ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

সাদা-কালোর যুদ্ধটা কবে থেকে শুরু হল তা আজ আর ঠিক করে যাচাই করে বলার উপায় নেই। তবে ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই তাহলে বলতেই হবে এই যুদ্ধে সর্বোপরী পরাজিত হচ্ছে কালোরাই। আমি এটি বলতে যাবো না যে এই যুদ্ধে জয়ী হচ্ছে সাদারা। কারন এই যুদ্ধে সব পক্ষই পরাজিত শক্তি। এই যুদ্ধে কখনো কোন বিজয়ী ছিল না। কখনো থাকবেও না। আর আমি সাদা-কালোর যুদ্ধ বলতে দুটি আদর্শের মাঝে লড়াইয়ের কথা বলছি না। এ হচ্ছে সাদা চামড়ার মানুষদের সাথে কালো চামড়ার মানুষদের যুদ্ধ! সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হয়েও এরকম বাহ্যিক এবং শারীরিক একটি বৈশিষ্ট্য কে কেন্দ্র করে মানুষের সাথে মানুষের লড়াই চলাটাকে যতোটা না মানবিক বলা যাবে তার চাইতে বেশি জান্তব বলতে হবে। কিন্তু আবার জানোয়ারেরাও হয়তো চামড়ার রঙকে কেন্দ্র করে একে অপরের উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে না! কিন্তু আমরা মানুষেরা পারি!
কিন্তু এই অসম যুদ্ধের সূচনাটা ছিল কবে? আগেই বলেছি এটি সঠিকমতো যাচাই করার উপায় আর নেই। কিন্তু সাদা-কালোর এই যুদ্ধ এবং এর ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হওয়া বর্ণবাদী বৈষম্য এর গোঁড়া পত্তন হয়েছিল দাস প্রথার মাধ্যমে। দাস প্রথা হাজার হাজার বছর ধরেই মানব সভ্যতায় বিদ্যমান ছিল। কিন্তু দাস বলতে চোখের সামনে একজন কালো মানুষের চেহারা ভেসে ওঠাটার জন্য দায়ী ছিল African Slave Trading যার সূচনা হয়েছিল ইউরোপ থেকে আফ্রিকায় আগত ঔপনিবেশিকদের হাতে। আগেই বলেছি দাসপ্রথা আরও অনেক আগে থেকেই চালু ছিল। যুদ্ধে পরাজিত রাজ্যগুলোর নাগরিকদের বিজয়ী সাম্রাজ্যগুলোর বিভিন্ন প্রান্তে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হতো। কিন্তু আফ্রিকায় কালো চামড়ার মানুষদের উপর যে অত্যাচার নিপীড়ন চলেছিল তা পুরোটাই হয়েছিল ব্যবসায়িক কারনে। ঐ অঞ্চলের মানুষগুলো এমনিতেই ছিল বলশালী এবং অনেকটাই সরল প্রকৃতির। তাঁদের মাঝেও নৃশংস যোদ্ধারা ছিল না তা বলা যাবে না। আফ্রিকার জুলুদের দিকে তাকালেই যোদ্ধা জাতির প্রমাণ মিলে যাবে। কিন্তু ইউরোপিয়ানরা প্রযুক্তিতে এবং শিক্ষায় অনেকটাই এগিয়ে ছিল এবং শিক্ষার সাথে সাথে কুটিলতায় তাঁরা হয়ে উঠেছিল পারদর্শী। তাঁদের কুটিলতার কাছে পরাজিত হয়ে ধীরে ধীরে দাসপ্রথার শিকার হতে থাকল আফ্রিকার কালো মানুষগুলো। বলশালী হওয়ায় এই কালো চামড়ার মানুষগুলোকে দিয়ে কঠিন কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল। এছাড়াও সরল প্রকৃতির হওয়ায় তাঁদেরকে ফাঁদে ফেলা সহজ ছিল।
সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীর দিকে তাকালে দেখা যাবে আরব ব্যবসায়ীরা অনেকটাই আফ্রিকায় দাস ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। আরব সমাজে দাস প্রথার পেছনে অ্যারিস্টোটল এর মতবাদ অনেকাংশেই দায়ী যা কিনা কালের প্রবাহে আরবদের মাঝেও প্রভাব বিস্তার করেছিল। অ্যারিস্টোটল এর মতবাদ অনুযায়ী, “For that some should rule and others be ruled is a thing not only necessary, but expedient; from the hour of their birth, some are marked out for subjection, others for rule…” বর্ণবাদী বৈষম্যও এসময়টাতে চোখে পড়ে। বিশেষ করে নুবিয়ান জাতিদের (মধ্যযুগে দক্ষিণ মিশর এবং সুদানে বসবাসকারী কালো চামড়ার আফ্রিকান অধিবাসী) প্রতি তীব্র ঘৃণা লক্ষ্য করা গিয়েছে আরব সাহিত্যেও। কালো চামড়ার মানুষদের খারাপ মানুষ হিসেবেই ধরে নেওয়া হতো। ইসলাম এর আবির্ভাবের মাধ্যমে অবশ্য কালো মানুষদের প্রতি বৈষম্যের হার অনেকটাই কমে আসে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আরনল্ড জোসেফ টোয়েনবির এর মতামত ছিল এরকম, “The extinction of race consciousness as between Muslims is one of the outstanding achievements of Islam and in the contemporary world there is, as it happens, a crying need for the propagation of this Islamic virtue.”
তবে আফ্রিকায় দাস ব্যবসা মহামারী আকার ধারন করে পনের থেকে উনিশ শতাব্দীর মাঝে যার জন্য দায়ী ছিল “Atlantic Slave Trade” এবং এর পেছনে যে কেবল মাত্র ইউরোপীয়রা জড়িত ছিল তা বলা যাবে না। আফ্রিকাতেই এ সময় গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন রাজ্য যারা নিয়মিত একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকত যাতে করে পরাজিত শত্রুর বন্দীদের দাস হিসেবে ইউরোপীয় দাস ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা সম্ভব হয়। এর ফলশ্রুতিতে দাস ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছিল এই সময়টাতে। এর মাঝে সর্বপ্রথম স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকরা আফ্রিকান ক্রীতদাসদের নিউ ওয়ার্ল্ডে (বর্তমান ওয়েস্ট-ইন্ডিজ, কিউবা এবং উত্তর-পূর্ব আমেরিকার একাংশ) প্রেরণ করা শুরু করে। এরপর আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের পর রচিত সংবিধানেও দাস প্রথাকে রক্ষা করার জন্য ধারা সংযুক্ত করা হয়। ১৮০৮ সাল পর্যন্ত এই ধারা বজায় থাকে এবং ১৮০৮ সালের পর দাস আমদানী করা সংবিধান অনুযায়ী নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এর পরও অবৈধভাবে দাস ব্যবসা চলতে থাকে আমেরিকাতে। ১৮১০ সাল এর পর তুলো উৎপাদন এবং রপ্তানি লাভজনক ব্যবসাখাতে পরিণত হয় এবং এই খাতে শ্রমিক হিসেবে খাঁটানোর জন্য জোরপূর্বক আফ্রিকান-আমেরিকান দাসদের আমেরিকার দক্ষিণে আরও গভীরে প্রেরণ করা হয়।
আমেরিকায় তখন অবশ্য অনেকেই দাস প্রথার বিরুদ্ধে তাঁদের মত প্রকাশ করতে শুরু করে। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে আমেরিকার জনগণ চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর মাঝে সাউদার্ন ডেমোক্রেটরা দাসপ্রথার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে, নরদার্ন ডেমোক্রেটরা ধাপে ধাপে এলাকা ভিত্তিক ভোটের মাধ্যমে দাসপ্রথার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে, কন্সটিটিউশনাল ইউনিয়ন পার্টি যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। আব্রাহাম লিংকনের রিপাবলিকানরা সম্পূর্ণভাবে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এর ফলশ্রুতিতে ১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় আমেরিকায়। ১৮৬৫ সালে গৃহযুদ্ধের অবসানের পর ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে আমেরিকায় দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হয়।
কিন্তু এর পরবর্তীতেও কালো চামড়ার অধিকারীদের উপর নিপীড়ন চালাতে থাকে এক শ্রেনীর মানুষ। এর ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় ভয়ঙ্কর কু ক্লুক্স ক্ল্যান যাদের চরমপন্থি আদর্শের মাঝে আসলটি ছিল হুমকি, হত্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে সাদা চামড়ার মানুষদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এই সংগঠনটি শক্তিশালী আকার ধারন করে ১৯২১ থেকে ১৯২৫ সালের মাঝে। পরবর্তীতে মার্টিন লুথার কিং এর নেতৃত্বে সিভিল রাইটস এর সংগ্রাম এবং তাঁর হত্যার পর সিভিল রাইটস অ্যাক্ট, ১৯৬৮ পাশ করা হয়। এরপরও বিভিন্নভাবে বিভিন্নবেশে আমেরিকায় কালো চামড়ার মানুষদের প্রতি বৈষম্য চলতে থাকে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ধারার সাথে তাল মিলিয়ে এবং সর্বোপরী সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে এবং আমেরিকানরা যে সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে এই পরিবর্তন গ্রহণ করেছে তার প্রমাণ মিলেছে ২০০৯ সালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ইলেকশনের মাধ্যমে যাতে সর্বপ্রথম একজন কালো চামড়ার মানুষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।
বর্ণবাদী বৈষম্যের ব্যাপারে আমেরিকার ইতিহাসই হয়তো সবচেয়ে নৃশংস মনে হতে পারে। কিন্তু এটি মনে রাখতে হবে যে আমেরিকায় বর্ণবাদী বৈষম্যের ব্যাপারগুলো রেকর্ড করা আছে। যে কোন ভুল থেকে বের হয়ে আসার জন্য প্রথমেই জরুরী হচ্ছে ভুলটা স্বীকার করা। আমেরিকা ভুলগুলো স্বীকার করেছে বলেই আজ এই অবস্থায় আসতে সক্ষম হয়েছে। এটি সত্যি যে কালো চামড়ার নাগরিকদের দেখেই গুলি করার জন্য হাত নিশপিশ করতে থাকা পুলিশদের নাম আবার ইদানীং আমেরিকান মিডিয়াতে উঠে আসছে এবং আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু এটাও ঠিক যে এই আন্দোলনগুলোর মাধ্যমেই আমেরিকায় আবার পরিবর্তন আসবে।
আফ্রিকায় দাসপ্রথা এবং বর্ণবাদের এত কথা বলার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি – আফ্রিকানদের নিয়ে মধ্যযুগে ফুঁলে ফেঁপে ওঠা দাস ব্যবসার সাথে বর্ণবাদের আবির্ভাবের সম্পর্ক স্থাপন। ইতিহাসের দিকে তাঁকালে দেখা যাবে এবং ইতিহাসবিদদের এক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে যে শেষ এক হাজার বছরে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ধনী ছিলেন চৌদ্দ শতাব্দীর আফ্রিকার মালি সাম্রাজ্যের রাজা কালো চামড়ার মানসা মুসা (এক) যার সম্পদের পরিমান বর্তমান হিসেবে ছিল প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। ইতিহাসের দিকে তাকালেই চোখে পড়বে যে একটা সময়ে আফ্রিকার কালো চামড়ার অধিকারী মানুষেরা প্রবল প্রতিপত্তির সাথে মিশরীয়, গ্রীক এবং রোমান সাম্রাজ্যের ধনী শাসক গোষ্ঠীর সাথে এক সাথেই চলেছে। পরবর্তীতে তাহলে কি কারনে এরকম ধারণার জন্ম হল যে কালো চামড়ার মানুষ মাত্রই সে খারাপ? মানুষের মাঝে দ্বিতীয় শ্রেণীর? হতদরিদ্র? এর উৎপত্তির পেছনে একমাত্র দায়ী আফ্রিকান মানুষদের নিয়ে করা দাস ব্যবসা। মানব চরিত্রের একটি দিক হল অনেকদিন ধরে অনুশীলনের পর যখন কোন কিছুতে অভস্ত্য হয়ে পড়বে, তখন তার ধ্যান-ধারণা সেই খাতেই প্রবাহিত হতে থাকে। প্রায় হাজার বছর ধরে কালো চামড়ার মানুষদের দাস হিসেবে দেখে এসেছে অন্যরা। হাজার বছর ধরেই একটু একটু করে পিছিয়ে পড়েছে আফ্রিকা। তাই কালো মানুষ বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে হত-দরিদ্র্য, অশিক্ষিত একজন মানুষের চেহারা অপরাধই যার পেশা। এটি আমাদের ধ্যান-ধারণার অংশ হয়ে পড়েছে।
এতো গেল কালো চামড়ার সাথে সাদা চামড়ার মানুষদের লড়াইয়ের গল্প। কিন্তু কালো চামড়ার মানুষদের অবজ্ঞার চোখে দেখাটা আমাদের অঞ্চলে কিভাবে এল? White Supremacy এর আদর্শগত উদ্দেশ্য কোনভাবেই আমাদের ক্ষেত্রে খাঁটানো যায় না। আমরা এই অঞ্চলের (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বিশেষ করে ভারত উপমহাদেশ) মানুষেরা শ্যামলা বর্নের মানুষ। “ধব ধবে ফর্সা” যে কথাটা বলে আমরা অনেকেই চোখ উল্টিয়ে হু হা শুরু করি সেরকম ফর্সা আমরা কখনই না। বরং বলতে হবে যে আসল White Supremacist এর সামনে পরে গেলে তারা আমাদের নিঁচু চোখেই দেখবে। আমাদেরকে ডাকবে Brown Skinned বলে। বর্তমানে বর্ণবাদী একটি পরিভাষা হল Colored People. এই পরিভাষাটির মাধ্যমে White Supremacist শুধু কালো চামড়ার মানুষদেরই বোঝায় না, আমাদের মত শ্যামলা বর্ণের মানুষদেরও বোঝায় এবং সাথে অন্যদেরও যাদের চামড়ার রঙ তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী সাদা নয়। তাহলে আমাদের মাঝে কালো বা গাঢ় শ্যামলা বর্নের মানুষদেরকে হেয় করার প্রবণতা কোথা থেকে এল?
এর জন্যও আমাদের তাকাতে হবে ইতিহাসের দিকে। ভারত উপমহাদেশে ক্রীতদাস প্রথাটি কখনই প্রকটভাবে চালু ছিল তা বলা যাবে না। কিন্তু শ্রেণী ভিত্তিক ভেদাভেদ প্রচন্ডভাবে চালু ছিল। এই অঞ্চলে স্বভাবতই যারা শাসক ও ধনী গোষ্ঠীর সদস্য ছিল তারা কখনই সেরকমভাবে সূর্যের তাপে ঘেমে কায়িক পরিশ্রমে অভ্যস্ত ছিল না। পরিশ্রম প্রয়োজন হয় এধরনের কাজগুলো শ্রমিকরাই করতো। যার ফলে শাসক ও ধনী গোষ্ঠীর মানুষগুলোর চাইতে শ্রমিক মানুষগুলোর চামড়ার রঙ কিছুটা গাঢ় হতো, শ্যাম বর্নের হতো বা কালো হতো। সেখান থেকেই এই ধারণাটার সূচণা হলো যে উজ্জ্বল বা ফর্সা চামড়ার মানুষ হলে সে অবশ্যই ধনী গোষ্ঠীর। আর গাঢ়, শ্যাম বা কালো চামড়ার মানুষ হলেই সে শ্রমিক হবে।
অবশ্য ভারত উপমহাদেশে সব জায়গাতেই এরকম চল ছিল তা বলা যাবে না। হিন্দু ধর্মের প্রধান দেবীদের একজন কালী কৃষ্ণ বর্ণের। আবার রাজপূত যোদ্ধাদের অনেকেই ছিল রোদে পোড়া চামড়ার অধিকারী (যুদ্ধ প্রশিক্ষণের কারনে)। আর ফর্সা রঙের ত্বক এবং শ্যাম বর্ণের ত্বকের এই পার্থক্যটা হয়তো সম্পদ এর দিক থেকে সামাজিক ভেদাভেদের একটা বহিঃপ্রকাশ ছিল, কিন্তু কোনভাবেই শুধুমাত্র চামড়ার রঙের উপর ভিত্তি করে বৈষম্য করার ব্যাপারটা বিদ্যমান ছিল না।
চামড়ার রঙের উপর ভিত্তি করে বৈষম্য সৃষ্টির পেছনে এই অঞ্চলের ক্ষেত্রেও প্রধানতভাবে ইউরোপীয়রা দায়ী। আরেকটু গভীরভাবে দেখাতে চাইলে বলতে হবে ব্রিটিশ বা ইংরেজ ঔপনিবেশিকরা দায়ী। ইংরেজ শাসনামলে আক্ষরিকভাবে সামাজিক অবস্থানের সাথে গায়ের রঙের সম্পর্কের প্রথাটি চালু হয়। ইংরেজ শাসকরা ইচ্ছাকৃতভাবেই এই প্রথাটি চালু করে এবং তৎকালীন ভারতীয়দের মাঝে যাদের গায়ের রঙ উজ্জ্বল অথবা ফর্সা, তাদের প্রতি পক্ষপাত মূলক আচরণ শুরু করে। সাদা চামড়ার অধিকারী ইংরেজরা এই প্রথা চালুকরণের মাধ্যমে এটিই স্থাপন করার চেষ্টা করে যে সাদা চামড়ার মানুষ মানেই স্বাভাবিকভাবেই শ্রেষ্ঠ। এর মাধ্যমে ইংরেজরা তাদের কর্তৃত্ব এবং শাসনকে পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করে। কালের ধারায় এই প্রথা ভারতীয়দের মজ্জাগত হয়ে পড়ে। এরকম একটি ধারণা জন্মায় যে পাশ্চাত্য সবকিছুই শ্রেষ্ঠ এবং গায়ের রঙ ফর্সা হলেই একজন মানুষ শ্রেষ্ঠ।
উপনিবেশ আমলের এই প্রথা দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সংস্কারের সাথে মিশে গিয়েছে। আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তাই আমাদের এই প্রথার সাথে যুদ্ধ করতে হয়। “ফেয়ার এন্ড লাভলী” এবং “ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম” নামের কসমেটিকসের বিজ্ঞাপনের সাথে পাল্লা দিতে হয়। আমাদের নামী তারকারাও এর সাথে গিয়ে হাত মিলিয়ে ঐসব কসমেটিকসের বিজ্ঞাপন এ অংশগ্রহণ করে। আমাদের সহ্য করতে হয় এরকম বিজ্ঞাপন যে ত্বকের রঙ ফর্সা না হলে স্বপ্নের চাকরীটা পাওয়া সম্ভব নয়। এবং দূর্ভাগ্যজনক হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি সত্যি! কারণ চাকরীদাতাদের অনেকেই এই উপনিবেশ আমলের ধারণা রক্তে নিয়ে বসে আছেন!
সমাজের এই বিশেষ কুৎসিত রূপটির অসংখ্য নোংরা রূপ আছে। নাহলে আমাকে শুনতে হতো না যে একজন মা কিভাবে তার নিজের সন্তানদের মাঝেই গায়ের রঙয়ের জন্য বৈষম্য করে যান! আমাকে শুনতে হতো না দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে বের হওয়া এবং শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে চাকরী করা একজন মানুষকে দোকানে গেলে অপরিচিত মানুষের কাছে শুনতে হয় যে তাঁকে দেখে দোকানের কর্মচারী মনে হয়েছে! (দোকানের কর্মচারী মানেই কটাক্ষ করা সে আরেকটি সামাজিক অবক্ষয়ের পরিচয় কিন্তু এই ব্যাপারে আরেকদিন আলোচনা করব) বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে মেহমানদের মুখে শুনতে হতো না যে “ছেলেটা একটু কালো হয়ে গেল না?” অথবা “আর মেয়ে ছিল না যে এমন একটা কালো মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে?” স্কুল-কলেজে গায়ের রঙের উপর ভিত্তি করে কালো সাব্বির বা কাউল্লা রাকিব শুনতে হতো না। ঢাকায় অনেক বিদেশী থাকেন যারা কালো চামড়ার অধিকারী। আফ্রিকান-আমেরিকান হতে পারেন অথবা আফ্রিকার কোন দেশের বা অন্য কোন দেশের। বাঙ্গালীরা খুব অতিথিপরায়ণ জাতি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আতিথেয়তার নমুনাটা দেখতে হলে আমাদের দেখতে হবে আমরা সাদা চামড়ার বিদেশীদের সাথে কিরকম আচরণ করি আর কালো চামড়ার বিদেশীদের সাথে কিরকম আচরণ করি। আমার চোখের সামনেই একজন ট্যাক্সি চালককে দেখেছি একজন কালো চামড়ার বিদেশীকে কিভাবে খারাপ আচরণ করে সরিয়ে দিচ্ছে! আমার একজন বন্ধুর মুখেই খুব হিংস্রভাবে শুনেছি কিভাবে এই কালো চামড়ার বিদেশী মানুষগুলো শুধু ড্রাগের ব্যবসা করতেই আমাদের দেশে এসেছে!
সমাজের এই নোংরা দিকটার (হ্যাঁ আমি সমাজের অংশই বলছি কারণ এই নোংরা অনুশীলন আজ আমাদের সমাজের অংশ) জন্য কারা দায়ী? কেন আমরা আজও এই ধারা থেকে বের হতে পারিনি? কেন আমাদের সমাজে ফর্সা চামড়া না পাওয়া মানুষগুলো আড়ালে-আবডালে অপমানের জ্বালায় লুকিয়ে চোখের পানি ফেলে? এজন্য সমষ্টিগতভাবে আমরা সবাই কি দায়ী নই? আমাদের মিডিয়াগুলোতে কিভাবে ফর্সা চামড়ার অধিকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় তা তো একেবারেই পরিষ্কার। কয়জন শ্যাম বর্ণের মানুষ নাটক সিনেমাতে সুযোগ পেয়েছে? আর যারা পেয়েছে তাঁদেরকেও কি একটা বড় সময় তাঁদের গায়ের রঙ নিয়ে বৈষম্য সামাল দিতে হয় না? তাঁদেরকে কি “আর সবার চাইতে একটু বেশি” মেধা দেখাতে হয় না টিকে থাকার জন্য? সেই “একটু বেশির” পরিমাণটা কি অপরিসীম নয়? ঘষেমেজে মেকাপ মেরে চেহারা জোর করে ফর্সা বানানোর মাধ্যমেই কি তাঁদের টিকে থাকতে হয় না?
অনেকগুলো প্রশ্ন। এই প্রশ্নগুলোই এই বৈষম্যের শিকার হওয়া মানুষগুলোর জন্য আক্ষেপ। তাঁদেরকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যেতে হচ্ছে এই প্রশ্নগুলোর বিরুদ্ধে। যে সমাজে গায়ের রঙ দেখে মানুষের মনে আপনা-আপনি একটা খারাপ ধারণা চলে আসে, সে সমাজে এই গায়ের রঙ নিয়ে বৈষম্যের শিকার হওয়া মানুষগুলোকে শুরু থেকে একটা দেয়াল টপকানোর জন্য কাজ করে যেতে হয়। একসময় দেয়ালটা টপকাতে পারলেও কিছু দূরেই সেই একই দেয়াল গজিয়ে যায় আবার। আবার নতুন করে তাঁদের শুরু করতে হয় সংগ্রাম।
যা বলেছিলাম। ইতিহাসের দিকে তাকালে মনে হবে আমেরিকানরাই হয়তো সবচেয়ে বেশি বর্ণবাদী। কিন্তু একটু গবেষণা করলেই বেরিয়ে যাবে যে আমেরিকানদের চাইতে ঢের বেশি বর্ণবাদী হচ্ছে ইউরোপীয়রা এবং আমরা। ত্বক ফর্সা করার ক্রীম, মেকাপ আর ফটোশপ এর মাঝে আমাদের মানবিকতা হাঁরিয়ে যাচ্ছে। সমাজের বড় অংশকে শিখাচ্ছি চেহারা সচেতন হয়ে সময় নষ্ট করতে। যারা ফর্সা নয় তাঁদের বাধ্য করছি তাঁদের আসল গুণলোর দিকে নজর না দিয়ে এই মেকী সমাজ সৃষ্ট “গুণ” এর অভাব নিয়ে অতিষ্ঠ থাকতে। ফলাফল যেটা হচ্ছে, ছোট বাচ্চাদের মাঝেও এই মনোভাব ক্রমশ ঢুঁকে যাচ্ছে। প্রথম শ্রেনীতে পড়া শিশুদের মুখে আজ বর্ণবাদী মন্তব্য শুনতে হয়।
এই বর্ণবাদী আচরণ একটি ব্যাধি এবং যারাই এই তামাশায় মেতে থাকেন তাঁরা সবাই এই রোগে আক্রান্ত। সমাজের দিকে তাঁকালে দেখা যাবে বেশিরভাগ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। হোক তাঁরা শিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত। এই রোগের প্রতিকারের সময় চলে এসেছে। এই সামাজিক ব্যাধির প্রতিকারের প্রধান উপায় সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে ধারণা বাসা বেঁধেছে যে ফর্সা না হলেই একজন মানুষকে কটাক্ষ করতে হবে তা থেকে বের হওয়ার জন্য আমাদের চোখের সামনে এমন কিছু মানুষের সাফল্য গাঁথা তুলে ধরতে হবে যারা চামড়ার রঙ দিয়ে নয়, বরং যোগ্যতা দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে। কালো চামড়ার অধিকারী কয়েকজন মানুষ আমাদের এই সমাজেও সুপারষ্টার এর মর্যাদা পেয়েছে। বারাক ওবামা, নেলসন ম্যান্ডেলা, ব্রায়ান লারা, মাইকেল জ্যাকসন এবং পেলের মতো রাজনীতিবিদ, খেলোয়ার বা গায়ক তারকাদের নাম বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখেই শুনতে পাওয়া যায়। আমাদের দেশেও কি রুবেল, রফিক, হাসান মাসুদদের মতো তারকারা বর্তমান নেই? এই মানুষগুলোর সামর্থ্য ও সাফল্যের কথা নিরপেক্ষ ভাবে তুলে ধরতে পারলেই তো ধীরে ধীরে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসা শুরু করবে!
এভাবে গণসচেতনতা আবার ঢাক-ঢোল পিঁটিয়ে তৈরি করলে হবে না। সেক্ষেত্রে মানুষের মনের ভেতর থেকে যে পরিবর্তনটা আনা জরুরি সেটা কখনই হবে না। পরিবর্তনটা আনতে হবে এমনভাবে যেন এসব বৈষম্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে চিন্তা করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়। শিশুদের কানের পাশে এধরনের মনোভাব বলে বেড়ালে হবে না। আপনি নিজে যদি সচেতন হন এবং যদি দেখতে পান যে আপনার সামনে কেউ বর্ণবাদী মন্তব্য করছে বা আচরণ করছে কোন শিশুর সামনে, তাহলে সেই ব্যক্তিকে বাঁধা দিন। প্রয়োজনে তিরষ্কার করুন। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে ওই ব্যক্তির প্রস্থানের পর ওই শিশুকে বোঝান যে ওই ব্যক্তি একটি সামাজিক ব্যাধির শিকার। মনে রাখবেন, বর্ণ বৈষ্যমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে ধর্ম, আইন, মনুষ্যত্ব, বিবেক সবকিছুই আপনার পক্ষে থাকবে। তাই শক্তভাবে প্রতিবাদ করুন।
এই মনোভাব থেকে বের হয়ে আসার জন্য আইনকানুনকেও শক্তিশালী করতে হবে। মানুষের অনুভূতিতে অন্যায়ভাবে আঘাত করাকে বা গায়ের রঙের জন্য কটাক্ষ করাকে বা চাকরি নিয়োগ না দেওয়াকে আইনতভাবে নিষিদ্ধ এবং দন্ডনীয় করতে হবে। অনেকগুলো কথা বলে ফেললাম। কিন্তু বলাটা জরুরী ছিল। আমরা কথা বলেই বেশিরভাগ সময় চুপ মেরে যাই। সময় এসেছে প্রতিবাদের ভাষা শুধু মুখে প্রকাশ না করে কাজে-কর্মেও প্রকাশ করার। আরেকজনের দোষ-ভুল দেখে আমরা কটাক্ষ করি, কিন্তু নিজেদের দোষ-ভুলগুলোর ক্ষেত্রে অন্ধ হয়ে থাকি। নিজেদের ভুলগুলোকে স্বীকার করতে হবে। স্বীকার করতে হবে বর্ণ বৈষম্য একটি সামাজিক ব্যাধি। এবং আমাদের আশপাশের যে মানুষগুলো এই বৈষম্যের শিকার তাঁদেরকে প্রকাশ্যে সাহস যোগাতে হবে। তাঁদের পক্ষে প্রতিবাদ করতে হবে। তাঁদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে। তাঁদের অপমানকে নিজের অপমান বলে স্বীকার করতে হবে। আর এভাবেই আমরা একসময় পারব আমাদের সমাজকে এই ব্যাধি থেকে মুক্ত করতে। সুতরাং নিজে সচেতন হই। অন্যকে সচেতন করি। প্রতিবাদী হই। এবং সমস্বরে বর্ণ বৈষম্যকে না বলি।

slide