্গরাজ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট এর আদিবাসী। আলাস্কা ও ওকলাহোমার পর সংখ্যার বিবেচনায় নিউ মেক্সিকোর স্থান তৃতীয়। আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের চেহারা ও কালচার অনেকটাই মেক্সিকানদের চেহারা ও কালচারের সাথে মিশে গেছে। দুই জাতির ইতিবৃত্ত জানা না থাকলে এদের আলাদা করা বেশ কঠিন। অবশ্য এ নিয়ে দুই পক্ষের কেউ যে বিশেষ চিন্তিত এমনটা মনে করার কারণ নেই। ওরা সবাই আমেরিকান।

সকালের এমন রহস্যজনক চেহারা ইতিপূর্বে দেখছি বলে মন হলনা। গোটা শহর ডুবে আছে ঘন কুয়াশার চাদরে। চারদিকে এক ধরণের হিসহিস শব্দ। দশ হাতে দুরে কি ঘটছে দেখার উপায় নেই। রাস্তাঘাট পরিত্যাক্ত লোকালয়ের মত ফাঁকা। চারদিকে তুষারপাতের চিহ্ন না থাকায় অনেকটা নিশ্চিন্তেই রওয়ানা দিলাম। বাসা হতে হাইওয়ে পাঁচ মিনিটের ড্রাইভ, রাস্তা ফাঁকা থাকায় ৩ মিনিটেই উঠে গেলাম নির্দিষ্ট এক্সিটে। প্রথম চমক অপেক্ষা করছিল এখানেই। ঘন কুয়াশা থামিয়ে দিয়েছে হাইওয়ের জীবন। কচ্ছপ গতিতে একে অপরের পেছনে লাইন ধরে এগিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার গাড়ি। ঘোলাটে ধোয়ার ভেতর গাড়ির বাতিগুলোকে দেখাল দৈত্যের চোখের মত। তবে তা নিভু নিভু, নিষ্প্রভ। বিশ্লেষণ পূর্বক রাস্তার অবস্থা অনুধাবন করতেই শীর দাড়া বেয়ে এক ধরণের ঠান্ডা ভয় নেমে গেল। ফিরে যাওয়ার চিন্তাটা ক্ষণিকের জন্যে মাথায় উকি দিল। যে গতিতে গাড়ি চলছে তাতে আগামী কয়েক ঘন্টায়ও গন্তব্যে পৌছাতে পারব বলে মনে হলনা। চাকরির বয়স মাত্র এক সপ্তাহ, আবহাওয়াকে উপলক্ষ বানিয়ে কাজে অনুপস্থিত থাকা এখানে হাস্যকর। শুরুতেই নিজকে হাসির পাত্র হিসাবে পরিচিত করার ইচ্ছা হলনা। সবাই পারলে আমিও পারব, এমন একটা বিশ্বাস নিয়ে হাইওয়ে হতে সরে না আসার সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম। শহরের যেখানে শেষ সেখানেই শুরু রেড ইন্ডিয়ানদের রিজারভেশন গুলোর। শুরুটা সান্ডিয়া পুয়েবলো দিয়ে। শহরের উত্তর মাথায় অবস্থিত সান্ডিয়া ক্যাসিনোর শেষ বাতিটা মিলিয়ে যেতেই পুরানো ভয়টা নতুন করে চেপে ধরল। কুয়াশার তীব্রতা বেড়েই চলল। সামনের গাড়ির ব্যকলাইটকে গাইডিং বিকন বানিয়ে অনেকটা অন্ধের মত ড্রাইভ করতে থাকলাম। সময়ের সাথে পাল্লা দেয়ার পুরানো অভ্যাসটা আজ উঠিয়ে রাখতে বাধ্য হলাম। শুরু হল কুয়াশার সাথে লড়াই করে হাইওয়ে জয় করার নতুন মিশন।

শান্তা আনা পুয়েবলো পার হতে গাড়ির সংখ্যা কমে এলো। এক্সিট নিয়ে অনেকেই বের হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। ইচ্ছে করেই ১৬ চাকার একটা ট্রাকের পেছনে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইন্টার স্টেট এসব ট্রাক গুলোকে দেখতে অনেকটা দানবের মত দেখায়। হাইওয়েতে এদের ওভারটেক করতে অনেকেরই জিহবা শুকিয়ে আসে। ডেনভারের দিকে যাচ্ছে ট্রাকটা। অস্বাভাবিক রকম ধীর গতি। লো বিমে উপস্থিতি ঠাহর করা বেশ মুস্কিল। এভাবে আধাঘন্টা চালিয়ে সান ফেলিপে পুয়েবলোর কাছাকাছি আসতেই কুয়াশার ঘনত্ব বেশ কিছুটা কমে এলো। এক্সিটের গোড়ায় ক্যাসিনোর বিলবোর্ডের লেখা গুলো পড়তেই মনটা হাল্কা হয়ে এলো। কুয়াশার রাজত্বও মনে হল অতীতের কোন ঘটনা। অতিক্রম করে গেলাম ১৬ চাকার দানবটাকে।

হাইওয়ের এ অংশটা একেবারেই অন্য রকম। উঁচুনীচু, আঁকাবাঁকা সাথে ভৌতিক নীরবতা। ডানে বায়ে পাহাড়ের চুড়া গুলোকে কেউ দৈত্য হিসাবে ভুল করলে অন্যায় কিছু হবেনা। আক্ষরিক অর্থেই দৈত্যের মত দেখায়। সাথে হাড় কাঁপানো শোঁ শোঁ বাতাস ছোট বেলায় দেখা ওয়েস্টার্ন মুভির প্রেইরির কথাই মনে করিয়ে দেয়। ভাল করে কান পাতলে মনে হবে ৭৪৭ জাতীয় বোয়িং চালিয়ে কাজে যাচ্ছি আমি। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিডি প্লেয়ারটার দিকে হাত বাড়ালাম। ’সোনা বন্ধু তুই আমারে ভোতা দাও দিয়া কাইট্টা লা, পিরীতির খেতা দিয়া যাইত্তা ধইরা মাইরা লা‘ – এমন একটা অন্যরকম গান অনেকদিন ধরে আমার কালেকশনে পরে আছে জানা ছিলনা। বাইরের বাস্তবতা ভুলতে গানটা ম্যাজিকের মত কাজে দিল। কোন অ্যাডভেঞ্চার ছাড়াই সান ফেলিপে পার হয়ে সানতা ডমিঙ্গো পুয়েবলোতে ঢুকে গেলাম। এবং এখানেই শুরু হল আসল পরীক্ষা। ধীরে ধীরে উপরের উঠছে হাইওয়ে। সাথে কমে আসছে গাড়ির স্পীড। সাপের মত একেকটা বাঁক পার হতে ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। যাদের প্রেসারের সমস্যা আছে তাদের জন্যে ড্রাইভিং এখানে খুবই অস্বস্তিকর ও বিপদজনক। প্রথম বাঁকটা পার হতেই দেখা মিলল হালকা তুষারপাতের।

– চলবে