ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

বিবিসি টেলিভিশন ধারাবাহিকভাবে একটি ডকুমেন্টরী প্রচার করেছিল যার শিরোনাম ছিল ‘থিংস টু ডু বিফোর ইউ ডাই’। তবে দর্শনীয় স্থান বিষয়ক প্রমামাণ্যচিত্র হওয়ায় এর ভাবানুবাদ করা যায় ‘মৃত্যুর পূর্বে যে স্থানগুলো অবশ্যই দেখবেন’। পঞ্চাশ পর্বের ধারাবাহিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ (কর্তৃপক্ষের বিবেচনায়) পঞ্চাশটি পর্যটন আকর্ষণকে তুলে ধরা হয়েছিল। তালিকার শীর্ষে ছিল পেরুর বিস্ময়কর স্থাপত্য নিদর্শন মাচুপিচু। মিশরের পিরামিড, আগ্রার তাজমহল, মাউন্ট এভারেস্ট, গ্রেট ব্যরিয়ার রীফ, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, নায়াগ্রা ও ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত, মিশর ও সুদান সীমান্তে অবস্থিত আবু সিম্বেল টেম্পল সহ অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার বৈশিষ্ট্যসমূহ খুব সাবলীলভাবে তুলে ধরেছিল। একটি পর্ব ছিল ইতালীর ঐতিহাসিক নগরী ভেনিসকে নিয়ে। তখন থেকেই গভীর আকাংখা ছিল একবার ভেনিস নগরীতে ঘুরতে যাবার।

ডেনমার্ক থেকে রওয়ানা দেবার আগেই স্লোভেনিয়া ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ট্যুরিজম বিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনা আমাদের দেওয়া হয়েছিল যেন আমরা এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্প সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাই। সেখানেই জানলাম স্লোভেনিয়ান বর্ডার থেকে মাত্র একশ আঠান্ন কিলোমিটার দূরেই সেই স্বপ্ননগরী! কিন্তু লুবলিয়ানা যাবার পরে ব্যস্ততা এত বেড়ে গেল যে কোনমতেই সময় সুযোগ বের করতে পারছিলাম না। হঠাৎ করে টিচার ক্লাসে একদিন বললেন, তার কোর্সে আমাদের গ্র“প প্রজেক্ট পেপার করতে হবে যে কোন পর্যটন বিষয়ক ইভেন্ট নিয়ে। অর্থাৎ সেই স্পটে যেতে হবে, বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে তার ট্যুরিজম বিষয়ক গুরুত্ব খুঁজে বের করতে হবে এবং সেই আয়োজনটিকে আরো কীভাবে ইউজফুল করা যায় সে বিষয়ে নতুন আইডিয়া জেনারেট করতে হবে।

সবাই খুঁজতে শুরু করলাম কোন বিষয় নিয়ে কাজ করা যায়। গ্র“প মিটিংয়ে অনেকগুলো বিকল্প প্রস্তাব আসল যার মধ্যে ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় বীচ, আল্পস পর্বতমালার স্কী স্পট, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, ইতালীর রোম, ক্রোয়েশিয়ার জাগরেব, জার্মানীর বার্লিন উল্লেখযোগ্য। সবগুলোই স্লোভেনিয়া বা তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রে তাই যেতে (পরিবহন ও ভিসা সংক্রান্ত) সমস্যা হবে না। তাছাড়া সিংহভাগ খরচ কর্তৃপক্ষ বহন করে বলে আমাদের সেদিক নিয়েও কোন টেনশন ছিল না। কিন্তু বিষয়গুলো নিয়ে টিচারের সাথে আলাপ করতে গেলে তিনি বললেন, তোমরা ‘ভেনিস কার্ণিভাল’ এর কথা বিবেচনা করছ না কেন? আসলে আমাদের গ্র“পের সদস্যরা ছিল এশিয়ান, আফ্রিকান, রাশিয়ান ও আর্মেনিয়ান; ফলে জানাই ছিল না যে সপ্তাহখানেক পরেই বিখ্যাত সেই কার্ণিভাল শুরু হতে যাচ্ছে। তাই সবাই একবাক্যে রাজী হয়ে গেল। শুরু হলো আমাদের ভেনিস প্রজেক্ট।

ঠিক মনে পড়ছে না প্রথম কীভাবে ভেনিস বিষয়ে জেনেছিলাম। তবে একটি রম্যগল্প এবং একটি রম্যনাটক ছোটবেলায় মনে খুব দাগ কেটেছিল যেগুলি ভেনিস নগরীর ঘটনাবলী নিয়ে রচিত। একটি ছিল সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘রসগোল্লা’ সেখানে পড়া দুটি শব্দ (চুঙ্গিওয়ালা, বাক্সপেট্রা) এখনো খুব মনে আছে। আরেকটি ছিল চারশ বছর আগে সেক্সপীয়রের লেখা ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’। সেখানে বন্ধুত্বের প্রতি অসম্মান এবং ধর্মীয় দ্বন্দ্বের বিষয়টি খুব নাড়া দিয়েছিল। পাশাপাশি নায়কের স্ত্রী পোর্শিয়ার বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। তবে সত্যি কথা বলতে কী যে পাড়াগাঁয়ে জন্মেছি তাতে ক্লাস সেভেনে পড়াকালে (রসগোল্লা গল্পটি সিলেবাসে ছিল) কল্পনাও করিনি যে সেই ভেনিস নগরীতে কখনো সত্যিই যেতে পারব! কিন্তু গত ফেব্র“য়ারিতে সেটাই বাস্তবে পরিণত হয় যা জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলিকে সামান্য হলেও সমৃদ্ধ করেছে।

ইউরোপে ভ্রমণের সুবিধাজনক একটি দিক হলো ‘ইউরো রেল’। তাই সিদ্ধান্ত হলো আন্ত:দেশীয় ট্রেনে লুবলিয়ানা থেকে ভেনিস যাবার। হাঙ্গেরীর বুদাপেস্ট থেকে বেলা পাঁচটায় ছেড়ে আসা ট্রেন ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেব হয়ে স্লোভেনিয়ার রাজধানীতে পৌঁছল রাত আড়াইটায়। প্লাটফর্মে যখন গিয়ে দাঁড়ালাম তখন মনে হচ্ছিল বাতাস শরীরের মধ্যে কেটে ঢুকছে কারণ তখন তাপমাত্রা (নাকি শীতমাত্রা!) ছিল মাইনাস নয় ডিগ্রী! ট্রেনে উঠার পরে নিশ্চিন্তে সবাই ঘুমের আয়োজন করলাম কারণ ভেনিসের সেন্ট লুসিয়া স্টেশনই ছিল ঐ ট্রেনের লাস্ট স্টপেজ। মাঝে দু’একবার ঘুম ভেঙ্গেছিল কিন্তু ভোরের লাল সূর্য যখন জানালা দিয়ে উঁকি দিল তখন হঠাৎ মনে হলো আমাদের ট্রেনটি চলছে পানির ওপর দিয়ে! দু’পাশে শুধু পানি আর পানি, দূরের বিল্ডিংগুলোও পানির ওপর দাঁড়ানো বলে মনে হচ্ছিল। সাড়ে ছয়টার দিকে আমরা নামলাম কাঙ্খিত গন্তব্যে। তবে বাইরে প্রচন্ড শীত হওয়ায় স্টেশনের ভেতরেই এক রেস্টুরেন্টে বসলাম। উদ্দেশ্য হলো ফ্রেশ হওয়া, নাস্তা করা, আর কিছুটা সময় কাটানো।

দু’সপ্তাহব্যাপী কার্নিভালের সেটি ছিল উদ্বোধনী দিন। আমরা কথাপ্রসঙ্গে একজনের কাছে জানতে চাইলে বললেন, বেলা দুইটায় কার্ণিভালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এই সময়ের মধ্যে শহরটি ঘুরে দেখার। আমার কাছে বিশেষ আকর্ষণ ছিল স্কুলের পাঠ্য বইয়ে যার জীবনী পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম সেই লিওনার্দ দ্যা ভিঞ্চির কর্ম নিয়ে গড়ে ওঠা যাদুঘরটি দেখার। কেউ কেউ বলছিল রোমিও-জুলিয়েটের শহর ‘ভেরনা’য় যাবার জন্য। কিন্তু দুরত্ব বেশি হওয়ায় আপাতত সেটা স্থগিত রেখে শুরু হলো রেনেসাঁ ও ক্রুসেডের সাথে নিবিঢ়ভাবে জড়িত ভেনিস শহর দেখা। নৌপথে চলাচল ও মালামাল বহণের সুবিধার্থে পৃথিবীর প্রাচীন (প্রায়) সব নগরী গড়ে উঠেছিল প্রবাহমান নদীর তীরে। তাই ভেনিস নগরীও নদীর তীরে অবস্থিত সে বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করার তেমন কারণ ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হলো কতোটা নদী থাকলে সেটাকে স্বাভাবিক বলে ধরা যাবে? সারাদিন হাঁটার পরে আমাদের ধারণা যে অন্তত ৫০/৬০টা ব্রীজ শতাধিকবার পার হয়েছি! আসলে পুরো শহরটি হলো অসংখ্য দ্বীপের সমস্টি। অসংখ্য বলা ঠিক হবে না; সংখ্যাটি হলো ১১৭। আর সেই দ্বীপগুলোকে যুক্ত করা হয়েছে মাত্র ৪০৯টি ব্রীজ দিয়ে!!! নগরের যে দিক দিয়েই প্রবেশ করেন না কেন নৌকা অথবা পায়ে হাঁটা ছাড়া আর কোন বিকল্প বাহন নেই।

আজ মনে হয় ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন, তাই শেষ করি…আগামী পর্বে বাকীটা বলব। লেখাটি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।