ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

আল্লাহ তাঁর রাসুলগণকে পাঠিয়েছেন মানুষের কাছে তাঁর বাণীসহ। এই বাণী ছিল সমাজের ব্যক্তিদের প্রতি। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিটি ব্যক্তি যেন তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে নিজের জীবনকে রূপান্তরিত করে। কিন্তু রাসুলদের জীবনের যে চিত্র আমরা কোরানে পাই তাতে দেখি, তাঁদের জীবন কুসুমে আস্তীর্ণ ছিল না; সমাজ থেকে তাঁরা প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। বাধা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই তাঁদেরকে অগ্রসর হতে হয়েছে। আমরা জানি তাঁরা সুনীতির অবতার এবং সুন্দর আচরণের আদর্শ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। আমার সাদামাটা দাবী, তাঁদের নীতিগুলো প্রতিষ্ঠিত ছিল ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সামাজিক চুক্তির উপর। এ নিয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিরা গবেষণা ও প্রকল্প রচনা করতে পারেন।

প্রথম নীতিটি হলো ব্যক্তির স্বাধীনতার নীতি। মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করার অধিকার তাঁদের আছে বলে তাঁরা মনে করতেন। নীতিগতভাবে এটি তাঁদের প্রত্যেকের নিজের স্বাধীনতারই অন্তর্গত। একইভাবে, অন্য ব্যক্তিরা তাঁদের আহ্বানে সাড়া দেবে কি দেবে না তার অধিকারও অন্য ব্যক্তিদের ছিল। মানুষকে নবীদের আহ্বানে সাড়া না দেবার জন্য মানুষের প্রতি আবেদন করার অধিকারকেও নবীরা অস্বীকার করেননি কখনও। তাহলে নবী ও তাঁর অনুসারীদের উপর অত্যাচার-নিপীড়নমূলক বিরোধের সূত্রপাত হলো কেন ও কিভাবে? অপর পক্ষ একইভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতার নীতি মেনে চললে তো পরিস্থিতি এরকম হবার কথা ছিল না।

রাসুলের অবস্থান আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। আল্লাহ নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তিনি তাঁকে অন্যদের কাছে ‘হাফিয’ বা ‘ওয়াকিল’ করে পাঠাননি। কোরানের ৪:৮০ আয়াতে বলা হয়েছে, “যে নবীকে অনুসরণ করে সে আল্লাহকেই অনুসরণ করে। আমরা তোমাকে তাদের সংরক্ষক (হাফিজ) করে প্রেরণ করিনি।” ১৭:৫৪ আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমার প্রতিপালক তোমাকে ভালভাবে জানেন। তিনি ইচ্ছে করলে তোমাকে করুণা করেন, ইচ্ছে করলে তোমাকে কষ্টের মধ্যে ফেলেন: আমরা তোমাকে তাদের কাজের বিধায়ক (ওয়াকিল) করে প্রেরণ করিনি।” ৪২:৪৮ আয়াতে বলা হয়েছে, “যদি তারা তোমার নিকট থেকে সরে যায়, তবে আমরা তো তোমাকে তাদের সংরক্ষক (হাফিজ) করে প্রেরণ করিনি।”

যারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তাদের নেতারা নবীদের বিরুদ্ধে সমাজের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ ও ব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলার অভিযোগই করেছিল। মানুষেরা সকলে মিলে নবীদের কথায় সাড়া দিয়ে তা যদি ভেঙ্গে ফেলতেই চায় তবে তা সংরক্ষণ করতে যাবে কেন এসব নেতারা? বা এ অধিকার তাদেরকে দিয়েছিলইবা কে? এসব প্রশ্নের একটি উত্তরই তাদের কাছে ছিল: আমরা সমাজের স্বঘোষিত অভিভাবক, মানুষের ‘ভাল’ আমরা বুঝি এবং তাদের অনিচ্ছায়ও তাদের ‘ভাল’ করাটা আমাদের কর্তব্য কাজ।

ব্যক্তিস্বাধীনতার উপরই কোরানের আদর্শের ডিফেন্স লাইনটি অঙ্কিত হয়েছে। কোন মুসলিম তাই শক্তি প্রয়োগে, প্রলোভন দেখিয়ে, বেকায়দায় ফেলে কাউকে নবীদের আদর্শের দিকে আসতে বাধ্য করতে পারে না। মানুষের চিন্তার কাছে, বুদ্ধির কাছে আবেদন করা ছাড়া এ উদ্দেশ্যে আর অন্য কোন পথ খোঁজার অধিকারও তাকে দেয়া হয়নি। ‘লা ইকরাহা ফিদ্দিন (মতাদর্শে কোন শক্তি প্রয়োগ নেই)’ বা ‘লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিন (আমার আদর্শ ও তার পরিণতি আমার, তোমাদের আদর্শ ও তার পরিণতি তোমাদের)’ এর কথা আমরা অনেকেই জানি। একই সাথে মুসলিমদেরকে আদেশ করা হয়েছে অন্যের উপর অত্যাচার করা থেকে বিরত থাকতে। অভিব্যক্ত এই জগত সম্বন্ধীয় চূড়ান্ত কথা আমাদের বুদ্ধিপ্রসূত জ্ঞানের কাছে গুপ্ত হয়ে আছে, রহস্য হয়ে আছে বিধায় বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের চূড়ান্ত মীমাংসার স্থান এই জগত নয়। এবিষয়ে কোরানে আমরা পাই প্রতীক্ষার নীতি।

কিন্তু যারা নবীকে রুদ্ধ করতে চেয়েছিল তারা নবীর অনুসারীদের উপর অত্যাচার করে নিজেরাই এই ডিফেন্স লাইনটি অতিক্রম করেছিল। তাই মুসলিমদের সমর্থনে আল্লাহ তাদের এই কাজের নিন্দা করেছেন। তাদের একাজকে আখ্যায়িত করা হয়েছে প্রকাশ্য সীমালঙ্ঘন বলে। একইভাবে, কেবলমাত্র অবিশ্বাসের কারণে মুসলিমরা কারও উপর অত্যাচার করলে তারাও যুক্তির এই ডিফেন্স লাইনটি অতিক্রম করে আগ্রাসী হয়, অত্যাচারী হয়।

আমরা নবীর কথা হিসেবে শুনেছি, অন্য ধর্মাবলম্বীর উপর যে মুসলিম অত্যাচার করবে তার বিরুদ্ধে তিনি নিজে সেই অত্যাচারিতের পক্ষে দাঁড়াবেন হাশরের মাঠে। অন্যদিকে, বিপরীত ক্ষেত্রে – অর্থাৎ মুসলিমরাই যদি অন্যদের দ্বারা অত্যাচারিত হয় – অত্যাচারিত মুসলিমের পক্ষ নিয়ে হাশরের ময়দানে দাঁড়ানোর কথা তিনি বলেছেন বলে শোনা যায়নি। নবীর এরকম অবস্থানের কারণ কি হতে পারে? আমার বিবেচনায়, মুসলিমদের নিজেদের দায়িত্ব নিজেদের রক্ষা করা, না পারলে সহ্য করা। এ দায় তাদের উপর বর্তায় নবীকে নবী হিসেবে গ্রহণমূলে। কিন্তু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দায়দায়িত্ব ঠিক করে দেয়া নবীর হাতে নেই যেহেতু তারা নবীকে গ্রহণ করেন না। কাজেই নবীর অনুসারীদের দ্বারা অত্যাচারিত হলে তারা এর জন্য স্বয়ং নবীকেই দায়ী করে বসতে পারেন। অধিকন্তু, এই অত্যাচারের মাধ্যমে অত্যাচারী মুসলিমরা ইসলাম ধর্মের যৌক্তিক ডিফেন্স লাইনটি সমূলে উৎপাটিত করে ও অন্য মুসলিমদেরকে যুক্তির দিক থেকে ডিফেন্সলেস ও বাস্তব দিক থেকে বিপন্ন করে তুলে।

অন্যদিকে, নবীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্বাধীনভাবে কৃত সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে। নবীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে একজন আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এই সমর্পণ প্রধানত আল্লাহর সাথে সমর্পণকারীর চুক্তি বা কাভনেন্ট এবং এর ফলিত দিক হচ্ছে নবীর কাছে আসা বাণীকে অবলম্বন করে জীবন গড়ে তোলার প্রয়াস। নবী মুসলিম ছাড়াও অন্যদের সাথে চুক্তি করেছিলেন। সেক্ষেত্রেও পারস্পরিক কর্তব্য চুক্তির ধারা অনুসারে নির্ধারিত হয়েছিল।

মদিনায় নবীকে আমরা দেখি অন্যান্য গোত্রগুলোর সাথেও প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হতে। সাধারণত মনে করা হয় নবী সকলের সরাসরি শাসক ছিলেন। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন আরবিট্রেটর। ধর্ম নির্বিশেষে সব গোত্র নিজেদের প্রধান দ্বারা শাসিত হতো। চুক্তিবদ্ধ গোত্রসমূহের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে তিনি মীমাংসা করতেন এবং তাঁর মীমাংসা মেনে নেয়া তাদের জন্য চুক্তিমূলে বাধ্যতা হিসেবে ছিল। আক্রান্ত হলে প্রতিরক্ষার সময় তিনি চুক্তিবদ্ধ সব গোত্রকে আহ্বান করতেন যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য এবং নিজেই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতেন।

ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সকল গোত্র স্বায়ত্তশাসিত ছিল। সকলে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতো, নিজ নিজ ধর্ম অনুসারে তারা নিজেদের পরিচালনা করতো। নবী এখানে তাঁর নিকট আসা বিধানাবলী অনুসরণ করতেন তাঁকে যারা নবী হিসেবে গ্রহণ করেছিল তাদের ক্ষেত্রে। নবী কোন সম্প্রদায়ের নিজেদের কর্মকাণ্ডে এবং তাদের ধর্মীয় বিষয়-আশয়ে হস্তক্ষেপ করেননি।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী