ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

দেশপ্রেমিক ও শান্তিপ্রিয় জনতা আতংকিত এবং ক্ষুব্ধ এই ভেবে যে প্রিয় মাতৃভূমিকে কোন পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। শংকাযুক্ত মনে প্রশ্ন করে ফিরছে একই দেশের নাগরিক হয়েও কেন বিপরীতমুখী সাংঘর্ষিক অবস্থান।কেন বিভক্তির এত কোরাস। জাতীয় স্বার্থে কেন ঐক্যমত্য হচ্ছে না ? কেন দেশের চেয়ে দলকে,দলের চেয়ে ব্যাক্তির স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে ? স্বাধীন দেশে কেন মতদ্বৈততার জন্য জনতাকে অকাতরে জবাবদিহি বিহীন প্রাণ দিতে হচ্ছে ? দেশটি তো কারো ব্যাক্তিগত ক্রয় করা সম্পত্তি নয় যে এই সম্পত্তির ব্যাপারে মালিকের ইচ্ছাই সর্বশেষ। দেশটি আপামর জনতার। যেই জনতা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের বাবা-মা,ভাই-বোন,স্বামী-স্ত্রী,আত্বীয়-স্বজন হারিয়েছে।দেশ হারিয়েছে ৩০ লক্ষ প্রাণ। এই ত্যাগী আপামর জনতাই পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত এই বাংলাদেশের মালিক। এই মালিকরাই প্রতি ৫ বছর অন্তর বাংলাদেশ নামক তাদের বাড়িটিকে দেখাশুনা ও তত্ত্বাবধান করার জন্য তাদের পছন্দমত পরিচালকবর্গ নিয়োগ দেন ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে। তাই সরকার নামক কোন পরিচালকবর্গই ৫ বছর মেয়াদকালীনের অধিক সময় রাষ্ট্র নামক বাড়িটি তদারকির ক্ষমতা রাখেনা। ৫ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকবর্গ যদি ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে মালিক পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে না চলে তখন মালিক পক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে সংঘবদ্ধ হতে বাধ্য হয়। তখন পৃথিবীর কোন বৈধ আইনই তাদের রক্ষা করতে সমর্থ হয়না। মালিকপক্ষ রুখে দাঁড়ালে বা মুখ ঘুরিয়ে নিলে প্রাপ্ত ৫বছরের পর অনির্দিষ্ট সমযের জন্য পাততারি গুটাতে হয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রাপ্ত ৫বছরই তাদের কাছে অনন্ত জীবন ন্যায় তূল্য। রাষ্ট্রের মালিক জনতা থেকে চাকুরী বুঝে নেওয়ার সময় দলীয় সরকার জনতাকে প্রতিশ্রতি দেয় মালিক পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষনের। কিন্তু ক্ষমতা পাওয়ার পরক্ষনেই নিজস্ব সার্থোদ্ধার এবং প্রতিহিংসা বাস্তবায়নে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। ভুলে যায় অঙ্গিকার, ভুলে যায় প্রতিশ্রতি,ভুলে যায় রাষ্ট্রের মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষনের বিষয়।কিন্তু কোন সরকার বা দলই আমজনতার সেন্টিমেন্টকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখার ক্ষমতা ধারণ করেনা।তারা পরিস্থিতির বিচারে সমর্থনের অবস্থান পরিবর্তন করে ।এখানে কতগুলি স্পর্শকাতর বিষয় তুলে ধরা হলো যা জনতাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে ।

রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালকবর্গের মাধ্যমে যে বিষয়গুলি বাস্তবায়িত না হলে জনতা মালিকপক্ষকে বেশী পীড়া দেয় তা হলো ১/ মালিকপক্ষের মৌলিক চাহিদা অনুযায়ী সংবিধানের সংরক্ষণ ও পরিমার্জন না করলে।২/ জবাবদিহিতা ও আইন প্রনয়নস্থল এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল জাতীয় সংসদ কার্যকরী না থাকলে।৩/ জনপযোগী মন্ত্রীসভা বা রাস্ট্র পরিচালক বর্গ যারা আন্তর্জাতিক, অভ্যন্তরীন উভয় পর্যায়ে দেশ ও মালিক পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষন করে চলবে,তারা তা না করলে।৪/ পক্ষপাতহীন বিচার বিভাগ যারা প্রভাবহীন ভাবে নির্ধারিত আইন বলে রাষ্ট্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করে সত্যের ঝান্ডা তুলে ধরবে,তার ধারাবাহিকতা না পাওয়া গেলে। ৫/ প্রশাসনকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে না দিয়ে দলীয় কাজের হাতিয়ার বানালে।৬/ বাকস্বাধীনতা, অন্ন,বস্ত্র,বাসস্থান ও জননিরাপত্তার নিশ্চয়তার ব্যাপারে সরকার বা পরিচালক বর্গের উদাসীনতা থাকলে।৭/ গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক গনমাধ্যমকে শৃংখলিত করে দমন-পীড়ণ ও হুমকির মাধ্যমে মুখে স্কচ টেপ মেরে এবং কলমের কালি চুষে নিয়ে রাষ্ট্রের পরিচালকবর্গ যদি শুধু তাদের মতবাদ প্রচারে ব্যাস্ত থাকে। ৮/ ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ন্যায়নীতির একটি শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করার চেষ্ঠা না করলে। ৯/ দূর্নীতি দমন ব্যুরোকে (দুদক) সরকার বা পরিচালকবর্গের প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীন ভাবে চলতে না দিলে।১০/ রাষ্ট্রের মালিক জনতার মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ সম্মান সংরক্ষণ না করে রাষ্ট্রযন্ত্র, কর্মচারী ও দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে হেনস্থা করলে।১১/ পাঁচ( ৫) বছর অন্তর গ্রহনযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দলমতহীন নির্বাচন পরিচালকবর্গের ব্যবস্থাসহ সর্বসম্মত নির্বাচন কমিশন গঠনের উপর জোর না দিলে বা জনমতের তোয়াক্কা না করিলে।১২/ আইনকে রাষ্ট্রের মালিকপক্ষ সহ সবার ন্যায্য স্বার্থ সংরক্ষণে স্বাধীনভাবে এবং সমভাবে চলতে না দিয়ে পরিচালক বর্গের স্বার্থে পরিচালিত করলে। ১৩/ রাষ্ট্রের মালিক দেশবাসীর জানমালের নিরাপত্তা না দিয়ে,মানবাধিকারকে ঠুটোজগন্নাথে পরিনত করে দলীয় দমন-পীড়ন চালালে।১৪/ ভিন্ন রাষ্ট্র দ্বারা নিজ দেশের স্বার্থহানি ও নাগরিক হত্যার বিষয়ে যথাযথ ব্যাবস্থা গ্রহন থেকে বিরত থাকলে এবং আগ্রাসন ও শোষণের ব্যাপারে নতজানুতার পরিচয় দিলে।উল্লেখিত প্রধান স্পর্শকাতর বিষয় গুলিকে নিয়ে স্বাধীনতা উত্তর সময় থেকে বর্তমান অবধি রাষ্ট্রের সচেতন মালিকপক্ষ ধর্মভীরু, শান্তিপ্রিয় ও অসাম্প্রদায়ীক জাতি সবচেয়ে বেশী পরিমানে ক্ষোভান্মিত ও প্রতিবাদী হয়ে যাচ্ছে ।এর সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে তত্বাবধায়ক ইস্যু। শান্তিপ্রিয় জনতার আশংকা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কোন দলের কাছেই নিরপেক্ষ বিবেচ্য হবেনা।যেখানে তত্বাবধায়ক সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় সেখানে কি করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সন্দেহাতীত হয় ? আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে দলীয় সরকারের বিরূদ্ধে অবস্থান নিয়ে এক সময় আওয়ামীলীগ অন্যান্ন দলকে সাথে নিয়ে নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের জন্য রাজপথ রক্তাক্ত ও দেশকে আন্দোলিত করেছে তা থেকে এখন পিছু হটেছে। ক্ষমতায় থেকে বিএনপি এই দাবীকে পাগলের প্রলাপ বলেছে। দেশের সংঘাতমুক্তিতার স্বার্থে তা এক সময়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। আর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় বসে নিজেদের রোপন করা বৃক্ষটি গোড়া থেকেই উপড়িয়ে ফেলেছে। একটি বিষয় জনতার কাছে স্পষ্ট হয়েছে তা হলো –“রাজনীতিবিদদের ক্ষমতান্ধতা”। যারাই ক্ষমতায় গেছে তারাই জনতাকে ও দেশের শান্তিকে ভুলে ক্ষমতার মোহে বিভোর হয়ে যাবতীয় দিবা বাস্তবতাকে অস্বীকার করেছে । ভাবেনা আজ আছি কাল থাকবো না। পরশু আবার আসবো তরশু থাকবোনা। ক্ষমতার হাত বদলের বাস্তবতাকে না মেনে যে কারো উপায় নেই এটা বোঝার সামান্য জ্ঞানটুকুও তারা ক্ষমতা ভোগকালীন সময়ে স্বইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হারিয়ে ফেলে।এই প্রবণতাকে চিরতরে মন থেকে নির্মূল করতে হবে।

স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হলেও মনের ভিতর দেশপ্রেমকে জাগিয়ে ক্ষমতার মোহ,বিভেদ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে জাতি মুক্ত হতে পারলো না। এখন সময় এসেছে জাতিকে নিয়ে নতুন করে ভাববার। রাজনীতিবিদদের বুঝতে হবে আপামর জনতা তাদের সাথে সুর মিলিয়ে স্বাধীন একটি দেশে এখন কেন আবার আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ চাচ্ছে ! এই শ্লোগান সব দলের সব নেতাদের মুখ থেকেই শুনতে পাচ্ছে গোটা জাতি। তাহলে কি আরেকটি দলাদলির যুদ্ধ জাতির কপালে ধেয়ে আসছে ? সেই যুদ্ধে লাভবান কে হবে ? জয়যুক্ত কে হবে ? কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে বা নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে তারাই জয়ী হবে ? এই নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবে যে তথাকথিত যুদ্ধের পর দেশে শান্তি ফিরে আসবে ? তাহলে কেন আরেকটি যুদ্ধের আহ্বান ? অতিসম্প্রতি দুই দলের দুই শীর্ষ নেতা উভয়কে দোষারোপ করছে সাপ নিয়ে খেলার অভিযোগে। সাপ নিয়ে খেলা যে কত ভয়ঙ্কর “বুঝিবে সে কিসে কভু আসি বিষে দংশেনি যারে “। সাপ নিয়ে কে বা কারা খেলা করছে বা নাচাচ্ছে তা ভুক্তভোগী জনতা সম্যক অবগত। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী কে ,অত্যাচারী শাসক কে ,লুটপাটকারী কে,সীমান্ত হত্যায় নীরব কে ? হত্যাকাণ্ড কারা করছে ? এসব বিষয়ে জনতা ঘটনা ঘটা মাত্রই জেনে যাচ্ছে অনলাইনের অবদানে। অতএব এই বিষয়গুলি মাথায় রেখে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভেদাভেদ ভুলে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এখনই সব দলকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি সর্বসম্মত পদ্ধতি বের করতে হবে যা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তোলার কোন অবকাশ না থাকে । যদি তা না হয় কোন দলের একগুয়েমির কারনে তবে তা হবে ভয়ংকর রকমের ভুল। জাতির কপালে অশনি সংকেতের পূর্বাভাসের আলামত এখনই সুষ্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠছে । এতদিন হয়েছে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি এখন হচ্ছে সাপের বিষের ছোঁড়াছুড়ি ,ভবিষ্যতে কি নিয়ে ছোড়াছুড়ি হবে তা নিয়ে জাতি আতংকিত ও বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত করছে।

সাংবাদিক ও কলাম লেখক
zabpathan@gmail.com