ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

৫০০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে চলতে থাকা মেক্সিকান মায়ান সভ্যতার বর্ষপঞ্জিকার শেষ দিনটিকে (গত ২১ শে ডিসেম্বর শুক্রবার) নিয়ে অনেক শঙ্কা আর বিতর্ক তৈরি হয়েছিল-মায়াযুগ শেষ, নাকি মহাপ্রলয়! পৃথিবী টিকে থাকবে, নাকি প্রলয়ের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে হারিয়ে যাবে কালের গর্ভে? এমন এক দোলাচলে সেদিন দুলছিল বিশ্বের অনেক মানুষ।

মুসলমান ধর্মে অবিচল বিশ্বাসী হওয়াতে আমি স্থির ছিলাম এই মহাবিশ্বে কোনো অঘটনই ঘটবে না! তারপরও বিভিন্ন মিডিয়াতে জানতে পারলাম, মায়ানদের অতীতের কোনো ভবিষ্যতবানীই নাকি ব্যর্থ হয়নি তাই অর্থাৎ শুক্রবার সারাদিন আমি অনলাইনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় চোখ রেখেছিলাম পশ্চিমা বিশ্বে কোনো উলট-পালট হ্য় কিনা বিশেষ করে মেক্সিকোতে! কারন পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের মিডিয়া এ ধরনের উৎভট তথ্য এবং গুজব প্রচার করে থাকে আর এইসব গুজবে বিশ্বাস করে দলে দলে আত্নাহুতিও দেয়। তাছাড়া হলিউড এসব গুজবের উপর ভিত্তি করে ‘Doomsday’ নামে সিনেমা বানিয়ে বিশ্ব্জুড়ে ধান্দা করে বেড়ায়।

এদিকে ২১ শে ডিসেম্বর মায়ান ভবিষ্যতবানীকে পাত্তা না দিয়ে ব্যাপক প্রচারের পর “রেদওয়ান রনি” পরিচালিত এ্যাকশন থ্রিলার মুভি ‘চোরাবালী’ রিলিজ হয়। ছোটকালে সিনেমা পাগলই ছিলাম বটে। হলে গিয়ে ১ দিনে ২/৩ শো সিনেমা দেখার রেকর্ডও রয়েছে এই অধমের। বেশ ক’বছর ধরে হলে গিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা হয় না। কারন সিনেমা হলে গিয়ে আড়াই-তিন ঘন্টা বসে মুভি দেখার সেই ধৈর্য্য এখন আর নেই।

সেদিন মায়া সভ্যতা, জটিল মায়া ক্যালে্ন্ডার আর দুনিয়া ধ্বংসের গুজব নিয়ে ফেসবুকে চলছিল দারুন মজা আর ফাজলামী। আমি আমার ওয়ালে এবং বিভি্ন্ন গ্রুপে একের পর এক পোস্ট দেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে ইনফো নিয়ে।

ফেসবুকে এক বন্ধু ইনবক্সে মেসেজ দেয়, “আজ ত দুনিয়ার শেষ দিন! তো দুনিয়া ধ্বংসের আগে কি করবার মন চায় আপনার?”
আমি হেসে জবাব দিলাম,”দুনিয়া ধ্বংসের আগে একটা সিনেমা দেইখাই মরি! হাহাহা কি কন?”
সেই বন্ধুও জবাব দিল, “মন্দ হয় না, বলা তো যায় না আর কোনো দিন মুভি দেখার সুযোগ পান কিনা।”

যে ভাবনা সে কাজ, বেলা ৩ টার দিকে টেক্সি ক্যাব নিয়ে চলে গেলাম বসুন্ধরা শপিংমলে! ভীষন ভীড়! ভাবলাম দুনিয়ার শেষদিন বিধায় সবাই বুঝি আমার মতই শেষ কেনাকাটা আর মুভি দেখতে এসেছে।
লেভেল ৮-এ স্টার সিনে্প্লেক্স-এ গেলাম। শুধু মানুষ আর মানুষ! যেখানে হলিউডের সিনেমা “Doomsday” বলেছে দুনিয়া ধ্বংসের কথা, আর দুনিয়া ধবংসের সম্ভাব্য দিনেই ‘চোরাবালি’ সিনেমা দেখার এত ভীড়, মানুষের চোখেমুখে কেয়ামতের ডর-ভয়ের কোনো আলামতই দেখতে পেলাম না! টিকেট কাউন্টারে গেলাম-আমি যাওয়ার আগেই নাকি সব টিকেট ফুরুত। সকল শো-এর টিকেট বুকড! কি আর করা- দোকানে দোকানে ঢু মারলাম কতক্ষন।

এক দোকানে ফুলহাতা মোটা সুয়েটার এবং কালো প্যান্ট পছন্দ করলাম। ট্রায়াল রুমেও যথারীতি ঢুকে পড়লাম। ম্যাচিং হলো কিনা আমার দ্বিধা দেখে “টেনসন করার কি আছে স্যার-দারুন মানাইসে’ বলেই চালু সেলসম্যান ছোকড়া তার মোবাইল ফোনে আমার ফটো তুলল! আমি তো অবাক!

তারপর আমাকে আরো অবাক করে সে বলল, “স্যার তারপরও যদি আপনার দ্বিধা থাকে তাহলে আমাদের ল্যাপটপ থেকে আপনার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করে দেন-তারপর দেখেন আপনার বন্ধুরা কি কমেন্ট করে। খারাপ বললে দামই নিমু না সার!” মনে মনে বললাম, লে হালুয়া, যুগ যুগ জিও ফেসবুক!

‘চোরাবলি’ সিনেমা না দেখেই কেনাকাটা করে বাসায় ফিরে রাতে আবারো চোখ রাখলাম ইন্টারনেটে। অনেক রাত জেগেও পৃথিবী ধ্বংসের কোনো আলামত না দেখতে পেয়ে মনে মনে ভাবলাম পৃথিবী ধ্বংস হোক আর না হোক তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। এখন আমার একটা ঘুম দরকার। পৃথিবী টিকে থাকলে আমিও টিকে থাকবো আর পৃথিবী টিকে না থাকলে তো গুড-বাই! একটা লম্বা হাই তুলে চোখ দুরু দুরু মনে চোখ দুটো বন্ধ করে দিলাম এক ঘুম।

সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখি নতুন এক সূর্য স্বাগত জানিয়ে বলল, “Don’t worry dear, ঐসব ফালতু গুজবে কান দিও না। পৃথিবী ধ্বংস হ্য়নি, বরং নতুন যুগের সূচনা ঘটেছে!”