ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

হঠাৎ করেই Facebook এর Desperately Seeking Dhaka গ্রুপে একটা পোষ্টে চোখ আঁটকে গেল। একজন ছোটভাই সৌদি-আরব কিভাবে যাওয়া যায় সে ব্যাপারে জানতে চাচ্ছে। তাঁর বাবা-মা দুজনই পবিত্র হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে এবার সৌদি-আরব গিয়েছেন। মীনার দূর্ঘটনার পর থেকেই তাঁদের সম্পর্কে কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। একটি সূত্র থেকে সেই ছোট ভাই জানতে পেরেছেন যে সম্ভবত তাঁর বাবা-মা দুজনই ইন্তেকাল করেছেন ওই ঘটনায়। কিন্তু কোন কিছুই এখনও পরিষ্কার হচ্ছে না। সব তথ্যতেই “কিন্তু” থেকে যাচ্ছে। সেই ছোটভাই এখন নিজেই সৌদি-আরব যেতে চাচ্ছেন নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার জন্য। তাঁর মনে এখনও আশা যে বাবা-মাকে হয়তো সুস্থ-জীবিত দেখতে পাবে।
নিজের অজান্তেই সেই ছোট ভাইয়ের প্রোফাইলে চলে গেলাম। আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটভাই। ঈদের আগের দিনগুলোতে বন্ধুদের সাথে হাস্যোজ্জ্বল ছবি। এরপরই শেষ পোষ্টে আকুলভাবে বাবা-মার খোঁজ পাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাওয়া নিয়ে পোষ্ট।
কত সহজেই মানুষের জীবনে হাসির পর কান্না চলে আসতে পারে। কিন্তু এরকম এক একটা অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষ একসময় অদম্য ইচ্ছাশক্তির বাস্তবরূপে পরিণত হয়। মানুষ মারা যাবে। এটাই অমোঘ সত্য। কিন্তু কিছু মানুষ অসময়ে চলে যায় যে সত্যগুলো আমরা কিছুতেই মানতে পারি না। কিন্তু যেহেতু আমরা মানুষ এবং সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ তাই একটা সময় আমরা অসময়ে চলে যাওয়া মানুষদের দুঃখটাও অবদমন করতে পারি কারণ আমাদের মানসিক সহ্য ক্ষমতাও অসম্ভব বেশি।
একটা মানুষ এরকম অভাবনীয় পরীক্ষা পার হয়ে এসে শক্তিশালী মনের অধিকারী হয়। নিজের মানসিক দুঃখ-কষ্টের সাথে নিজে যুদ্ধ করতে শেখে। এরকমটা করতে পারি দেখেই আমরা মানুষ।
কিন্তু এই সময়গুলো কেউই একলা অতিক্রম করতে পারে না। নিজের মনের সাথে যুদ্ধটা হয়তো একা করতে হয়, কিন্তু এই সময়টা চারপাশের মানুষগুলোর কাছ থেকে সহানুভূতির প্রয়োজন হয়।
আর ঠিক এই জায়গাটিতেই আমরা ব্যার্থ হয়েছি……
মীনায় দূর্ঘটনার পরপরই শুরু হয়েছে এক অসহনীয় পর্যায়ের কাঁদা ছোঁড়া-ছুঁড়ি। সৌদিআরব আর ইরানের মাঝে আদর্শগত শত্রুতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু হজ্বে সংঘটিত এই দূর্ঘটনার পর এই দুদেশের মাঝে বাকযুদ্ধ চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। হজ্বের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন কোণা থেকে মুসলমানরা এসে হাজির হয় মক্কায় এক ভাতৃত্ব এবং সম্প্রীতির টানে। যেখানে একটা পরিচয়ই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়- “আমরা সবাই এক আল্লাহর বান্দা”। কিন্তু সৌদিআরব এবং ইরানের মাঝে বাকযুদ্ধ এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেঁকেছে যে তা কুৎসিত আঁকার ধারণ করেছে। কতজন মানুষ ইন্তেকাল করেছে তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে ধূম্রজালের। সৌদিআরব বলছে এক সংখ্যা, ইরান বলছে আরও অনেক বেশি। এরকম লাশ নিয়ে রাজনীতিতে যোগ হয়েছে আরও বিভিন্ন আদর্শের মানুষ। আর এখানেই আমাদের দেশের কথাও চলে আসে।
এবারে হজ্বের দূর্ঘটনাগুলোর পর থেকেই একটা দল, যারা হজ্ব এর বিরোধী, তাঁরা নতুন করে শব্দের গোলা-বারুদ খুঁজে পেয়েছেন তাঁদের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
আরেকটি দল যাঁরা সৌদিআরবকে পছন্দ করে না তাঁরা মত্ত হয়ে পড়েছেন এটা প্রমাণ করতে যে সৌদিআরব হজ্ব অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে পারবে না।
আরেকটি দল যাঁরা সৌদি রাজ পরিবারকে পছন্দ করে না তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কিভাবে একজন সৌদি যুবরাজ এর যাত্রার জন্য এই দূর্ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে।
একটা দল যাঁরা মনে করেন সৌদিআরব বা সৌদি রাজ পরিবার কোন ভুল করতে পারে না তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে কোন মূল্যে কথার জোরে হলেও সৌদিআরব বা সৌদি রাজপরিবারকে নির্দোষ প্রমাণ করতে।
আমাদের অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোও কম যায় না। গরম গরম চলতি খবরের সাথে তাল মেলাতে “মক্কায় খোঁড়া হচ্ছে ৭৪,০০০ (!!) কবর…” বা “সৌদি যুবরাজদের প্লেবয় স্টাইল লাইফ…” ইত্যাদি ব্যাপারে মুখরোচক সংবাদ ছাঁড়া শুরু করেছে। আর আমাদের নিজেদের মাঝে “কার দোষে দূর্ঘটনা…” তা নিয়ে তো তর্ক চলছেই।
কিন্তু এ সকলের মাঝে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটাই ভুলে বসে আছি! তা হলো দূর্ঘটনায় নিহত হওয়া মানুষগুলো এবং তাঁদের বেঁচে থাকা কাছের মানুষগুলোর কথা। নিজেদের মাঝে কাঁদা ছোঁড়া-ছুঁড়িতে এতটাই ব্যস্ত আমরা যে, ইন্তেকাল করা বা নিখোঁজ থাকা মানুষগুলোর পরিবার যে অসহনীয় সময় পার করছে তা আমাদের চিন্তাতেও আসছে না! এই মানুষগুলো এরকম নোংরা রাজনীতির খেলায় জড়াতে চায় না। তাঁদের শুধু দরকার কিছু সহানুভূতিশীল মানুষের আশ্বাস, সান্ত্বনা এবং সমবেদনা।
সেই ছোটভাইটার আনন্দঘন ছবিগুলো দেখে চোখে পানি এসে গেল। কি অসহনীয় সময় পার করছে সে অনিশ্চয়তার মাঝে ভাবতেও পারছি না। আর আমরা এদিকে কাঁদা ছুঁড়ে যাচ্ছি।
যুক্তি তর্কে রাজনীতি রাজনীতি খেলতে গিয়ে তোমার কষ্টে শরীক হতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দিও ভাইয়া……