ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 
আমি এই ব্লগে এযাবৎ যা লিখেছি তার পিছনে যে দুটি ধারণা ক্রিয়াশীল রাখার চেষ্টা করেছি তা হলো ব্যক্তির আত্মমর্যাদাবোধ ও অন্যের প্রতি মমত্ববোধের ধারণা। এদুটি নীতিকে আমি অক্ষ হিসেবে নিয়ে লিখতে চেষ্টা করেছি। আমার ধারণায়, ব্যক্তির এই মর্যাদা ঈশ্বরের এমন উপহার যা অপরিহার্য আর অন্যের প্রতি মমত্ববোধ মানুষের এমন কর্তব্য যা অপরিত্যাজ্য।

ঈশ্বর, জগত ও ব্যক্তি এক নয়, তিন। জগত ব্যক্তির দেশ ও ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করার সাধনার ক্ষেত্র। ঈশ্বর সেই সাধনায় একই সাথে ব্যক্তির আদর্শ ও লক্ষ্য। ব্যক্তিরা স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্য থেকে আসে ব্যক্তির মর্যাদা। মর্যাদা থেকে আসে স্বাধীনতা। প্রত্যেক ব্যক্তি মানুষের মর্যাদা সমগ্র প্রকৃতির ঊর্ধ্বে। সকল ব্যক্তি মানুষ সমমর্যাদার অধিকারী। ব্যক্তি যখন প্রকৃতি, অন্য ব্যক্তি, মানুষের সৃষ্ট যে কোন ধারণা বা সংস্থা, অথবা সমষ্টির কাছে নিজেকে অবনত করে বা সমর্পণ করে তখন সে তার মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্যকে পরিত্যাগ করে। তবে প্রতিটি ব্যক্তি স্বাধীন থেকে যায় তার নিজের জীবনের পথ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে।

সকল ধর্মই অন্যের প্রতি মমতাকে অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছে। তবে সমস্ত কোরান জুড়ে ঈশ্বরের একত্ব ও উপাসনায় ঈশ্বরের সাথে কাউকে অংশীদার না করার যে প্রবল আবেদন আমরা শুনতে পাই তার সাথে এই মর্যাদার সম্পর্ক প্রত্যক্ষ ও অবিচ্ছেদ্য। আপত্তি করা যেতে পারে, ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করাও ব্যক্তির স্বাধীনতা, মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্যের জন্য হানিকর। দার্শনিক সার্ত্রের ভয়টি ছিল সম্ভবত এখানেই। তাঁর বিবেচনায় যাকিছু ব্যক্তির স্বাধীনতার জন্য প্রতিবন্ধক তার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র বিরাগ।

কিন্তু মানুষকে তো এক বা একাধিক কারও না কারও কাছে নিজেকে সমর্পণ করতেই হয়: হয় নিজের ইচ্ছা ও বাসনার কাছে, নয় অন্য মানুষের ইচ্ছা ও শিক্ষার কাছে, নয়তো কোন কর্তৃপক্ষ বা সিস্টেমের কাছে। মানবিকতা বা মানবিক মূল্যবোধকেও মানুষ নিজেকে সমর্পণের চূড়ান্ত বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। জীবনের স্বাধীনতার অর্থ তো মরুভূমিতে পথ হারিয়ে যেদিক ইচ্ছা সেদিক যাওয়ার ব্যাপার নয়। কাজেই সার্ত্রে ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন এ কথা বলা হলে কি খুবই অত্যুক্তি হয়?

কোরানে তিনটি শব্দ আছে: কারামাহ, ফাদিলাহ ও দারাজাহ। কারামাহ অর্থ মর্যাদা, যা আদমের সব সন্তানের জন্য সমমানে প্রযোজ্য। ফাদিলাহ অর্থ দান বা উপকারী বিষয়াবলী, এখানে প্রাকৃতিকভাবেই বিভিন্নতা রয়েছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষক বা শ্রমিক – এদের এককে প্রদত্ত (বা এক কর্তৃক অর্জিত) ফাদিলাহ অন্যের সাথে সংশ্লিষ্ট ফাদিলাহ’র সমরূপ নয়। দারাজাহ অর্থ দায়িত্বশীলতার সাংগঠনিক কাঠামোয় অবস্থান। একটি সংস্থার প্রধান ও উপপ্রধানের এরূপ অবস্থানে পার্থক্য আছে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ফাদিলাহ ও দারাজাহ’তে পার্থক্য থাকলেও কারামাহ’তে কোন ফারাক নেই।

কারামাহ, ফাদিলাহ ও দারাজাহ এর অর্থসমূহকে গুলিয়ে ফেলে আমরা কোরানকে পুরুষতন্ত্রের ও বৈষম্যরক্ষী মূল্যবোধের প্রবক্তা বানিয়ে বসেছি। আমরা ফাদিলাহ ও দারাজাহ’তে বিদ্যমান এই পার্থক্য থেকে কারামাহ বা মর্যাদায় পার্থক্যটি করে বসেছি। এখানে ভুল ধারণা নিরসনের উদ্দেশ্যে একটি কথা পরিষ্কার করে নেয়া ভাল হবে। মানুষে মানুষে মর্যাদা বা কারামাহ’য়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর দৃষ্টিতে বা বিচারে পার্থক্য আছে। তাঁর কাছে সে-ই বেশী মর্যাদার অধিকারী যে চিন্তা ও আচরণে বেশী সচেতন, সাবধান ও বিচারশীল। কিন্তু এ থেকে একথা বলা যাবে না যে, আমরা মানুষেরাই সে বিচার করে মানুষে মানুষে মর্যাদায় বৈষম্য করতে পারব। নবীদেরকে আল্লাহ ফাদিলাহ ও দারাজাহ এর ক্ষেত্রে সমরূপ করেননি, কিন্তু আমাদেরকে বলেছেন তাঁদের মধ্যে কোন পার্থক্য না করতে। কারামাহ’য়ের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

ফজিলত ও দারাজাতের দিক থেকে আধিক্য অর্জনকে আভিজাত্যের বা অহংকারের ভিত্তি হিসেবে নেয়াটা হচ্ছে একজনের অকৃতজ্ঞতার চূড়ান্ত প্রকাশ। আদর্শ সমাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সকলেই সেখানে জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলো সমভাবে লাভ করবে। এরূপ অবস্থার দিকে যাওয়ার জন্য আমাদের সংগ্রামের মধ্যে রয়েছে আমাদের প্রকৃত ভালোমানুষিটা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তার বিপরীত – অর্থাৎ অসম বণ্টনটা থেকেই যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমার গায়ে ভাল জামাটি অন্যের জামার অভাব থেকে এসেছে। কাজেই যার গায়ে জামা নেই তারই বরং আমার সামনে বড়াই করার কথা, আর আমার থাকার কথা এপোলোজেটিক হিসেবে। তা না করে আমরা করছি পুরো উল্টোটা।

মানুষ নিজেকে অন্যের কাছে অবনত করে কেন? লোভ ও ভয়ই এর কারণ। বেশী ফজিলতের অধিকারী মানুষের কাছে মানুষ লোভের বশে নিজেকে খাট করে। বেশী দারাজাতের মানুষের কাছে মানুষ ভয়ের বশে নিজেকে খাট করে। যারা ফজিলত ও দারাজাতে আধিক্য লাভ করে তারা কারামা’য় আধিক্য প্রত্যাশা করে এবং নিজেদেরকে অভিজাত শ্রেণীভুক্ত হিসেবে গ্রহণ করতে অন্যদেরকে ‘শিক্ষিত’ করে তুলতে চায়। ফলে তৈরি হয় বৈষম্যরক্ষী সামাজিক মূল্যবোধ। আবেগের বশেও মানুষ নিজেকে খাট করতে পারে। অনেকে এই আবেগকে ব্যবহার করে রেজিমেন্টেশনের জন্য, আদর্শ বা স্বার্থের লড়াইয়ে সৈন্য তৈরির উদ্দেশ্যে। স্বজাতি, স্বধর্মী, স্বদেশী, স্বশ্রেণী ইত্যাদি নানা ভাবরসে নানা ধরণের সাম্প্রদায়িক অন্ধ আনুগত্যের ক্ষেত্র তৈরি করা যায় আবেগকে ব্যবহার করে। ব্যক্তি তখন সমষ্টির কাছে বিচারবর্জিভাবে আত্মসমর্পণ করে।

তাহলে কি আমরা সমাজবদ্ধ থাকব না? আমাদেরকে সব সংগঠন বিলুপ্ত করতে হবে? সবাইকে সমান বেতন দিতে হবে? না, আমার এখনকার ওকালতিটা হচ্ছে, মনের মধ্যে প্রথম পরিবর্তন আনার পক্ষে। আমি যদি ডাক্তার হই তবে আমার কর্তব্যের একটি বিশেষ ক্ষেত্র তৈরি হয়, মর্যাদায় কোন বৃদ্ধি ঘটে না। আমি যদি কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হই তবে আমার দায়িত্বের ব্যাপ্তি বাড়ে, মর্যাদায় কোন প্রসার ঘটে না। আমি যদি কৃষক বা শ্রমিক হই তবে আমার কর্তব্যক্ষেত্র চিহ্নিত হয় কিন্তু মর্যাদায় কোন হ্রাস ঘটে না। আমার ওকালতিটা এখানে, এই নীতিকে মনেপ্রাণে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার পক্ষে। এটা করা গেলে যার সাথেই আমার সাক্ষাৎ ঘটবে, যার সাথেই আমি কিছু কাজে-ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ব তার সাথে আচরণে এর একটি স্পষ্ট প্রভাব নিশ্চয়ই দেখা যাবে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী