ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

রবিউল সাহেব (ছদ্ম নাম) একজন মেধাবী ব্যাংক কর্মকর্তা। তাঁর কর্ম জীবনে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পেশাগত কারণে তাঁর সাথে বিভিন্ন মানুষের সাথে পরিচয় ও উঠা-বসা।

তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে তিনিও পিছিয়ে নন কম্পিউটার-ইন্টারনেট ব্যাবহার থেকে। সারাদিন অফিসের কাজ সেরে তিনি বাসায় ফেরেন। রাতে বিভিন্ন মেইল আদান-প্রদান ও অনলাইন সংবাদ পড়ার জন্য তিনি তাঁর ল্যাপটপটা নিয়ে বসেন। সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকে তিনি একটা অ্যাকাউন্ট খুলেন। মাঝে মাঝে তিনি তা ব্যাবহার করেন।

একদিন হঠাৎ তাঁর কাছে তাঁর বিভিন্ন বন্ধু ও পরিচিত মানুষের কল আসতে থাকে এবং তাকে তাঁর ফেসবুকে দেওয়া তাঁর বিভিন্ন ছবি সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে। রবিউল সাহেব এসব প্রশ্ন শুনে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং কাউকে কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দ্রুত ল্যাপটপটি নিয়ে তাঁর ফেসবুক খুলেন। এরপর তিনি যা দেখতে পান তাতে যেমন খুবই অবাক হলেন তেমন ক্রোধান্বিতও হলেন। তিনি দেখতে পেলেন এক অপরিচিত ফেসবুক ব্যাবহারকারী তাঁর ফেসবুক ওয়ালে তাকে নিয়ে বানানো বিভিন্ন অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে দিয়েছে। আর সেই সাথে প্রতিটি ছবির নিচে নোংরা মন্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যে ফেসবুক ব্যাবহারকারী তাঁর যত বন্ধু ও পরিচিত মানুষ ছিলেন তাদের প্রায় সবাই এসব ছবি দেখেন এবং কেউ কেউ এসব ছবি নিয়ে আজে-বাজে মন্তব্যও করেন। অথচ এই সব ছবির সাথে তাঁর আদৌ কোন সম্পর্ক নেয়। তিনি তাঁর ফেসবুক ওয়ালে ট্যাগকৃত ছবিগুলো দ্রুত রিমুভ করে দেন। কিন্তু পরে আবার অন্য আরেক ফেসবুক আই. ডি. থেকে একই ভাবে ছবিগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা তাঁকে খুবই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। তিনি কি করবেন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। পরদিন এসব দুশ্চিন্তার কারণে তিনি অফিসেও গেলেন না। ভাবতে লাগলেন জনে জনে গিয়ে তিনি কি বলতে পারবেন যে এসব ছবি বানানো, কেউ শত্রুতা বা হিংসাপরায়ণ হয়ে করে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এমন কাজ করেছে!

তিনি এর জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একজন আইনজীবীর শরণাপন্ন হন এবং এর জন্য ওই ফেসবুক ব্যাবহারকারীর বিরুদ্ধে কি ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া যায় তার পরামর্শ নেন। পরদিন রবিউল সাহেব একটি মামালা দায়ের করেন। যথারীতি সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা অপরাধীকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠান। এক্ষেত্রে পাঠক একটি কথা বলি, ওই অপরাধী ভেবেছিল যে ভুয়া ফেসবুক আই. ডি. থেকে রবিউল সাহেবের নামে অশ্লীল ছবিগুলো ছড়িয়ে দিলেও সে ধরা পড়বে না। কিন্তু পুলিশ শুধুমাত্র তাঁর ভুয়া আই. ডি.-ই নয় বরং সে কোন কম্পিউটার বা ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র থেকে সেই সময় ইন্টারনেট ব্যাবহার করেছিল, তার লোকেশান কোথায় সবই বের করে ফেলতে সক্ষম হয়। সর্বশেষ জানা যায়, মামালাটি এখন চট্রগ্রামের একটি দায়রা আদালতে বিচারাধীন।

পাঠক দেশের প্রচলিত আইনে এই ধরণের কাজ একটা গুরুতর অপরাধ। কারণ এই সব কাজ যেমন কাউকে সামাজিকভাবে ভীষণ হেয় প্রতিপন্ন করে তেমন মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই ব্যাপারে আইনে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এই ধরনের তথ্যগুলোর মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয় তা হলে তার এই কাজ হবে একটি অপরাধ (তথ্য ও প্রযুক্তি আইন,২০০৬ এর ৫৭-১)।

এখানে কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাস বলতে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক বা টুইটারকেও বুঝাবে।

আর এর শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি এই ধরণের অপরাধ করলে তিনি অনধিক দশ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন (তথ্য ও প্রযুক্তি আইন,২০০৬ এর ৫৭-২)। আদালত সাধারণতঃ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই ধরণের দণ্ডযোগ্য কোন অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি প্রদান করে না। তাহলে পাঠক এক বার ভেবে দেখুন ওই অপরাধীর কত বড় শাস্তি হতে পারে যদি আদালতে তার কৃত কাজটি প্রমাণিত হয়। আর আমারাও প্রায় কোন অপরাধের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নি না বলে অপরাধীরা এমন সব জঘন্য অপরাধ করতে ভয় পাচ্ছে না।

লেখকঃ মানবাধিকার কর্মী
আইন বিভাগ, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Email: zahidlawcu@gmail.com