ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সাগর এবং রুনী। এই ছবি শুধুই স্মৃতি।

প্রথমে গোধুলি (ফারজানা খান গোধুলি) আপার কথা দিয়ে শুরু করছি। বাংলানিউজে তিনি লিখেছিলেন সংবাদের নিচে সংবাদ চাপা পড়ে যায়। কিন্তু সাগর রুনীর হত্যার সংবাদ চাপা পড়েনি। আসলেও তাই। এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলার খবর এখন পর্যন্ত চাপা পড়েনি। যেকোন ভাবেই সংবাদ পত্রের শিরোনাম হচ্ছে। এই হত্যার বিচারের জন্য এখনও আন্দোলন করছে সাংবাদিক সমাজ।

সাগর ভাই রুনী আপা মারা যায় ১ মাসের বেশী হয়েছে। এর মধ্যে কোন খুনিকে গ্রেফতার করতে পারেনি আমাদের চৌকশ পুলিশ,গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তারা সব সময় আমাদের আশ্বাসের মধ্যে রেখেছে। সেই আশ্বাসের কিছু অংশ পাঠকদের জন্য নিম্নে তুলে ধরছি।

১০ ফেব্রুয়ারি : সাগর ও রুনী মধ্যরাতের পর পশ্চিম রাজাবাজারের নিজ ফ্লাটে খুন হন। পুলিশ ধারণা করে রাতের শেষভাগে দু-জনই বেডরুমে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারান।

১১ ফেব্রুয়ারি : খবর পেয়ে সাংবাদিক দম্পতির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সকালেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে খুনিদের সনাক্ত ও গ্রেফতার করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারি : সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ – আতঙ্ক বিরাজ করে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছে তদন্ত চলছে।

১৩ ফেব্রুয়ারি : পুলিশ সদর দফতরে ব্রিফিংয়ে আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার সাংবাদিকদের হতাশ করে জানালেন কেউ গ্রেফতার হয়নি, আটকও নেই। তবে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কি ধরনের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে আর কিছু বলা যাবে না।

১৪ ফেব্রুয়ারি : পুলিশের তেজগাঁও জোনের ডিসি ইমাম হোসেন জানান, পুলিশ কাউকে গ্রেফতার , আটক কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। তবে নজরদারি করছে অনেককে।

১৫ ফেব্রুয়ারি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেন, ৪৮ ঘন্টার সময় বেধে দেওয়া ছিলো কৌশল মাত্র। এ ধরণের বক্তব্য প্রচার হওয়ামাত্র সাধারণ মানুষসহ গণমাধ্যম কর্মীরা হতভম্ব হয়ে পড়েন।

১৫ ফেব্রুয়ারি: ডিবি ডিসি মনিরুল ইসলাম জানান, পুলিশ কাউকে নজরদারি করছে না। কোন গণমাধ্যম কর্মীকেও না। ডিসি বলেন, তদন্তে যথেষ্ঠ অগ্রগতি হয়েছে। তদন্তের
স্বার্থে কিছু বলা যাচ্ছে না।

১৬ ফেব্রুয়ারি : ডিসি মনিরুল পুনরায় জানান তদন্ত চলছে এবং তদন্তের স্বার্থে কিছু বলা যাবে না।

১৭ ফেব্রুয়ারি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেন, তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে কিছু বলা যাচ্ছে না।

১৮ ফেব্রুয়ারি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অপর এক অনুষ্ঠানে বলেন সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলার তদারক করছেন প্রদানমন্ত্রী নিজেই।

১৯ ফেব্রুয়ারি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এদিন স্বীকার করেছেন, প্রকাশ করার মতো কোন তথ্য নাই।

২১ ফেব্রুয়ারি: ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমদ শহীদ মিনার পরিদর্শনকালে বলেন, ডেটলাইন দিয়ে তদন্ত সম্ভব না।

২১ ফেব্রুয়ারি : সিআইডি প্রধান মোখলেসুর রহমান জানান, সিআইডির ফরেনসিক শাখায় জনবল সংকট রয়েছে।

২২ ফেব্রুয়ারি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারের পক্ষে সবার বেডরুম পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়।

২৬ ফেব্রুয়ারি : ডিএমপির মুখপাত্র ডিসি মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, খুনের কারণ স্পষ্ট এবং খুনিও সনাক্ত হয়েছে। এখনই খুনের কারণ ও খুনির পরিচয় বলা যাবে না।

২৮ ফেব্রুয়ারি : হাইর্কোটে এক রিট আবেদন করেন অ্যাড.মনজিল মোরশেদ। ওই রিট আবেদনের শুনানি শেষে আদালত আদেশ দেন। ওই আদেশে বলা হয়, হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূএ ছাড়া কোন সংবাদ প্রচার করা যাবে না। ডিবিকে ১৪ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।

অনেক আশ্বাস পাবার পরে আমরা মনে করেছিলাম খুনিদের গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু আমাদের সব আশা ফিকে হয়ে গেল। রাষ্ট্রের কর্তারা আমাদের শুধুই আশা দিয়ে গেছে। তারা বলেছে এই হচ্ছে ,হবে, হয়েছে,প্রণিধান অগ্রগতি হয়েছে ইত্যাদি।

কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের কর্তাদের কাছে বলতে চাই ,আর কত মিথ্যা আশ্বাসের মধ্যে রাখবেন? সত্য কোনদিন চাপা থাকে না। সাগর রুনীর হত্যার সাথে কারা জড়িত তা আমরা এখন না জানলেও আগামি ১০ বছর পরে হলেও আমরা জানতে পারবো। ইতিহাস তাই বলে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ৪৮ ঘন্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের কথা বললেন ,তখন আমরা একদিকে আশায় বুক বেধে ছিলাম আবার অন্যদিকে জজ মিয়ার প্রতিচ্ছবি দেখছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে কিছুই হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চাই একটি মামলা তদন্ত করতে কত সময় দরকার হয়?

আপনি প্রথমে মিডিয়ার চাপেই যদি বলে থাকেন ৪৮ ঘন্টার কথা তাহলে পরবর্তীতে কেন বলেছিলেন, অপেক্ষায় থাকুন সুসংবাদ শুনতে পারবেন?

আপনি সাংবাদিকদের ধৈর্য্য ধরতে বললেন। কিন্তু ধৈর্য্য আর কত দিন ধরে রাখবো। পরবর্তীতে আপনিই নিজে বলেছেন প্রকাশ করার মত কোন তথ্য নেই। তারপর আবার বললেন সাগর এবং রুনীর হত্যা মামলা প্রধানমন্ত্রী নিজেই তদারক করছেন। এ থেকে আপনিই নিজে মুক্ত হতে চেয়েছেন। কিন্তু আপনি মুক্ত হতে পেরেছেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি দেশের কর্তা । আপনার কথায় দেশ চলে। আপনার সাথে যখন মেঘ এবং তার নানু , দাদুরা দেখা করতে গিয়েছিলো তখন আপনি বলেছিলেন ,খুব দ্রুত এই হত্যার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করা হবে । কিন্তু আপনি কেন বললেন,সরকারের পক্ষে বেডরুম পাহাড়া দেয়া সম্ভব না। আপনার সরকারকে তো বেডরুম পাহাড়া দিতে কেউ বলে নাই ,আপনার সরকারের কাছে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়া সাংবিধানিক অধিকার।

সাংবিধানিক অধিকারের কথা বাদ দিলাম,একটি রাষ্ট্র খুনিদের বের করে এনে শাস্তির মুখোমুখি করবে এটাই তো নিয়ম। তাহলে আপনিই কেন বললেন,সরকারের পক্ষে সবার বেডরুম পাহাড়া দেয়া সম্ভব না। এতে করে সে সময় সবার মনে সন্দেহ জাগল এই হত্যার বিচার আদৌ হবে। এখন এই সন্দেহ সত্য প্রমান হতে চলছে।

প্রধানমন্ত্রী যখন এই মন্তব্য করল ,তখন মিডিয়ায় ঝড় বইতে শুরু করল। প্রধানমন্ত্রী আপনার সাথে যখন মেঘ দেখা করতে গেল তখন বলেছিলেন যত দ্রুত সম্ভব খুনিদের গ্রেফতার করা হবে। তারপর আবার বললেন সরকারের পক্ষে সবার বেডরুম পাহাড়া দেয়া সম্ভব না। তাহলে এতে প্রমান হয় আপনি এই হত্যার বিচার চান না।

প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে বিনীত ভাবে একটি কথা বলি,মেঘ এখন স্বজনহারা। আপনিও স্বজনহারা। আপনি স্বজন হারার ব্যাথা বুঝেন। তাই আপনার কাছে আমাদের সবার অনুরোধ মেঘের বাবা মার খুনিদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করেন।

সাংবাদিক দম্পতি হত্যার পরে আমাদের মিডিয়া ছিলো সরব। তারা প্রতিদিন এই হত্যা নিয়ে সংবাদ শিরোনাম করতো। আবার এটা রাজনীতিবিদ দের ইস্যু হয়েছিল।

সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া তার উওর অঞ্চলের একটা জনসমাবেশে বলেছিল, সরকার সাগর রুনীর হত্যার বিচার করবে না। সরকারের সব দূর্নীতির তথ্য সাগর এবং রুনীর কাছে থাকায় তাদের হত্যা করা হয়েছে।

বিরোধী দলীয় নেত্রী তার সমাবেশে লোকজনদের তার দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য নানান কথা বলে থাকেন । যেন মানুষরা তার কথায় আকৃষ্ট হয়।

কিন্তু খালেদা জিয়ার কথার জের ধরে ২৮ ফেব্রুয়ারী হাইকোর্টে রিট করেন অ্যাড.মনজিল মোরশেদ। তখন আদালত নির্দেশ দিলো হত্যাকান্ড সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূএ ছাড়া কোন সংবাদ প্রচার করা যাবে না। এই এক কথায় শেষ । আমাদের মিডিয়া আদালতকে সম্মান প্রদর্শন করে একদম চুপ।

কিন্তু যারা এই হত্যা কাণ্ডের পরে নোংরা বানোয়াট কথা যারা লিখল তাদের বিরুদ্বে আদালতে রিট কেন হল না?

বিরোধী দল ১২ই মার্চ মহাসমাবেশ করল। এই সমাবেশে নাকি নাশকতা বোমাবাজি করা হবে। এজন্য ঢাকার বাইরে থেকে কোন প্রকার লোকজন আসতে দেয়া হয়নি। কারন: গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য আছে ঢাকায় নাশকতা চলবে। এখন কথা হলো গোয়েন্দারা নাশকতার আগাম তথ্য পায় কিন্তু সাগর এবং রুনীর হত্যার রহস্য উন্মোচন করতে পারছে না কেন।

২৬ ফেব্রুয়ারি ডিএমপির মুখপাত্র ডিসি মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়ে ছিলেন খুনের কারণ স্পষ্ট এবং খুনিও সনাক্ত হয়েছে অতিশীঘ্র গ্রেফতার করা হবে। তাহলে এখন পর্যন্ত খুনিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন?

আমাদের সবার প্রশ্ন সাগর ও রুনীর হত্যা মামলার অপেক্ষার শেষ কবে?