ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

গত ২ জুলাই শনিবার ‘ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করলেন ভিকারুন্নিসা স্কুলের শিক্ষক’ শিরোনামে নয়া দিগন্তের প্রথম পাতায় একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিস্তারিত বিবরণে লেখা হয়েছে, ভিকারুন্নিসা বসুন্ধরা শাখার বাংলার এক শিক্ষক জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ও সে দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে ব্লাকমেইল করেছে দশম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে।

মোবাইলে ধারণকৃত ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে মেয়েটিকে শিক্ষক পরিমল জয়ধর দুইবার শিকারে পরিণত করে। ব্ল্যাকমেইলের এ অপচেষ্টা অব্যাহত রাখতে চাইলে মেয়েটি সহপাঠি ও অভিভাবকদের ঘটনা খুলে বলে। অভিভাবকরা ঘটনাটি দায়িত্বশীল শিক্ষককে জানায়।

পরিমল জয়ধর একটি বাসাভাড়া নিয়ে কোচিং করায়। ঘটনার শিকার মেয়েটি তার কাছে কোচিং করতো। একদিন ব্যাচের সব শিক্ষার্থীকে জানিয়ে দেয় পরদিন পড়াবে না। তারা কেউ যেন পড়তে না আসে। ভুক্তভোগি মেয়েটিকে পরে ফোন করে জানায় সে যেন পরদিন পড়তে আসে। কোচিংয়ে গিয়ে দশম শ্রেণীর ছাত্রীটি দেখত পায় ব্যাচের অন্য কেউ নেই। রুমের ঢোকার পর পরিমল দরজা বন্ধ করে তার ওপর বর্বরতা চালায়। তাকে জানানো হয় এ অপকর্মটি মোবাইলে ধারণ করা হয়েছে। পরিমল তাকে জানিয়ে দেয় কথা মতো না চললে এটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হবে।

ঘটনাটি মে মাসের প্রথম দিকের। শনিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে পরিমলকে প্রশ্রয় দেয়ার। সেদিন পর্যন্ত অধ্যক্ষ বসুন্ধরা শাখায় যাননি। এ ঘটনার আগেও পরিমলের বিরুদ্ধে অন্যান্য শিক্ষকরা অভিযোগ করলে অধ্যক্ষ অভিযোগকারী শিক্ষকদের তিরস্কার করে বলেন, ‘আপনারা বেশি কনজারভেটিভ!’

পরিমলের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর একই শাখার আরেক শিক্ষক বরুন চন্দ্র বর্মনের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের সাথে অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে। এক পর্যায়ে পরিমল ও বরুন দুই জনের ক্লাস বর্জন করে শিক্ষার্থীরা। তারা দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এসব অনাচারের কথা সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ করে হুমকি দেওয়ার পর পরিমল একদল বিক্ষুদ্ধ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বলেছে, ‘তোমরা আমার কলা করবা!’

উল্লেখ্য ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগম দায়িত্ব নেয়ার পর ছয়জন পুরুষ শিক্ষক নিয়োগ পান। এরা হলেন পরিমল জয়ধর, বরুণচন্দ্র বর্মন, বাবুল কর্মকার, প্রণব ঘোষ, বিশ্বজিৎ ও বিঞ্চু চন্দ্র। তাদের তিনজন অবিবাহিত। ভিকারুন্নিসা একটি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ। শিক্ষকদের প্রায় ৯৯ ভাগ মহিলা। সাধারণত একটি শাখায় দুই তিন জনের বেশি পুরুষ শিক্ষক থাকে না। সেখানে একসাথে ছয়জন পুরুষ শিক্ষক নিয়োগ দেয়ায় বিস্ময়ের সৃস্টি হয়েছে। (অবশ্য সব শিক্ষক কাকতালীয়ভাবে! হিন্দু হওয়ায় পত্রিকাটি এ নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন তোলেনি।)

পত্রিকাটি পরিমলের ব্যাপারে আরো বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে। পরিমল চলমান বিসিএস পরীক্ষায় অ্যাডমিন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে। ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগের ৯৫ জনের একটি তালিকা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদনের যে অভিযোগ রয়েছে পরিমল সে তালিকারই একজন।

অলিখিত নিয়ম রয়েছে নতুন শিক্ষক নিয়োগের দুই বছরের মধ্যে প্রকাশ্যে তিনি কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। ছয়জন শিক্ষক নিয়োগের পর স্বয়ং অধ্যক্ষের কাছ থেকে নির্দেশ আসে তাদের জন্য সব ধরনের সুযোগ উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সিনিয়র শিক্ষকদের হটিয়ে উপরের দিকের গুরুত্বপর্ণ ক্লাস তাদের জন্য বরাদ্দকরণ। বিনা বাক্য ব্যয়ে এসব শিক্ষকরা মেনে নিয়েছেন।

প্রথম আলো দেশের প্রধান পত্রিকা। তারা জাতীয় স্বার্থ সংক্রান্ত বিষয়গুলো আগবাড়িয়ে গিয়ে অনুসন্ধানি প্রতিবেদন দেয়। বিশ্লেষণ ব্যাখ্যার মাধ্যমে ঘটনার সরল উপস্থাপন করে। মন্তব্য প্রতিবেদনের মাধ্যমে কল্যাণের পক্ষে জনমতকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে দুর্নীতি ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। পরিবেশ প্রাণ নিয়ে বুড়িগঙ্গা নিয়ে পত্রিকাটির অসাধারণ ভূমিকা মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। সর্বশেষ মুন্সিগঞ্জে বিমানবন্দর নির্মাণের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পত্রিকাটি দারুণভাবে জনগণের পক্ষে দাঁড়ায়। একই ধরনের ভূমিকা পালন করতে দেখেছি ডেইলি স্টার ও সমকালকেও।

কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে এ পত্রিকাগুলো কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যটি প্রকাশের ক্ষেত্রে একেবারেই উৎসাহ পায় না। ভিকারুননিসার ঘটনাটি রহস্যাবৃত। এটা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হতে পারে। ধরে নিলাম খবরটি প্রথম আলো পায়নি। কিন্তু নয়া দিগন্তে এটি ফলাও করে প্রকাশের পর তারা এটি নিয়ে জনস্বার্থে একটি ইনডেপথ রিপোর্ট করতে পারতো। সেখানে উঠে আসতে পারতো কেনো একসাথে ছয়জন তরুণ পুরুষ নিয়োগ দেয়া হলো, কাকতালীয়ভাবে কেনো তারা সবাই একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের (ফেয়ার সিলেকশনের মধ্যে দিয়ে হলে কর্তৃপক্ষের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তো), অধ্যক্ষ কেনো এই তরুণ শিক্ষকদের অধিকতর সুযোগ সুবিধা দেয়ার জন্য জোর তদবির করলেন। পুরো খবরটি চেপে গিয়েছে পত্রিকাটি। তাদের দৃষ্টিতে হয়তো এটি সংবাদ নয়। একই সাথে দেখা গেল অন্যান্য বেশিরভাগ পত্রিকা যারা ভারত প্রশ্নে রহস্যময় নিরবতা পালন করে তারাও এ বিষয়টি চুপ করে রইল। বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থী অভিভাবকরা এ ধরনের খবর নিয়ে নয়া দিগন্ত, আমার দেশের মতো পত্রিকার দিকে দৌড়াবে। কারণ তাদের জন্য যে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে প্রথম শ্রেণীর প্রায় সব পত্রিকার জন্য। কেউ একজন প্রশ্ন তুলতে পারেন এসব ঘটনার প্রকাশ করার মাধ্যমে নয়া দিগন্ত তার কনজারভেটিভনেস শো করছে! যেমনটি ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ ধমকের সুরে বসুন্ধরার শিক্ষকদের বলেছিলেন, আপনারা এতো কনজারভেটিভ কেনো? শিক্ষকরা একটু আধটু খুনসুটি করলে কি হয়? বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর বেশিরভাগ পত্রিকাও কি জোরপূর্বক অনাচারের ঘটনাটিকে সেভাবে দেখে? এভাবে চলতে চলতে একদিন সবাই সুশীল (!) হব…………….