ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

সর্ষে ফুল! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এবং বিশ্ব শাসন ও কর্তৃত্বে নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রটি বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু মোমবাতির ন্যায় গলে-ক্ষয়ে নিভে যাওয়ার পর্যায়ে উপনীত হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দীদের জাম্পিং অগ্রযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার লেজুড় ধারক উচ্ছিষ্টভোগী মিত্ররা ঘুম থেকে জেগে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত প্রতিদিনই শর্ষে ফুলের দুর্বোধ্য নাচন দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে। উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্রের হুংকার, জোটবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার উল্লসিত এবং অর্থনৈতিক প্রাচুর্যতার আস্ফালন সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের কাছে মরিচীকার ন্যায় মনে হচেছ। প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রের অধঃপতনের দিকে ধাবিত অর্থনৈতিক দৈন্যদশার দিকে ফিরে তাকানো যাক। ইউ.এস. ক্যানসাস ব্যুারো এর হিসাব মতে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্রতার হার ১৫.১%। লোকসংখ্যার বিচারে তা গিয়ে দাঁড়ায় সর্বমোট ৪৬.২ মিলিয়ন। যারা দারিদ্র্যতা নিয়ে দিনাতিপাত করছে। ১৯৯৩ সালের পর বর্তমানের এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। যা ক্রমবর্ধমান। ২০০৮ সালে ছিলো ৩৯.৮ মিলিয়ন (১৩.২%)। ২০০৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩.৬ মিলিয়ন (১৪.৩%)।

দারিদ্র্যতার ক্রমবর্ধমান হার বিশ্বকে জানিয়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দৈন্যদশার ভয়াবহতা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভট অজুহাতে সময়-অসময়ে কমজোরি রাষ্ট্রগুলির উপর হামলে পড়ে লাখ লাখ মানুষের হত্যাকারী এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক রাষ্ট্রটি বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঋণী দেশে পরিণত হয়েছে। যার ঋণের পাহাড় আকাশচুম্বি। যুক্তরাষ্ট্রকে ঋণ দিয়ে চালিয়ে নেওয়া দেশগুলি আকাশছোঁয়া এই্ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে বর্তমানে উন্মুক্তভাবে সন্দেহ প্রকাশ করছে। ঋণ দিতেও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ছে। লাখ লাখ নির্যাতিত মানুষের অভিশাপ পাওয়া এই রাষ্ট্রটির বর্তমানে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সর্বমোট- ১৫ হাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার বা ১৫.৫ ট্রিলিয়ন ইউ.এস. ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের পরেই সর্বোচ্চ ঋণের তালিকায় ক্রমান্বয়ে আছে তার সহযোগী দোসরেরা। যথাক্রমে- বৃটেন, জার্মানী, ফ্রান্স, ইটালী নামক পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। বিশ্বের বহু দেশের বাৎসরিক বাজেটের চেয়েও অনেক বেশী যুক্তরাষ্ট্রের বাৎসরিক বাজেট ঘাটতির পরিমান। যুক্তরাষ্ট্রের গত বছরের বাৎসরিক রাজস্ব আয় হয়েছে- ৪.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। রাষ্ট্রের ব্যয় ৬.০ ট্রিলিয়ন ডলার। বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার বা এক হাজার তিনশত বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বাজেট ঘাটতির প্রধান যোগানদাতা দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। দ্বিতীয় যোগানদাতা জাপান এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে মধ্যপ্রাচ্যের তৈলাক্ত মস্তিষ্কের তেল চকচকে চাটুয়া তেলসমৃদ্ধ রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভের পরিমাণ ১৫০ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বে অবস্থানের দিক দিয়ে যার ক্রমিক ১৪ তম। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে- তিন হাজার পঞ্চাশ বিলিয়ন (৩০৫০) ডলার। বিশ্বে যার অবস্থান প্রথম। পুঁজিবাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলা মার্কিন সরকার তাদের ক্রমবর্ধমান দরিদ্রদের জন্য ধনীদের উপর বর্ধিত করারোপের সাহসটুকু দেখাতে পারেনি নতুন বাজেট প্রাক্কালে। সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে পর পিছপা হয়েছে। যার ফলশ্রতিতে বর্তমানে সুবিধা বঞ্চিত জনতা রাস্তায় নেমে পড়েছে অকুপাই আন্দোলন নামের ছায়াতলে। লাখ লাখ বঞ্চিত জনগণের মৌলিক দাবীর এই আন্দোলনকে দমন করা হচ্ছে কঠিন অমানবিক ভাবে। যাদের মুখ দিয়ে মানবাধিকারের বুলি আওড়ানোর তোড়ে ফেণা বের হয়ে যায় প্রতিনিয়ত। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দৈন্যদশা, দেশী অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং জনগণের মৌলিক আন্দোলনে ফুটে উঠা দৈন্যদশা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে দৈন্য গর্ভে অন্তরীণ।

রাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্ব কর্তৃত্ব রক্ষায় সামরিক খাতে অতিরিক্ত ব্যয় তাদেরকে অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় নিপতিত করার অন্যতম কারণ। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশী সামরিক খাতে ব্যয় বরাদ্দ রাখা দেশ। যার বাৎসরিক পরিমাণ- ৭০০ বিলিয়ন ডলার। কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দ্বন্দ্ব উসকে দিয়ে ও জিইয়ে রেখে অস্ত্র বিক্রির টাকা প্রাপ্তিতেও শীর্ষস্থান ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। গত বছর অস্ত্র বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্র অর্থ পেয়েছে তিন হাজার পাঁচশত কোটি ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মার্কিন এই অস্ত্র বিক্রি প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের কর্তৃত্ব হাতের মুঠোয় রাখার উচ্চাকাংখায় যুক্তরাষ্ট্র নিজের অর্থনীতিকে ও ডলারের রাজত্বকে ধ্বংস করার পাশাপাশি মিত্রদেরও ধ্বংসের কোণায় ঠেলে দিচ্ছে। ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উপর এককভাবে ও জাতিসংঘের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে সেই সব রাষ্ট্রকে বিকল্প মুদ্রা, রাষ্ট্র ও জোটের উপর নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দিচেছ। ফলে বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থায় লেনদেনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মুদ্রা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ও সঞ্চয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য স্থানের সন্ধান খুঁজে পাচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের পাশাপাশি বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃত্বের তরীটিও বর্তমানে নিমজ্জমান। যুক্তরাষ্ট্রের নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি এ যাবৎকাল যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা শোষিত হয়ে বর্তমানে রুখে দাঁড়িয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকার রাষ্ট্রগুলি বর্তমানে সামরিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি ও লেনদেনের মাধ্যমে মার্কিন প্রতিপক্ষ চীন ও রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করছে। যেই রাষ্ট্রগুলির সাথে বাণিজ্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের একটি বড় অংশ পূরণ হতো এবং প্রতিপক্ষকে নিকট সীমানায় ঘেষতে না দিয়ে নিরাপদ চিত্তে মোছে তা দিতো। সেই শোষিত রাস্ট্রগুলি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে বাদ দিয়ে ল্যাটিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ৩৩টি দেশ মিলে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে একটি নতুন আঞ্চলিক জোট গঠন করছে। মার্কিন সদর আঙ্গিনায় প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া জোটটি মার্কিন নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিবে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালে অবাধ্যতার কারণে এই ল্যাটিন আমেরিকার পানামা নামক দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ২১ বছর যুক্তরাষ্ট্র তাদের হেফাজতে জেলে বন্দি করে রেখেছিলো। কিছুদিন আগে পানামার বর্তমান সরকারের কাছে ফ্রান্সের মাধ্যমে নরিয়েগাকে হস্তান্তর করা হয়। ল্যাটিন ও ক্যারিবীয় জাতিপুঞ্জের মার্কিন অত্যাচারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার এই হল একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।

আফ্রিকা মহাদেশও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে মার্কিনীদের কব্জা থেকে। দক্ষীণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে শ্বেতাঙ্গদের আশ্রয় দিয়ে কালোদের নিগ্রহ এবং শোষণ বেশী পুরোনো দিনের নয়। নেলসন ম্যান্ডেলার হাত ধরে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে তারা এখন রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত স্বকীয়তা ফিরে পেয়েছে। সিদ্ধান্ত এখন স্বাধীন ভাবে নিতে পারছে, সেই সিদ্ধান্তের তরী যুক্তরাষ্ট্রের ঘাট স্পর্শ করে না। সোমালিয়ায় নাক চুবানো মার খেয়ে ভেগে গিয়ে এখন ভিন্ন পথে প্রতিহিংসা বাস্তবায়ন করছে। সুদানে দীর্ঘ সময় যাবৎ খ্রীস্টান মিশনের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত গোষ্ঠিকে দিয়ে সুদানকে দ্বিখন্ডিত করে স্বগোত্রীয়দের অঞ্চলে নিজকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মিশরে ইসলামী মেজরিটিকে প্রতিষ্ঠিত হতে না দিয়ে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রশ্রয় দিয়ে দু’হাত ভরে নিজস্ব স্বার্থ হাসিল করা যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সে সব দেশ থেকে প্রায় বিতাড়িত। মৌলিক স্বাধিকার বঞ্চিত নিপীড়িত জনতা ইসলামকেই শেষ ভরসা হিসাবে বেছে নিয়েছে। অধিকার বঞ্চিত এসব জনতার ভাষা আমলে নিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক শাসকগণ সুসম্পর্ক স্থাপন করছে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের সাথে। রাশিয়াও চীনের সাথে কৌশলগত অংশিদারীত্বে অংশ গ্রহন করছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসককুল বর্তমানে বসন্তের ঢেউয়ের আঘাতে মার্কিন আশ্রয়ে মাটি কামড়িয়ে কোনমতে টিকে আছে। জনতার অগ্নুৎপাতের তোড়ে ইয়েমেন ও লেবাননের যুক্তরাষ্ট্রের আঁচল আকড়িয়ে থাকা উভয় সরকারের বিদায় ঘন্টা বেজেছে। এখন মার্কিন আচলের নীচে আশ্রয় নিয়ে চলা জিইসি ভূক্ত রাজতান্ত্রিক জনসমর্থনহীন সরকারগুলি বিশ্ববাসী ও নিজ দেশের জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে সিরিয়া ও ইরানকে নিয়ে মেতে উঠেছে।

‘‘চোরের মার বড় গলা’’ প্রবাদ বাক্যটির ন্যায় উল্লেখিত দেশগুলি নিজ দেশের জনগণের উপর স্টীম রোলার চালিয়ে, ট্যাঙ্ক দিয়ে পিষে মেরে, প্রকাশ্য রাজপথে গুলি করে মেরে, গুম করে, জেলে পুরে অন্য দেশের জনগণের পক্ষ মায়া কান্না করছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরাইলকে দিয়ে এককভাবে এখন আর পেরে উঠতে না পেরে এবং দুই প্রতিবেশী লেবানন ও মিশর হাত ছাড়া হয়ে যাওয়াতে এখন জিইসি নামক উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদটি প্রধান অবলম্বন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। ইরাক থেকে মার্কিন উপস্থিতি প্রত্যাহার উত্তর শিয়া সরকারের ইরান ঘেঁষা অবস্থান গ্রহন, লেবাননে নির্বাচনের মাধ্যমে হিজবুল্লার শক্ত অবস্থান গ্রহন এবং ইরানের উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন সামরিক স্বাবলম্বিতা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও জিইসিকে অত্র অঞ্চলে স্বার্থ হাসিলে বড্ড বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। পথের কাঁটা সরিয়ে দেওয়ার মানসে সিরিয়া ও ইরানকে টার্গেট করেও বেশীদূর অগ্রসর হতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী প্রধান, গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইরানে হামলার পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন- ইরানে হামলা করলে প্রলয় ঘটে যাবে। ইরান ঘোষণা দিয়ে রেখেছে- তাদের দেড় লক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের প্রতি ইঞ্চি ভূমিতে আঘাত করতে প্রস্ত্তত হয়ে আছে। ইরান আরো বলে রেখেছে- হামলা হলে তারা ইসরাইলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দিবে। চীন ও রাশিয়ার প্রকাশ্যে সিরিয়া ও ইরানের পক্ষাবলম্বন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। চীন আরো উন্মুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সাবধান করে দিয়ে বলেছে যে- ”ইরানের উপর কোন শক্তি হামলা চালালে চীন ইরানের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহন করবে। তাতে যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও লেগে যায় চীন পরোয়া করবে না”।

আগের মত সহজে দাদাগিরির পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। তবে মধ্য প্রাচ্যের টলায়মান ছারপোকা সদৃশ্য রাজতান্ত্রিক সরকারগুলি এই ব্যাপারে আমেরিকা ও ইসরাইলকে এখনো উস্কে দিচ্ছে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য। যে কর্মটি তারা ইরাকের বেলায় করেছিলো।বিশেষজ্ঞদের মতে অদূর ভবিষ্যতে এশিয়া বিশ্বকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শাসন করবে। এশিয়ার বিশালত্ব, প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ, সর্বোচ্চ প্রযুক্তির ব্যাপকতা, আত্মনির্ভরতা, অর্থনৈতিক মজুদের প্রাচুর্যতা এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শ্রেষ্ঠতার দিকে এগিয়ে চলাকে পাশ্চাত্য সহজভাবে গ্রহন করতে পারছে না। তাই ইদানিং এশিয়াকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের পদচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত চীন, রাশিয়া, ইরান, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের এই লম্ফঝম্ফ। পাশ্চাত্যের দুশ্চিন্তা বিশ্ব ক্ষমতার বলয়ে এই শক্তিগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে জাতীয় দুর্যোগের সময় যখন তখন যে কোন সম্পদশালী অবাধ্য রাষ্ট্রের উপর হামলে পড়ে নিজস্ব অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা যাবে না এবং কর্তৃত্ব ফলানো যাবে না। তাই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন পরিকল্পনা নিয়ে রাশিয়াকে বেধে ফেলার মানসে ইউরোপকে ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্রের জুজুর ভয় দেখিয়ে রাশিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা ইউরোপে ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপদ দূরত্বে থেকে তাকে উদ্দ্যেশ্য করে রাশিয়ার ছোঁড়া ক্ষপনাস্ত্রগুলিকে ইউরোপের ভূমিতে ও আকাশেই ঠেকিয়ে দেওয়ার চিন্তাটিই বেশী কাজ করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউরোপ, বেঁচে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও পাকিস্তানের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিবেশী ও ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্র তুরষ্কে ঘাটি স্থাপনে সম্মতি আদায় করে নিয়েছে। এতেও পাঠার বলি হবে তুরষ্ক। উত্তর কোরিয়া ও চীনের পাশে দক্ষীণ কোরিয়াতে এবং জাপানে যুক্তরাস্ট্র সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে । তাইওয়ানকে অস্ত্র সজ্জিত করছে । ভারতকে অংশিদারিত্ব চুক্তিবিহীন আন্ডার টেবিল সাদৃশ্য দলভূক্ত করার পাশাপাশি ভিয়েতনাম ও মায়ানামারকে নতুন করে কাছে টানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা।

মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান থেকে ঘাঁটি সরানোর নোটিশ যুক্তরাষ্ট্রের মাথার উপর ঝুলছে। যে কোন সময় তা বাস্তবায়িত হয়ে যেতে পারে ঘটনা পরিক্রমায়। ইরানের পারস্য উপসাগরের অপর তীরে বাহরাইনের অগণতান্ত্রিক সরকার মার্কিন নৌঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার রক্ষার শর্তে। সমউদ্দেশ্য সৌদীআরব ও কুয়েতেরও। চীনের দোরগোড়ায় অবস্থিত নেপালে ঘাঁটি গাড়ার ইচ্ছা কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ করেছিলো নেপালের কাছে। সেই স্বপ্ন দেখা চোখে মরিচের গুড়া ছিটিয়ে দিয়েছে নেপালের চীনঘেঁষা কম্যুনিষ্ট সরকার। চীন, পাকিস্তান ও ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে ২০১৪ সালে পশ্চিমাদের চলে যাওয়ার চুক্তি থাকলেও এখন কৌশলগত কারণে ঘাঁটি স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়ার জন্য মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। এতে সামগ্রিকভাবে ক্ষতি হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর, পক্ষান্তরে ওদের চেয়ে বেশী লাভবান হবে ভারত। পশ্চিমাদের সাথে যৌথভাবে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে অরাজকতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে চাপে রাখবে ভারত । অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতাকে খর্ব করার উদ্দেশ্যে একটি নতুন সামরিক জোট গঠনের পায়তারা চালিয়ে যাচ্ছে। যাকে উদ্দেশ্য করে কিছুদিন আগে ওবামা অষ্ট্রেলিয়া সফরে এসে সেখানে মার্কিন ঘাঁটি করার অনুমোদন নিয়েছে। অষ্ট্রেলিয়ার নতুন করে লিপ্সা জেগেছে- বিশ্ব মঞ্চে ভূমিকা রাখার। তাই দক্ষীণ কোরিয়া, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অষ্ট্রেলিয়া সামরিক কো-অপারেশন বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে কাজ করছে। ভারত এক্ষেত্রে চাণক্য কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। সরাসরি জোটভূক্ত না হয়ে ব্যাক সাপোর্টার হিসাবে কাজ করে যাবে। যা দৃশ্যমান হবে না কিন্তু তুষের আগুনের ন্যায় ভিতরে ভিতরে প্রজ্জ্বলিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসরদের এতসব চক্রান্তের বিছানো জাল গুটিয়ে যাচ্ছে তাদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, সাম্রাজ্যবাদী শোষকের চরিত্র, উন্মুক্ত স্বার্থপরতা এবং বিশ্ব কর্তৃত্বে নতুন নতুন শক্তির আবির্ভূতের কারণে। বর্তমানে বিশ্বে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনায় ও কর্মকান্ডে পশ্চিমাদের প্রতিপক্ষ শক্তিদের জোরালো ভূমিকা প্রতিফলিত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের প্রতিবাদী এই বলয়কে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে মূলত চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষীণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা, ইরান, পাকিস্তান, ভেনিজুয়েলা, কিউবা, বলিভিয়া, উত্তর কোরিয়া। বিশ্বে সবচেয়ে বেশী পারমাণবিক বোমার অধিকারী রাশিয়া। যার কাছে সর্বমোট এগার হাজার (১১,০০০) পারমাণবিক বোমা রক্ষিত আছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রক্ষিত আছে মোট আট হাজার পাঁচশত (৮,৫০০) পারমাণবিক বোমা। রাশিয়া অর্থনৈতিক দুরাবস্থা কাটিয়ে বর্তমানে স্বাবলম্বী। পুতিন কিছুদিন আগে ইচ্ছা পোষণ করে বলেছেন- ভিত্তি তৈরী হয়েছে এবার গঠন করতে হবে শক্তিশালী রাশিয়া।

মধ্য এশিয়ার তেলসমৃদ্ধ ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশগুলিকে রাশিয়া তার কর্তৃত্বাধীনে রেখেছে, পাশাপাশি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মাধ্যমে চীন, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার চারটি দেশ মিলে একটি বৃহত্তর প্লাটফর্ম তৈরী করেছে যার গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইরান, পাকিস্তান, ভারত সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছে। তারা বর্তমানে পর্যবেক্ষক সদস্য হিসাবে আছে। বিশ্ব জুড়ে মার্কিন প্রভাবের বিকল্প তৈরীর জোর তাগিদ পরিলক্ষীত হচ্ছে। দেশে দেশে মার্কিন চাটুকার সরকারগুলির পতনই বলে দিচ্ছে বিশ্ব নতুন রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। যেখানে পাশ্চাত্য থাবা বিস্তার করছে সেখানে উদ্ধারের ঝান্ডা হাতে চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষীণ আফ্রিকা মতাদর্শের দেশগুলি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আর পরিণামে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃত্ব হারাচ্ছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিকে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সাহায্যের মাধ্যমে চীন তার বলয়ভুক্ত করে নিচ্ছে। যার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক দৈন্যদশা ও বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে পেরে উঠছে না।

তাই সামগ্রিক পরিসংখ্যান মূল্যায়নে বলা যায়, বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরী হয়েছে এবং ক্ষমতার শ্রেষ্ঠত্বের পালাবদলও শীঘ্রই বিশ্ববাসী দেখতে পাবে। তখন দুর্বল ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারবে এবং স্বজাতির উন্নয়নে স্বাধীনভাবে মনোযোগী হতে পারবে অনেকাংশে।

***
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
zabpathan@gmail.com